kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

হুমায়ূন আহমেদ : ও কারিগর, ও জাদুকর

আহমাদ মোস্তফা কামাল   

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ১৬:৪৮ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



হুমায়ূন আহমেদ : ও কারিগর, ও জাদুকর

গভীর আর্তিভরা এক গান লিখেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ—‘ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়/চাঁদনি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।’ গানটি যখনই শুনি তখনই মনে পড়ে শহীদুল্লাহ হলে তাঁকে দেখার সেই দিনগুলোর কথা। তিনি তখন ওই হলের হাউস টিউটর, আর আমি আবাসিক ছাত্র। অবাক বিস্ময়ে আমরা দেখতাম তাঁর অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ড, যেগুলো তাঁরই লেখায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। ভাবতাম, এত রোমান্টিক কোনো মানুষ হতে পারে? তো, এত আকুতিভরা প্রার্থনা, জ্যোত্স্নাভরা রাতে মরার এত আকুলতা, অথচ তিনি আমেরিকায় মারা গেলেন দিনের বেলায়, বাংলাদেশে যদিও তখন রাত, কিন্তু সেটি ছিল অমাবস্যার রাত। এই কথাটি মনে পড়লে এখনো আমার মন খারাপ হয়ে যায়। সামান্যই তো চাওয়া, যদিও খুবই ব্যতিক্রমী এই আকাঙ্ক্ষা—কজন মানুষই বা সুনির্দিষ্টভাবে এমন করে নিজের মৃত্যুর ক্ষণকে কল্পনা করতে পারেন? সেই চাওয়াটুকুও পূরণ করলেন না তাঁর কারিগর-দয়ার সাগর-দয়াময়! কী এমন ক্ষতি হতো আমাদের এই জাদুকরের সামান্য এই প্রত্যাশাটুকু পূরণ করলে?

হ্যাঁ, তিনি তো জাদুকরই ছিলেন। বাংলাদেশের পাঠক-দর্শক-শ্রোতা অবাক চোখে দেখেছে তাঁর আশ্চর্য সৃজনকুশলতা, দেখেছে, যেখানেই হাত দিচ্ছেন তিনি—গল্প-উপন্যাস-নাটক-চলচ্চিত্র-গান—সেখান থেকেই তুলে আনছেন হীরা-জহরত-মণি-মাণিক্য। অথচ তিনি এসেছিলেন, শুরু করেছিলেন সামান্য এক কথাকার হিসেবে। অমন তো কতজনই আসে, এসে হারিয়ে যায়, কেউ কেউ থেকে গেলেও এমন বিপুলভাবে জনচিত্তকে স্পর্শ করতে পারেন না, যেমনটি তিনি পেরেছিলেন।

তাঁর প্রথম দুটি উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আমাদের যে ছবি উপহার দিয়েছে সেটি এর আগে আর কখনো বাংলা সাহিত্যে দেখা যায়নি। মধ্যবিত্ত জীবনের এমন ছোটখাটো অনুষঙ্গও যে উপন্যাসের বিষয় হতে পারে, সেটি এই উপন্যাস দুটির আগে কে-ই বা ভাবতে পেরেছিল? আর এই জীবনকে এর খুঁটিনাটিসহ এমন গভীরভাবে চেনার প্রমাণই বা আর কে দিতে পেরেছিলেন, হুমায়ূনের আগে? আমাদের সাহিত্য জগতে মধ্যবিত্তরা তো অবহেলিত চরিত্রই ছিল, যেন তারা কোনো মানুষই নয়, তাদের কোনো সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা নেই! হুমায়ূন এসে দেখালেন, মধ্যবিত্তরা যন্ত্র নয়, ভিলেনও নয়, বাংলার কথাশিল্পীদের প্রিয় চরিত্রদের, দরিদ্র মানুষদের চেয়ে তাদের দুর্দশা ও সংকটও কম নয়! প্রথা ভেঙে একটি শ্রেণির দিকে মানবিক চোখে তাকিয়েছিলেন তিনি, মমতা ও সহানুভূতি দিয়ে এঁকেছিলেন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখকথা। এরপর একের পর এক গল্প-উপন্যাস আর টেলিনাটকেও তিনি এঁকে গেছেন মধ্যবিত্ত জীবনের মমতামাখা ছবি। যথার্থই ছোট ছোট দুঃখ-কথার রূপকার ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ভঙ্গিটিও ছিল সহজ-সরল। কোনো ভান নেই, ভণিতা নেই, বর্ণনায় কোনো জটিলতা নেই, ‘ঘটনার ঘনঘটা’ নেই, আয়তনেও নিতান্তই ছোট; তবু পড়ার পর ছোট্ট একটা দুঃখ বুকের কোথাও যেন আটকে থাকে, অথবা চোখের কোণে। জীবন, জগৎ ও মানুষ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই ইতিবাচক। তাঁর প্রায় প্রতিটি গল্প বা উপন্যাসে শেষ পর্যন্ত মানুষের খুব গভীর-কোমল-মায়াময় একটি রূপ ফুটে ওঠে, আর আমরা দেখি, জীবন যতই গ্লানিকর আর বেদনাময় হোক না কেন, মানুষের জন্য কোথাও না কোথাও এক টুকরো মমতা জমা করে রাখা হয়েছে। উপন্যাসে তো বটেই, অধিকাংশ গল্পেও তিনি এই মায়ার চিহ্ন ধরে রেখেছেন। দু-একটি উদাহরণ দিলে এসব কথার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

