• ই-পেপার

বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে কিছু পরামর্শ

যে ৮ ইবাদতে জুমার দিন প্রাণবন্ত হয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে ৮ ইবাদতে জুমার দিন প্রাণবন্ত হয়
সংগৃহীত ছবি

ইসলামে জুমার দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। জুমার দিনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো—

১. জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা অনুধাবন করা

আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—এক. আল্লাহ তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন। দুই. আল্লাহ তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে জমিনে অবতরণ করিয়েছেন। তিন. এই দিনে আদম (আ.)-কে মৃত্যু দিয়েছেন। চার. এই দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছুই প্রার্থনা করবে তিনি তা দেবেন। যতক্ষণ সে হারাম কিছু প্রার্থনা করবে না। পাঁচ. এই দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৯৫)

২. জুমার নামাজ আদায় করা

সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অতঃপর মসজিদে এলো, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)

অন্য হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা, এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান মধ্যবর্তী সময়ের পাপ মোচন করে; যদি সেই ব্যক্তি সব ধরনের কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩৩)

৩. জুমার দিন গোসল করা

জুমার দিন গোসল করা ও আগে আগে মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আউস বিন আউস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালো করে গোসল করল, দ্রুততর সময়ে মসজিদে গেল ও (ইমামের) কাছাকাছি বসে মনোযোগসহ (খুতবা) শুনল, তার জন্য প্রতি কদমের বদলে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব থাকবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৫)

৪. মসজিদে প্রথমে প্রবেশ করা

জুমার দিন মসজিদে আগে প্রবেশ করা ও মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার বিশেষ গুরুত্ব আছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, অতঃপর প্রথমে মসজিদে গেল সে যেন একটি উট কোরবানি করল। যে এরপর মসজিদে গেল, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল। আর যে এরপর ঢুকল, সে যেন ছাগল কোরবানি করল, এরপর যে ঢুকল সে যেন মুরগি কোরবানি করল, আর যে এরপর ঢুকল সে ডিম সদকা করল। অতঃপর ইমাম খুতবার জন্য এলে ফেরেশতারা আলোচনা শোনা শুরু করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৪১)

৫. দোয়া করা

জুমার দিন একটি সময় আছে, যখন মানুষ আল্লাহর কাছে কোনো দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দেন। তোমরা সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান কর।’ (আবু দাউদ, হাদিস নম্বর : ১০৪৮)

জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিনের বারো ঘণ্টার মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যদি কোনো মুসলিম এ সময় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে, তাহলে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে দান করেন। এই মুহূর্তটি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কর। (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)

৬. সুরা কাহাফ পাঠ করা

জুমার অন্যতম আমল সুরা কাহাফ পাঠ করা। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে তা দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার জন্য আলোকিত হয়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি এই সুরার শেষ ১০ আয়াত পাঠ করবে অতঃপর দাজ্জাল বের হলে তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যে ব্যক্তি অজুর পর এই দোয়া পড়বে তার নাম একটি চিঠিতে লেখা হবে। অতঃপর তাতে সিল দেওয়া হবে, যা কেয়ামত পর্যন্ত আর ভাঙা হবে না।’ (সহিহ তারগিব, হাদিস : ১৪৭৩, আল মুসতাদরাক : ২/৩৯৯)

৭. ক্ষমা প্রার্থনা করা

সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অতঃপর মসজিদে এলো, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)

৮. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা 

জুমার দিন নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা কর্তব্য। আউস বিন আবি আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এই দিনে শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং এই দিনে সবাইকে বেহুঁশ করা হবে। অতএব তোমরা এই দিনে আমার ওপর বেশি পরিমাণ দরুদ পড়ো। কারণ জুমার দিনে তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ সাহাবারা বললেন, আমাদের দরুদ আপনার কাছে কিভাবে পেশ করা হবে, অথচ আপনার দেহ এক সময় নিঃশেষ হয়ে যাবে? তিনি বলেন, ‘আল্লাহ জমিনের জন্য আমার দেহের ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)

শিশুকে দুগ্ধদানে ইসলামের নির্দেশনা

মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া
শিশুকে দুগ্ধদানে ইসলামের নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ মায়ের দুধের ওপর সন্তানের অধিকার দিয়েছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতেও শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ, শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্ণতা লাভে মায়ের দুধ অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো বর্তমান যুগে কোনো কোনো মা তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে চান না, খাওয়ালেও খুব কম খাওয়ান। তাঁরা তাঁদের শিশুকে শুধু বাজারের গুঁড়া দুধ খাইয়ে লালন করে থাকেন। অথচ এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সন্তানের জন্য প্রদত্ত খাবার। তাই মায়ের শারীরিক অসুস্থতা কিংবা বিশেষ কোনো অপারগতা না থাকলে সন্তানকে বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মায়েরা নিজেদের বাচ্চাদেরকে পূর্ণ দুই বছর স্তন্যদান করবে, যদি দুধ খাওয়ার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৩৩)

তাফসিরবিদরা বলেন, আয়াত থেকে বোঝা যায় যে সন্তানকে দুধ পান করানো ওয়াজিব এবং বিশেষ অপারগতা ছাড়া স্তন্যদান থেকে বিরত থাকার অবকাশ নেই। (জামিউ আহকামিসসিগার : ১/১২৩)

অন্যদিকে দেখা যায়, অনেক মা সন্তানকে তিন-চার বছরও দুধ খাওয়ান। আবার অনেকে আড়াই বছর খাওয়ানো যায় মনে করে এই মেয়াদ পূর্ণ করেন। এটা ভুল। সন্তান অনূর্ধ্ব দুই বছর মায়ের বুকের দুধ খেতে পারবে। দুই বছরের বেশি বয়সী সন্তানকে দুধ পান করানো নাজায়েজ। দুই বছর দুধ পান করানোর বিষয়টি সুরা বাকারার ২৩৩ নম্বর আয়াতে রয়েছে। এ ছাড়া আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘মায়ের দুধ পানের সময় দুই বছরই।’ (সুনানে দারাকুতনি : ৪/১৭৪)

অনেকে মনে করেন, দুই বছরের বেশি দুধ পান করানো যায় না—এ কথা ঠিক, তবে শিশুর স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা থাকলে কিংবা অন্য খাবারে অভ্যস্ত না হলে আড়াই বছর বুকের দুধ খাওয়ানোর সুযোগ আছে এমন ধারণাও ভুল। শিশুকে দুই বছরের বেশি বুকের দুধ খাওয়ানোর কোনো সুযোগ নেই, শিশু অন্য খাবারে অভ্যস্ত না হলেও।

যে ছেলে-মেয়ে এক মায়ের দুধ পান করেছে তারা পরস্পর দুধ ভাই, দুধ বোন। এদের মধ্যে বিয়েশাদি হারাম। অথচ এ মাসআলাটির প্রতি অনেকেই ভ্রুক্ষেপ করে না। গ্রামগঞ্জে মহিলারা শখ করেই একে অন্যের সন্তানকে দুধ খাইয়ে থাকেন। আবার অনেকে প্রয়োজনবশতও খাওয়ান। যেমন—মায়ের অসুখ হলে বাচ্চাকে পার্শ্ববর্তী অন্য মা দুধ পান করান, কিন্তু এ বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে যায়। যিনি দুধ পান করালেন তিনিও এটা স্মরণ রাখেন না, অন্যদেরও জানানো হয় না। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শিদেরও বিষয়টি জানা থাকে না। ফলে অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো দম্পতির বিয়ে হয়ে সন্তান-সন্ততি হয়ে যাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দুধ ভাই-বোনের সম্পর্কের খোঁজ পাওয়া যায়। কত ভয়াবহ ব্যাপার! এ জন্য প্রথমত দুধ পান করানোর বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি। শিশুর দুধের অভাব বা প্রয়োজন ছাড়া শুধু শখ করে কিংবা হাসিঠাট্টা করে অন্য মায়ের দুধ পান করানো থেকে বিরত থাকা জরুরি।

আর যদি কোনো শিশুকে দুধ পান করানো হয়, তবে এ দুধ-সম্পর্কের কথা আত্মীয়-স্বজনকে জানানো এবং এ সম্পর্কের সংরক্ষণ করা জরুরি, বরং ডায়েরিতে নোট করে রাখা উচিত। (তাফসিরুল মানার : ৪/৪৭০; ফিকহুস সুন্নাহ : ২/৪০৩)

অনেকে মনে করেন, শিশু তার দাদি-নানির দুধ পান করতে পারবে না। যদি দুধ পান করে, তবে মা-বাবার বৈবাহিক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। শিশু তার দাদি-নানির দুধ পান করলে মা-বাবার সম্পর্ক নষ্ট হবে না। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৫/১২৫)

কোনো কোনো এলাকায় দেখা যায়, খালাতো ভাই-বোন বা চাচাতো ভাই-বোন, যাদের মধ্যে পর্দা ফরজ, তারা বড় হলে পর্দা করতে পারবে না—এ আশঙ্কায় ছোট থাকতেই খালা বা চাচির দুধ খাইয়ে দেওয়া হয়, যেন তারা বড় হয়ে পর্দা লঙ্ঘনের গুনাহে পতিত না হয়। যৌথ পরিবারে এমনটি বেশি ঘটে থাকে। অথচ শরিয়তে দুধ-সম্পর্কের বিধান এ উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। দুধ-সম্পর্কের ভিত্তি হবে সন্তানের দুধের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে। পর্দার হুকুম আদায় করতে পারবে না এ আশঙ্কায় দুধ পান করানো সমীচীন নয়। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ৬/৩৬৯)

দুধ-সম্পর্কের কারণে দুধ ভাই-বোনের দেখা-সাক্ষাৎ বৈধ হয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে বিয়েশাদি হারাম হয়ে যায়। কিন্তু তারা সব ক্ষেত্রে রক্ত সম্পর্কীয় আসল মাহরামের মতো নয়। আজকাল দুধ ভাই-বোনের চালচলন আপন ভাই-বোনের মতোই দেখা যায়, যা মোটেই কাম্য নয়। একইভাবে তাদের একাকী সফরসম দূরত্বে  যাওয়াও ঠিক নয়। (সংক্ষেপিত)

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৯ জুন ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৯ জুন ২০২৬

আজ শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩, ৩ মহররম, ১৪৪৮।
ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জুমার সময় শুরু ১২টা ০৩ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৩৯ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫২ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৮ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৬ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৭ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১১ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার বিশিষ্ট মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার বিশিষ্ট মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’
সংগৃহীত ছবি

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির তীরে, আলজেরিয়ার রাজধানীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক ইসলামি স্থাপত্যের এক বিস্ময়—‘জামিউল জাজাইর’। ইসলামের সৌন্দর্য, জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল এই বিশাল মসজিদ আজ শুধু আলজেরিয়ার নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের গর্বের প্রতীক। চার লাখ বর্গমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এই মহাপরিকল্পনা মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীর পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ এবং আফ্রিকা মহাদেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত।

যে ভূমিতে আজ ইসলামের এই মহিমান্বিত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে সেই এলাকাকে মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক কার্ডিনাল লাভিজেরির নামে নামকরণ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর আলজেরিয়া সেই ইতিহাসকে পেছনে ফেলে ইসলামী পরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটায়। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজ শেষে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেল মাজিদ তেব্বুন আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটির উদ্বোধন করেন। 

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার
জামিউল জাজাইরের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ২৩৫ মিটার (প্রায় ৮৬৯ ফুট) উচ্চতার মিনার, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার হিসেবে পরিচিত। ৪৩ তলাবিশিষ্ট এই মিনারটি কেবল আজানের জন্য নির্মিত হয়নি; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র। এর ভেতরে রয়েছে— ইসলামি সভ্যতা জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র, আধুনিক গ্রন্থাগার, পর্যটকদের জন্য অবজারভেশন ডেক ও রেস্তোরাঁ ও সাংস্কৃতিক সুবিধা। মিনারের উপরের তলা থেকে পুরো আলজিয়ার্স শহর এবং ভূমধ্যসাগরের অপূর্ব দৃশ্য এক নজরে দেখা যায়। রাতের বেলায় এটি সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর জন্য বাতিঘরের ভূমিকাও পালন করে।

লাখো মুসল্লির ইবাদতের কেন্দ্র
মসজিদের মূল নামাজঘরে একসঙ্গে প্রায় ৩৬ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশাল চত্বর ও বহিরাঙ্গনসহ মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের। ২২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের নামাজঘরের উপরে রয়েছে প্রায় ৫০ মিটার ব্যাসের এক বিশাল গম্বুজ। দেয়ালজুড়ে খোদাই করা হয়েছে কোরআনের আয়াত ও দৃষ্টিনন্দন ইসলামি ক্যালিগ্রাফি, যা পুরো পরিবেশকে আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যে ভরিয়ে তোলে। মসজিদের মিম্বারটি আফ্রিকান ওক কাঠ ও প্রাকৃতিক মুক্তা দিয়ে নির্মিত। 

ভয়াবহ ভূমিকম্পেও নিরাপদ
আলজিয়ার্স অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় মসজিদটির নিচে বসানো হয়েছে শত শত আধুনিক সিসমিক আইসোলেটর ও ড্যাম্পার। এই প্রযুক্তি ভূমিকম্পের কম্পন উল্লেখযোগ্যভাবে শোষণ করে ভবনকে নিরাপদ রাখে। ফলে এটি আধুনিক প্রকৌশলের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইসলামিক থিমেটিক গার্ডেন
মসজিদ কমপ্লেক্সের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে এক মনোমুগ্ধকর ইসলামিক বাগান। এখানে কোরআনে উল্লেখিত বিভিন্ন বৃক্ষ যেমন— ত্বীন (ডুমুর), জাইতুন (অলিভ), ডালিম, সুগন্ধি লেবু, জুঁই ফুল রোপণ করা হয়েছে। বিশেষভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে আল-আকসা প্রাঙ্গণের মাটি থেকে আনা অলিভ গাছও এখানে স্থান পেয়েছে।

স্বর্ণখচিত বিশাল ঝাড়বাতি
মসজিদের কেন্দ্রীয় ঝাড়বাতিটি বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতিগুলোর অন্যতম। ১৩.৫ মিটার ব্যাস এবং প্রায় ৯.৫ টন ওজনের এই ঝাড়বাতি ২৪ ক্যারেট স্বর্ণে আবৃত। এতে ব্যবহৃত হয়েছে তিন লক্ষাধিক স্বরোভস্কি ক্রিস্টাল, যা আলো প্রতিফলিত করে পুরো নামাজঘরকে অপূর্ব আভায় আলোকিত করে তোলে।

জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র
জামিউল জাজাইর শুধুমাত্র একটি মসজিদ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জ্ঞানকেন্দ্র। এখানে রয়েছে— দারুল কোরআন, উচ্চতর ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রায় ১০ লক্ষ বইয়ের গ্রন্থাগার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী হল, আধুনিক ভূগর্ভস্থ পার্কিং ব্যবস্থা। এসব সুবিধা ইসলামের জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে। প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত জামিউল জাজাইর ইতিহাস, স্থাপত্য, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্ঞানচর্চা ও ইসলামি সভ্যতার এক মহাকাব্যিক প্রকাশ। ভূমধ্যসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহান স্থাপনাটি যেন মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি জ্ঞান, সৌন্দর্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবকল্যাণের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।