kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

অভিযান জোরদার করেছে ভোক্তা অধিদপ্তর

সরকার নির্ধারিত মূল্যের প্রভাব নেই বাজারে

♦ কম দামের তেল-চিনি কম্পানি থেকে এখনো সরবরাহ করা হয়নি
♦ আগের দামে কেনা তাই সরকারি দামে বিক্রি করছেন না ব্যবসায়ীরা

এম সায়েম টিপু   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৩:০৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সরকার নির্ধারিত মূল্যের প্রভাব নেই বাজারে

নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছু কিছু পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা যখন দাম বাড়ান তখন সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদক, পাইকারি এবং খুচরা—সব পর্যায়ে দাম বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দাম বাড়ানোর আগে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এমনকি  উল্টো চিত্র দেখা যায়, যখনই কোনো পণ্যের দাম কমানো হয় তখন।

বিজ্ঞাপন

দাম কমলে তখন আর বাজারে সহজে দাম কমে না। সম্প্রতি সরকারের নির্ধারিত চিনি ও পাম অয়েলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি সংস্থাগুলোর এই নির্লিপ্ততার জন্যও ব্যবসায়ীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।

গত বৃহস্পতিবার সরকার চিনি ও পাম অয়েলের দাম কিছুটা কমিয়ে নির্ধারণ করে দিয়েছিল। নতুন মূল্য অনুযায়ী গত রবিবার থেকে এক কেজি খোলা চিনি বিক্রি হওয়ার কথা ৮৪ টাকা, প্যাকেটজাত এক কেজি চিনি ৮৯ টাকা এবং এক লিটার পাম অয়েল ১৩৩ টাকায়। অথচ গত দুই দিনে এই দামে কোনো বাজারে চিনি ও পাম অয়েল তেল বিক্রি হতে দেখা যায়নি। সরকার দাম বেঁধে দিয়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা তা মানছেন না। খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিল মালিকরা এখনো কম দামের চিনি ও তেল বাজারে ছাড়েননি—এজন্য কম দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না।

ট্যারিফ কমিশন জানায়, খুচরা মূল্য ছাড়াও পাম অয়েল ও চিনির উৎপাদক এবং পাইকারি পর্যায়ের মূল্যও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি লিটার পাম অয়েল সুপারের মিলগেট বা উৎপাদক পর্যায়ের মূল্য ১২৮ টাকা এবং পরিবেশক বা পাইকারি পর্যায়ের মূল্য ১৩০ টাকা।

অপরদিকে প্রতি কেজি খোলা চিনির মিলগেট মূল্য ৭৯ টাকা এবং পরিবেশক মূল্য ৮১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি প্যাকেটজাত চিনির মিলগেট মূল্য ৮২ টাকা এবং পরিবেশক মূল্য ৮৪ টাকা। ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, নতুন এ মূল্য ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। তবে গত দুই দিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে কোনো দোকানে নতুন এই দামের তেল-চিনি মেলেনি।

পাম অয়েলের দর লিটারে ১২ টাকা আর চিনিতে কেজিপ্রতি ছয় টাকা কমিয়ে সরকার গতকাল রবিবার থেকে মূল্য কার্যকরের ঘোষণা দিলেও এদিন রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে গিয়ে আগের দরেই পণ্য দুটি বিক্রি হতে দেখা যায়। পাম সুপার তেল আগের দাম ১৪৫ টাকা আর খোলা চিনি ৯০ ও প্যাকেটজাত চিনি ৯৫ টাকাতেই বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া লাল চিনি প্রতি কেজি ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের এক দোকানি বলেন, ‘আমরা বেশি দাম দিয়ে কিনেছি তাই সে দামেই বিক্রি করব। আমাদের কাছে এমন কোনো নির্দেশনা আসেনি। ’

গত এক বছরে দেখা গেছে, ভোজ্য তেলের দাম যখন সরকার বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, তখন বাড়তি সেই দর কার্যকর হয় সঙ্গে সঙ্গে। তবে দুবার দাম কমানোর সিদ্ধান্তে দেখা গেছে দুই সপ্তাহ পরও আগের দরেই বিক্রি হয়েছে পণ্য। দোকানিদের যুক্তি, আগের কেনা।

এ বিষয়ে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন,  দেশের ভোগ্য পণ্যের ব্যবাসায়ীরা অসততার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। তাঁদের ভেতর নীতি-নৈতিকতা বলতে কিছু নেই। সরকারও কেন জানি এ ব্যাপারে গা ছাড়া ভাব দেখায়। সরকার যে দাম বেঁধে দিল, সে দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কি না সেটি পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে। আমরা তো তেমন কোনো কিছু দেখলাম না বাজারে। সরকারি সংস্থাগুলোর এই নির্লিপ্ততার জন্যও ব্যবসায়ীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। ’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ইউসুফ জেনারেল স্টোরের মালিক মোহাম্মদ ইউসুফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দাম কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে শুনেছি। এখনো কম দামের চিনি ও তেল আমাদের হাতে আসেনি। আমরা কম দামের তেল-চিনি এখনো হাতে পাইনি। কম দামেরটা পেলে তখন কম দামেই বিক্রি করব। ’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৯টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মধ্যে দুটির দাম নির্ধারণ হয় গত বৃহস্পতিবার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য শাখা দাম নির্ধারণ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে, যা রবিবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা জানানো হয়।

বাংলাদেশ পাইকারি চিনি ব্যবসায়ী সমিতির নেতা হাশেম আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি দামের চিনি আমাদের হাতে আসতে আরো দুই-তিন দিন সময় লাগবে। কারণ মিল থেকে এখনো কম দামের চিনি আমরা পাইনি। আগের রেটের চিনি তো আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারি না। আশা করছি আগামী দু-এক দিনের মধ্যে কম দামের চিনি বাজারে চলে আসবে। ’

এদিকে সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম না মানায় বাজারে অভিযান জোরদার করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ বিষয় ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম শফিকুজ্জামান  বলেন, ‘যখন কোনো পণ্যের মূল্য বাড়ে তখন ত্বরিতগতিতে সেটি বাস্তবায়ন হয়। বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিন্তু কোনো শুক্রবার, শনিবার নেই, অর্থাৎ যখন মন চায় দাম বাড়িয়ে দেয়। অপরদিকে যখন দাম কমে তখন কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন করার গতি অনেক স্লো। তখন পুরনো স্টক আর ফুরায় না। তবে সরকার তেল ও চিনির যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সে দামে ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন কি না সেটি আমরা তদারকি করতে অভিযান জোরদার করেছি। ’



সাতদিনের সেরা