kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

সৌদিফেরত রুবিনার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা

প্রতিদিন দলবেঁধে ধর্ষণ করা হতো মেয়েটিকে

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি   

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৮:৪০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রতিদিন দলবেঁধে ধর্ষণ করা হতো মেয়েটিকে

স্থানীয় দালালের 'লোভনীয় অফারে' সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিক বিকারগ্রস্ত এক তরুণী গৃহবধূ তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ফিরেছেন।

৩ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে ইউএনও'র দপ্তরে কেমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাঁর স্ত্রী- তারই বর্ণনা দিতে গিয়ে স্বামী বলেন, চার-পাঁচ দিন আগে বাড়ি ফিরে নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে জ্ঞান হারান তার স্ত্রী। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সৌদি আবর থেকে বেঁচে এসে নিজ বাড়ি ফিরে বীভৎস ও লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা দেন রুবিনা বেগম (২২) নামের ওই তরুণী। তিনি লোভনীয় প্রস্তাবে গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে সৌদি আরব গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ২৭ নভেম্বর দেশে ফেরেন। বাড়িতে শারীরিক অবস্থা অবনতি হওয়ায় ২৮ নভেম্বর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলেও অর্থের অভাবে পুরো চিকিৎসা না নিয়েই রবিবার ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফেরেন রুবিনা।

সৌদিফেরত রুবিনা বেগমের বাড়ি কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে। সে বনগাঁও গ্রামের ফুল মিয়ার স্ত্রী। তার বাবার বাড়িও একই ইউনিয়নের রাজকান্দি গ্রামে। মঙ্গলবার দুপুরে স্বামীসহ রুবিনার বাবা ও মা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হকের কাছে স্থানীয় দালাল ইউপি সদস্য মোস্তফা মিয়ার বিচার চান। তখন মেয়েটি কোনো কথা বলতে পারেনি। বোবার মতো চারদিকে চেয়ে দেখেছে। ইউএনও তাৎক্ষণিক সৌদিফেরত রুবিনার উন্নত চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তির ব্যবস্থা করেন এবং আশ্বাস দেন স্থানীয় দালাল এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার।

এদিকে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রুবিনার স্বামী ফুল মিয়া জানান, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ২৭ নভেম্বর দেশে ফেরেন তার স্ত্রী। বাড়ি ফেরার পর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। টাকা রোজগারের আশায় গেলেও, একটি টাকাও দেশে পাঠাতে পারেননি তার স্ত্রী।

তিনি আরো বলেন, ইসলামপুর ইউনিয়নের রাজকান্দি গ্রামের সিদ্দিক আলীর মেয়ের সাথে সাত মাস আগে বিয়ে হয় ফুল মিয়ার। বিয়ের পর স্থানীয় ইউপি সদস্য ও মানব পাচারকারী মোস্তফা মিয়া সৌদি আরবে চাকরির প্রলোভন দেখান। অভাবের সংসার থাকায় প্রলোভনে রাজি হয়ে সৌদিয়া রিক্রুটিং এজেন্সীর মাধ্যমে চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল সৌদি আরবে পাড়ি দেন রুবিনা। তাকে সেখানে গৃহকর্মীর চাকরি দেওয়ার কথা থাকলেও ভিসা পেয়ে সৌদি আরবের দাম্মামে পৌঁছার পর তিনি জানতে পারেন, ৩-৪ লাখ টাকায় তাকে যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। যৌনকাজে লিপ্ত না হলে তার ওপর চালানো হতো নানা নির্যাতন। একটি কক্ষে রেখে প্রতিদিন কয়েকজন তাকে যৌনকাজে বাধ্য করত। এ সময় জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে তার বুক ও স্পর্শকাতর স্থানও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া তার হাত-পা ও উরুতে জখমের দাগ রয়েছে।

স্ত্রীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন দলবেঁধে চার-পাঁচজন মিলে তাকে ধর্ষণ করত। তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলত রুবিনা। একপর্যায়ে সৌদি পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। বিষয়টি আদম ব্যবসায়ী মোস্তফাকে জানালে সে এসব 'মিথ্যা কথা' বলে উড়িয়ে দেয়। স্থানীয় সাংবাদিক সাব্বির এলাহীকে জানালে তিনি নিয়ে যান কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হকের কাছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগের পর ৬ মাস ২৬ দিন পর দেশে ফেরেন আমার স্ত্রী।

রুবিনার বাবা সিদ্দেক মিয়া জানান, বার বার দালাল মোস্তফা কামালের কাছে মেয়ের খবর জানতে চেয়েছি সে জানায় মেয়েটি সৌদির কারাগারে আছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, এই আদম ব্যাপারি আমার মেয়ের সাথে এলাকার আরো কয়েকজন যুবতীকে বিদেশ পাঠিয়েছে। তিনি স্থানীয় এই দালালের বিচার দাবি করেন।

স্থানীয় আদম ব্যাপারি ও ইউপি সদস্য মোস্তফা মিয়ার সাথে এ ঘটনার বিষয়ে যোগযোগ করতে চাইলে মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।

বেসরকারি হাসপাতাল মুক্তি মেডিকেয়ার প্রাইভেট ক্লিনিকের ডা. সাধন চন্দ্র ঘোষ জানান, ভর্তিকৃত রুবিনার গোপন অঙ্গসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়া ও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ক্ষতগুলো সারতে একটু সময় লাগবে। শারীরিক নির্যাতনের কারণে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন।

কমলগঞ্জের উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক বলেন, মেয়েটির স্বামী বিষয়টি জানালে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। তবে মেয়েটির মানসিক ও শারীরিক অবস্থা করুণ। রুবিনার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যে দালাল জড়িত তাকে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা