kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

বেতনের টাকায় চাল-ডাল কিনে গরিবদের বিলাতে রাস্তায় তিন কন্যা

সাকিব সিকান্দার   

২৭ মার্চ, ২০২০ ১৯:০৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বেতনের টাকায় চাল-ডাল কিনে গরিবদের বিলাতে রাস্তায় তিন কন্যা

ছবিটি তুলেছেন কালের কণ্ঠের ফটোসাংবাদিক শেখ হাসান আলী। প্যাকেট বিলানোর সময় তাঁরা সাংবাদিকের চোখে পড়ে যান। বামে ডা. নিশাত, তাঁর পাশে শাকিলা আর ভ্যানের ওপাশে বসেছেন মালিহা

ডা. নিশাতের ইচ্ছা ইংল্যান্ডে লেখাপড়া করবেন। ওখানে গিয়ে কিছু পরীক্ষাও দিয়ে এসেছেন তিনি। বাংলাদেশ থেকে ডাক্তারি পাস করে বিলেতে যাবেন উচ্চতর ডিগ্রি নিতে। করোনার এই মহামারীর শুরুতেই এসেছেন দেশে। কয়েকমাসের জন্যে চাকরি নিয়েছেন একটি হাসপাতালে। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিকে থাকেন তিনি। তাঁর সাথে একই রুমে থাকেন শাকিলা আর মালিহা। সবাই শিক্ষার্থী। তাঁরা এখন ঘরবন্দি। গোটা এলাকার একই চিত্র, সবাই স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। সুনশান এলাকা। রিকশায় হাসপাতাল কিংবা বাজার কিংবা জরুরি স্থানে প্রতিদিন আসা-যাওয়া তিন তরুণীর। কিন্তু এখন আগের মতো রিকশাও নেই এলাকায়। যে গুটিকয়েক রিকশাওয়ালা আছেন, তাঁদের অবস্থাও শোচনীয়। মানুষ ঘর থেকে বের হন না, কাজেই যাত্রী নেই, রোজগারও নেই। কথা বলে এমনটাই জেনেছেন তাঁরা। এই দিন এনে দিন খাওয়া মানুষদের ঘরে খাবার নেই। কোনো কোনো সামর্থবান এগিয়ে আসছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। ক্ষুদ্র সামর্থ্য আর প্রয়াস নিয়ে তাঁরাও ঘর থেকে বেরিয়েছেন আজ। 

একজন ফটোসাংবাদিক আপনাদের ছবি তুলেছেন। এ বিষয়ে একটা স্টোরি বা ছবি প্রকাশ যদি করা হয় আপত্তি নেই তো? হাসলেন ডা. নিশাত আর শাকিলা। জানালেন, আমরা এটা করার সময় নিজেদের ছবি তুলবো সে চিন্তা ছিল না। তিনি (ফটোসাংবাদিক) ছবি তুলেছেন। একটু লজ্জা লেগেছে তখন। আবার যে ভ্যানে চড়ে ঘুরেছি সেই ভ্যানওয়ালাকে শেষ প্যাকেটটা দেয়ার সময় একজন উৎসাহী হয়ে ছবি তুলেছেন। 

কাজ শেষে ভ্যানওয়ালাকে একটা প্যাকেট দেয়ার সময় উৎসাহী একজন তাঁদের ছবি তুললেন 

জানা গেলো, মূল পরিকল্পনাটা ডা. নিশাতের। হাসপাতালে চাকরির সুবাদে যে বেতন পান, তার একটা অংশ বসুন্ধরা আবাসিকের প্রতিদিনের খেটে খাওয়া মানুষদের জন্যে আলাদা করলেন তিনি। শাকিলা আর মালিহা অর্থ দিয়ে নিশাতের সাথে যোগ হতে পারেননি, তাদের হাতে টাকা নেই তেমন। তবে এমন উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রম তো দেয়াই যায়। তিনজন মিলে গতকাল (২৬ মার্চ) সন্ধ্যায় বাজারে চলে গেলেন। চাল, ডাল, আলু আর হাত ধোয়ার জন্যে সাবান কিনলেন। বাজেটে যা হয় তা-ই। বাজার শেষে একটা ওজন মাপার ডিজিটাল যন্ত্র কিনে বাড়ি ফিরলেন। সারারাত পালা করে মাপজোক হলো। পণ্যগুলো আলাদা প্যাকেটে ভরে সবগুলো মিলিয়ে একটা বড় সাইজের প্যাকেট হলো। প্রতিটা প্যাকেটে রয়েছে তিন কেজি চাল, এক কেজি ডাল, দুই কেজি আর একটা হাত ধোয়ার সাবান। মন্দ নয়, তিরিশটা প্যাকেট তৈরি হলো। একটা ভ্যানও ঠিক করলেন তাঁরা। ওটাতে করে ঘুরে ঘুরে প্যাকেটগুলো বিলিয়ে দেবেন। আজ (২৭ মার্চ) বিকেল চারটার দিকে বের হলেন তিন কন্যা। 

তাঁরা জানালেন, পরিকল্পনা ছিল বসুন্ধরা আবাসিকের গেট, ঘাটপাড় আর অ্যাপোলো গেটের দিকে চক্কর দিয়ে বুঝে শুনে বাছাই করে একজনকে একটা করে প্যাকেট দেবেন। তবে বাড়ি থেকে বেরুতেই রীতিমতো ভিড়মি খেলেন। খুব বেশিদূর ছুটতে হলো না। অভাবী মানুষগুলো মুহূর্তে কোত্থেকে যেন ভ্যানের চারপাশে জুটে গেলো! চোখের পলকে ফুরিয়ে গেলো প্যাকেটগুলো! 

ডা. নিশাত বললেন, 'আমি অনেকদিন ধরে এখানে থাকি। আমি দেখেছি এখানকার রিকশাওয়ালাদের উপার্জনের ভরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যাত্রীদের বড় অংশ এরাই। কিন্তু সব ভার্সিটি বন্ধ। তাদের আয়-রোজগার নেই বললেই চলে। মনে হলো, এদের সাধ্যমতো কিছু খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত। তাই এটা করলাম। শাকিলা আর মালিহা অনেক হেল্প করেছেন। ওদের ছাড়া আমি হয়তো একা করতেও পারতাম না কাজটা।' 

পুরো কাজ শেষে তাঁরা সরল অভিজ্ঞতার বয়ান দিলেন, 'মনে হলো এই তিরিশটা প্যাকেট কিছুই না। মনটা সবারই খারাপ হয়েছে। মনে হচ্ছিল, আমরা যদি আরো অনেকগুলো প্যাকেট করতে পারতাম ভালো হতো। যারা জড়ো হয়েছিলেন, তাদের সবাইকে দেয়া সম্ভব হয়নি। যারা পেয়েছেন তার যারপরনাই খুশি। যাদের দিতে পারিনি তাদের করুণ মুখগুলোর দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। যখন বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করেছি, তখনও অনেকেই পেছন পেছন আসছিলেন। বাসা পর্যন্ত চলে আসলেন তাঁরা। চোখে কিঞ্চিৎ আশা, যদি এই তিনজনের বাসার নিচে দাঁড়ালে একটা প্যাকেট মেলে!' 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা