kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

তারুণ্য জাগলেই দেশ দাঁড়াবে

ড. শফিক আশরাফ   

১ নভেম্বর, ২০২০ ০৩:২৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তারুণ্য জাগলেই দেশ দাঁড়াবে

যুগে যুগে পৃথিবীর বাঁক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তরুণরা। আমরা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো কথাটিকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, দুরন্ত ও দুঃসাহসী তরুণরা যদি ঘরের খেয়ে বনের মোষ না তাড়াত, তাহলে এই পৃথিবী মানুষের বাসযোগ্য হতো না। আমরা পেতাম না আবাদযোগ্য বিস্তীর্ণ চাষের জমি। তারুণ্যের শক্তিতে ভর করেই রাজা শুদ্ধোধনের পুত্র রাজকুমার সিদ্ধার্থ ভিখারিরূপে বেরিয়ে পড়েছিলেন মানবকল্যাণের চিন্তা মাথায় নিয়ে। কাজেই বলা যায়, পৃথিবীর ইতিহাস তৈরি করেছে তরুণরা। পৃথিবীর বড় বড় শিল্পী-সাহিত্যিক তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন। আমাদের রবীন্দ্রনাথ-নজরুল তো রীতিমতো তারুণ্যের বন্দনা করেছেন। আর তাঁরা বন্দনা করবেন না-ই বা কেন! আমরা যদি আমাদের সাম্প্রতিক সময়ে ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে তারুণ্যের উদাহরণযোগ্য অনেক ঘটনাই দেখতে পাব। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত তারুণ্যের মহাবিস্ফোরণ। তারা রাষ্ট্রভাষা কমিটির মূল সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ও পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে এসে যে ইতিহাস তৈরি করেছে, সেটা আসলে তারুণ্যের ইতিহাস। আবার এই সময়ে তারুণ্যের বুকে বন্দুক তাক করার কারণে পাকিস্তানিদের এ দেশ থেকে বিদায়ের হিসাব নিশ্চিত হয়। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সুসজ্জিত এবং পৃথিবীর একটা দক্ষ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল এ দেশের লাখ লাখ তরুণ তাদের তারুণ্যের শক্তি ও সাহস নিয়ে। আর পাকিস্তান সেনাবাহিনী মূলত পরাজয়বরণ করেছিল এই তারুণ্যের কাছেই।

বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গবেষকরা বলেছেন, বিগত নিরানব্বইয়ের জাতীয় নির্বাচনে ভোটের হিসাবকে ওলট-পালট করে দিয়েছিল তরুণদের ভোট। তাদের সামনে সেই সময়ে তুলে ধরা হয়েছিল ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নকে ছোঁয়ার আশায় তারা ভোটের হিসাব পাল্টে দিয়েছিল। অর্থাৎ এ কথা সহজেই বলা যায়, তরুণরা চাইলেই ইতিহাস বদলে যায়, তরুণরা চাইলেই উল্টে দিতে পারে যেকোনো হিসাব-নিকাশ। কাজেই একটা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেমন হবে সেটা নির্ভর করছে সেই রাষ্ট্রের তারুণ্য কোন ধরনের চিন্তার ভেতর সময় কাটাচ্ছে। তরুণ-তরুণীদের মানসিক গঠনে, চিন্তা-চেতনা বিকাশে যেমন একটা পারিবারিক ভূমিকা থাকে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে রাষ্ট্রের। সমাজের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা, বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা, সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর এগুলোর ওপর অনেকটাই নির্ভর করে তারুণ্যের সুষ্ঠু বিকাশ।

আমাদের দেশে ব্রিটিশ পদ্ধতির ডাটাবেইস শিক্ষাব্যবস্থার অনেক দুর্বলতা রয়েছে। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থায় শুরুতেই শিশুদের শেখানো হয় গ্রুপওয়ার্ক। অর্থাৎ একটা কাজ সবাই মিলে কিভাবে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়। পরবর্তী সময়ে কর্মজীবনে তারা সেটা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগায়। কিন্তু বর্তমানে তরুণদের নিয়ে আমাদের দেশে সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এ দেশের তরুণদের বড় একটা অংশ পড়ালেখা শেষ করে কর্মহীনতার আতঙ্কে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিপথগামী হয়ে মাদক বা জঙ্গিবাদের দিকে ঝোঁকে। ইদানীং তারুণ্যের বড় একটা অংশ সময় অপচয় করছে ভার্চুয়ালজগতে বা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থেকে। সেখানে তারা ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়ে সারা দিন লাইক গুনে কিংবা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কুতর্কের মধ্যে তারা একটা ভ্রমের ভেতর হাবুডুবু খাচ্ছে, মূলত সেখান থেকে তাদের অর্জন হচ্ছে না কিছুই। কখনো কখনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী এসব সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই তরুণদের টার্গেট করে তাদের ঘর গোছানোর চেষ্টা করছে বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নানা প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। তারা তরুণদের অলস মাথার সুযোগ নিচ্ছে।

এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের উচিত তারুণ্য শক্তিকে কাজে লাগানোর কার্যকর কিছু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। শিক্ষা শেষে তরুণরা বেকার থাকবে না, এটা নিশ্চিত করা গেলেই সাফল্যের বড় ধাপের উত্তরণ ঘটে। আর এ জন্য প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষার চমৎকার কিছু পরিকল্পনা, যাতে তাদের অর্জিত জ্ঞান দেশে-বিদেশে সর্বত্র কাজে লাগাতে পারে। আশার কথা, এরই মধ্যে সরকার কারিগরি শিক্ষার প্রতি মনোযোগী হয়েছে। আবার এটাও বলা যায়, সেখানে বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে। দেশে জেলায় জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় করার চেয়েও জরুরি প্রান্তিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো। এ ছাড়া দেশের যে হাজার হাজার তরুণ জমিজমা, গরু-বাছুর বেচে, ঘটিবাটি বন্ধক রেখে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে গিয়ে কোনো একটা কাজের দক্ষতা নিয়ে দেশে ফিরে আসছে, তাদের সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণও হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস বদলে দেওয়ার একটা সিদ্ধান্ত। আমরা এখনো পরাধীনতার অদৃশ্য শিকল মনের মধ্যে বহন করে চলেছি। ফলে আমাদের পরিবার, আমাদের সমাজ তরুণদের মন্ত্র দেয়—‘চাকরি করো, চাকরি করো’। অর্থাৎ মধ্যবিত্তের একটা নিরাপদ অর্থনৈতিক শৃঙ্খলের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে পারলেই নিশ্চিত শান্তির জীবন বলে মনে করি। তাদের বলি না, তুমি এমন একটা কিছু করো, যাতে তুমি মানুষকে চাকরি দিতে পারো। এই মানসিকতা ভাঙার সময় এসেছে। তরুণদের উদ্যোক্তা হতে সাহায্য করতে রাষ্ট্রের প্রচার-প্রচারণা, তরুণদের দ্বারা বিভিন্ন ইনোভেশন কম্পিটিশনের আয়োজন ছাড়াও স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণসহ সার্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার দ্বার অবাধ করা প্রয়োজন। সরকারি চাকরিতে ঘুষ, দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করলে সমাজ মানসিকতারও কিছুটা পরিবর্তন আসবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চার বছরের অনার্স কোর্স কমপ্লিট করে একজন শিক্ষার্থী আবার মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। অথচ শিক্ষকতার মতো কিছু পেশা ছাড়া মাস্টার্স ডিগ্রি পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও খুব বেশি প্রয়োজন নেই। তরুণদের এই সময়ের অপচয় রোধেও পদক্ষেপ প্রয়োজন। এই সময়ে পৃথিবী একটা গ্লোবাল ভিলেজের স্বীকৃতি পাচ্ছে এবং মানুষের কারিগরি জ্ঞান কাজে লাগানোর জন্য উন্নত দেশের দরজা উন্মুক্ত রেখেছে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অনেক তরুণ তাদের শ্রম বিক্রি করে রাতারাতি নিজেদের ভাগ্যের চাকা বদলে ফেলেছে। এই দিকটাতেও সরকারের জরুরি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীর কোন দেশে কোন কোন ধরনের সহায়তা নিচ্ছে, সেই অনুযায়ী দেশের তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের দেশের যেসব মেধাবী তরুণ-তরুণী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাদের মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফিরিয়ে এনে কাজে লাগতে হবে। ব্রেনড্রেন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

তারুণ্য মূলত একটা পজিটিভ শক্তি, তারুণ্য একটা দেশের ঐশ্বরিক সম্পদ। এই তরুণরাই হিমালয় পর্বতের মাথায় দেশের পতাকা উড়িয়ে আসে, এই তারুণ্য শক্তিই ক্রিকেট কিংবা ফুটবলে নৈপুণ্য দেখিয়ে পৃথিবীর মানুষের মুখগুলো আমাদের দেশের দিকে ঘুরিয়ে আনে—বলে, দেখো, আমরা বাংলাদেশের তরুণ। তারা গুগল, নাসার মতো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বলে—আমিই বাংলাদেশ! কাজেই তারুণ্যের এই বাংলাদেশকে জাগাতে হবে। আর এই তারুণ্য জাগলেই দেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা