kalerkantho

মঙ্গলবার ।  ১৭ মে ২০২২ । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩  

ফিচার

নার্সিং ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ে

অনলাইন ডেস্ক   

২০ এপ্রিল, ২০২২ ১৬:১৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নার্সিং ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ে

দিনা মৃ

টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের ইদিলপুর গ্রামের গারো তরুণী দিনা মৃ। নার্সিংয়ে পড়াশোনা করলেও কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন ফ্রিল্যান্সিংকেই। প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেও আয় করেন মাসে তিন হাজার ডলার। কাজ করছেন কানাডা, ইউএসএ, লন্ডন, নাইজেরিয়া, জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

তাঁকে নিয়ে লিখেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

পথ দেখাল নকরেক আইটি
দিনার মা সিনিয়র নার্স। বাবা ল্যাব টেকনিশিয়ান। ভাই ডাক্তার। স্বামী চাকরি করেন হাসপাতালে। দিনা নিজে নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা করেছেন। তবে নার্সিংটা ঠিক মানিয়ে নিতে পারেননি। দিনা বলছিলেন, ‘২০১৮ সালে নার্সিংয়ের পড়াশোনা শেষ করি। তখন জানতে পারি ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে। নিরাপদ, ঘরে বসে কাজ করা যাবে, আবার আয়ও হবে। এই সবটুকু পাওয়া সম্ভব ফ্রিল্যান্সিংয়ে। এটি জেনেই ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য সিদ্ধান্ত নিই। ’
২০১৯ সালে ফ্রিল্যান্সিং শেখানোর প্রতিষ্ঠান নকরেক আইটি ইনস্টিটিউট থেকে দিনা কোর্স করেন। চার মাসের ডিজিটাল মার্কেটিং কোর্স, পাশাপাশি নিজেও অনলাইনে শেখার চেষ্টা করেন। কোর্স শেষ হয়েছে মাত্র এক সপ্তাহ। তখন মার্কেটপ্লেস ‘ফাইভার’-এ প্রথম কাজ পান ১০ ডলারের।

১০ থেকে তিন হাজার ডলার
দিনার প্রথম আয় ছিল মাত্র ১০ ডলার। এখন মাসিক আয় তিন হাজার ডলার। দিনা থাকেন টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের ইদিলপুর গ্রামে। প্রত্যন্ত গ্রাম। চারদিক বনে ঘেরা। এই নিভৃত পল্লীতে ঘরে বসে এত্ত আয়! কিভাবে সম্ভব হলো? দিনা বলেন, ‘দ্রুতগতির ইন্টারনেট ছিল না। পেশা হিসেবে নার্সিং ভালোই ছিল। সেটি ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিং। পরিবারও প্রথম দিকে সেটিকে ভালোভাবে নেয়নি। যখন মাসে লাখ টাকা আয় করি, তখন পরিবারের সবার মুখে হাসি ফুটেছিল। তাদের আনন্দ আর আমার প্রতি তাদের বিশ্বাস আমাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা জোগায়। ব্যাপক পরিশ্রম করতে হয়েছে। দৈনিক কাজ করেছি ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টার মতো। ’

ডিজিটাল মার্কেটিং
দিনা বর্তমানে ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন ফ্রিল্যান্সিংয়ের শুরুটা ডিজিটাল মার্কেটিং দিয়ে করা উচিত। নিজের অভিজ্ঞতায় তিনি মনে করেন, ডিজিটাল মার্কেটিং নারীদের জন্য রপ্ত করতে সহজ হয়। দেশের অনেক কম্পানির সঙ্গে কাজ করেছেন দিনা। দেশের বাইরে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নাইজেরিয়া, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ আরো অনেক দেশের কম্পানির সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটে ডিজিটাল মার্কেটিং ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছেন। এখানে তিনি ডিজিটাল মার্কেটিং শেখান। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মধ্যে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, লিংকডইন, ইউটিউব মার্কেটিং, এসইও, ডিজাইনের বেসিক পার্ট, ওয়েবের বেসিক পার্ট, ই-মেইল মার্কেটিং এবং মার্কেটপ্লেসগুলোতে কিভাবে কাজ করতে হয় সেসবও শিখিয়ে থাকেন।

