গ্রীষ্মকাল মানেই আমের মৌসুম। বছরের এই সময়টায় বাংলাদেশের বাজার, ফলের দোকান এমনকি গ্রামের উঠানও ভরে ওঠে নানা জাতের আমে। গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, বারি আম—প্রতিটি জাতের আমের স্বাদ ও ঘ্রাণ আলাদা। শুধু স্বাদের জন্যই নয়, পুষ্টিগুণের কারণেও আমকে বলা হয় ফলের রাজা।
প্রখর গরমে এক টুকরো ঠাণ্ডা আম কিংবা আম দিয়ে তৈরি কোনো পানীয় মুহূর্তেই এনে দিতে পারে প্রশান্তি। একই সঙ্গে শরীরকে দেয় প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও শক্তি। তাই আমের মৌসুমে শুধু আম কেটে খাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে এটি দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে নানা ধরনের সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর খাবার।
কেন খাবেন আম?
পাকা আমে প্রধানত ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘সি’ এবং ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্স (যেমন : ভিটামিন বি-৬ ও ফোলেট) থাকে। এ ছাড়া এতে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন (যা শরীরে ভিটামিন ‘এ’-তে রূপান্তরিত হয়) এবং ভিটামিন ‘ই’, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার, পটাশিয়াম এবং বিভিন্ন ধরনের শরীরের জন্য উপকারী উদ্ভিজ্জ যৌগ পাওয়া যায়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
আমে থাকা ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। নিয়মিত পরিমিত আম খেলে মৌসুমি নানা রোগের ঝুঁকি কমতে পারে।
চোখের জন্য উপকারী
ভিটামিন এ ও বিটা-ক্যারোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় আম চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।
হজমে সাহায্য করে
আমে থাকা ফাইবার ও হজমে সহায়ক এনজাইম খাবার দ্রুত পরিপাকে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে ভূমিকা রাখে।
ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সহায়ক
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি ত্বকের কোষকে সুরক্ষা দেয় এবং ত্বককে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
শরীরে পানির ঘাটতি কমাতে সাহায্য করে
গরমে শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যায়। আম দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পানীয় শরীরে তরল ও শক্তির ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পারে।
আমের কিছু সহজ রেসিপি:
ম্যাঙ্গো স্মুদি/ মিল্কশেক
উপকরণ
১ কাপ পাকা আমের টুকরা
আধা কাপ গুঁড়া দুধ
১ কাপ ঠাণ্ডা দুধ
১ টেবিল চামচ মধু
ঠাণ্ডা পানি
কয়েকটি বরফ কুচি
প্রস্তুত প্রণালি
সব উপকরণ ব্লেন্ডারে দিয়ে মিহি করে ব্লেন্ড করুন। ঠাণ্ডা অবস্থায় পরিবেশন করুন। গরমে ক্লান্ত শরীরে এটি দ্রুত শক্তি ও প্রশান্তি এনে দিতে পারে।
আমের লাচ্ছি
উপকরণ
১ কাপ দই
আধা কাপ পাকা আম
২ টেবিল চামচ চিনি
বরফ
প্রস্তুত প্রণালি
সব উপকরণ ব্লেন্ড করে গ্লাসে ঢেলে পরিবেশন করুন। এটি একই সঙ্গে ঠাণ্ডা ও পুষ্টিকর একটি পানীয়।
কাঁচা আমের শরবত
উপকরণ
২টি কাঁচা আম
চিনি
বিট লবণ
ভাজা জিরা গুঁড়া
ঠান্ডা পানি
প্রস্তুত প্রণালি
কাঁচা আম সিদ্ধ করে শাঁস বের করে নিন। এরপর পানি, স্বাদমতো চিনি, ভাজা জিরা গুঁড়া ও বিট লবণ মিশিয়ে শরবত তৈরি করুন। প্রচণ্ড গরমে এই পানীয় শরীরকে দ্রুত ঠান্ডা করতে সাহায্য করে।
আমের আইসক্রিম
উপকরণ
২ কাপ আমের পাল্প
১ কাপ ফ্রেশ ক্রিম
আধা কাপ কনডেন্সড মিল্ক
প্রস্তুত প্রণালি
সব উপকরণ মিশিয়ে ফ্রিজে ৬-৮ ঘণ্টা রেখে দিন। বাড়িতেই তৈরি হয়ে যাবে সুস্বাদু আমের আইসক্রিম।
ম্যাঙ্গো ফ্রুট সালাদ
উপকরণ
আম
তরমুজ
পেঁপে
আঙুর
ডালিম
চাট মসলা
বিট লবণ
প্রস্তুত প্রণালি
সব ফল ছোট ছোট টুকরা করে কেটে চাট মসলা ও বিট লবণের সঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করুন। গরমের দিনে এটি হালকা ও সতেজ একটি খাবার।
আমের ক্ষীর
উপকরণ
১ লিটার দুধ
২ টেবিল চামচ পোলাও এর চাল গুঁড়া
১ কাপ আমের পাল্প
চিনি
এলাচ
বিভিন্ন বাদাম কুচি
প্রস্তুত প্রণালি
পোলাও এর চাল গুঁড়া, চিনি ও দুধ মিশিয়ে জ্বাল দিয়ে ঘন করুন। ঠান্ডা হলে আমের পাল্প মিশিয়ে ও বাদাম কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।
ম্যাঙ্গো চিয়া পুডিং
উপকরণ
৩ টেবিল চামচ চিয়া সিড
১ কাপ দুধ
আধা কাপ আমের পিউরি
প্রস্তুত প্রণালি
চিয়া সিড ও দুধ মিশিয়ে রাতে ভিজিয়ে ফ্রিজে রাখুন। সকালে আমের পিউরি মিশিয়ে পরিবেশন করুন।
আমের দই
উপকরণ
১ কাপ পানি ঝড়ানো টক দই
আধা কাপ গুঁড়া দুধ
আধা কাপ পানি ছাড়া আমের পিউরি
সামান্য মধু
প্রস্তুত প্রণালি
সব উপকরণ মসৃণভাবে মিশিয়ে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।
ম্যাঙ্গো কুলার
উপকরণ
১ কাপ আমের রস
সোডা ওয়াটার
লেবুর রস
পুদিনা পাতা
বরফ
প্রস্তুত প্রণালি
সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করুন। গরমে এটি মুহূর্তেই এনে দিতে পারে সতেজ অনুভূতি।
আমের ফালুদা
উপকরণ
সেদ্ধ নুডলস
দুধ
আমের কুচি
তোকমা
আইসক্রিম
ম্যাঙ্গো জেলি
প্রস্তুত প্রণালি
সব উপকরণ স্তরে স্তরে সাজিয়ে ঠান্ডা অবস্থায় পরিবেশন করুন।
আম খাওয়ার সময় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
খুব বেশি মিষ্টি আম একসঙ্গে না খাওয়াই ভালো। অতিরিক্ত আম খেলে রক্তে শর্করা বাড়তে পারে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। আম খাওয়ার আগে পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত। কেটে রাখা আম বেশিক্ষণ কক্ষতাপমাত্রায় রাখা যাবে না। এয়ার টাইট বাক্সে ফ্রিজে রাখতে হবে।
বাংলাদেশের গ্রীষ্ম মানেই আমের উৎসব। এই মৌসুমে পাকা কিংবা কাঁচা আম শুধু স্বাদই বাড়ায় না, শরীরকেও দেয় প্রয়োজনীয় পুষ্টি। আম দিয়ে তৈরি এক গ্লাস ঠাণ্ডা শরবত, এক বাটি ফ্রুট সালাদ কিংবা ঘরে তৈরি আইসক্রিম গরমের ক্লান্তি দূর করে এনে দিতে পারে অনন্য প্রশান্তি। তাই আমের মৌসুমে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে আম রাখুন, আর উপভোগ করুন স্বাদ, পুষ্টি ও সতেজতার অনন্য সমন্বয়।




