দেশে অনলাইন ও অফলাইন জুয়া প্রতিরোধ এবং মাদক কারবার ছড়ানো রুখতে ডগ স্কোয়াড গঠন, পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট হ্যাকিংয়ের সর্বোচ্চ সাজা ৫ বছর কারাদণ্ড নির্ধারণ এবং বগুড়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মোট চারটি আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সংসদ ভবনের মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ গুরুত্বপূর্ণ খসড়াগুলোর নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়েছে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জুয়ার বিস্তারে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ হওয়ায় অনলাইন ও অফলাইন নানা ধরনের জুয়া কার্যক্রম বিস্তার লাভ করছে। ফলে জনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রবণতা হ্রাস, আর্থসামাজিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধকল্পে এ সকল জুয়া কার্যক্রমের উপর সমসাময়িক উৎকর্ষিত প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করে যথাযথ তত্ত্বাবধান ও আইনগত কাঠামো প্রদানপূর্বক রাষ্ট্রের সার্বিক নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে হালনাগাদ ও যুগোপযোগী করে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়।
প্রস্তাবিত খসড়া আইনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
- জুয়া খেলা, জুয়ার স্থান, জুয়ার সামগ্রী, ডিজিটাল সম্পদ, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট, টোটালাইজেটর, অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া, বাজি বা পণ (বেটিং), বাজিকর (বুকমেকার), ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংসহ জুয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
- অপরাধের প্রকৃতি ভেদে বিভিন্ন ধরনের সাজার (অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড এবং উভয়দণ্ড) বিধান রাখা হয়েছে। পরে মন্ত্রিসভা কর্তৃক ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে।
সভায় ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে এই আইনের খসড়া উপস্থাপন করা হয়।
দেশের পাবলিক পরীক্ষাসমূহে নকল, প্রশ্নফাঁস, জাল সনদ প্রস্তুত এবং বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধের লক্ষ্যে ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৮০’ প্রণীত হয়। তবে, বর্তমান প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরীক্ষাসংক্রান্ত অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যমান আইনের বিভিন্ন ধারা সময়োপযোগী নয়। পাবলিক পরীক্ষাসমূহে সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং ডিজিটাল পদ্ধতি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরীক্ষাসংক্রান্ত অপরাধসমূহ এবং এর দণ্ড আইনের আওতায় আনয়নের উদ্দেশ্যে বিদ্যমান আইনে সংশোধন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
- পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বা মেধাতালিকায় হ্যাকিং বা অবৈধভাবে পরিবর্তন করাকে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ শিরোনামে নতুন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
- ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
- পাবলিক পরীক্ষায় সংগঠিতভাবে পরীক্ষা জালিয়াতি বা চক্র গঠন করলে কঠোর শাস্তি এবং জরিমানার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এদিন সভায়, ‘বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৬’-এর খসড়াও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই আইনটির উদ্যোক্তাও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।
এই আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০১ গত ১৫ জুলাই ২০০১ তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশিত হলেও সেটি কার্যকর করা হয় নাই। বর্তমানে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিয়োগ ও শিক্ষা কার্যক্রম চালু প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিবর্তন করে বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, প্রকৌশল, কারিগরি, কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসা প্রশাসন, আইন, কৃষি ও চিকিৎসাবিজ্ঞান ইত্যাদিসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন ক্ষেত্রে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি, জ্ঞান চর্চা ও দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়।
একইসঙ্গে সভায় ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই আইনে বলা হয়েছে- মাদকদ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও চাহিদা হ্রাস, অপব্যবহার ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ২০১৮ সালের ৬৩ নম্বর আইন ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধিত, ২০২০)’ প্রণয়ন করা হয়। বর্তমান, মাদক পাচার ও অপব্যবহারের পরিবর্তিত ধরণ মাদকসংক্রান্ত প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার এবং বিচারিক কার্যক্রমে উদ্ভূত বাস্তব সমস্যাসমূহ নিরসনকল্পে আইনটির কতিপয় ধারা সংযোজন ও সংশোধন করে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়।
প্রস্তাবিত খসড়া আইনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
- বিচারিক কার্যক্রম জোরদারকরণে মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
- মাদকদ্রব্য সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার রোধে বিশেষ করে সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধ দমনে সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণের নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
- সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার প্রতিরোধ, অভিযান পরিচালনা ও আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
- মাদকদ্রব্য সহজেই শনাক্তকরণে ডগ স্কোয়াড গঠনের বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
মন্ত্রিসভা কর্তৃক ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সূত্র : বাসস




