kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

ভারতের করোনা পরিস্থিতি থেকে আমরা আদৌ কোনো শিক্ষা নিচ্ছি কি?

ড. প্রণব কুমার পান্ডে   

২৮ এপ্রিল, ২০২১ ১৫:২১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতের করোনা পরিস্থিতি থেকে আমরা আদৌ কোনো শিক্ষা নিচ্ছি কি?

গত কয়েকদিন যাবত ভারতে করোনা পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হয়েছে যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং মিডিয়ায় প্রচারিত রোগীদের আহাজারি এবং মৃত্যুর খবর সকলকেই ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছি ভারতের করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে চলে গেছে। বাংলাদেশের মিডিয়াতে ভারতের করোনা পরিস্থিতির ওপর, বিশেষ করে মানুষের আহাজারি এবং মৃত্যুর যে দৃশ্য প্রচার করা হচ্ছে সেটা সত্যিই বিচলিত হবার মত। গত কয়েকদিন যাবত সামাজিক গণমাধ্যমে প্রচারিত একটি ছবি সত্যিই আমাকে বিচলিত করেছে। সেই ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে একজন স্ত্রী তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিজের মুখ দিয়ে স্বামীর মুখে বাতাস দিয়ে যাচ্ছেন যদিও তিনি জানেন এটা করলেও তার স্বামীকে বাঁচানো যাবে না। তবে, স্বামীকে বাঁচানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা মানবতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এটিই শুধু একমাত্র ঘটনা নয়। এরকম হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে যেখানে দেখা গেছে যে করোনা রোগীর আত্মীয়স্বজন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের বাঁচানোর জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছেন যদিও তারা জানেন এটি একটি অত্যন্ত ভয়াবহ অসুখ। কিন্তু, সকল ধরনের ভয়াবহতার ঊর্ধ্বে উঠে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের পরিজনকে বাঁচানোর।

বাংলাদেশের মতো করোনাভাইরাস এর প্রথম ঢেউ এ ভারত খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল না। ফলে কয়েক মাস পরেই মানুষের জীবন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে পশ্চিম বাংলাসহ বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও মাদ্রাজ এবং কলকাতা হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের এই সময়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করেছেন। এছাড়াও, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মানুষের উন্মাদনা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদান এই অবস্থাকে আরো ত্বরান্বিত করেছে বলে অনেকেই মনে করেন। ফলে, অবস্থা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখান থেকে উত্তরণ পাওয়া খুব কঠিন।

এখন অনেকেই ভারতে কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটল সে বিষয়ে কারণ অনুসন্ধানে চেষ্টা করছেন। অনেকেই বলছেন যে নির্বাচনসহ মানুষের সুরক্ষা বিধি মানার ক্ষেত্রে অনীহা এই অবস্থার জন্য দায়ী। আবার অনেকেই বলছেন যে ভারতের ডাবল এবং ট্রিপল মিউট্যান্ট ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অথবা জন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখনো সেটিকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে সত্যিই যদি ট্রিপল মিউট্যান্ট ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যেয়ে থাকে, তবে সেটি অত্যন্ত বিপদজনক হবে কারণ এই ভাইরাস আগের ভাইরাসগুলো চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এটি অনেক বেশি গতিতে মানুষকে আক্রান্ত হতে পারবে। ভারতের এই অবস্থায় সাহায্য করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য সকল দেশ ভারতকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছে।

আমরা সকলেই জানি যে করোনা চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে অক্সিজেন। ভারতে ইতিমধ্যেই অক্সিজেন সরবরাহে ঘাটতি দেখা গেছে। আমরা দেখেছি সেখানে কিভাবে সরকারকে বিভিন্ন পেশার, ও শ্রেণীর মানুষ সহয়তা প্রদান করছে। ভারতে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী অর্থ দিয়ে সরকারকে সহায়তা করছেন। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী তাদের ব্যবসার ধরণ পরিবর্তন করে অক্সিজেন তৈরির জন্য কাজ করছেন। এটি সত্যি দেশাত্মবোধের একটি বড় পরিচয়। আমরা জানি যে ভারত আমাদের একেবারেই প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ভারতে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হলে বাংলাদেশে এক ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকবে এটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। এই ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই আসলে বাংলাদেশ সরকার ভারতের সাথে ১৪ দিন সকল ধরনের বর্ডার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ভারতে তান্ডব করা ভাইরাস যদি আমাদের দেশে প্রবেশ করে তাহলে অবস্থা আসলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে যে ভারতের অবস্থা দেখে আমরা আসলেই কি কোন শিক্ষা গ্রহণ করছি? সার্বিক ভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হই না যে আসলে আমরা আদৌ কোনো শিক্ষা গ্রহণ করছি। কারণ এখন পর্যন্ত মানুষের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে অনীহা দেখে মনে হয় যে করোনার ভয়াবহতা নিয়ে কারো মধ্যে কোন চিন্তা ভাবনা আছে। আবার পাশাপাশি আমরা এটাও লক্ষ্য করেছি যে করোনার সময় সরকার যেভাবে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান করছে, তেমনি ভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করে নি। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান করোনার প্রথম ধাক্কায় সহায়তা প্রদান করলেও দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় এখন পর্যন্ত সেই রকম কোনো সহায়তা নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি যেটি আমরা ভারতে দেখেছিলাম। বরং, বাংলাদেশে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো কি ভাবে সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা আদায় করা যায় সে চেষ্টায় সবসময় ব্যস্ত রয়েছে। এই ধরণের মানসিকতা কখনোই দেশাত্মবোধের পরিচায়ক হতে পারে না। তাছাড়া, আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে এক ধরনের মানসিকতা রয়েছে যে কোনো ধরনের বিপদ থেকে দেশকে রক্ষা করার সকল দায়-দায়িত্ব আসলে সরকারের। এটি কখনোই কাম্য নয়।

একটি দেশ তখনই উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাবে যখন সরকার, জনগণ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুঘটকগুলো একসঙ্গে কাজ করার একটি পরিবেশ তৈরি হবে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সেই ধরণের পরিবেশের এখনো গড়ে ওঠেনি। বরং সব সময় এক ধরনের দোষারোপের রাজনীতির চর্চা এখানে বিদ্যমান। বিরোধী দলগুলো বিপদের সময় সরকারের পাশে না দাঁড়িয়ে সরকারের বিভিন্ন কাজের সমালোচনায় ব্যস্ত রয়েছে। এই ধরনের মনমানসিকতা নিয়ে যদি রাজনৈতিক দলগুলো এগিয়ে চলে তবে আসলেই করোনা মহামারীর মত এই দুর্যোগ মোকাবেলা করা সরকারের পক্ষে সত্যিই খুবই কঠিন একটি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

এই মুহূর্তে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল করোনা মহামারীর ভয়াবহতা সম্পর্কে এবং সুরক্ষা বিধিমালা মেনে চলার ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে বাংলাদেশে যদি করোনা পরিস্থিতি এর চেয়েও খারাপ হয়ে যায় তাহলে সবচেয়ে জরুরিভাবে যেটি প্রয়োজন সেটি অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা। অক্সিজেন সরবরাহ

যদি কমে যায় তাহলে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা খুবই কঠিন। আমরা জানি যে বাংলাদেশ ভারত থেকে অক্সিজেন আমদানি করে। কিন্তু, বর্তমানে ভারতে অক্সিজেনের ঘাটতি এতটাই প্রকট যে ভারত রপ্তানি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এই মুহূর্তে সরকারের মূল কাজ হবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা অথবা বাইরে থেকে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা। ভারত ইতিমধ্যে জার্মানি থেকে অক্সিজেন প্লান্ট নিয়ে এসে দেশব্যাপী প্রতিস্থাপন করছে। একইরকমভাবে, বাংলাদেশ সরকারের এই মুহূর্তে উচিত অক্সিজেন এর বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থা খুঁজে বের করা এবং দেশে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা। সরকারী সহায়তা, অক্সিজেন সরবরাহের নিশ্চিত এবং চিকিৎসা সেবা প্রদান করলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। এখন দরকার, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে করোনা মোকাবেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ঘরে থাকা, বাইরে গেলে মাস্ক পরিধান করা, এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। যেগুলোর মাধ্যমে আমরা সার্বিকভাবে করোনা মোকাবেলা করতে পারি। এই ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি জনগণকে করোনা মোকাবেলয় জনগণেরও একই রকম দায়বদ্ধতা রয়েছে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে আমরা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বেশিরভাগ জনগণের মধ্যে সুরক্ষা ব্যবস্থা মেনে চলার ক্ষেত্রে এক ধরণের অনীহা লক্ষ্য করছি। জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সকলে এক হয়ে কাজ করার মানসিকতা এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি। আমদেরকে ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সকলকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে অবস্থা খারাপ হওয়ার আগেই অবস্থা খারাপ হওয়াকে রুখতে হবে। এটা করতে আমরা ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তখন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াই করতে হবে।

লেখক- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর।



সাতদিনের সেরা