পাবনার ঈশ্বরদীস্থ বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিএসআরআই) আয়োজনে ২ দিনের কর্মশালা উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রথম দিনে অতিথিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির আখসহ মিষ্টি জাতীয় খাদ্যপণ্যের উৎপাদন গবেষণার উজ্জ্বল সম্ভাবনা। এর সঙ্গে উঠে এসেছে বিএসআরআই প্রতিষ্ঠানটি নানা মুখি সমস্যার কথা। গবেষণায় বৈজ্ঞানিকদের পদনোন্নতি, শুন্যতা, পরিবেশ পরিস্থিতি অনুসারে আখের নতুন জাত উদ্ভাবন না হওয়া, মাঠ পর্যায়ে কৃষিবিদ না থাকা, একই ক্যাটাগরিতে কৃষকদের ভুর্তকি প্রদান, আখের জীবনকাল আরও কমিয়ে এনে অন্যান্য ফসলের চাষ করে কৃষকদের লাভবান করানো উদ্যোগ না নেওয়াসহ গবেষণার ফলাফল সেমিনালে উপস্থাপনা না করার সমস্যাতেও জর্জরিত দেশে আখের উৎপাদন গবেষণার এই বিএসআরআই প্রতিষ্ঠানটি।
আজ সোমবার (২২ জুন) সকালে প্রতিষ্ঠানের এএসএম কামাল উদ্দিন মিলনায়তনে এ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা এসব সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বক্তরা।
গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, উন্নত জাত, চাষাবাদ কৌশলকে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ কার্যক্রমের সঙ্গে আরো কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করে প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যক্রম গতিশীল করাই এ কর্মশালার অন্যতম লক্ষ্য বলে কর্মশালার শুরুতে জানানো হয়।
উদ্বোধনী কর্মশালার প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এগ্রিকালচারাল ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ ও বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য অধ্যাপক এ এস এম গোলাম হাফিজ।
তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত বৈজ্ঞানিকদের মামলাসহ নানা জটিলতার কারণে পদন্নোতি হয়নি। শুন্য রয়েছে বৈজ্ঞানিকদের পদ। এই কারণে বৈজ্ঞানিকরা মনোযোগসহ গবেষণামুলক কাজ করতে পারছেন না। এই কারণে প্রতিষ্ঠান নানা মুখি সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিএসআরআই প্রতিষ্ঠানটিতে সুপার ফুড/ ব্রেন ফুড তথা মিষ্টি চিনি জাতীয় পণ্য উৎপাদন ও গবেষণার রয়েছে উজ্জ্বল সম্ভাবনা। এই জন্য নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত সভা সেমিনার করা, মাঠে উৎপাদন কাজে নিয়োজিত থাকা চাষীদের সমস্যাগুলো চিহিৃত করে দ্রুত সমাধান করার বিকল্প নেই।’
বিএসআরআই-এর মহাপরিচালক (ডিজি) ড. কবির উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএসফআইসি) যুগ্মসচিব এবং পরিচালক (ইক্ষু উন্নয়ন ও গবেষণা) ড. আব্দুল আলীম খান বলেন, ‘বিগত তিন বছর ধরে বিএসআরআই আখের কোন নতুন জাতের আখ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। চাষীর নিকট নতুন জাতের আখের চাহিদা রয়েছে, কিন্তু আমরা তা দিতে পারছি না। আখের জীবনকাল আরো কমিয়ে অন্যান্য ফসলের সঙ্গে চাষ করার ব্যবস্থা করে চাষীদের লাভ না করাতে হবে। আখের চাষ কমিয়ে যাওয়ার পেছনে এটি প্রধান একটি কারণ।’
কর্মশালার বিএসআরআই-এর পরিচিতি ও গবেষণা সাফল্য উপস্থাপন করে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটিতে ৩৫ টি বৈজ্ঞানিক পদ শুন্য রয়েছে। ১৫ টি মুখ্য বৈজ্ঞানিক পদে পদন্নোতি হয়নি। যার ফলে বৈজ্ঞানিক শুন্যতার কারণে অনেক বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে না।’
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মিল এলাকায় ইক্ষু চাষ বিষয়ক প্রযুক্তি বিস্তারের সমস্যা, সম্ভাবনা এবং প্রণীতব্য অগ্রাধিকারভিত্তিক গবেষণা নিয়ে আলোচনায় করেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের প্রতিনিধি ড. মো. ইউসুফ আলী।
নন-মিল জোনে ইক্ষু ও অন্যান্য সুগারক্রপ চাষের প্রযুক্তি বিস্তারে বিরাজমান সমস্যাদি ও গবেষণা অগ্রাধিকার নিরূপণ বিষয়ক প্রতিবেদন উপস্থাপন ও আলোচনা কালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ী ঢাকার পরিচালক (ক্রপস) ড. সালমা লাইজু বলেন, ইংল্যান্ডের মানুষ বছরে ১৬ কেজি মিষ্টি জাতীয় তথা সুগার গ্রহন করেন। আর বাংলাদেশের মানুষ গ্রহন করেন মাত্র ৫-৬ কেজি। বছরে ইংল্যান্ডের একজন লোক এতো পরিমাণে সুগার গ্রহন করলেও তাদের মধ্যে কোনরুপ ভয় ভীতি নেই। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সুগার গ্রহনের ক্ষেত্রে রয়েছে নানাবিধ ভয় ও ভীতি। কারণ আমরা জানি না কখন কিভাবে সুগার গ্রহন করতে হয়।
একই সঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘সুগার ফুডকে ব্রেন ফুডও বলা হয়। যা মানব দেহের জন্য অতি প্রয়োজন। তারপরও বাংলাদেশের সব জেলায় আখের উৎপাদন হয় না। আবার বিশ্বের আখ উৎপাদন দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নামই নেই। এদেশের মানুষের জন্য ব্রেন ফুড প্রয়োজন রয়েছে। তাই বাড়ির আঙ্গিনায় ব্রেন ফুড তথা আখের চাষ করা উপর গুরুত্ব আরোপ করেন ড. সালমা লাইজু।’ কর্মশালায় আগত সকলকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন বিএসআরআই-এর পরিচালক (প্রযুক্তি হস্তান্তর) ড. সেলিনা আখতার।
এ অনুষ্ঠানে বিএসআরআই-এর বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সুগারমিল, এনজিও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, মৌ চাষি ও কৃষকেরা উপস্থিত ছিলেন।যৌথভাবে কর্মশালা সঞ্চালনায় ছিলেন বিএসআরআইর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নুসরাত জাহান উপমা ও নাজনীন আক্তার মুন্না।
কর্মশালার আয়োজক সুত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে বিএসআরআই-এর রোগতত্ত্ব, কীটতত্ত্ব, কৃষি প্রকৌশল, কৃ ষি অর্থনীতি, অন-ফার্ম এবং প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বিভাগের প্রযুক্তি উপস্থাপন ও আলোচনা করবেন বিভাগীয় প্রধানরা।




