ক্যাশলেস সমাজ গঠনে নানা উদ্যোগ ও প্রচারণা চালানো হলেও দেশে এখনো লেনদেনের প্রধান মাধ্যম নগদ অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের মোট লেনদেনের ৬৭ দশমিক ২ শতাংশই হয়েছে নগদে। এ বিষয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরে মোট লেনদেনের ৩২.৮ শতাংশ হয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে নগদে লেনদেন হয়েছিল ৭২ শতাংশ, আর বাকি লেনদেন হয়েছিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। অর্থাৎ, ধীরে ধীরে ক্যাশলেস লেনদেনের পরিধি বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে মোট লেনদেন হয়েছে ৩১১ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগদে লেনদেন হয়েছে ২০৯ লাখ কোটি টাকা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ১০২ লাখ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, আরটিজিএস, এনপিএসবি, বাংলা কিউআর, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে যে লেনদেন সম্পন্ন হয়, সেগুলোকে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের আওতায় ধরা হয়।
অন্যদিকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা ব্যাংকের এটিএম বুথের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন কিংবা জমা দেওয়া—অর্থাৎ যেখানে নগদ টাকার ব্যবহার রয়েছে—সেগুলোকে নন-ডিজিটাল বা নগদ লেনদেন হিসেবে ধরা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এমএফএস কিংবা ব্যাংকের বুথ—যেখান থেকেই টাকা উত্তোলন বা জমা দেওয়া হোক না কেন, তা নগদ লেনদেন হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ লেনদেন যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে থাকে, তখন সেটি ডিজিটাল ট্রানজেকশন; আর সেখানে নগদ টাকার ব্যবহার হলেই তা নগদ বা নন-ডিজিটাল লেনদেন।’
অনানুষ্ঠানিক খাত ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ার লক্ষ্যে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডিজিটাল ব্যাংকিং, কিউআর পেমেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবস্থার বিস্তার ঘটেছে। তবুও অধিকাংশ লেনদেন এখনো নগদে হয়। এর পেছনে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব এবং করের আওতা এড়ানোর প্রবণতা বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তাদের মতে, দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে যে পরিমাণ লেনদেন হয়, তার বড় একটি অংশ এখনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। অনেক ব্যবসা ও লেনদেন আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হওয়ায় এসব ক্ষেত্রে নগদ অর্থ ব্যবহারকে বেশি সুবিধাজনক মনে করা হয়।
যদিও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের প্রসার হয়েছে, তবুও স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল দক্ষতা সবার সমান নয়। অনেক দোকান, হাট-বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের অবকাঠামো নেই; আবার অনেকেই তা ব্যবহার করতে আগ্রহী নন। এ ছাড়া ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে সব আয় দৃশ্যমান হয়ে যাওয়ায় কর-সংক্রান্ত কারণে কিছু ব্যবসায়ী নগদে লেনদেন পছন্দ করেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের বরাত দিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দেশের অনানুষ্ঠানিক খাত ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রয়েছে। অর্থনীতির অনেক বড় অংশে এখনো নগদে লেনদেন হয়। তাদের এখনো ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি।’
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশের বেশিরভাগ নগদ লেনদেন অনানুষ্ঠানিক খাতে হয়। এই খাতগুলোকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় না আনলে ক্যাশলেস সমাজ গড়া কঠিন।’
তিনি বলেন, ‘পরিবহন খাত, কৃষি, খুচরা ও পাইকারি খাতে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে, তবে তারা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে। তারা অন্তর্ভুক্ত হতেও চায় না। কারণ এই চ্যানেলের মধ্যে এলে করের আওতায় পড়তে হবে।’
পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব
ব্যাংকাররা বলছেন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো সবার কাছে না থাকায় নগদে লেনদেন বেশি হচ্ছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ‘দেশের মানুষ এখনো নগদ টাকায় লেনদেন বেশি করছে। ডিজিটাল পেমেন্ট কম হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে অবকাঠামো। না হলে কোনো না কোনো পর্যায়ে গিয়ে নগদে লেনদেন করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সবার কাছে ডিজিটাল পেমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস না থাকলে এ ধরনের লেনদেন করা সম্ভব নয়। আবার মানুষের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্টে অভ্যস্ত হওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ডিজিটাল লেনদেনে সবাইকে অভ্যস্ত করতে হলে শুধু নীতি প্রণয়ন করলেই হবে না; মানুষ যাতে ডিজিটালি লেনদেন করে, সে জন্য ব্যবস্থাটিকে আরো সহজ করতে হবে।’
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, সীমিত ডিজিটাল দক্ষতাসম্পন্ন ব্যবহারকারীদের জন্য ডিজিটাল সেবা সহজ করার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জালিয়াতির ঘটনা, ব্যর্থ লেনদেন ও জটিল ইন্টারফেসের কারণে গ্রাহকদের আস্থা কমে যেতে পারে এবং তারা আবার নগদ লেনদেনের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
তিনি বলেন, ক্যাশলেস ব্যবস্থায় যেতে হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে। এর লক্ষ্য নগদ টাকা পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং মানুষ যেন নিজের সুবিধামতো নগদ বা ডিজিটাল—দুই মাধ্যমেই লেনদেন করতে পারে, সেই সুযোগ বাড়ানো।
নগদনির্ভরতা অর্থনীতির বড় ব্যয় বহন করলেও দেশে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার এখনো ধীরগতিতে বাড়ছে। ব্যাংক খাতের হিসাব অনুযায়ী, মুদ্রা নোট ছাপাতে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।










