২০১০-১২ সালের ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়াসহ প্রতিজনে প্রায় ৩৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকার পাওনা দাবি করছেন গ্রামীণফোনের (জিপি) চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাঁদের দাবি, প্রায় ১৬ বছর ধরে এ পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় গত ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে এলেও এখনো কোনো সমাধান হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বসুন্ধরায় জিপি হাউসের সামনে পূর্বঘোষিত অবস্থান কর্মসূচি শুরুর আগেই পুলিশ ছয় আন্দোলনকারীকে থানায় নিয়ে যায়।
‘গ্রামীণফোন ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কর্মসূচি শুরুর আগেই পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে ভাটারা থানায় নিয়ে যায়। এতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়। যদিও ভাটারা থানার পুলিশ বলছে, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়নি; জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া, পরবর্তী ১৭ বছরের লভ্যাংশ এবং অন্যান্য আইনসংগত পাওনা মিলিয়ে প্রায় চার হাজার সাবেক কর্মীর প্রত্যেকের প্রাপ্য প্রায় ৩৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। তবে তাঁদের ভাষ্য, এই অঙ্ক আদায় করাই তাঁদের উদ্দেশ্য নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য সমাধানেই তাঁরা আগ্রহী।
জিপি হাউসের সামনে আন্দোলনরত অবস্থায় সাবেক কর্মী সাদিয়া আফরিন বলেন, ‘গত ১৬ বছরেও তাঁদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। প্রায় ১৮-১৯ মাস ধরে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও কোনো সরকারই এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। তিনি দাবি করেন, এরই মধ্যে সাতজন সাবেক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। আমাদেরও কি তাহলে লাশ হতে হবে? আমরা কম্পানির ক্ষতি চাই না, আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক সমাধান চাই।’
আরেক সাবেক কর্মী মৌটুসী বলেন, ‘আমরা একটি আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে এসেছিলাম। কিন্তু কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়াই আমাদের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে।’ কেন ন্যায্য দাবির আন্দোলনে পুলিশি হস্তক্ষেপ করা হলো, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
পরে আন্দোলনকারীরা রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী অডিটরিয়ামে সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় তাঁরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় তাঁরা নিজেদের গ্রামীণফোনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অংশীজন হিসেবে বিবেচনা করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির জন্য কয়েকটি প্রস্তাবও তুলে ধরেন।
এর মধ্যে আগামী এক বছরে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত থার্ড-পার্টি কর্মীদের নিয়মিত চাকরির আওতায় আনা, ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের কর্মীদের শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা, কলরেট ও মোবাইল ডেটার মূল্য কমানো, ডেটার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, পাওনাসংক্রান্ত বিরোধের গ্রহণযোগ্য সমাধানে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে আলোচনায় বসতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো প্রত্যাহার এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার আহবান জানান তাঁরা। অন্যথায় দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি আরো বিস্তৃত করার ঘোষণা দেন।
গ্রামীণফোনের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ আন্দোলন নতুন নয়। ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একই দাবিতে জিপি হাউসের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। সেদিন আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার ও লাঠিপেটা করে। নারীসহ কয়েকজনকে আটকও করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা। কিন্তু আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের পাওনা নিয়ে এখনো কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি।





