কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে টাকার বিনিময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের অবৈধভাবে বাংলাদেশের জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ব্যাপারে ৬নং ফতেহাদ ইউপি’র ১নং ওয়ার্ড সদস্য মো. নুরুল ইসলাম নুরু মেম্বার জানান, সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ ও মুবিনা খাতুন তার ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা। ওরা এখনো এলাকায়ই অবস্থান করছেন।
ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল এবং ইউপি সচিব মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ এনে রেজিস্ট্রার জেনারেল (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) কার্যালয়ে একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
গত ৭ জুলাই ২০২৬ স্থানীয় বাসিন্দা শফিউল আলম অভিযোগটি দায়ের করেন। একই সঙ্গে অভিযোগের অনুলিপি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং কুমিল্লার জেলা প্রশাসকের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল ও ইউপি সচিব মো. নজরুল ইসলাম যোগসাজশ করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর তিনজনকে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদান করেছেন। এর বিনিময়ে প্রতিটি নিবন্ধনের জন্য ৩ লাখ টাকা করে মোট ৯ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন— সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ, বাবা রফিকুল ইসলাম, মা নুরজাহান। তার জন্ম তারিখ ১৪ মার্চ ১৯৯৮। জন্ম নিবন্ধনের রেজিস্ট্রেশন তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০২৫ এবং সনদ ইস্যুর তারিখ ১৯ অক্টোবর ২০২৫।
দ্বিতীয় ব্যক্তি মুবিনা খাতুন, তার বাবা মোহাম্মদ কাশেম, মা নুরজাহান। জন্ম তারিখ ১০ ডিসেম্বর ১৯৭৮। জন্ম নিবন্ধনের রেজিস্ট্রেশন তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০২৫ এবং সনদ ইস্যুর তারিখ ৭ জুলাই ২০২৫।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ ও মুবিনা খাতুনের মায়ের নাম একই অর্থাৎ নুরজাহান হলেও তাদের বাবার নাম ভিন্ন। একই দিনে তাদের জন্ম নিবন্ধনের রেজিস্ট্রেশন করা হলেও তথ্যের এই অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।
তৃতীয় ব্যক্তি হাফিছা। তার বাবা ফোরকান আহমদ, মা পাখিজা আক্তার। জন্ম তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০০৫। জন্ম নিবন্ধনের রেজিস্ট্রেশন তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০২৫। তবে সনদ ইস্যুর তারিখে ১ জানুয়ারি ০০০১ উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এই তিনজনের কেউই ফতেহাবাদ ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা নন। তাদেরকে অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে জন্ম নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে তিনটি জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সরকারের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন যাচাইকরণ (Birth and Death Verification) ওয়েবসাইটে পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, মুবিনা খাতুন ও সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদের জন্মস্থান কক্সবাজার দেখাচ্ছে। তবে হাফিছার জন্মস্থান কুমিল্লা প্রদর্শিত হচ্ছে।
লিখিত অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের জন্ম নিবন্ধনের সরকারি সার্ভারের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড শুধুমাত্র চেয়ারম্যান ও সচিবের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা অবৈধভাবে জন্ম নিবন্ধন প্রদান করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে দাবি করা হয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত হলে এ ধরনের আরো বহু ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
এ বিষয়ে ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল বলেন, তিনি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করলেও জন্ম নিবন্ধনের ইউজার এক্সেস পান ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ সালে। তার দাবি, অভিযোগে উল্লেখিত জন্ম সনদগুলো তার সময়ে তৈরি হয়নি। অভিযোগ দায়েরের আগে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। করা বা কিভাবে এ জন্ম নিবন্ধন করা হলো তাও তিনি বলতে পারেন না। তবে জন্ম সনদের ইস্যুর তারিখ অনুযায়ী ঘটনাগুলো তার দায়িত্বকালেই হয়েছে বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন।
অভিযোগকারী শফিউল আলম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সব অবৈধ জন্ম নিবন্ধন বাতিল করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের নাম-ঠিকানা গোপন রাখার জন্যও প্রশাসনের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন অভিযোগকারী।




