kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

৮ বছরের বাগান, ১০ লাখ লেবুসহ ৫ হাজার গাছ কেটে দিল বন বিভাগ!

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার   

৩ আগস্ট, ২০২১ ২০:১৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৮ বছরের বাগান, ১০ লাখ লেবুসহ ৫ হাজার গাছ কেটে দিল বন বিভাগ!

কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের পূর্ব পাড়ার এক দরিদ্র কৃষকের পাঁচ হাজারের বেশি লেবু গাছ কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বনকর্মীদের বিরুদ্ধে। পুরোদমে ফলনও এসেছিল গাছগুলোতে। প্রতিটি গাছে গড়ে কমপক্ষে ২০০ হলেও অন্তত ১০ লাখ লেবুসহ গাছগুলো কেটে পাহাড়গুলো করা হয়েছে বৃক্ষহীন। গত কয়েক বছরে তিলে তিলে গড়ে তোলা একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম লেবু বাগানটি কেটে ফেলায় আহাজারিতে বুক ভাসাচ্ছেন কৃষক নজির আলম (৪৩)।

লেবু বাগানের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জানান, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের জোয়ারিয়ানালা বন রেঞ্জের প্রায় ২০ কানি (৮ একর) বনভূমিজুড়ে একটি লেবু বাগান করেন। এসব বনভূমি এমনিতেই পরিত্যক্ত। বন বিভাগের কোনো গাছগাছালিও নেই সেখানে। স্থানীয় সোনাইছড়ি খালের তীরে ভিলেজারের (বনজায়গীরদার) উত্তরাধিকার সূত্রে বনকর্মীদের অনুমতিসাপেক্ষে বনভূমিতে লেবু বাগানটি করা হয়।

এর আগে, ওই বনভুমিতে গত ২০ বছর ধরে তিনি তরমুজ, মরিচসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে আসছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেখানে অপহরণকারী ও ডাকাতদলের উৎপাত বাড়লে তিনি আট বছর পূর্বে সেখানে লেবু চাষ শুরু করেন।

বনভূমিতে গড়ে তোলা এতবড় লেবু বাগানটি কেটে ফেলার কথা অকপটে স্বীকার করেন কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) তৌহিদুল ইসলাম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'লেবু বাগান কেটে বন বিভাগের জমি জবরদখলমুক্ত করেছি। বনভূমি রক্ষায় উচ্ছেদের সময় কি গাছ বা বন কাটা গেল সেটা মুখ্য নয়।'

বনভূমির ওই এলাকায় বন বিভাগের সৃজিত কোনো গাছগাছালি নেই এমনকি আরো অনেক জনের লেবু বাগান থাকা সত্ত্বেও কেন শুধু নজির আলমের বাগান কাটা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'উচ্ছেদ মাত্র শুরু হয়েছে, এটা চলবে।'

এদিকে, বনভূমিতে বাগান করার বিনিময়সহ স্বল্প টাকার মজুরিতে বনকর্মীরা কৃষক নজির আলম ও তার পুত্র আরিফকে সেগুন বাগান পাহারাসহ নানা কাজে লাগায়। গত ৩০ মাস ধরে কৃষক নজির ও তার পুত্র বন বিভাগের স্থানীয় সেগুন বাগান পাহারার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু তাদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। 

লেবু বাগানের মালিক কৃষক নজির বন রেঞ্জ কর্মকর্তার নিকট সেগুন বাগান পাহারার পাওনা দুই লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করায় উল্টো বনভূমিতে লেবু বাগানের জন্য তার (কৃষক) কাছে টাকা চাওয়া হয়। কৃষক নজিরের অভিযোগ, টাকা না দেওয়ায় গত কয়েকদিন আগে বনকর্মীরা ধরে নিয়ে যায় তার পুত্র আরিফকে। বনকর্মীরা তাকে মারধর করে বনভূমিতে লেবু বাগান করার জন্য তিন লাখ টাকা দাবি করেন। এ ঘটনার পর থেকে লেবু বাগানের মালিক নজিরের সঙ্গে বনকর্মীদের সম্পর্কে মারাত্মক দূরত্বের সৃষ্টি হয়।

বর্তমানে সবকটি গাছে লেবুর ফলন আসতে শুরু করেছে। প্রতিটি গাছে ১০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত লেবু ধরেছে। তার এ সফলতা দেখে বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা-হেডম্যান (বনজায়গীরদার প্রধান) তার কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করতে থাকেন। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় গত বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) সকালে জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জ কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ টিটুসহ একদল ভাড়াটে লোকজন তার লেবু বাগানে গিয়ে ফলবান এসব গাছ কাটা শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা পুরো বাগানের পাঁচ হাজার লেবু গাছ কেটে দেয়।

জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স কালের কণ্ঠকে বলেন, নজির আলমের সৃজিত বাগানের বিপুল পরিমাণ লেবু গাছ কেটে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিলে তিলে গড়ে তোলা হাজার হাজার ফলবান গাছের একটি বাগান কেটে ফেলার মানে উচ্ছেদ হতে পারে না।

ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, কৃষক নজির সারাজীবনই বন বিভাগের কাজ করে যাচ্ছেন। বনকর্মীদের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণেই এমন সবুজ বাগানটি কেটে ফেলা হয়েছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, হাজার হাজার একর বনভূমি পড়ে রয়েছে বৃক্ষহীন অবস্থায়। শূন্য বনভূমিতে বনকর্মীরা কোনো বনায়ন করে যেখানে সবুজায়নও করতে পারছে না সেখানে স্থানীয়দের গড়ে তোলা বাগান কেটে ফেলার ঘটনাটি পরিবেশের জন্যও উদ্বেগজনক। তারা বিষয়টি নিয়ে তদন্তসাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে, লেবু বাগান কেটে সাবাড় করার ঘটনায় অভিযুক্ত জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জ কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ টিটু বন বিভাগের পক্ষে তিন লাখ টাকা দাবির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে বাগানটি সৃজন করায় সেটি কেটে দেওয়া হয়েছে। কেটে ফেলা পরিত্যক্ত বনভূমিতে রয়েছে আরো অনেক লেবু বাগান। প্রতিহিংসামূলক নাহলে কৃষক নজির আলমের ছাড়া অন্য কোনও লেবু বাগান কাটা হয়নি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আরো যারা এভাবে বন দখল করে বাগান করেছেন তাদের বাগানও উচ্ছেদ করা হবে।'



সাতদিনের সেরা