প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটাকে ঘিরে নতুন করে গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রযুক্তিবিষয়ক ম্যাগাজিন ওয়্যার্ড-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মেটা আমাদের স্মার্টফোনে থাকা "মেটা এআই" অ্যাপের ভেতরে গোপনে মানুষের মুখ চেনার ( ফেসিয়াল রিকগনিশন ) কোড ঢুকিয়ে দিয়েছে ।
এ কোম্পানিটির তৈরি রে-ব্যান ও ওকলি স্মার্ট চশমার মাধ্যমে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করা যেকোনো মানুষকে সরাসরি চেনার জন্যই এই গোপন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যদিও মেটা দাবি করেছে, এই ফিচারটি সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এখনও চালু করা হয়নি
সাইবার নিরাপত্তা গবেষক ও সফটওয়্যার বিশ্লেষকদের পরীক্ষায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে একাধিক অ্যাপ আপডেটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ফোনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এআই মডেল যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মানুষের মুখ শনাক্ত করতে পারে, দ্বিতীয়টি ছবির ভেতর থেকে মুখ আলাদা করে ক্রপ করতে পারে এবং তৃতীয়টি সেই মুখকে একটি বিশেষ ডিজিটাল বায়োমেট্রিক পরিচয়ে রূপান্তর করতে সক্ষম।
গবেষকদের দাবি, এই প্রযুক্তি এখন প্রায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। মেটা অভ্যন্তরীণভাবে প্রকল্পটির নাম দিয়েছিল “নেমট্যাগ”। তবে সাম্প্রতিক এক আপডেটে এর নাম পরিবর্তন করে “কানেকশনস” রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
এ বিষয়ে মেটার মুখপাত্র রায়ান ড্যানিয়েলস বলেন, কোম্পানি কেবল এ ধরনের প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করছে। এখনো সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য কোনো ফেসিয়াল রিকগনিশন ফিচার চালু করা হয়নি এবং কোনো কেন্দ্রীয় ফেস ডেটাবেস তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি।
তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন গোপনীয়তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি প্রযুক্তিটি শুধুই পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকে, তাহলে কয়েক মাস আগেই কেন এর প্রয়োজনীয় কোড ব্যবহারকারীদের ফোনে পাঠানো হলো—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেয়নি মেটা।
আরো বিতর্ক তৈরি হয়েছে কারণ চলতি বছরের এপ্রিল মাসেও মেটার কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, স্মার্ট চশমায় ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিক ও সামাজিক দিক নিয়ে তারা এখনো চিন্তাভাবনা করছেন। অথচ নতুন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তারও কয়েক মাস আগে এই প্রযুক্তির মূল উপাদান ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
প্রাইভেসি বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ট্যাগ করার প্রযুক্তির তুলনায় স্মার্ট চশমাভিত্তিক রিয়েল-টাইম ফেসিয়াল রিকগনিশন অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে রাস্তায় চলাফেরা করা কোনো অপরিচিত ব্যক্তির পরিচয় মুহূর্তেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই উদ্বেগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিক অধিকার সংগঠন আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) এবং ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ফাইট ফর দ্যা ফিউচার সহ ৭০টির বেশি মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে মেটাকে স্মার্ট চশমায় ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ কারণ ২০২১ সালে তীব্র সমালোচনার মুখে মেটা ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় ফেস-ট্যাগিং প্রযুক্তি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল। সে সময় কোম্পানিটি ব্যবহারকারীদের এক বিলিয়নের বেশি ফেসপ্রিন্ট বা বায়োমেট্রিক তথ্য মুছে ফেলার কথাও জানিয়েছিল।
শুধু তাই নয়,এর আগে বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহারের অভিযোগে অতীতে মেটাকে যুক্তরাষ্ট্রে বড় অঙ্কের আইনি জরিমানাও গুনতে হয়েছে। ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কোম্পানিটি ৬৫০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দেয়। পরে ২০২৪ সালে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে সমঝোতায় আরও ১.৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়।
নতুন এই তথ্য প্রকাশের পর প্রযুক্তি বিশ্বে প্রশ্ন উঠেছে—মেটা কি ভবিষ্যতে তাদের স্মার্ট চশমা ও এআই সেবায় ব্যাপকভাবে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে? যদিও কোম্পানিটি এখনই এমন কোনো পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেনি, তবু ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ আবারও সামনে চলে এসেছে।
তথ্যসূত্র: ওয়্যার্ড, এনগ্যাজেট ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।




