অক্সফাম ইন বাংলাদেশ ও মিশন গ্রিন বাংলাদেশ (এমজিবি)-এর যৌথ উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাজধানীর ‘দ্য ডেইলি স্টার অডিটরিয়াম’-এ ‘দ্য রোড টু কপ৩১ : ব্রিজিং এশিয়ান ইয়ুথ ডিমান্ডস ফ্রম গ্রাসরুট টু গ্লোবাল লেভেল’ শীর্ষক একটি নীতি-নির্ধারণী সেমিনার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারক, শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু বিজ্ঞানী, পরিবেশ অর্থনীতিবিদ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং যুব নেতারা উপস্থিত হয়ে কপ৩১-কে সামনে রেখে জলবায়ু অর্থায়নে ঋণের বোঝা বন্ধ করে সরাসরি অনুদান নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে যুব ফেলো নুহাইল কবির এবং এ. জে. সাগর ঢাকা শহরের বস্তি, রাজশাহী ও কক্সবাজারে পরিচালিত মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতার চিত্র তুলে ধরেন। তারা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী ৩০ বছরে দেশের অর্ধেক এলাকা পানির নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহীর মুন্ডা আদিবাসী সম্প্রদায় তীব্র সুপেয় পানি ও শিক্ষা সংকটে ভুগছে। ৩২ বছরে ৯ বার নদী ভাঙনের শিকার হওয়া মানুষের গল্প তুলে ধরে তারা জলবায়ু অর্থায়নে ‘সরাসরি অনুদান, কোনো ঋণ নয়’ নীতি কার্যকরের দাবি জানান।
প্রধান বক্তা হিসেবে দেশের প্রথিতযশা জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের কাঠামোগত জটিলতা তুলে ধরে বলেন, উন্নত দেশগুলো অনুদান-ভিত্তিক তহবিলের ধারণায় সম্মত হলেও আমাদের দেশে সরাসরি আবেদন করার সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। প্রায়ই নিয়ম বহির্ভূতভাবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আবেদন করার ফলে বাংলাদেশ সরাসরি তহবিল থেকে বঞ্চিত হয়। আমরা আসলে আন্তর্জাতিক ফোরামে আমাদের দাবিগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতেই জানি না। জলবায়ু অর্থায়নকে অবশ্যই ন্যায়সংগত, দ্রুত, অনুদান-ভিত্তিক, সহজলভ্য এবং জবাবদিহিমূলক হতে হবে-এখানে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা ফাঁকা প্রতিশ্রুতির স্থান নেই।
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর শরীফ জামিল যুবকদের উদ্দেশে বলেন, কপ বিশ্বনেতাদের একটি বিশাল মঞ্চ, কিন্তু তরুণদের সেখানে কেবল শ্রোতা হিসেবে গেলে চলবে না। বৈশ্বিক নীতি-প্রক্রিয়াকে সত্যিকার অর্থে প্রভাবিত করতে হলে আমাদের তরুণদের গভীর প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং নিখুঁত ডেটা বা তথ্য-প্রমাণ নিয়ে হাজির হতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সাথে বৈশ্বিক আর্থিক জবাবদিহিতার সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে। এখন আর শুধু প্রচারণার সময় নয়, আক্রমণাত্মক ও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক কূটনীতির সময়।
সেমিনারের বিশেষ যুব প্যানেলে ইয়ুথনেট গ্লোবাল-এর অ্যাক্সিকিউটিভ কোঅর্ডিনেটর সোহানুর রহমান জলবায়ু কূটনীতিতে যুবদের কৌশলগত অগ্রাধিকারের বিষয়ে বলেন, বিশ্বমঞ্চ বা কপে যাওয়ার চেয়েও আমাদের জন্য এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজস্ব জলবায়ু সংকটগুলো নিয়ে আগে বাংলাদেশ সরকারকে প্রভাবিত করা এবং দেশের নীতি কাঠামোতে যুবদের দাবি অন্তর্ভুক্ত করা।
এই প্যানেলে আরো বক্তব্য দেন ব্রাইটার্স-এর চেয়ার ফারিয়া অমি, ফাউন্ডার সাইদুর রহমান সিয়াম এবং ইয়ুথ৪এনডিসি-এর নির্বাহী পরিচালক আমানুল্লাহ পরাগ। বক্তারা কপের অতিরিক্ত প্রচারণার পেছনে না ছুটে যুবদের তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করার এবং জলবায়ু আন্দোলনে অভ্যন্তরীণ বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।
পরবর্তী বিশেষজ্ঞ প্যানেলে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, তৃণমূলের পরিবেশগত সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাবগুলোকে আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে যুবদের নিখুঁত ডেটা মডেলিং এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ ব্যবহার করতে হবে।
সিরাক বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে এখনই রুখতে হবে, তা না হলে বিশ্ব ধ্বংসের মুখে পড়বে। যদিও কপ থেকে সরাসরি তহবিল তাৎক্ষণিকভাবে আসে না, তবুও এটি বিশ্বনেতাদের একত্রিত করার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম, তাই পরিবেশগত অ্যাজেন্ডাকে সবার মূল লক্ষ্য বানাতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে এখন টিভি-এর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহমুদ রাকিব বলেন, আমাদের জাতীয় গণমাধ্যমগুলো প্রায়শই জলবায়ু বিপর্যয়কে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দৈনন্দিন ‘দুর্ঘটনা বা ঘটনা’ হিসেবে দেখায়। কিন্তু এই সংকটের পেছনের মূল কাঠামোগত কারণ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু অন্যায়ের চিত্রটি তারা গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলে না, যা বদলানো দরকার।
প্যানেলে বাংলাভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কেফায়েত শাকিলও একই মত পোষণ করেন।
অনুষ্ঠানের মডারেটর এবং অক্সফাম ইন বাংলাদেশ-এর ইনফ্লুয়েন্সিং, কমিউনিকেশনস, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড মিডিয়া (আসিএএম) প্রধান মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশের জলবায়ু বাজেট ২৫% বৃদ্ধি পেলেও জলবায়ু জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় কেবল প্রচারণা যথেষ্ট নয়, এর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে সরাসরি এবং কঠিন পুঁজি পাট্টা বা আর্থিক অনুদান প্রয়োজন।
সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন সিথ্রিইআর, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ডেপুটি ডিরেক্টর রউফা খানম, ইউএএলবি-এর স্কুল অব বিজনেস-এর ডিন অধ্যাপক ড. সারওয়ার উদ্দিন আহমেদ, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ (এমজিবি)-এর নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি সামাজিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতা ও যুব প্রতিনিধিরা।
সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব আবহে অনুষ্ঠানের সমাপনীতে কোনো প্লাস্টিক বা কৃত্রিম স্মারক না দিয়ে, টেকসই জলবায়ু সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে উপস্থিত সকল অতিথি ও যুব প্রতিনিধিদের মাঝে বিশেষ উপহার হিসেবে টবসহ জীবন্ত গাছ বিতরণ করা হয়।