‘নিশিকাব্য’ গল্পে শহরবাসী চাকরিজীবী ছেলে হঠাৎ সুযোগ পেয়ে এক রাতের জন্য বাড়িতে এলে যেন এক উৎসব শুরু হয়। নতুন করে রান্না চড়ে চুলায়, পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি করে গোসল করে দুই ভাই, তার শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে মা-বাবার স্নেহময় উত্কণ্ঠা, আর স্ত্রীর মৃদু লজ্জামাখা আহ্লাদ। এত সহজ ভাষায়, এত মৃদুকণ্ঠে এসব ছোট ছোট সুখ ও আনন্দের গল্প শোনান তিনি যে মনে হয়, জীবনের কোথাও কোনো কালো দাগ লেগে নেই। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ভোরের ট্রেন ধরতে বেলা ওঠার আগেই বাড়ি ছাড়তে হয় তাকে, কিন্তু পেছনে রেখে যায় এক অপার ভালোবাসার গল্প। ছোট্ট একটি গল্প। এমনকি তেমন কোনো ঘটনাই ঘটে না, তবু বুকের গভীরে যেন একটা ছাপ রেখে যায়। মনে হয়, জীবন কত সুন্দর, কত প্রেমময়! ‘ফেরা’ গল্পে গভীর রাতে রুই মাছ হাতে বাড়ি ফেরার পর ঘুমিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের জাগিয়ে ফের রান্নার আয়োজন, টুকিটাকি কথাবার্তা, দুষ্টুমি-খুনসুটি, আনন্দ-আনন্দ-আনন্দ। কারণ আহ্লাদি মেয়েটা যে আজকে খাবার পছন্দ হয়নি বলে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল! এটাও খুব ছোট একটি গল্প, বিষয়ও সামান্য। একটা রুই মাছ, একটা ছোট্ট সাধ পূরণ—কত সাধারণ এই আখ্যান। অথচ এই সামান্যের ভেতরে যে অসামান্যতা লুকিয়ে আছে, যে গভীর গভীরতর আনন্দ লুকিয়ে আছে, হুমায়ূন তার মায়াবি আবিষ্কারক। এই শ্রেণিটি এত সংকট, এত যন্ত্রণা, এত জটিলতা নিয়েও কিভাবে বেঁচে থাকে, সেটি তিনি আবিষ্কার করেছেন নিপুণ কুশলতায়। তাঁর মতো করে আর কেউ কখনো এই জীবনকে দেখেননি বোধ হয়।

 ‘সৌরভ’, ‘নিশিকাব্য’, ‘ফেরা’, ‘জলছবি’, ‘জীবনযাপন’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘সুখ অসুখ’ প্রভৃতি গল্পেও এমন মায়াভরা জীবনের ছবি এঁকেছেন তিনি। আবার তাঁর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গল্পগুলোয় যুদ্ধের ব্যাপারটি সরাসরি আসেনি, বরং এসেছে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ও অর্জন, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, ত্যাগ-তিতিক্ষার এক সূক্ষ্ম অথচ হৃদয়গ্রাহী বিবরণ; যেমন ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’, ‘উনিশ শ একাত্তর’,  ‘অসুখ’, ‘শ্যামল ছায়া’ প্রভৃতি। কত-রকম গল্প যে লিখেছেন হুমায়ূন, তার ইয়ত্তা নেই। ‘অদ্ভুত গল্প’, ‘ভৌতিক গল্প’, ‘অতিপ্রাকৃত গল্প’ ইত্যাদি শিরোনাম দিয়ে তিনি যে গল্পগুলো লিখেছেন, বাংলাদেশের গল্পসাহিত্যে তা পুরোপুরি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলা সাহিত্য থেকে তো এ ধরনের গল্পগুলো হারিয়েই গিয়েছিল, তিনি সেগুলোকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন। ‘ছায়াসঙ্গী’, ‘ভয়’, ‘পিঁপড়া’, ‘সে’, ‘কুকুর’, ‘আয়না’ প্রভৃতি গল্পের উদাহরণ বাংলা গল্পের দীর্ঘ ইতিহাসে খুব সুলভ নয়। ‘খাদক’, ‘চোখ’, ‘অচিন বৃক্ষ’, ‘অয়োময়’, ‘আয়না’, ‘ভয়’, ‘ব্যাধি’, ‘কুকুর’, ‘পিশাচ’, ‘গন্ধ’, ‘গুনীন’, ‘অঁহক’ প্রভৃতি গল্পকে কোনো গোত্রবদ্ধ করাই কঠিন, কোনো শিরোনামেই এসব গল্পের যথার্থ পরিচয় পাওয়া যাবে না। আবার তাঁর প্রেমের গল্পগুলো যেন হয়ে উঠেছে না-পাওয়ার গল্প, বেদনার গল্প, হারানোর গল্প।  ‘রূপা’, ‘একটি নীল বোতাম’ বা ‘কল্যাণীয়াসু’ অসাধারণ গল্পপাঠের অভিজ্ঞতা দেয়। ‘ভালোবাসার গল্প’, ‘নন্দিনী’, ‘একজন ক্রীতদাস’, ‘গোপন কথা’, ‘শঙ্খমালা’ ‘অসময়’ ‘পাখির পালক’ প্রভৃতি গল্প পড়লেই বোঝা যাবে, হুমায়ূন শেষ পর্যন্ত পাঠকের মনে বেদনা সঞ্চার করতেই চেয়েছেন। অমীমাংসিত সম্পর্কের বেদনা, কাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক গড়ে না ওঠার বেদনা, তুচ্ছ কারণে বা কোনো কারণ ছাড়াই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বেদনা, না পাওয়া, না হওয়ার বেদনা এবং কোনোভাবেই এসবের কার্যকারণ খুঁজতে না যাওয়া—হুমায়ূনের প্রেমগুলো যেন এ রকমই। আমরাও এসব জাদুকরী গল্পে জর্জরিত হই, মন খারাপ করে একা একা ঘুরে বেড়াই! 

তিনি যে একজন ভার্সেটাইল লেখক হয়ে উঠেছিলেন, সেটি তাঁর ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কাজের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। যখন সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন তিনি, সেগুলোকে নিয়ে গেছেন এক ভিন্নতর উচ্চতায়। সেগুলো শুধু বিজ্ঞান বা ফিকশন থাকেনি, তাঁর হাতে পড়ে হয়ে উঠেছে মানবিক অনুভূতির দলিল। তাঁর রচিত সায়েন্স ফিকশন এই একটি জায়গায় পৃথিবীর অন্য সব সায়েন্স ফিকশন থেকে আলাদা। ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’, ‘শূন্য’, ‘নি’ প্রভৃতি উপন্যাস সেই প্রমাণ দেবে। আবার মানবমনের গূঢ়-অপার রহস্য নিয়ে তিনি যে মিসির আলী সিরিজ রচনা করেছিলেন, প্রথম দিকে তা-ও ছিল এক গভীর মানবতাবোধে উজ্জীবিত। এমনকি তাঁর হিমু চরিত্র দিয়ে তিনি প্রথম দিকে খুঁজতে চেয়েছিলেন প্রকৃতির অব্যাখ্যাত রহস্য। জীবন নামক একটি ঘরে যদি দুটি দরজা থাকে, তার একটি দরজা বিজ্ঞান, যুক্তি, দর্শন, ইতিহাস ও মনোবিজ্ঞানের, যেগুলো দিয়ে এই জীবনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলছে হাজার বছর ধরে; আর অন্য দরজাটি এখনো খোলাই হয়নি, সেটি রহস্যময়তায় ভরা, হুমায়ূন সেই দরজাটি খুলতে চেয়েছিলেন হিমুকে দিয়ে। সত্যি বলতে কি, হুমায়ূনের উত্থান ঘটেছিল টেলিভিশন-নাটকের মধ্য দিয়ে। আশির দশকের গোড়ার দিকে হুমায়ূনের ‘এইসব দিনরাত্রি’ দেশব্যাপী বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে সমাদৃত ও অভিনন্দিত হয়। শুধু ‘এইসব দিনরাত্রি’ নয়, প্রায় এক দশক ধরে হুমায়ূন ছিলেন টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটকের রাজলেখক। হুমায়ূন মানেই হিট, হুমায়ূনের নাটক মানেই রাস্তাঘাট খালি হয়ে যাওয়া, টেলিভিশনের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়া; পেশা-বয়স নির্বিশেষে সব ধরনের দর্শকদের ক্লান্তিহীন উপভোগ! ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘আজ রবিবার’ ইত্যাদি ধারাবাহিকের কথা এখনো দর্শকরা ভোলেননি। সঙ্গে একক নাটক তো ছিলই। কিন্তু নাটকেই বা হুমায়ূন এ রকম বাজিমাত করলেন কিভাবে? তখন কি নাট্যকার-নাটক সংকটে ভুগছিল টেলিভিশন বা দর্শকরা? না, তা নয়। বরং ওই সময়টিই ছিল বাংলা টেলিনাটকের স্বর্ণযুগ। আতিকুল হক চৌধুরী, মমতাজউদ্দীন আহমদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন এবং আরো পরে এসে ইমদাদুল হক মিলন—টেলিনাটকে একেকটা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো নাম। তবু হুমায়ূন কিভাবে সব এমন দখল করে নিলেন? তার কারণ ওই ‘এইসব দিনরাত্রি’। টেলিভিশনের মধ্যবিত্ত দর্শকরা নিজেদের দেখতে পেলেন এই নাটকে; দেখলেন নিজেদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, ঠাট্টা-দুষ্টুমি, আবেগ-অভিমান এবং সর্বোপরি গোপন-অপ্রকাশিত-অচরিতার্থ আকাঙ্ক্ষার চিত্র। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশে টেলিভিশন ব্যাপারটা আজকের মতো এত সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি এবং এর নিয়মিত দর্শক ছিল মূলত শহুরে মধ্যবিত্তই। এই দর্শকরাই ‘এইসব দিনরাত্রি’র মাধ্যমে হুমায়ূনের সঙ্গে প্রথমবারের মতো পরিচিত হয়েছিলেন। সত্যি বলতে কি, ‘পারিবারিক কাহিনী’ বলতে যা বোঝায়, ‘এইসব দিনরাত্রি’ ছিল তারই প্রথম সার্থক রূপায়ণ, পারিবারিক বিনোদন বলতে যা বোঝায়, সেটাও এই প্রথমবারের মতো উপভোগ করল টেলিনাটকের দর্শককুল। তাঁদের একটি বড় অংশ যেহেতু মধ্যবিত্ত শিক্ষিত দর্শক, তাঁরা যে এই নাট্যকারের বই পড়ে দেখতে চাইবেন, তা আর অস্বাভাবিক কি? এই পাঠকরা হয়তো সাহিত্যের মূলধারার কোনো খবরই রাখতেন না, হুমায়ূন ছাড়া যে আর কোনো লেখক আছেন দেশে, সাহিত্য বলে যে একটি বিষয় নিয়ে কিছু লোক মাতামাতি করেন, তা-ও হয়তো তাঁদের অজানাই ছিল। এই নতুন পাঠকগোষ্ঠী, যাঁরা প্রধানত টেলিনাটকের দর্শক, যখন হুমায়ূনের বই কেনা শুরু করলেন তখন একটা অভাবিত ঘটনা ঘটল। বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস নতুন একটা বাঁক নিল, পণ্য হিসেবে ‘বই’ নামক অত্যন্ত ‘স্লো আইটেম’ (এবং প্রায়শই অলাভজনক) দ্রুতই একটা লাভজনক পণ্যে পরিণত হলো। হুমায়ূন কিন্তু থামলেন না, ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের নাটক উপহার দিয়েই চললেন এবং ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার এই কাজগুলো তাঁকে দর্শকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে তুলল। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, হুমায়ূন যে শুধু নাটক নিয়েই পড়ে রইলেন তা নয়, লেখালেখিও চালিয়ে গেলেন পূর্ণ মাত্রায়। এভাবেই তিনি হয়ে উঠলেন পাঠকপ্রিয় লেখক, দর্শকপ্রিয় নাট্যকার।

সত্যি বলতে কি, বিস্ময়কর পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার পর তিনি আর নিজেকে ‘ছোট ছোট দুঃখকথা’র ভেতরে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। পাঠককে তিনি নিয়ে যেতে চেয়েছেন এক স্বপ্নঘোরগ্রস্ত পৃথিবীতে, যে পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের কখনো দেখা হয় না; সৃষ্টি করেছেন হিমু বা মিসির আলীর মতো অদ্ভুত সব চরিত্র—যারা আদৌ আমাদের পরিচিত পৃথিবীতে বাস করে না, যাদের জীবনযাপনের সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কোনো সম্পর্কসূত্র নেই, যাদের কাজকর্ম প্রায়-উদ্ভট ও অপরিচিত, শুধু স্বপ্ন ও কল্পনায়ই তাদের পাওয়া সম্ভব, বাস্তবে নয়। হুমায়ূন পাঠককে অতি দক্ষতার সঙ্গে সেই স্বপ্ন ও বিভ্রমের জগতে পরিভ্রমণ করান, পাঠক আনন্দ পান; অভিভূত হন, সাময়িকভাবে বিস্মৃত হয় তার দৈনন্দিন সংকট ও বাস্তবতা। বলা বাহুল্য যে পাঠ শেষে পাঠক তার বেদনাক্লিষ্ট - সমস্যাজর্জরিত —সংকটমুখর ক্লান্ত জীবনে ফিরে আসে। কিন্তু ওই ক্ষণিক বিস্মৃতি ও বিভ্রম তাঁদের আনন্দ দেয় বৈকি! নিজের দুঃখ-কষ্ট, সংকট-সমস্যা ভুলে থাকার মতো আনন্দ আর কিসে আছে? হুমায়ূন ভাগ্যবান ও সফল। তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন, সোনা ফলেছে। তিনি যখন তাঁর মধ্যবিত্ত পাঠকদের প্রতিদিনের জীবনকে আঁকলেন, পাঠক সেটি গভীর আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে গ্রহণ করল; আবার যখন তাঁদের ভুলিয়ে দিতে চাইলেন নিজেদের করুণ বাস্তবতা, পাঠক সেটিও গ্রহণ করল! এ রকম বিস্ময়কর গ্রহণযোগ্যতা বাংলা সাহিত্যে এর আগে কখনো দেখা যায়নি!

হুমায়ূন আহমেদ যা-ই লিখেছেন, তাঁর উপস্থাপন পদ্ধতিটি এত চমৎকার যে অবাস্তব কল্পকাহিনীও সত্য বলে মনে হয়। বিশ্বাসযোগ্যভাবে যেকোনো কিছু উপস্থাপন করার এই দুর্লভ ক্ষমতাই তাঁকে পরিণত করেছে গল্পের জাদুকরে। বহুকাল পর আমরা এমন এক কথাকার পেয়েছি, যিনি হাসাতে চাইলে আমরা হাসি, কাঁদাতে চাইলে কাঁদি, আর যখন স্বপ্নঘোরগ্রস্ত বিভ্রান্তি তৈরি করেন, আমরাও তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভ্রান্ত হই। যেন তিনি নিজেই এক কারিগর, জাদুকরও বটে, তাঁরই ইচ্ছায় আমরা, পাঠকরা, এতকাল ধরে হাসছি, কাঁদছি।

যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন প্রিয় জাদুকর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা