কারো মাথা ব্যথা সারছিল না বহুদিন। কারো হাত-পা একে একে অবশ হয়ে আসছিল। কেউ আবার একদিন আতঙ্কে বুঝতে পারলেন, পৃথিবীটা আর আগের মতো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না—দৃষ্টিশক্তি হারানোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এমন ১০০টি মানুষের গল্প আলাদা, কিন্তু এক জায়গায় তারা সবাই মিলে যান—মস্তিষ্কের অত্যন্ত স্পর্শকাতর কোনো এক জায়গায় বাসা বেঁধেছিল টিউমার, যেখানে কয়েক মিলিমিটারের ভুলও বদলে দিতে পারে একটি জীবনের পুরো গতিপথ। এই ১০০টি জীবনের গল্পই এখন রূপ নিয়েছে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায়, যা চট্টগ্রামের নিউরোসার্জারির ইতিহাসে যুক্ত করেছে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
যখন সীমাবদ্ধতাই হয়ে ওঠে সাহসের পরীক্ষা :
বিশ্বব্যাপী ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশেও রোগ নির্ণয়ের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি প্রকৃত রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই রোগের চিকিৎসায় যা প্রয়োজন—অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ সার্জিক্যাল টিম, নিবিড় পোস্ট-অপারেটিভ পরিচর্যা, তা এখনো দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে সীমিত। সর্বাধুনিক নিউরো ন্যাভিগেশন বা ইন্ট্রা-অপারেটিভ এমআরআইয়ের মতো প্রযুক্তি দেশের অনেক বেসরকারি হাসপাতালেই সহজলভ্য নয়।
ঠিক এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেড প্রমাণ করেছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। রবিবার (২৮ জুন) পার্কভিউ হাসপাতালে এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে উপস্থাপিত হয় হাসপাতালটির প্রথম ১০০টি ব্রেইন টিউমার সার্জারির পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিবেদন। গবেষণাটি উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মু. ইসমাঈল হোসেন।
যন্ত্র নয়, মানুষই আসল শক্তি :
গবেষণায় পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে রোগী নির্বাচন, অপারেশন পরিকল্পনা, অ্যানেস্থেসিয়া, অপারেটিভ টেকনিক এবং পরবর্তী নিবিড় পরিচর্যার সমন্বয়ের মাধ্যমে সীমিত সম্পদ নিয়েও অত্যন্ত সন্তোষজনক সার্জিক্যাল ফলাফল অর্জন করা সম্ভব।
ডা. ইসমাঈল তার উপস্থাপনায় বলেন, সফল নিউরোসার্জারি শুধু উন্নত যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না, এর সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ সার্জনের অভিজ্ঞতা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নিবেদিতপ্রাণ টিম এবং রোগীর প্রতি আন্তরিক দায়িত্ববোধ। এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে পুরো গবেষণার মূল বার্তা, অভিজ্ঞতা আর টিমওয়ার্ক যেখানে যন্ত্রের সীমাবদ্ধতাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।
সংখ্যার আড়ালে যে গল্প :
গবেষণায় দেখা যায়, ব্রেইন টিউমার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ পুরুষ এবং ৪২ শতাংশ মহিলা। ১৮ বছরের নিচে রোগীর সংখ্যা ১৩ শতাংশ, অর্থাৎ এই রোগ বয়সের কোনো সীমারেখা মানে না, ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে পারে শিশু থেকে বয়স্ক, সবার জীবনেই।
সার্জারি করা রোগীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ আক্রান্ত ছিলেন মেনিঞ্জিওমা টিউমারে, আর ২৪ শতাংশ গ্লাইওমা টিউমারে। আর সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক তথ্যটি হলো ফলাফলে ৮৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ টিউমার অপসারণ সম্ভব হয়েছে। আরো ১০ শতাংশ রোগীর প্রায় সম্পূর্ণ অপসারণ সম্ভব হয়েছে। শুধু ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ অপসারণ সম্ভব হয়নি, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনীয় একটি সাফল্যের হার। অত্যাধুনিক মাইক্রোস্কোপ ব্যবহারের ফলে সুনিপুণ সার্জারির সম্ভাবনা বেড়েছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে সার্জিক্যাল আউটকামেও।
কিন্তু এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একজন মানুষ, এক পরিবার ও একটি জীবনের গল্প। কারও দীর্ঘদিনের মাথাব্যথা, কারও খিঁচুনি, আবার কারো অবশ হয়ে যাওয়া হাত-পা, কারো দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কা প্রতিটি রোগীই ছিলেন একটি স্বতন্ত্র চিকিৎসা-চ্যালেঞ্জ। আর এই ১০০টি অপারেশনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা, জটিলতা মোকাবেলার কৌশল এবং সার্জিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব অভিজ্ঞতাই এই গবেষণার সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা :
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন পার্কভিউ হাসপাতালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. এ টি এম রেজাউল করিম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ নিউরোসার্জারির সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. কামাল উদ্দিন। প্যানেল অফ এক্সপার্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ, নিউরো সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল আলম, নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মুহিতুল আলম, নিউরোসার্জন সহযোগী অধ্যাপক (সাবেক) ডা. মো. মঞ্জুরুল ইসলাম এবং নিউরোসার্জন সহযোগী অধ্যাপক (সাবেক) ডা. মো. আনিসুল ইসলাম খান।
তারা সবাই গবেষণার বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার সম্ভাবনার প্রশংসা করেন। তাদের অভিন্ন মতামত- নিয়মিত অডিট, ফলাফল বিশ্লেষণ এবং গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসাই ভবিষ্যতের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে।
এক সূচনা, যার গন্তব্য আরো দূরে :
সিম্পোজিয়ামে ডা. মু. ইসমাঈল হোসেন স্পষ্ট করে বলেন, এই ১০০টি কেস কেবলই একটি সূচনা। পরবর্তী পর্যায়ে আরো বৃহৎ রোগী সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপ, জীবনমানের উন্নয়ন, টিউমারের ধরনভিত্তিক ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি অপারেশন থেকে শেখা প্রতিটি অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতের রোগীদের আরো নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশে ব্রেইন টিউমার সার্জারির ফলাফল নিয়ে একক প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক গবেষণা এখনও খুবই সীমিত। এই গবেষণা ভবিষ্যতে দেশের নিউরোসার্জারির মান মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে তুলনা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে, দেশের দক্ষ নিউরোসার্জনরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সফলভাবে জটিল মস্তিষ্কের অপারেশন পরিচালনা করতে সক্ষম।
একশ পরিসংখ্যান নয়, একশ নতুন সূর্যোদয় :
বাংলাদেশে যখন ব্রেইন টিউমারের রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, তখন এই গবেষণা একটি স্বস্তিদায়ক বার্তা দেয়- সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ সার্জন, নিবেদিত চিকিৎসক দল এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশের মধ্যেই বিশ্বমানের নিউরোসার্জারি সম্ভব।
পার্কভিউ হাসপাতালের প্রথম ১০০টি ব্রেইন টিউমার সার্জারির এই অভিজ্ঞতা আসলে কোনো শুকনো পরিসংখ্যান নয়। এটি এক শতাধিক মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো ফিরিয়ে আনার গল্প, যেখানে কেউ একদিন মাথাব্যথা নিয়ে এসেছিলেন আতঙ্কিত মনে, আর ফিরে গেছেন নতুন এক জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে। আর এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা, নিরলস পরিশ্রম এবং একজন নিউরোসার্জনের অবিচল প্রতিশ্রুতি- প্রতিটি রোগীর জন্য সর্বোচ্চ মানের নিরাপদ অস্ত্রোপচার নিশ্চিত করা।