তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত একনেকে অনুমোদন, অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবিতে তিস্তা নদীর দুই তীরের পাঁচ জেলায় গণসমাবেশ ও আলোর মিছিল করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রত্যয়ের ঘোষণা দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে এবং ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে বুধবার (১জুলাই) রাতে এ কর্মসূচির আয়োজন করে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে-রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় একযোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। সমাবেশ শেষে মশাল প্রজ্বালনের মাধ্যমে আলোর মিছিল বের করা হয়।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাবাজারের আলীবাবা থিম পার্কসংলগ্ন তিস্তাপারে আয়োজিত কেন্দ্রীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী।
তিনি বলেন, ‘চীন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরেই এই সরকার যে কোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। আমরা এ ঘোষণাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। তবে তিস্তাপারের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শুধু প্রতিশ্রুতি শুনেছে। এখন তারা নতুন আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়।
অধ্যক্ষ নজরুল বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি নদীভাঙন রোধ, তিস্তার দুই তীর সংরক্ষণ, নদী খনন, শাখা-উপনদী পুনরুজ্জীবন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, কৃষি উৎপাদন ও সেচ সম্প্রসারণ, নৌযোগাযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।
পরিষদ সভাপতি বলেন, ‘জাতীয় সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়নই হবে তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন।’ তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার মানুষ আজ আলোর মিছিলে অংশ নিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত একনেকে অনুমোদন এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়বদ্ধ বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানাচ্ছে।’
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন প্রকৌশলী শেখ রেজওয়ান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য আব্দুর রাজ্জাক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আলমগীর কবির, বাবুল আক্তার, আশিকুর রহমান,ববিউল ইসলাম,স্থানীয় সংগঠক আব্দুস ছাত্তার, জিয়াউর কামরুজ্জামান ও রফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
বক্তারা বলেন, আমরা আশা করেছিলাম মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা এবং একনেকে অনুমোদন দেওয়া হবে। যদিও সেটি এখনো হয়নি, তবু চীন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা তিস্তাপারের মানুষের মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। এখন তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাই।
পদ্মা হলে তিস্তা নয় কেন-এই স্লোগানকে সামনে রেখে পুরো জুন মাসজুড়ে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে সভা-সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ, হাটসভা, উঠান বৈঠক, বিক্ষোভ ও মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে বলে জানান বক্তারা।
এদিকে, একই দাবিতে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আউলিয়ার বাজার পয়েন্টে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য আব্দুন নুর দুলাল ও মাহমুদ আলম এবং কেন্দ্রীয় নেতা আশরাফুল ইসলাম, পারভিন আক্তার, ওমর ফারুক ও মোনায়েম সরকার।
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শৈলমারী ও বানপাড়া তিস্তাপারের কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান, স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ছাদেকুল ইসলাম, শৈলমারী ইউপি চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান জামান এবং কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম পাশা এলিচ ও জাহাঙ্গীর রহমান।
এছাড়া কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট তিস্তা তীর এবং উলিপুর উপজেলার হোকোডাঙার তিস্তাপারেও পৃথক কর্মসূচি পালন করা হয়। সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, ‘জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি তিস্তা অববাহিকার মানুষের মধ্যে নতুন আশা সঞ্চার করেছে। সেটাকে বাস্তবে রূপ দিতে দ্রুত একনেকে অনুমোদন, অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা এখন সময়ের দাবি।’
শফিয়ার রহমান বলেন, আগামী দিনে রংপুর অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
সমাবেশ থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত একনেক অনুমোদন ও বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণা; অভিজ্ঞ নদী প্রকৌশলী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও তিস্তা আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তিস্তা কর্তৃপক্ষ গঠন এবং দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ।
এ ছাড়া সরকারি ব্যবস্থাপনায় তিস্তা বন্ড চালু ও বালু-পাথর বিক্রির আয় প্রকল্পে বিনিয়োগ; ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল, কৃষি অঞ্চল, সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, কৃষিভিত্তিক সমবায় ও কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলার দাবি করা হয় সমাবেশে।