আলোর নিচে অন্ধকার
ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সালে ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে বাংলাদেশের অবস্থান সেরা ১০ দেশের মধ্যে অষ্টম। এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের হিসাব মতে, বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ৬০ হাজারের মতো, যার মধ্যে সক্রিয় আছে ৯ হাজারের মতো। দিন দিন নারী ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও। পৃথিবীতে ১০২ কোটি ফ্রিল্যান্সারের মধ্যে পুরুষ ও নারী ফ্রিল্যান্সারদের অনুপাত ৬০ঃ৪০। এই উন্নতির পরেও এই সেক্টরে বেশ কিছু সমস্যা আছে। তবে দিনার মতে, মূল সমস্যা হচ্ছে, অনেকে কাজ না শিখেই মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট খোলেন। কাজ পেয়েও কাজ বুঝিয়ে দিতে পারেন না। তখন দেশের ফ্রিল্যান্সারদের সম্পর্কে খারাপ ইমেজ তৈরি হয়। কাজ না শিখেই যাঁরা মার্কেটে আসেন, তাঁরা কাজ পান না। তখন তাঁরা অন্যদের ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়ে নিরুৎসাহ করেন। কিছু লোক অন্যের কাজগুলো কপি করে নিজের জন্য পোর্টফলিও তৈরি করেন।

ভালো-মন্দ অভিজ্ঞতা
মাত্র চার দিন হয়েছে মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। তখন রাত ৩টা বাজে। ঘুম ঘুম চোখে তিনি দেখতে পান—‘অর্ডার ইজ রানিং। ’ দ্রুত ট্রেনারকে জানান। তিনি বলেন, ‘তুমি কাজ পেয়েছ। ’ এত কম সময়ের মধ্যে যে কাজ পাবেন—এটি বিশ্বাসই হচ্ছিল না দিনার। আনন্দে সে রাতে আর ঘুমাতে পারেননি। দিনা বলেন, ‘সিঙ্গাপুরের এক ক্লায়েন্টের অনেক পছন্দ হয়েছিল আমার কাজ। তিনি আমাকে সিঙ্গাপুরে গিয়ে কাজ করার অফারও করেছিলেন! ভবিষ্যতে হয়তো বিদেশে গিয়ে কাজ করতেও পারি। আপাতত গ্রামে থেকেই খুব ভালো উপার্জন করছি আমি। ’ দ্বিতীয় যে অর্ডারটি তিনি পান, কাজটি ভালোমতো করতে পারেননি। অর্ডার বাতিল হওয়ায় তাঁর মন খুব খারাপ হয়, কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। নিজেকে তৈরি করেছেন। এখন সেই কাজের অর্ডারই বেশি আসে তাঁর কাছে।

টাইম ম্যানেজমেন্ট
কাজের জন্য সময় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দিনা বলেন, ‘সময় বের করা আসলে নিজের কাছে। আমার মূল লক্ষ্য আমাকে সফল হতেই হবে। সব কিছুর পেছনে আমার প্রবল ইচ্ছাশক্তি আসল। পাশাপাশি ঘরের কাজে হাজব্যান্ড আমাকে সাহায্য করেন। কখনো যে কাজটা আমি সময়ের জন্য কুলিয়ে উঠতে পারিনি, তিনি সেটা করে দিয়েছেন।

পেয়েছেন ফ্রিল্যান্সিং অ্যাওয়ার্ড
৪ এপ্রিল ২০২২। দিনার জীবনে অত্যন্ত আনন্দের এক দিন। তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলকের হাত থেকে ফ্রিল্যান্সিং অ্যাওয়ার্ড হিসেবে ল্যাপটপ পান দিনা।

 নতুনদের উদ্দেশে
ভালো কাজ পারলে মাসে লাখ টাকা আয় যেমন সম্ভব, তেমনি প্রথমেই অ্যাকাউন্ট খুইয়ে হতাশ হতে পারেন। ফ্রিল্যান্সিংকে পার্টটাইম চাকরির মতো ভাবা যাবে না। এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। নিজের সেরা কাজটিই দিতে হবে। নিজের মনকে স্থির করতে হবে।    আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে যে আমি পারব এবং এর শেষ দেখেই ছাড়ব। শুরুতেই আয় নয়। আগে শেখার চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি প্রচুর ধৈর্য থাকতে হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ফ্রিল্যান্সিংয়ের ব্যাপারে দিনার কাছে সাহায্য চেয়েছেন কিন্তু পাননি এমনটি হয়নি। যতটুকু জানেন ততটুকু দিয়ে সাহায্য করেন। ভবিষ্যতে নিজের দলটিকে আরো বড় করার ইচ্ছা তাঁর। পাশাপাশি এই সেক্টরে যাঁরা কাজ করতে চান, তাঁদের সহযোগিতা করতে চান। এটিই তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।



সাতদিনের সেরা