রাজধানীর কয়েক এলাকায় আটটি আবাসন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঐশী প্রপার্টিজ। এর মধ্যে ছয়টি রয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাতেই। এই ছয় প্রকল্পে নির্মিত হবে ৯৬টি অ্যাপার্টমেন্ট। এ বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। তবে, এখনো একটি অ্যাপার্টমেন্টও বিক্রি করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
ঐশী প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান মো. আইয়ূব আলী গণমাধ্যমকে বলেন, সাধারণত প্রতি মাসে দু-তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। অথচ গত পাঁচ মাসে একটিও হয়নি। আসলে দুই বছর ধরেই আবাসন খাতের ব্যবসা খারাপ। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটার সম্ভাবনা থাকলেও ইরান যুদ্ধের কারণে তা হয়নি। নতুন করে করের বোঝাও চেপেছে। তাতে সামনের দিনে আবাসন ব্যবসায় টিকে থাকা চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন এই ব্যবসায়ী।
আবাসন খাতের অনেক উদ্যোক্তাই এমন শঙ্কায় আছেন। কারণ, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নির্মাণসামগ্রীর ওপর করহার বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুধু তা-ই নয়, ডেভেলপারদের কাছ থেকে পাওয়া ফ্ল্যাট বা অন্য যেকোনো আর্থিক সুবিধার ওপর জমির মালিকদের ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনসে ট্যাক্স আরোপ করেছেন তিনি।
কয়েকজন আবাসন ব্যবসায়ী বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে আবাসন খাতে মন্দাভাব চলছে। এ সময়ে প্রথমসারির প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যদের বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছিলেন তারা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তায় সেটি হয়নি। আবার কর আরোপের কারণে ব্যবসায়ে গতি ফেরাও কঠিন হবে। তার কারণ করের প্রভাবে খরচ বাড়বে। ফ্ল্যাটের দাম প্রতি বর্গফুটে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
আরো পড়ুন
নবম পে স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির বৈঠক আজ
দেশের অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসের সংস্কৃতি গড়ে উঠতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। তাতে ধীরে ধীরে আবাসন ব্যবসা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। অন্যদিকে ঢাকায় জমির উচ্চমূল্যের কারণে অনেক আগে থেকেই অ্যাপার্টমেন্টের দাম আকাশছোঁয়া। তাতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের নিচের মানুষের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট কেনাটা বেশ কঠিন। তারপরও এক হাজারের বেশি আবাসন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে দেশজুড়ে। তার বেশির ভাগই রাজধানী ঢাকায়। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে বছরে ৮ থেকে ১০ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট সরবরাহ করে থাকে।
ভবন নির্মাণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয় রডে। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের বাজেটে গর্দা বা মেলটেবল স্ক্র্যাপ থেকে উৎপাদন করা বিলেট এবং বিলেট উৎপাদিত প্রতি মেট্রিক টন রডের ওপর ভ্যাট ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া বাজেটের আগে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে সরকার।
আরো পড়ুন
রাজধানীতে হাসপাতালের ‘অক্সিজেন লাইনে লিকেজ’, শিশু মৃত্যুর অভিযোগ
গত সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলন করে ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) বলেছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন কর-শুল্ক কাঠামোর সম্মিলিত প্রভাবে প্রতি টন রড উৎপাদনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ মিলিয়ে অতিরিক্ত ১১–১২ হাজার টাকা ব্যয় বাড়তে পারে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রাহকের ওপর।
জানতে চাইলে ইস্পাত খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে রডের টনপ্রতি দাম দুই হাজার টাকা বাড়বে। এখন পর্যন্ত আমরা এই বাড়তি ব্যয়ের আংশিক সমন্বয় করেছি। বাকিটাও করতে হবে। নতুন করকাঠামোর কারণেও দাম বাড়বে। তবে আমরা বাজেট পাস না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছি।
আরো পড়ুন
প্রযুক্তিগত বিভ্রাটে জার্মানিজুড়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ
তিনি বলেন, বাজারের চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামের ওপর নির্ভর করবে দাম কতটুকু বাড়বে।
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, জমির মালিকদের প্রাথমিক সাইনিং মানির পাশাপাশি ডেভেলপারদের কাছ থেকে পাওয়া ফ্ল্যাট বা অন্য যেকোনো আর্থিক সুবিধার ওপরও ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স দিতে হবে। এত দিন সাইনিং মানির ওপর জমির মালিকদের শুধু ১৫ শতাংশ কর দিতে হতো।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের নেতারা বলছেন, জমির মালিকদের ওপর নতুন কর আবাসন খাতে নতুন সংকট তৈরি করবে। ২৪টি ফ্ল্যাটের একটি প্রকল্পে যদি ১২টি ফ্ল্যাট জমির মালিক পান এবং সেই ফ্ল্যাটগুলোর মূল্য ১২ কোটি টাকা হয়, তাহলে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর দিতে হবে। এতে ফ্ল্যাটের দাম আকাশচুম্বী হবে।
আরো পড়ুন
রাজধানীতে হাসপাতালের ‘অক্সিজেন লাইনে লিকেজ’, শিশু মৃত্যুর অভিযোগ
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষস্থানীয় আবাসন প্রতিষ্ঠান শেলটেকের বিক্রি কমেছে ২০ শতাংশ। জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে ফ্ল্যাটের বিক্রি কিছুটা বেড়েছিল। তবে চলতি মাসে বিক্রি আবার কমে গেছে। এমন তথ্য দিয়ে শেলটেকের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মো. শাহজাহান বলেন, জমির মালিকদের ওপর নতুন করের কারণে আবাসন খাতের গতি কমবে। ফ্ল্যাটের নিবন্ধনও কমে যাবে। তাতে সরকারের রাজস্ব হ্রাস পাবে।
এক প্রশ্নের জবাবে মো. শাহজাহান বলেন, প্রতিবছরই নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ছে। এবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন করের কারণে আরেক দফা বাড়বে। আবার জমির মালিকদের ওপরও কর বাড়ছে। ফলে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে।