প্রচারের আলো এড়িয়ে চলেছেন সব সময়। নিভৃতে কাজ করে যেতেই তার আনন্দ। তাই সাক্ষাৎকার দেওয়ার প্রস্তাব শুনেই মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘এটা তো সমাজের প্রতি আমার দায়িত্ব। প্রচারের কী দরকার?’
‘আপনার এই কাজের কথা জানলে হয়তো আরো অনেকে এগিয়ে আসবেন। ভালো কাজে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করা—এটাও তো সমাজের প্রতি এক ধরনের দায়িত্ব’—এটা শুনে নিমরাজি হলেন।
মুঠোফোনে বললেন, ‘আচ্ছা, কাল সকাল ১১টার দিকে আসুন।’
যথাসময়ে হাজির হলাম হাতিরপুলের বাসায়। একেবারে সড়ক লাগোয়া বাড়ি। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে কতটা খোলামেলা আর সবুজ।
ঘাস, কলাগাছ আর হরেক রকম ফুল-ফলে ছেয়ে আছে বাসার পেছনের খোলা জায়গাটা।
কলিং বেল বাজাতেই এগিয়ে এলেন ভদ্রলোক। হাসিমুখে বললেন, ‘আমি মবিনুল। আসুন।’
ভেতরে ঢুকতেই কানে এলো রবীন্দ্রসংগীত—‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু।’ ড্রয়িং রুমের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে সফিউদ্দিনের মতো দেশীয় শিল্পীদের নানা চিত্রকর্ম। আলমারি ঠাসা বই। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে পিকাসোর আলোকচিত্র নিয়ে লেখা বইও আছে সারিতে।
পুরো নাম মীর মবিনুল হক। সদালাপী মানুষটির একদম সাদাসিধে জীবন। বললেন, ‘আগামীকাল (৪ জুন) ফ্লাইট। তাই গোছগাছের জন্য আপনাকে বেশি সময় দিতে পারব না। এ জন্য দুঃখিত।’
মবিনুল হক দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় থাকেন। কিছুদিন আগে দেশে আসেন। বললেন, ‘এবার হাতে সময় কম ছিল। যে কাজের জন্য আসা, অল্প সময়ে সেটা করতে পারব কি না—সংশয় ছিল। পেরেছি বলে তৃপ্তি নিয়ে ফিরতে পারছি।’
কিসে তৃপ্তি তাঁর? : মবিনুল হকের আত্মতৃপ্তির মূলে তিনি নিজেই। গবেষণার উন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ভূতত্ত্ব বিভাগে এক কোটি টাকার এনডাউমেন্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে ২ জুন। নাম ‘মীর ময়নুল হক অ্যান্ড জন ট্যালেন্ট মেমোরিয়াল এনডাউমেন্ট ফান্ড’। ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মীর ময়নুল হক এবং ঢাবিতে তাঁর এমএস তত্ত্বাবধায়ক প্রাক্তন ইউনেসকো অধ্যাপক ড. জন আলফ্রেড ট্যালেন্টের স্মৃতি রক্ষার্থে এই ফান্ড। মীর ময়নুল হকের ছোট ভাই এই মবিনুল হক। তিনি সেদিন এক কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করেন ঢাবির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালামের কাছে। এনডাউমেন্ট ফান্ডের ৩০ লাখ টাকা দিয়ে ভূতত্ত্ব বিভাগে ‘ময়নুল-ট্যালেন্ট গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ স্থাপন করা হবে। অবশিষ্ট ৭০ লাখ টাকার লভ্যাংশ থেকে গ্র্যাজুয়েট রিসার্চারদের পিএইচডি ও এমফিল গবেষণা, এমএস ফেলোশিপ, স্কলারশিপ ও ফিল্ড ওয়ার্কসংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা হবে।
বিরল দৃষ্টান্ত : অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘এই অনুদান বিভাগের গবেষণা কার্যক্রমের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।’
ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বললেন, ‘ভূতত্ত্ব বিভাগের ইতিহাসে এত বড় অনুদান আর কেউ দিয়েছে বলে জানা নেই। বিভাগে ভালোমানের ল্যাব ছিল না। এখন সেই অভাব পূরণ হবে। নিজের সম্পদ বিক্রি করে সব অর্থ অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন ড. মবিনুল। এমন দৃষ্টান্ত বিরল!’
বাংলাদেশের ভূ-বিজ্ঞান অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মীর ময়নুল হক। বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমেদ ফারুক বলেন, ‘পেট্রোবাংলা এবং বাপেক্সে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন তিনি। দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে মৌলিক ভূমিকা ছিল মীর ময়নুলের। তাঁর উদ্যোগে পেট্রোবাংলা ড্রিলিং ডেটা রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণের জন্য প্রথমবারের মতো একটি কম্পিউটারাইজড মাড-লগিং ইউনিট সংগ্রহ করে, যা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমায়। মীর ময়নুলের নেতৃত্বে পরিচালিত তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের রিজার্ভ পুনর্মূল্যায়নে ২.১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট থেকে বেড়ে ৭.৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নতুন করে ১৩টি কূপ খনন করা হয়। ২০২০ সালের ২৬ আগস্ট তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
বিলিয়ে দিয়েছেন সব : শুধু ভাইয়ের নামে নয়, মা-বাবার নামেও ফান্ড গড়েছেন মবিনুল হক। উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ কিছু সম্পত্তি পেয়েছিলেন তিনি। অর্থমূল্যে সেটা কয়েক কোটি টাকা। নিজের জন্য কিছু না রেখে সব অর্থ দান করেছেন মানুষের কল্যাণে। জনহিতকর কাজে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ আরো কয়েক জায়গায়। উদ্দেশ্য একটাই—কিছু মানুষ যেন ভালো থাকে। বললেন, ‘দেশে আমার সব সম্পদ মানুষের জন্য দান করেছি। আসলে দেশের সম্পদ দেশের মানুষের কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছি।’
অল্প বয়সে বাবাকে হারানো মবিনুল ভাই-বোনের সমর্থনে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। এ জন্য নিজেকে তিনি অনেক ভাগ্যবান মনে করেন। বললেন, ‘কষ্ট পাই, যখন দেখি অহেতুক খরচের নেশায় মত্ত মানুষ। আমি মনে করি, জীবন যাপনের জন্য খুব বেশি কিছু দরকার নেই। যতটা পারা যায় সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে চললে সকলে মিলে ভালো থাকা যায়। নিজের যোগ্যতায় যারা এগোতে চায়, তাদের সাহায্য করাই আমার মূল লক্ষ্য।’ তিনি বলেন, ‘দেখেছি, শিক্ষার সুযোগ পেলে কিভাবে ছাত্রদের জীবন বদলে যায়। ফান্ডগুলো গঠনের উদ্দেশ্য শিক্ষা ও গবেষণার প্রসার, নারীদের জীবনমান উন্নয়ন, যাতে অর্থাভাবে কেউ পিছিয়ে না পড়ে।’
চার দশকের শিক্ষক জীবন : ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট মীর মবিনুল হক। বাবা মীর আশরাফুল হক ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। সেই সূত্রে দেশের নানা জায়গায় কেটেছে শৈশব। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে ক্যান্সারের কাছে হার মানেন বাবা। তখন মবিনুল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। এরপর পরিবারের হাল ধরেন মা জোবেদা হক। সন্তানদের নিয়ে তিনি থিতু হন ঢাকায়।
ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল থেকে ১৯৭০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন মবিনুল। ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ১৯৭৩ সালে সুযোগ মেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। মুহসীন হলের ছাত্র ছিলেন। স্নাতকে প্রথম হয়েছিলেন। স্নাতকোত্তর শেষে বছরখানেক শিক্ষকতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে।
১৯৮০ সালে উচ্চ শিক্ষা নিতে জমান কানাডায়। ইউনিভার্সিটি অব ওয়ের্স্টান অন্টারিওতে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন। পিএইচডি চলাকালেই ১৯৮৪ সালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব সাসকাচেওয়ানে। দীর্ঘ ৩৯ বছর সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। এর মধ্যে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যান যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০২৩ সালে পেশাগত জীবন থেকে অবসর নেন। ব্যক্তিগত জীবনে এক সন্তানের জনক তিনি। ছেলে আইনজীবী।
সহায় রবীন্দ্রনাথ : শিক্ষকতা ছাড়লেও ড. মবিনুল মাইক্রো ইকোনমিকস নিয়ে লেখালেখি করছেন নিয়মিত। তাঁর স্ত্রীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে প্রায়ই ঘুরে বেড়ান। বললেন, ‘কাছ থেকে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি অবলোকন করা আমার শখ। তাই ঘাসে ঘাসে পা ফেলি।’ সুখে-অসুখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান-কবিতায় শান্তির অন্বেষণ করেন ড. মবিনুল।
বেশি কিছু চাওয়ার নেই : দেশে তো কোনো সম্পদ নেই। তাহলে পরবর্তী জীবনে চলবেন কিভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মবিনুল হেসে বললেন, ‘জীবনে খুব বেশি কিছু চাওয়ার নেই আমার। সুস্থ থেকে ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে পারলেই হলো।’
সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্য খুব পীড়া দেয় ড. মবিনুলকে। সেদিক থেকে সম্পদের পুনর্বণ্টনে বিশ্বাসী তিনি। নিজে যে পৈতৃক সম্পত্তি পেয়েছেন, এটাও ভাগ্যের ব্যাপার বলে মনে করেন তিনি। বললেন, ‘এমন একটা পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলেই আমি এই সম্পত্তি পেয়েছি। সেটা আসলে এই সমাজেরই প্রাপ্য। মানুষের দুর্ভোগ দেখে মনে হয়েছে, এটা যত কমানো যায় তত ভালো।’




