• ই-পেপার

মাপে কম দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ

মধ্য এশিয়ার গর্ব : নুর সুলতান গ্র্যান্ড মসজিদ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মধ্য এশিয়ার গর্ব : নুর সুলতান গ্র্যান্ড মসজিদ
সংগৃহীত ছবি

মধ্য এশিয়ার হৃদয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানার দৃষ্টিনন্দন নুর সুলতান গ্র্যান্ড মসজিদ। আধুনিক স্থাপত্য, ইসলামি শিল্পকলার সৌন্দর্য এবং জাতীয় ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে নির্মিত এই মসজিদ আজ শুধু কাজাখস্তানের নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ধর্মীয় স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। 

মধ্য এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ হিসেবে পরিচিত এই মহিমান্বিত স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছে প্রায় ১০ হেক্টর (প্রায় ২৫ একর) ভূমির ওপর। বিশাল এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন, যা একে বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদগুলোর কাতারে স্থান দিয়েছে।

আকাশছোঁয়া মিনার ও বিশাল গম্বুজ
মসজিদের চার কোণে স্থাপিত চারটি সুউচ্চ মিনারের প্রতিটির উচ্চতা ১৩০ মিটার। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মিনারগুলো যেন রাজধানীর আকাশরেখাকে স্পর্শ করেছে। মসজিদের কেন্দ্রীয় গম্বুজের ব্যাস ৬২ মিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৯০ মিটার, যা বিশ্বের বৃহত্তম গম্বুজগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। প্রধান গম্বুজকে ঘিরে রয়েছে আরও ৭২টি ছোট গম্বুজ, যা পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে এক অনিন্দ্যসুন্দর ও রাজকীয় আবহ। নীল, সাদা ও সোনালি রঙের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই স্থাপত্য যেন ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

আধুনিক প্রযুক্তি ও ইসলামি স্থাপত্যের অসাধারণ সমন্বয়
মসজিদটির নকশা প্রণয়ন করেছে দুবাইভিত্তিক দিওয়ান আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স। স্থপতিরা এমনভাবে পরিকল্পনা করেছেন যাতে স্থাপনাটির বিশালতা, নান্দনিকতা এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে সুশোভিতভাবে মিশে যায়। গম্বুজ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষ হালকা স্টিল ফ্রেম, যার ফলে মসজিদের প্রধান নামাজঘরটি প্রায় স্তম্ভবিহীন রাখা সম্ভব হয়েছে। এতে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি একসঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে ইবাদত করতে পারেন।

আলো-ছায়ার মোহনীয় জগৎ
মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে মনোমুগ্ধকর আলোকসজ্জা। গম্বুজ, দেয়াল, খিলান এবং কার্পেটের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক এলইডি প্রযুক্তি ও কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত লাইটিং ব্যবস্থা। বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এসব আলো প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়। জুমা, রমজান, ঈদ কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা ভিন্ন ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করে, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

কিবলা দেয়ালে আল্লাহর ৯৯ নাম
মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর কিবলামুখী দেয়াল। সেখানে কুফি ক্যালিগ্রাফিতে অত্যন্ত নান্দনিকভাবে অঙ্কিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার ৯৯টি পবিত্র নাম। জ্যামিতিক নকশা, কাচের ব্যাকলিট মোজাইক এবং সোনালি আলোকছটার সমন্বয়ে এই দেয়াল এক অপার্থিব সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। নামাজরত মুসল্লিরা যখন কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়ান, তখন আলোকিত এসব নাম তাদের হৃদয়ে আল্লাহর মহিমা ও স্মরণকে আরও গভীর করে তোলে। এ কারণেই স্থপতিরা এই অংশকে মসজিদের ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করেন।

জাতীয় পরিচয় ও ইসলামি ঐতিহ্যের প্রতিফলন
মসজিদের বাহ্যিক অংশে ব্যবহৃত সাদা পাথর, নীল ও সোনালি রঙ কাজাখস্তানের জাতীয় পতাকার রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং কাজাখ জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক। মসজিদের চারপাশের প্রাঙ্গণ পাঁচটি অংশে বিভক্ত, যা প্রতীকীভাবে ইসলামের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের স্মারক। চারদিকে সুনিপুণ বাগান, খোলা প্রাঙ্গণ ও শান্ত পরিবেশ দর্শনার্থীদের মনে প্রশান্তির অনুভূতি জাগায়।

ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র
নুর সুলতান গ্র্যান্ড মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ও সামাজিক কমপ্লেক্স। এখানে রয়েছে আধুনিক গ্রন্থাগার, কনফারেন্স হল, ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র, শিশুদের প্রশিক্ষণ কক্ষ, টেলিভিশন স্টুডিও, বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত স্থান এবং পর্যটকদের জন্য তথ্যকেন্দ্র। ফলে মসজিদটি আজ ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

হাদিসের বাণী

কেয়ামতের দিন যাদের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতের দিন যাদের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ
সংগৃহীত ছবি

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মহানবী (সা.) বললেন, তোমরা কি জানো, গরিব-সম্বলহীন কে? তাঁরা বললেন, আমাদের মধ্যে গরিব হলো ওই ব্যক্তি, যার কোনো দিরহাম, দিনার ও মাল-সামানা নেই। তখন মহানবী (সা.) বললেন, প্রকৃত সম্বলহীন তো ওই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন সালাত, জাকাত, সিয়াম নিয়ে উপস্থিত হবে ঠিকই; কিন্তু এটাও সঙ্গে আনবে যে সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারো প্রতি অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ গ্রাস করেছে, হত্যাকাণ্ড করেছে, কাউকে প্রহার করেছে। ফলে সেদিন মাজলুম ব্যক্তিকে এই জালিম থেকে সাওয়াব দেওয়া হবে। আর যদি সাওয়াব শেষ হয়ে যায়, তাহলে মাজলুমের গুনাহ এই জালিমের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। অবশেষে তাকে জাহান্নামের অতলে ফেলে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৫৭৯, মুসনাদে আহমাদ, ৮০২৯)

শিক্ষা ও বিধান
১. মানুষ সাধারণত অর্থ-সম্পদহীন ব্যক্তিকে গরিব বা নিঃস্ব মনে করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত নিঃস্ব হলো সেই ব্যক্তি, যে অনেক নেক আমল নিয়ে কিয়ামতের ময়দানে উপস্থিত হবে, কিন্তু মানুষের অধিকার নষ্ট করার কারণে সব সাওয়াব হারিয়ে ফেলবে।
২. নামাজ, রোজা, জাকাত ইত্যাদি মহান ইবাদত হলেও মানুষের প্রতি জুলুম করলে এসব আমল বিপদের কারণ হতে পারে। তাই ইবাদতের পাশাপাশি চরিত্র ও আচরণও শুদ্ধ হওয়া জরুরি।
৩.  আল্লাহ তাআলা নিজের হক ক্ষমা করতে পারেন; কিন্তু বান্দার হক আদায় না করে ক্ষমা পাওয়া কঠিন। এ জন্য মানুষের অধিকার নষ্ট করা থেকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।
৪.  কারো সম্মানহানি করা, গালি দেওয়া, অপবাদ দেওয়া বা কুৎসা রটানো কিয়ামতের দিন কঠিন ক্ষতির কারণ হবে।
৫. অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা কবিরা গুনাহ। প্রতারণা, ঘুষ, সুদ, জবরদখল, আত্মসাৎ বা অন্যের হক নষ্ট করা আখিরাতে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, শুধু বেশি বেশি নামাজ, রোজা বা নফল ইবাদত করাই যথেষ্ট নয়; বরং মানুষের অধিকার সংরক্ষণ, জুলুম থেকে বেঁচে থাকা এবং উত্তম চরিত্র গঠনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি আল্লাহর হক আদায়ের পাশাপাশি বান্দার হকও যথাযথভাবে আদায় করবে, সেই-ই প্রকৃত সফলকাম হবে। আর যে মানুষের ওপর জুলুম করে, সে যত বড় ইবাদতকারীই হোক না কেন, কিয়ামতের দিন প্রকৃত দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কায় থাকবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের মানুষের হক আদায়কারী, জুলুম থেকে বেঁচে থাকা এবং আখিরাতের প্রকৃত সফল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।

দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে কোরআনে বর্ণিত দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে কোরআনে বর্ণিত দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবন কখনোই দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা ও পরীক্ষামুক্ত নয়। কখনো সফরের চিন্তা, কখনো জীবিকার উদ্বেগ, কখনো ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কা—এসব বিষয় মানুষের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তোলে। কিন্তু একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সে তার সকল দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ আল্লাহ তাআলার কাছে সোপর্দ করে। সফরে বের হওয়ার সময়, নতুন কোনো কাজে প্রবেশের সময় অথবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তের মুহূর্তে নিম্নোক্ত কোরআনে বর্ণিত দোয়াটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি এমন একটি দোয়া, যা আল্লাহর নিকট কল্যাণকর প্রবেশ, কল্যাণকর প্রস্থান এবং তাঁর বিশেষ সাহায্য প্রার্থনার শিক্ষা দেয়। দোয়াটি হলো-

 رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَلْ لِي مِن لَّدُنكَ سُلْطَانًا نَّصِيرًا

উচ্চারণ : রাব্বি আদখিলনী মুদখালা সিদক্বিও ওয়া আখরিজনী মুখরাজা সিদক্বিও ওয়াজআল্লী মিল্লাদুনকা সুলতানান নাসীরা।

অর্থ : হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে বের করো কল্যাণের সাথে; আর তোমার পক্ষ থেকে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৮০)

বর্তমান যুগে দুশ্চিন্তা যেন মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একজন মুমিন জানে, তার সকল সমস্যার সমাধান আল্লাহর কাছেই রয়েছে। সুরা ইসরার এই মহান দোয়াটি শুধু সফরের দোয়া নয়; বরং জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে আল্লাহর সাহায্য, হেফাজত ও কল্যাণ কামনার এক অপূর্ব প্রার্থনা। তাই যখনই হৃদয় উদ্বেগে ভারাক্রান্ত হবে, তখন এই দোয়াটি আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠ করুন। আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। কারণ যে হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত রেখে তাঁর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ইসলামী অর্থনীতির স্বরূপ ও সুফল

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ইসলামী অর্থনীতির স্বরূপ ও সুফল
সংগৃহীত ছবি

মানুষ যখন প্রথম নদীতীরবর্তী জনপদে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছিল, তখন থেকেই তার জীবন জড়িয়ে যায় উৎপাদন, বিনিময় এবং জীবিকার সঙ্গে। মাঠে বীজ বপন, ফসল সংগ্রহ, পশুপালন, কারিগরি দক্ষতা কিংবা দূরপথের বাণিজ্য—এসবের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মানবসভ্যতার অর্থনৈতিক ভিত্তি। ইতিহাসের গতিধারায় সেই ভিত্তি ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে; কাফেলার পথ রূপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের মুদ্রা জায়গা করে দিয়েছে কাগুজে নোটকে, আর আজকের পৃথিবীতে অর্থের লেনদেন মুহূর্তের মধ্যে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু সভ্যতার এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় একটি বিষয় কখনো পরিবর্তিত হয়নি—সম্পদকে ঘিরে মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্ব।


অর্থনীতির ইতিহাস মূলত সম্পদের ইতিহাস নয়; বরং সম্পদকে কেন্দ্র করে মানুষের সম্পর্ক, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও ন্যায়বোধের ইতিহাস। তাই অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—অর্থনীতির উদ্দেশ্য কী? শুধু সম্পদ সৃষ্টি, নাকি মানবকল্যাণও?

অষ্টাদশ শতাব্দীর স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের মতে, মানুষের স্বাভাবিক স্বার্থসংশ্লিষ্টতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। আধুনিক বাজার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি নির্মিত হয়েছে এই ধারণার ওপর।
কিন্তু শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী ইউরোপে যখন উৎপাদন ও সম্পদের বিস্তার ঘটছিল, তখন একই সঙ্গে বাড়ছিল বৈষম্যও। এই বাস্তবতা সামনে রেখে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাঁদের যৌথ গ্রন্থ ‘The Communist Manifesto’ (1848)-এ লিখেছিলেন,  ‘The history of all hitherto existing society is the history of class struggles.’ মার্ক্সের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু সম্পদ উৎপাদনের বিষয় নয়; বরং তা ক্ষমতা, আধিপত্য এবং বৈষম্যেরও উৎস।

মানবসভ্যতার এই দীর্ঘ বৌদ্ধিক অভিযাত্রায় ইসলামী অর্থনীতি একটি স্বতন্ত্র অবস্থান ধারণ করে। এটি সম্পদ সৃষ্টির গুরুত্ব অস্বীকার করে না, বৈষম্যের প্রশ্নকে উপেক্ষা করে না এবং মানবকল্যাণের আলোচনাকেও এড়িয়ে যায় না; বরং এসব আলোচনার সঙ্গে আরো একটি মৌলিক বিষয় যুক্ত করে নৈতিক জবাবদিহি।

ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তি এমন এক বিশ্বদৃষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সম্পদকে শুধু অর্থনৈতিক উপাদান হিসেবে দেখা হয় না; বরং একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষ সম্পদের চূড়ান্ত মালিক নয়; বরং তার তত্ত্বাবধায়ক। মুসলিম ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদ ইবনে খালদুন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুকাদ্দিমাহ’য় লিখেছেন, ‘জেনে রাখো, উপার্জন মূলত মানুষের শ্রমের মূল্য।’

শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে উচ্চারিত এই বক্তব্যে শ্রম, উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীর উপলব্ধি ফুটে ওঠে। একই গ্রন্থে তিনি আরেকটি ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন, ‘জুলুম সভ্যতার ধ্বংসের পূর্বঘোষণা।’ ইবনে খালদুনের এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং সভ্যতার ইতিহাসের এক গভীর সত্যকে ধারণ করে। যখন অন্যায় বৃদ্ধি পায়, সম্পদের সুষমপ্রবাহ ব্যাহত হয় এবং মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, তখন শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা।

ইসলামী অর্থনীতির আলোচনায় এই ন্যায়বোধ কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করে আছে। কোরআন মাজিদ সম্পদ অর্জনকে বৈধতা দিয়েছে, ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করেছে এবং মানুষের অর্থনৈতিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সম্পদের সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা হাশরে ঘোষণা করেন, ‘যাতে সম্পদ শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’

এই আয়াত ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। ইসলাম সম্পদের বিরোধিতা করে না; বরং সম্পদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা করে। ব্যক্তি উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু সেই উদ্যোগ যেন সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট না করে, সে বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করে। এ কারণেই ইসলামে জাকাত শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি সম্পদের পুনর্বণ্টনের একটি সামাজিকব্যবস্থা। সদকা শুধু ব্যক্তিগত উদারতা নয়, এটি সামাজিক সংহতির মাধ্যম। উত্তরাধিকার আইন শুধু পারিবারিক বিধান নয়, এটি সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভবন রোধের একটি কার্যকর নীতি।

ইসলামী অর্থনীতি কোনো ব্যাংকিং পদ্ধতির নাম নয়, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প কাঠামোর নামও নয়। এটি সম্পদ, শ্রম, উৎপাদন, ভোগ, বণ্টন এবং সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি। এর লক্ষ্য এমন একটি সমাজ নির্মাণ, যেখানে সমৃদ্ধি থাকবে কিন্তু শোষণ থাকবে না; প্রবৃদ্ধি থাকবে কিন্তু বৈষম্য নয়; সম্পদ থাকবে; কিন্তু মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে নয়।