বরিশাল সার্কিট হাউসের বিপরীতে একটি একতলা ভবন। ভবনের খোলা ছাদে শামিয়ানা টানানো। শামিয়ানার নিচে আছে পাঁচ শতাধিক প্লাস্টিকের চেয়ার। আছে অস্থায়ী মঞ্চ। এখানেই নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে কর্মীর ভিড় লেগেই আছে। উল্টো চিত্র বিবিরপুকুরপারে সিটি করপোরেশনের অ্যানেক্স ভবনের। ওই ভবনের নিচতলার একটি বড় কক্ষে বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়। সেখানে নেতাকর্মীদের দেখা মেলা ভার। জেলা ও মহানগরের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের প্রায় সবাই আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং তাঁর ছেলে মেয়র সাদিকের অনুসারী। বাবা-ছেলের বরিশালে দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে সেখানে কর্মীদের দেখা নেই। সে কারণে কার্যালয়টি বেশির ভাগ সময় তালাবদ্ধ থাকে। শুধু আওয়ামী লীগের মহানগর কার্যালয় নয়, দলটির বরিশাল নগরের ৩০টি ওয়ার্ডে ১৯টি কার্যালয়ের দুই-তৃতীয়াংশ এখনো তালাবদ্ধ। ওয়ার্ডের কমিটিগুলো মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সাদিক আব্দুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। যদিও ভার্চুয়ালি মেয়র সাদিক একাধিকার দলীয় নেতাকর্মীদের নৌকার পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। খোকন অনুসারীদের দাবি, নির্বাচনে বাধার সৃষ্টি করতে সাদিক অনুসারীরা দলীয় কার্যালয়গুলো তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। আর সাদিক অনুসারীরা বলছেন, নির্বাচনের বিষয়ে তাঁদের এখন পর্যন্ত কিছু জানানো হয়নি। মহানগর ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নৌকা প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনায় যেসব কমিটি করা হয়েছে ওই কমিটিতেও নেই সাদিক অনুসারী আওয়ামী লীগ নেতারা। কমিটিগুলোতে স্থান পেয়েছেন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতারা, যাঁরা সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরন অনুসারী হিসেবে পরিচিত। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট লস্কর নুরুল হক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মহানগরের ৩০টি ওয়ার্ডে একটি করে কমিটি করে দিয়েছি। সেই কমিটি নৌকা প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনা করবে। কমিটিগুলো ১২৪টি সেন্টার কমিটিও করবে। আমরা যাচাই-বাছাই করে সেই কমিটিগুলোর অনুমোদন দেব।’ ওয়ার্ড পর্যায়ে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ কার্যালয় তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তাই পৃথকভাবে প্রতিটি ওয়ার্ডেই নৌকা প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনার জন্য অস্থায়ী কার্যালয় করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের তালাবদ্ধ কার্যালয়গুলো উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গাজী নইমুল হোসেন লিটু বলেন, ‘নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের ১৯টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের অস্থায়ী কার্যালয় রয়েছে। সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকার কারণে কার্যালয়গুলো তালাবদ্ধ থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না।’ তিনি আরো বলেন, প্রতীক বরাদ্দের পর ২৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু হবে। তখন সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ শুরু করবেন। মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, এবারের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর মেয়র সাদিক ঢাকায় অবস্থান করছেন। ওয়ার্ড কমিটিগুলো সাদিকের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ওই সব কমিটির নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষে কাজ করতে মাঠে নামেননি। মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য সিটি কাউন্সিলর জিয়াউর রহমান বিপ্লব বলেন, ‘এখনো যাঁরা নৌকার পক্ষে মাঠে নামেননি তাঁরা আর কবে নামবেন? ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কাজ তো করছেনই না, এমনকি তাঁরা দলীয় কার্যালয়গুলো তালাবদ্ধ করে রেখেছেন।’ মহানগরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হুমায়ুন হাওলাদার বলেন, দলীয় কোন্দলের কারণে তিনি কার্যালয়ে যাচ্ছেন না। সে কারণে দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। অন্যদিকে সাদিক অনুসারী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে মহানগরের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী জিয়াউর রহমান বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়ের চাবি কেউ না চাইলে দেব কিভাবে? তা ছাড়া আমাদের না জানিয়ে নৌকা প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনায় ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটিতে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদককে রাখা হয়নি।’ ২৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জগলুল মোরশেদ ওরফে প্রিন্স বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীরা আসছেন, কিন্তু নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীলরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না তা-ও আমার জানা নেই।’ মহানগরীর ২২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মঞ্জুর মোরশেদ বলেন, ‘ঈদের পরে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে থাকা সাবেক আহ্বায়ক হালিম খান কার্যালয়ের চাবি নিয়ে যান। এখন তাঁরাই সেখানে বসছেন। আমাদের তাঁরা নির্বাচনের ব্যাপারে সম্পৃক্ত করছেন না।’