kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

করোনা প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যয়

মিল্টন বিশ্বাস   

১ জুন, ২০২০ ১১:৫৭ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনা প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যয়

৩০ মে (২০২০) পুনরায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যয়ী কণ্ঠস্বর শোনা গেল। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ব্যাধিটির বিস্তার রোধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রাণঘাতি এই ভাইরাসের বিস্তার রোধ করার পাশাপাশি করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মেডিক্যাল সেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদানও করেন তিনি। মূলত করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৈনন্দিন কর্মপঞ্জি গত তিন মাসে বিশাল এক রাষ্ট্রীয়-কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। অবশ্য সংক্রমণ রোধের প্রস্তুতি ছিল তার আগে থেকেই।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে চীনের উহান প্রদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের খবর প্রকাশ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী গণভবনে অনুষ্ঠিত একটি সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন। তিনি ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে চীন থেকে আটকেপড়া বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। মার্চের ৮ তারিখে প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিয়ে জরুরি নয় এমন ব্যবসা-বাণিজ্য অনলাইনে পরিচালনার নির্দেশ দেন। এর আগে জানুয়ারির প্রথম থেকেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে স্ক্রিনিং ডিভাইস বসান, যাতে কেউ করোনাভাইরাসের উপসর্গ বহন করছে কিনা তা বোঝা যায়। প্রায় সাড়ে আট লাখ মানুষের স্ক্রিনিং হয়, তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়।

গত তিন মাস ধরে করোনাভাইরাসের মহামারি ঠেকাতে লড়ছে বাংলাদেশ। ছোঁয়াচে এই রোগের বিস্তার রোধের জন্য ৩০ মে পর্যন্ত ছিল সাধারণ ছুটি। সবাইকে বলা হয়েছিল ঘরে থাকতে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের সূচনা দিন অর্থাৎ ১৭ মার্চ থেকে সর্বস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি ঘোষিত হবার পর, ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হয়। অর্থাৎ রোগী শনাক্তের ২ সপ্তাহ পরই হার্ডলাইনে চলে যায় সরকার। গত ৩ মাসে দেশের আট বিভাগের জেলা প্রশাসক, চিকিৎসক, পুলিশ, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি ও জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে ব্রিফিং ও নির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংকট মোকাবিলার জন্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মতামতও নিয়েছেন; লকডাউনের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষগুলো যেন খাবার সংকটে না পড়ে সেজন্য তাদের পাশে দাঁড়াতে দলীয় এমপি-মন্ত্রী ও নেতা-কর্মীদের নির্দেশও দিয়েছেন একাধিকবার। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। 

উল্লেখ্য, তিনি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে কয়েক দফায় পৃথক ভিডিও কনফারেন্সে চট্টগ্রাম ও সিলেট (৭ এপ্রিল), খুলনা ও বরিশাল (১২ এপ্রিল), ঢাকা (১৬ এপ্রিল), ঢাকা ও ময়মনসিংহ (২০ এপ্রিল), রাজশাহী (২৭ এপ্রিল) এবং রংপুর বিভাগের (৪ মে) জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাইরের মানুষের সঙ্গে না মেশা, বেশি লোকসমাগম না হওয়া, মানুষ থেকে দূরে থাকা দরকার। যা নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার জন্যও প্রয়োজন। তাঁর মতে, ‘বাইরের লোকের সঙ্গে যত কম মেশা যায়, কম যোগাযোগ রাখা যায়, সেটা সব থেকে ভাল। সেটাই সুরক্ষিত করবে আমাদের। কারণ এটি হচ্ছে অত্যন্ত সংক্রামক একটা ব্যাধি। এত সংক্রামক, এটা কার যে কখন হবে তা বোঝাও যায় না। এটিই হচ্ছে সব থেকে দুশ্চিন্তার বিষয়।’ কেবল পরামর্শ ও নির্দেশনা নয় বাস্তবায়নযোগ্য অনেককিছু করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মহামারির কারণে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সরবরাহ ও চাহিদা দ্বিমুখী সংকটের সম্মুখীন। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে যে বৃহৎ অঙ্কের প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে যার মূল সুবিধা ভোগ করবে উৎপাদন ও সেবা খাত, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষামূলক খাতসমূহ। সংকট প্রলম্বিত হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী এ সময় শুধু কৃষি খাতে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার প্রণোদনা দিয়েছেন। অর্থাৎ কৃষিখাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে মহামারি পরিস্থিতিতে। কেবল দেশ ও জাতি নিয়ে ব্যস্ত নন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশ্বের নেতৃবৃন্দের কথাও ভেবেছেন করোনা মোকাবেলার মুহূর্তে।

তিনি চীনে করোনাভাইরাসে প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করে ১৩ ফেব্রুয়ারি চীনের  প্রেসিডেন্টকে একটি পত্র পাঠান এবং এই সংকট কাটিয়ে উঠতে যে কোনো ধরনের সহায়তা প্রদানে বাংলাদেশের আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় চীনের পাশে থাকায় দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন একইমাসে। মার্চ মাসে এক পত্রে যুক্তরাজ্যের যুবরাজ চার্লস করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হওয়ায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে এই রোগ মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কাজ করার বাংলাদেশের অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যুবরাজ চার্লসের পূর্ণ আরোগ্য এবং যুক্তরাজ্যের জনগণের অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। উপরন্তু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন; ২৮ মার্চ এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সুস্থতা কামনা করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।’ এভাবেই দেশ থেকে বহির্বিশ্বে শেখ হাসিনার করোনাভাইরাস মোকাবেলার ভাবনা প্রসারিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা ও সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের সূচনা হয় মার্চ মাস থেকেই; সমন্বয় করা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সঙ্গে। অর্থাৎ করোনা মোকাবেলায় ২০২০ সালের মার্চ থেকেই শেখ হাসিনা কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন। এপ্রিল মাসকে তিনি করোনা ভাইরাস বিস্তারের জন্য ‘খারাপ সময়’ হিসেবে উল্লেখ করে এসময় দলীয় নেতা-কর্মী এবং সরকারের সকল স্তরে যেমন যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন, তেমনি দেশের কোথায় কী করতে হবে, কী ঘটছে- যাবতীয় বিষয়ে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেন। ২৭ এপ্রিল শেখ হাসিনা বলেন- ‘আমরা এই দুঃসময় কাটিয়ে উঠব। দুর্যোগ আসবে সেটি আবার চলে যাবে। আবার আলো আসবে।’ কেবল আশার কথাই শোনান নি, রীতিমত কর্মব্যস্ত সময় পার করেছেন তিনি।

রোজা ও ঈদ-উল-ফিতরের মধ্যে যখন করোনায় মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ছোবলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। করোনা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় মে মাস জুড়ে প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেছেন। এ মাসে ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, করোনাভাইরাসের মহামারি পরিস্থিতিতেও উদীয়মান সবল অর্থনীতি ৬৬টি দেশের। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। অর্থাৎ নবম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হলো বাংলাদেশ। করোনাভাইরাসের ভয়াবহতার মধ্যেও পাকিস্তান, ভারত, চীন এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের চেয়ে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এদেশের অর্থনীতি।

উপরের বিবরণ থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সংক্রমণ ব্যাধির ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি মোকাবেলায় সবকিছুতেই কঠোর নজরদারি বাড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন তিনি বেশি ব্যস্ত। করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বনেতাদের মতো তিনিও উদ্বিগ্ন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত কথা বলছেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সঙ্গেও। ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভিডিও কলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অতি জরুরি মনে হলে মিটিং-কনফারেন্স করছেন গণভবনে। প্রতিদিন সকাল থেকেই দলের কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়াও তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দেশের সাধারণ মানুষের খোঁজ-খবর রাখছেন।

লকডাউন ও ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটির পরবর্তী দিনগুলোতেও খেটেখাওয়া মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষার জন্য সুচিন্তিত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুচ্ছে সরকার। যাতে কোনো মানুষই মৃত্যুবরণ না করে, আর যাতে মানুষ আক্রান্ত না হয়, সেই লক্ষ্য নিয়েই প্রধানমন্ত্রী সবাইকে নিয়ে কাজ করছেন। অন্যদিকে মানুষের জীবিকা রক্ষার জন্য লকডাউন শিথিল করে দিয়েছেন তিনি।

আমেরিকার জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘ফোর্বসে’ ২২ এপ্রিল প্রকাশিত কানাডিয়ান লেখক অভিভাহ ভিটেনবারগ-কক্স রচিত '8 (More) Women Leaders Facing The Coronavirus Crisis’ শীর্ষক প্রবন্ধে করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলায় শেখ হাসিনার প্রশংসা করা হয়েছে। নারী নেতৃত্বাধীন সিঙ্গাপুর, হংকং, জর্জিয়া, নামিবিয়া, নেপাল, বলিভিয়া, ইথিওপিয়া এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কদের ওপর আলোকপাত করার সময় বলা হয়, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন ১৬ কোটি ১০ লাখের মতো মানুষের দেশ বাংলাদেশের মহামারির সংকট মোকাবেলায় দ্রুত সাড়া দিয়েছেন, যাকে ‘প্রশংসনীয়’ বলেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। কলামে বলা হয়েছে, এদেশের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তিনি গত ফেব্রুয়ারি থেকে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন সেগুলো এক অর্থে যুক্তরাজ্যও করতে পারেনি। তবে একথা সত্য দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় প্রশংসা পাবার জন্য শেখ হাসিনা কখনো কাজ করেন না। তাঁর কাজ জনগণের স্বার্থে নিবেদিত। এজন্যই তিনি জনগণের কাছে এতো বেশি আস্থাভাজন।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস,  বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা