ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে মাদক ও নানা অপরাধ নিয়ে একের পর এক ঘটনা যেন ঘটেই চলেছে। সর্বশেষ রবিবার (১৪ জুন) রাতে উপজেলার সলিমগঞ্জ ইউনিয়নের বাড়াইল দাস পাড়ায় (হিন্দু পাড়া) এলাকায় আধিপত্য বজায় ও মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোলাগুলির ঘটনায় এক নারী (৪০) আহত হয়েছেন।
তবে ওই গোলাগুলিতে এক ব্যক্তি (২৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর তার লাশ গুম করা হয়েছে বলে এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জন চলছে। যা ইতিমধ্যে ফেসবুকে ওই ব্যক্তির ছবিসহ ঘটনাটি ভাইরালও হয়েছে।
আলোচিত এ ঘটনার খবর পেয়ে সোমবার (১৫ জুন) সকালে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নবীনগর সার্কেল) পিয়াস বসাক, নবীনগর থানার ওসি মোরশেদুল আলম চৌধুরী ও ইন্সপেক্টর (তদন্ত) রাজীব কান্তি নাথের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ও জেলার গোয়েন্দা পুলিশের দুটো দল ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ পুলিশ সকাল থেকে সেখানে অবস্থান করছে বলে কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) ওবায়দুর রহমান।
তবে ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ভীতি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা সমৃদ্ধ সলিমগঞ্জ ও বড়িকান্দি ইউনিয়ন দুটোর নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য, মাদক, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের সম্রাট (পুলিশের তালিকায় মোস্ট ওয়ান্টেড) হিসেবে সুপরিচিত মন্নাফ মিয়া ওরফে মনেক ডাকাত। যার বিরুদ্ধে নবীনগর থানাসহ বিভিন্ন থানায় ৩০টিরও বেশি মামলা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এই দুর্ধর্ষ মনেক ডাকাতের বাড়ি সলিমগঞ্জ ইউনিয়নের নূরজাহানপুর গ্রামে।
অন্যদিকে মনেক ডাকাতের মূল প্রতিপক্ষ ছিলেন, পুলিশের এক এসপি পদ মর্যাদার কর্মকর্তার ভাই ওই এলাকারই এমরান মাস্টার। যেই এমরান মাস্টারের বাড়ি সলিমগঞ্জের পার্শ্ববর্তী বড়িকান্দি ইউনিয়নের থোল্লাকান্দি গ্রামে।
কিছুদিন আগে মনেক বাহিনীর গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে এখন এমরান মাস্টার ঢাকায় চিকিৎসাধীন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী এ প্রতিবেদককে জানান, এলাকার আধিপত্য নিয়ে গত ১ নভেম্বর এমরান মাস্টারের বাহিনীর সদস্য রিফাতের গুলিতে বড়িকান্দি গণিশাহ বাজারে মনেক ডাকাতের ছেলে একাধিক মামলার আসামি শিপন মিয়াসহ (২৮) দুজন নিহত হন। এ ঘটনায় তখন দুটি মামলাও হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ওই ঘটনার জের ধরে ও এলাকায় মাদক বিক্রিসহ নানা অপরাধের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রাখতে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ মনেক ডাকাতের দুই ছেলে সুমন ও নোমানের নেতৃত্বে মনেকের বাহিনী গত রবিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে বাড়াইল দাস পাড়ায় (হিন্দু পাড়া) মাদক বিক্রেতা রিফাতের সমর্থক জনৈক সামিরের বাড়িতে অতর্কিতে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ঢুকে পড়ে। এসময় গুলির প্রচন্ড আওয়াজে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, সেসময় রিফাত (২৫) মাদক বিক্রেতা সামিরের ঘরেই অবস্থান করছিলেন। ওই হামলায় এক নারী (৪০) গুলিবিদ্ধ হন বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসী জানান, তবে ওই গোলাগুলিতে আলোচিত এক ব্যক্তি (২৫) গুলিবিদ্ধ ও নিখোঁজ হওয়ার পর মনেক বাহিনী ওই ব্যক্তির লাশ গুম করেছে বলে পুরো এলাকায় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। যা আজ দিনভর ফেসবুকে ওই ব্যক্তির ছবিসহ ঘটনাটি ভাইরাল হয়।
এদিকে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ক্ষোভের সঙ্গে জানান, এত বড় ভয়াবহ একটি গোলাগুলির ঘটনার পর এবং এলাকায় পুলিশ টহলে থাকার পরও মনেক বাহিনী সোমবার দুপুরে গণিশাহ বাজারে এক এনজিওকর্মীর কাছ থেকে প্রকাশ্যে অস্ত্র ঠেকিয়ে নগদ ২ লাখ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এতে করে ওই ভয়ংকর গোলাগুলি ও ২ লাখ টাকা প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের পর পুরো এলাকায় এখন মনেক বাহিনীর ভয়ে চরম ভীতি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে এলাকাবাসী কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সোমবার কথা বলতে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) ওবায়দুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনা শোনার পর সোমবার সকালেই একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের দুটি টিম এলাকায় গিয়ে বিষয়টির তদন্ত করছেন।’
তিনি জানান, গোলাগুলির ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে, একজন নারী আহতও হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তবে একজন ব্যক্তি ‘গুলিবিদ্ধ ও ‘নিখোঁজ’ হওযার পর তার লাশ ‘গুম’ করা হয়েছে, এমন খবরের তথ্য প্রমাণ এখনো পুলিশ খুঁজে পায়নি। তবে এরকম খবর ফেসবুকে আমরাও দেখেছি।
তিনি আরো জানান, সেজন্যই পুলিশ গুরুত্বসহ পুরো বিষয়টি তদন্ত করে, এ বিষয়ে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’




