• ই-পেপার

তদারকি নেই, চামড়া দ্রুত বিক্রি করে দায় মুক্তির প্রবণতা

ট্রিলিয়ন ডলারের দেশে পরিণত করতে ১০ খাতকে অগ্রাধিকার

অনলাইন ডেস্ক
ট্রিলিয়ন ডলারের দেশে পরিণত করতে ১০ খাতকে অগ্রাধিকার

বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ১০ খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। 

সরকারের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ও কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে জনমিতিক, দীর্ঘজীবিতা ও গণতান্ত্রিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

এ লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনার কথাও বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে।

প্রথম অগ্রাধিকার ‘সবার জন্য উন্নয়ন’। বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সর্বস্তরের মানুষ, সব খাত ও সব অঞ্চলের সুষম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

দ্বিতীয় অগ্রাধিকার ‘সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা’। বাস্তবমুখী, দক্ষতানির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা এবং সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

তৃতীয় অগ্রাধিকার ‘সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা’। জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে সব বয়স ও শ্রেণির মানুষের জন্য সুরক্ষা বলয় সম্প্রসারণের মাধ্যমে কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

চতুর্থ অগ্রাধিকার ‘বিনিয়োগনির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি’। পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিকে খাদ্যনিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।

পঞ্চম অগ্রাধিকার ‘বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজিকৃত ব্যবসার পরিবেশ’। সরকারি কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও বিলম্ব কমিয়ে স্বচ্ছ, সহজ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ষষ্ঠ অগ্রাধিকার ‘আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা’। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সপ্তম অগ্রাধিকার ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’। উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অষ্টম অগ্রাধিকার ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ’। প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলে দেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নবম অগ্রাধিকার ‘প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা’। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বনায়ন সম্প্রসারণ, নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর মাধ্যমে টেকসই ও পরিবেশ-সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

দশম অগ্রাধিকার ‘স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা’। মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সরকারের মতে, এসব অগ্রাধিকার বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার পথ সুগম হবে।

বাংলাদেশি টাকায় আজকের মুদ্রা বিনিময় হার

অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশি টাকায় আজকের মুদ্রা বিনিময় হার
সংগৃহীত ছবি

বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। এই বর্ধিত বাণিজ্যিক লেনদেনকে সচল রাখতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিনিময় হার এবং এর প্রয়োজনিয়তা।

লেনদেনের সুবিধার্থে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার সঙ্গে বাংলাদেশি টাকার বুধবার (১৭ জুন, ২০২৬) বিনিময় হার—

মুদ্রার নাম বাংলাদেশি টাকা

ইউএস ডলার : ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা
ইউরো : ১৪২ টাকা ৪৭ পয়সা
পাউন্ড : ১৬৪ টাকা ৮০ পয়সা
কানাডিয়ান ডলার : ৮৭ টাকা ৭০ পয়সা
চাইনিজ ইয়েন : ১৮ টাকা ১৬ পয়সা
ভারতীয় রুপি : ১ টাকা ২৯ পয়সা
মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত : ৩০ টাকা ২১ পয়সা
সিঙ্গাপুরি ডলার : ৯৫ টাকা ৬৭ পয়সা
সৌদি রিয়াল : ৩২ টাকা ৭৩ পয়সা
কাতারি রিয়াল : ৩৩ টাকা ৭৪ পয়সা
কুয়েতি দিনার : ৩৯৮ টাকা ৫২ পয়সা
অস্ট্রেলিয়ান ডলার : ৮৬ টাকা ৭৩ পয়সা

*মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন হতে পারে।

প্রসঙ্গত, বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন।

আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা

অনলাইন ডেস্ক
আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা

দেশের বাজারে সবশেষ সমন্বয়ে বাড়ানো হয়েছে সোনার দাম। আজ বুধবার (১৭ জুন) মূল্যবান এই ধাতু দুটি বিক্রি হচ্ছে সবশেষ নির্ধারিত দামে। সবশেষ গত ১৫ জুন সোনার দাম বাড়ায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সেদিন ভরিতে মূল্যবান এই ধাতু দুইটির দাম যথাক্রমে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা ও ২৩৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার (পিওর গোল্ড ) মূল্য বেড়েছে। সেদিন সকাল ১০টা থেকেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের সোনার দাম পড়ছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৯ হাজার ৯৮৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫৭ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।

এর আগে, সবশেষ গত ১৩ জুন সকালে দেশের বাজারে সোনার দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। সে সময় ভরিতে ৬ হাজার ৫৯০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছিল সংগঠনটি।

এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৪ হাজার ৭৩৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। যা কার্যকর হয়েছিল সেদিন সকাল ১০টা থেকেই।

এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে ৭৫ বার সমন্বয় করা হয়েছে সোনার দাম। যেখানে দাম ৩৯ দফা বাড়ানো হয়েছে; কমানো হয়েছে ৩৬ দফা। আর ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার সোনার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল; যেখানে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল, আর কমানো হয়েছিল ২৯ বার।

ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা এখন ঋণাত্মক

অনলাইন ডেস্ক
ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা এখন ঋণাত্মক
ছবি: কালের কণ্ঠ

কোনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার পরিমাপ হলো তার মূলধন পর্যাপ্ততা। এটি নির্দেশ করে যে ব্যাংকটি সম্ভাব্য ব্যবসায়িক ঝুঁকি (যেমন খেলাপি ঋণ) মোকাবেলা করতে সক্ষম কিনা।

মূলধন পর্যাপ্ততা বা সিআরএআর হলো ব্যাংকের মূলধন এবং তার ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত। বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাসেল থ্রি অনুযায়ী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সিআরএআর পর্যবেক্ষণ করে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সিআরএআর সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা। এর উদ্দেশ্য আমানতের অর্থ সুরক্ষিত রাখা, ব্যাংককে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচানো।

বাংলাদেশে খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে পারছে না অনেক ব্যাংক। এর প্রভাবে ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে গেছে। যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে চর্চিত ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর সিআরএআর সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা। কার্যকর অর্থনীতির কোনো দেশের ব্যাংক খাতের গড় মূলধন ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে আধুনিক বিশ্বের বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে বণিক বার্তা।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের মূলধন সক্ষমতা ঋণাত্মক ধারায় চলে গেলেও এ সময়ে আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার ব্যাংকগুলো। পাকিস্তানের ব্যাংক খাতে সিআরএআর এখন প্রায় ২১ শতাংশ। আর শ্রীলংকায় ১৯ শতাংশেরও বেশি। প্রতিবেশী ভারতের ব্যাংকগুলোর গড় সিআরএআর ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ বলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫-এ তুলে ধরা হয়েছে। যদিও মাত্র তিন বছর আগেও অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়াত্বের মুখে পড়েছিল শ্রীলংকা ও পাকিস্তান। ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়েছিল দেশ দুটি।

মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে কোনো ব্যাংকের দেউলিয়াত্বের নির্দেশক ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় দুই ডজন ব্যাংক এখন মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এ ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে এ ঘাটতিও সঞ্চিতি সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ছাড়ের বদান্যতায় হয়েছে। এক্ষেত্রে নীতি ছাড় দেয়া না হলে দেশের ব্যাংক খাতের সিআরএআর ঘাটতি কয়েক গুণ বেড়ে যেত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কোনো দেশের ব্যাংক খাতের সম্মিলিত সিআরএআর ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে বিরল ঘটনা বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আধুনিক বিশ্বের আর কোনো দেশের ব্যাংক খাতের সিআরএআর ঋণাত্মক ধারায় থাকার কথা নয়। সে অর্থে বাংলাদেশের উদাহরণটি বিরল বলা যেতেই পারে। কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির সূত্রপাত হয় প্রভিশন ঘাটতি থেকে। আর প্রভিশন ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক আকারে বেড়ে গেলে। দেশের ব্যাংক খাতে এখন যে খেলাপি ঋণ দেখা যাচ্ছে, সেটি কোনো ব্যাংকিংয়ের ফল নয়। বরং এটি ঋণের নামে ব্যাংক লুটের বহিঃপ্রকাশ।’

আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে দেশের কিছু ব্যাংকে ঋণের নামে যে জালিয়াতি হয়েছে, সেগুলোকে কোনো অর্থেই ব্যাংকিং বলা যায় না। এটিকে লুট বলা যেতে পারে। এ ঋণ যারা নিয়েছে, তারা ঋণগ্রহীতা নয়, বরং লুটেরা। লুট হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের জন্য আমরা টাকা ছাপিয়ে ধার দিতে বাধ্য হচ্ছি। কিন্তু এভাবে তো দীর্ঘদিন চলা যাবে না। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিও জিম্বাবুয়ে কিংবা আর্জেন্টিনার পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।’

দেশের আর্থিক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি ও স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন করে প্রতিবছর ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট’ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্রতিবেদনের সর্বশেষ সংস্করণে দেখা যায়, ২০২৩ সাল শেষেও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত বা সিআরএআর ছিল ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪ সাল শেষে এ হার এক ধাক্কায় ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে নেমে যায়। আর গত বছর (২০২৫ সাল) শেষে সিআরএআর ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে আসে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মূলধন সক্ষমতা যখন ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে, ঠিক তখন প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যাংক খাত শক্তিশালী হয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ভারতের ব্যাংক খাতে সিআরএআর ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। গত বছর দেশটিতে এ হার ১৭ দশমিক ২০ শতাংশে উন্নীত হয়। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এখন পাকিস্তানের ব্যাংক খাতের মূলধন কাঠামো সবচেয়ে শক্তিশালী। গত কয়েক বছরের আর্থিক বিপর্যয় সত্ত্বেও ২০২৩ সালে পাকিস্তানের ব্যাংক খাতে সিআরএআর ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল। গত দুই বছরে এটি আরো বেড়ে ২০২৫ সালে দেশটির ব্যাংকগুলোর গড় সিআরএআর ২০ দশমিক ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়।

মূলধন কাঠামোর দিক থেকে শক্তিশালী অবস্থানে আছে শ্রীলংকার ব্যাংক খাতও। গত বছর দ্বীপরাষ্ট্রটির ব্যাংক খাতে সিআরএআর ছিল ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। এর আগে ২০২৩ সালেও শ্রীলংকার ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল। যদিও ২০২০ সালের কভিড মহামারী-পরবর্তী সময়ে শ্রীলংকার অর্থনীতিই দেউলিয়াত্বের মুখে পড়েছিল। এর জেরে দেশটির রাজাপাকসে সরকারের পতনও ঘটেছিল। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি ঠেকেছিল রেকর্ড ৬৯ শতাংশে।

ব্যাংক নির্বাহীসহ এ খাতের নীতিনির্ধাকরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে দেশের খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। অলিগার্ক ও মাফিয়া শ্রেণীর চেয়ারম্যান-পরিচালকদের ব্যাংকে যথাযথ নিরীক্ষা হতো না। অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির অভাব ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলোর লুকানো খেলাপি ঋণ উন্মোচিত হয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার প্রভাবেই ব্যাংক খাতের সিআরএআর অল্প সময়ে ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে।

বিপর্যয় সত্ত্বেও দেশের বেশকিছু ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলে জানান অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন। সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকা এ শীর্ষ নির্বাহী বলেন, ‘দেশে বেসরকারি খাতে এমন কিছু বড় ব্যাংকও রয়েছে, যাদের সিআরএআর ১৭-২০ শতাংশ। এ তালিকায় আমাদের সিটি ব্যাংকও রয়েছে। করপোরেট সুশাসন মেনে চলা ব্যাংকগুলো মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করায় জোর দিয়েছে। সমস্যা হলো অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়ানো ব্যাংকগুলোর সিআরএআর এতটাই খারাপ অবস্থায় যে পুরো খাতকে ঋণাত্মক ধারায় নিয়ে গেছে। এ কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আর দেশের সামগ্রিক রেটিংও খারাপ দেখাচ্ছে।’

ব্যাংক খাতে সিআরএআর ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়ার মূলে রয়েছে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ। ২০২৪ সালের জুনেও দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এটি ছিল মোট বিতরণকৃত ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকে। ওই সময় ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশই খেলাপির খাতায় ওঠে। গত বছরের শেষ তিন মাসে বিশেষ ছাড় দিয়ে পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমানো হয়। তবে এর পরও চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হলেও প্রতিবেশী ভারতে এ হার এখন মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। আর পাকিস্তানে খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। তিন বছর আগে দেউলিয়া হয়ে পড়া শ্রীলংকায়ও খেলাপি ঋণের হার এক অংকের ঘরে সীমাবদ্ধ।

দেশের ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা কতটা নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেটি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে। গত বছর শেষে সরকারের মালিকানাধীন এ ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৬৪ হাজার ৪০৬ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়েরও প্রায় দ্বিগুণ। আর সঞ্চিতি সংরক্ষণে নীতি ছাড় দেয়া না হলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মূলধন ঘাটতি ছাড়াবে ৭০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। একই ভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত হতে যাওয়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিও দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি হবে।

ব্যাংক খাতের বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি ও সিআরএআর ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে ‘ভয়ংকর’ বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অর্থ সচিব ও সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার এ যুগে কোনো দেশে সিআরএআর ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়ার ঘটনাটি অস্বাভাবিক ও অকল্পনীয়। এ পরিস্থিতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করাও অর্থহীন। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখুক, এ আহ্বান থাকল।’

প্রসঙ্গত, আর্থিক দুর্যোগ কিংবা পতনোন্মুখ ব্যাংকের আপৎকালীন ক্ষতি সামাল দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাসেল-৩-এর নীতি প্রবর্তন করা হয়। এ নীতির উদ্দেশ্য ছিল, বিপর্যয়ের সময়েও ব্যাংক যাতে নিজের মূলধনে চলতে পারে সেটি নিশ্চিত করা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বহু আগেই এ নীতি চর্চিত হয়ে আসছে। আর বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ২০১৫ সালে চালু হওয়া এ ব্যাসেল বাস্তবায়নের সীমা ধরা হয়েছিল ২০১৯ সাল পর্যন্ত। এ নীতি অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে সাড়ে ১২ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণ করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এ মূলধন পর্যাপ্ততার হার এখন ঋণাত্মক ধারায়।

তদারকি নেই, চামড়া দ্রুত বিক্রি করে দায় মুক্তির প্রবণতা | কালের কণ্ঠ