নিমতলী, চুড়িহাট্টা ও এফআর টাওয়ারের মতো অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১১ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।
রবিবার (২৮ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘নিমতলী ট্রাজেডি : অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড থামবে কবে?’ শীর্ষক সেমিনারে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির।
১১ দফা সুপারিশগুলো হল : আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানার সম্পূর্ণ স্থানান্তর করতে হবে। জাতীয় রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আধুনিকায়ন করতে হবে। আইন ও বিল্ডিং কোডের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল লাইসেন্সিং ও নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জাতীয় ডেটাবেস ও প্রকাশ্য তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। ভবনের নিরাপত্তা সনদ বাধ্যতামূলক করতে হবে। জরুরি প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আইন বাস্তবায়নে সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অগ্নিদুর্যোগমুক্ত ও নিরাপদ নগরায়ণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার করতে হবে। নগর অগ্নি ও রাসায়নিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সেমিনারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, সমাজের শিক্ষত ও ধনী শ্রেণিদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে দেশের আমূল পরিবর্তন সম্ভব। শুধুমাত্র আর্থিক লোভের কারণে কিছু লোক আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল গোডাউনের জন্য বাসা ভাড়া দিয়ে থাকে। এতে নিমতলী-চুড়িহাট্টার মত অগ্নিদুর্ঘটনার শিকার হয় সাধারণ মানুষ। এ বিষয়ে স্থানীয় জনসাধারণকে সচেতন হতে হবে। সচেতনতার পাশাপাশি বিল্ডিংকোড নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ দরকার।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন বলেন, দেশের যেকোনো ডিজাস্টারে প্রথমে ফায়ার সার্ভিস কাজ শুরু করে। ভবন তৈরির ক্ষেত্রে সঠিক নীতিমালা মানা হয় না। অনুমোদন ৫ তলা থাকলেও করা হয় ১০ তলা। এটা রাজউক জেনেও কার্যকর কোনো পদক্ষে নেয় না। এ ক্ষেত্রে দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনের কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নাই।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, দুর্যোগ নিরসনে সরকারের সঠিক নীতিমালা তৈরি করা দরকার। পরিবেশ ও জনবান্ধবতার কথা চিন্তা করে ঢাকাকে আর বাড়ানো উচিত হবে না। সিটি গভর্নমেন্টের আয়তায় ঢাকাকে আনতে হবে। পরিবেশ ও জনবান্ধব উন্নয়নশীল ঢাকা গড়তে সঠিক ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মূল প্রবন্ধে বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, শিল্পায়নের প্রসার, রাসায়নিকভিত্তিক ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং নগর জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপদ রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, নগর পরিকল্পনা এবং আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ দাহ্য, বিস্ফোরক ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহার হলেও সেগুলোর নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এরই নির্মম পরিণতি ছিল ২০১০ সালের নিমতলী কেমিক্যাল ট্র্যাজেডি। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার, সীতাকুণ্ড বিএম কনটেইনার ডিপো কিংবা সাম্প্রতিক বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ড, বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং নীতিগত ব্যর্থতা, দুর্বল নগর শাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ধারাবাহিক প্রতিফলন।




