• ই-পেপার

বাংলাদেশে যেদিন পালিত হবে পবিত্র আশুরা

সাফল্য লাভে গোপন ইবাদতের গুরুত্ব

মুফতি ওমর বিন নাছির
সাফল্য লাভে গোপন ইবাদতের গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন সে একা থাকে—কেউ তাকে দেখে না, কেউ তার প্রশংসা করে না, কেউ তার আমল গণনা করে না। কিন্তু সেই নির্জন মুহূর্তেও একজন মুমিনের হৃদয় জেগে থাকে। সে জানে, পৃথিবীর সব চোখ বন্ধ হলেও আসমানের মালিক তাকে দেখছেন। তাই সে নিভৃতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, অশ্রুসিক্ত নয়নে ক্ষমা প্রার্থনা করে, গোপনে দান করে, নিরবে আল্লাহর জিকির করে। এই নিভৃত ইবাদতই একজন বান্দার ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহপ্রেমের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।

প্রকাশ্য আমল মানুষ দেখতে পায়, কিন্তু গোপন আমল কেবল আল্লাহই জানেন। আর যে আমলের সাক্ষী কেবল আল্লাহ, সেই আমলের মর্যাদা তাঁর কাছে কত মহান—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এজন্যই সালাফে সালেহিন গোপন ইবাদতকে ঈমানের প্রাণ এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে গণ্য করতেন।

গোপন ইবাদত : ইখলাসের সর্বোত্তম নিদর্শন
গোপন ইবাদতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে লোক দেখানোর সুযোগ খুব কম থাকে। বান্দা যখন একান্তে আল্লাহর জন্য কোনো নেক আমল করে, তখন তার উদ্দেশ্য থাকে কেবল রবের সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনীতভাবে ও গোপনে। নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৫)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহ গোপন দোয়া ও নির্জন ইবাদতকে বিশেষভাবে পছন্দ করেন।

রাতের ইবাদত ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের পরিচয়
রাতের গভীর নির্জনতায় যখন মানুষ ঘুমে বিভোর থাকে, তখন কিছু সৌভাগ্যবান বান্দা তাদের রবের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করে। তারা মানুষের চোখ থেকে দূরে থেকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে পৃথক থাকে; তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে।’ (সুরা : সাজদাহ, আয়াত : ১৬)
তাহাজ্জুদ, গভীর রাতে কোরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার ও অশ্রুসিক্ত দোয়া—এসব এমন আমল যা বান্দাকে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য দান করে।

গোপন দান আল্লাহর ক্রোধ নিবারণ করে
গোপনে দান করা এমন একটি নেক আমল, যা মানুষের সম্মান রক্ষা করে এবং দাতার ইখলাস বৃদ্ধি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে প্রতিদান রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের দিন আরশের ছায়াপ্রাপ্ত সাত শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘...এমন ব্যক্তি, যে গোপনে দান করেছে; এমনকি তার ডান হাত যা দান করেছে, বাম হাতও তা জানেনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪২৩, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৩১)

গোপন আমল বিপদ থেকে মুক্তির মাধ্যম
আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া কোনো নেক আমল মানুষের জীবনের কঠিনতম বিপদ থেকেও মুক্তি এনে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যারা একটি গুহায় আটকা পড়েছিলেন। তারা প্রত্যেকে নিজেদের একান্ত আন্তরিক নেক আমলের উসিলায় আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। ফলে আল্লাহ তাদের বিপদ দূর করে দেন এবং তারা মুক্তি লাভ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২১৫, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৪৩)
এ ঘটনা আমাদের শেখায় যে, গোপন ও খাঁটি আমল আল্লাহর দরবারে কত মূল্যবান।

নবী ইউনুস (আ.)-এর মুক্তির রহস্য
আল্লাহর নবী ইউনুস (আ.) যখন মাছের পেটের অন্ধকারে বন্দি হয়ে পড়েছিলেন, তখন তিনি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তিনি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতেন, তবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই অবস্থান করতেন।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১৪৩-১৪৪)


গোপন আমল মানুষকে ইহসানের স্তরে পৌঁছে দেয়। গোপন ইবাদত বান্দার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকে ইহসানের উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর যদি তাঁকে দেখতে না পারো, তবে বিশ্বাস করবে যে তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০)
যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, সে ধীরে ধীরে এই অনুভূতিতে অভ্যস্ত হয়ে যায় যে, আল্লাহ সর্বদা তাকে দেখছেন।

গোপনে করা যায় এমন কিছু মহৎ আমল

তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা।
গভীর রাতে ইস্তিগফার করা।
গোপনে দান-সদকা করা।
নফল রোজা রাখা।
কাউকে না জানিয়ে অসহায় মানুষের সাহায্য করা।
এতিম, বিধবা ও দরিদ্রদের সহযোগিতা করা।
নির্জনে কোরআন তিলাওয়াত করা।
একাকী অবস্থায় জিকির ও দোয়ায় মশগুল থাকা।
মানুষের জন্য গোপনে দোয়া করা।

অতএব, গোপন ইবাদত হলো মুমিনের সেই অমূল্য সম্পদ, যা মানুষের প্রশংসা থেকে মুক্ত এবং সরাসরি আল্লাহর দরবারে জমা হয়। প্রকাশ্য আমল মানুষ দেখতে পারে, কিন্তু গোপন আমল শুধু আল্লাহ দেখেন। আর যে আমলের সাক্ষী স্বয়ং আল্লাহ, তার মর্যাদা কত মহান হতে পারে—তা শুধু তিনিই জানেন।

তাই আসুন, আমরা এমন কিছু নেক আমল নিজের জন্য সংরক্ষণ করি, যা পৃথিবীর কেউ জানবে না। এমন কিছু সিজদা, এমন কিছু অশ্রু, এমন কিছু দান, এমন কিছু দোয়া—যার সাক্ষী শুধু আল্লাহ। হয়তো কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে, যখন আমলনামা খুলে দেওয়া হবে, তখন সেই গোপন আমলগুলোই আমাদের মুক্তির কারণ হবে এবং আল্লাহর রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেবে। যে বান্দার গোপন সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ়, তার প্রকাশ্য জীবনও আল্লাহ সুন্দর করে দেন। আর যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে খুঁজে পায়, সে কখনো প্রকৃত অর্থে একা থাকে না।

হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্ম

মাওলানা আদনান জহির
হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্ম
সংগৃহীত ছবি

বিকেলের সোনাঝরা রোদ, মাঠজুড়ে ছুটে চলা দুরন্ত কিশোরেরা, বন্ধুদের প্রাণখোলা হাসি, ফুটবল আর ক্রিকেটের উত্তেজনা—একসময় এ দৃশ্য ছিল আমাদের সমাজের অতি পরিচিত ছবি। মাগরিবের আজান না হওয়া পর্যন্ত চলত দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা আর আনন্দ-উচ্ছ্বাস। ধুলোবালি মাখা শরীর, ঘামে ভেজা জামা আর ক্লান্ত মুখের প্রশান্ত হাসিতে ফুটে উঠত একটি সুস্থ ও প্রাণবন্ত শৈশবের প্রতিচ্ছবি। 

কিন্তু আজ সেই দৃশ্য যেন ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। মাঠের জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন, বন্ধুর আড্ডার জায়গা নিয়েছে ভার্চুয়াল চ্যাট, আর বাস্তব খেলাধুলার পরিবর্তে শিশু-কিশোরেরা ডুবে যাচ্ছে ডিজিটাল গেমসের কৃত্রিম জগতে। আজকের শিশুদের বড় একটি অংশ বন্দি হয়ে পড়েছে চার দেয়ালের ভেতর, হাতে স্মার্টফোন আর চোখে স্ক্রিনের নীল আলো। এটি শুধুমাত্র প্রযুক্তির অগ্রগতির গল্প নয়; বরং এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা, চরিত্র, স্বাস্থ্য ও জীবনদর্শনের পরিবর্তনের গল্প।

উদ্দেশ্যহীন জীবন কাম্য নয়
মানুষকে আল্লাহ তাআলা অনর্থক সৃষ্টি করেননি। মানুষের জীবন একটি মহান উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন। তাই সময়, শক্তি ও মেধাকে অর্থহীন কাজে ব্যয় করা একজন মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১১৫)

আজ যখন অসংখ্য শিশু-কিশোর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করছে, ভার্চুয়াল যুদ্ধের খেলায় মগ্ন থাকছে এবং বাস্তব জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় করছে, তখন এই আয়াত আমাদের সামনে গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছি?

হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের প্রাণচাঞ্চল্য
একসময় শিশুদের আনন্দ ছিল মাঠে। তারা দলবদ্ধভাবে খেলত, নেতৃত্ব শিখত, সহযোগিতা শিখত, জয়-পরাজয় মেনে নিতে শিখত। খেলাধুলা তাদের শুধু শরীরকে শক্তিশালী করত না; বরং চরিত্র, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক দক্ষতাও গড়ে তুলত। কিন্তু আজ বাস্তব মাঠের জায়গা দখল করেছে ফ্রি ফায়ার, পাবজি কিংবা অন্যান্য ভার্চুয়াল গেমস। বাস্তব জীবনের বন্ধুদের পরিবর্তে স্ক্রিনের ভেতরের চরিত্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠছে। ফলে শিশুরা ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। যেখানে ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, অল্পবয়সী সাহাবিরা ঈমান, সাহস ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন; সেখানে আমাদের অনেক কিশোর আজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কৃত্রিম জগতের পেছনে ব্যয় করছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার দুই পা এক কদমও সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—তার জীবন কী কাজে ব্যয় করেছে, তার জ্ঞান দিয়ে কী করেছে, তার সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে ও কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার শরীর কী কাজে ক্ষয় করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৭)
এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর নিকট জবাবদিহির বিষয়। তাই সময়কে এমন কাজে ব্যয় করা উচিত যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ বয়ে আনে।

যেসব কারণে আমাদের শিশুরা মাঠ ছেড়ে স্ক্রিনে
১. খেলার মাঠের সংকট

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহর ও মফস্বলে খেলার মাঠ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বহুতল ভবনের ভিড়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ উন্মুক্ত স্থান দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।

২. নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ
ব্যস্ত জীবনযাপন এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বাইরে পাঠাতে স্বস্তি বোধ করেন না। ফলে শিশুদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন।

৩. প্রযুক্তির আসক্তিমূলক নকশা
আধুনিক অ্যাপস, গেমস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে এগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকে। প্রতিনিয়ত নতুন কনটেন্ট, নোটিফিকেশন এবং পুরস্কারভিত্তিক ডিজাইন শিশুদের মনোযোগকে আটকে রাখে।


শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ
দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে স্থূলতা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ব্যথা, চোখের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। মাঠের খেলাধুলা মানুষকে দলগত জীবন শেখায়। কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতা শিশুদের একাকী, আত্মকেন্দ্রিক ও খিটখিটে করে তোলে। বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ক তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়। দীর্ঘ সময় কোনো কাজে একাগ্র থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় উত্তম এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।’(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
এখানে শক্তি বলতে শুধু শারীরিক শক্তি নয়; বরং ঈমানি শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা, কর্মক্ষমতা এবং উপকারী দক্ষতাও অন্তর্ভুক্ত। খেলাধুলা, শরীরচর্চা এবং সুস্থ জীবনযাপন একজন মুমিনকে এই শক্তি অর্জনে সহায়তা করে।

তরুণদের যৌবন, মেধা ও শক্তি আল্লাহর এক মহান আমানত। এই মূল্যবান সময়কে অর্থহীন বিনোদন, অবিরাম স্ক্রোলিং এবং ভার্চুয়াল জগতের পেছনে নষ্ট করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আজ যারা বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, জ্ঞান অর্জন করবে, শরীরচর্চা করবে, ইসলামী আদর্শে নিজেকে গড়বে—তারাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। আর যারা কেবল স্ক্রিনের নেশায় ডুবে থাকবে, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করবে।


আজকের শিশু আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, আলেম, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা ও সমাজনেতা। তাই তাদের শৈশবকে স্ক্রিনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা সময়ের অন্যতম বড় দাবি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ, সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে, যেন প্রযুক্তি হয় উপকারের মাধ্যম, ধ্বংসের নয়।

মনে রাখতে হবে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের হাতে। আজ আমরা যদি তাদের হাতে বই, জ্ঞান, চরিত্র ও সুস্থ জীবন তুলে দিতে পারি, তবে আগামীকাল তারা হবে উম্মাহর গর্ব। আর যদি তাদেরকে স্ক্রিনের নেশা ও উদ্দেশ্যহীন বিনোদনের মাঝে হারিয়ে যেতে দিই, তবে তার মাশুল পুরো সমাজকেই দিতে হবে। আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুত তাক্বওয়া আল-ইউসুফিয়্যাহ সরাইল, বি-বাড়িয়া। 

 

হিজরি সনের ইতিহাস

মুফতি আতাউর রহমান
হিজরি সনের ইতিহাস
সংগৃহীত ছবি

হিজরি সন মুসলিম জাতির গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। ইসলামের সোনালি যুগে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর সব কর্মকাণ্ড হিজরি সন অনুযায়ী পরিচালিত হতো। মুসলিম ঐতিহাসিকরা ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস হিজরি সন অনুসারেই লিপিবদ্ধ করেছেন। তাই আসুন! জেনে নেওয়া যাক হিজরি সন সূচনার ইতিহাস।

ইসলামের সূচনালগ্নে মুসলমানদের নিজস্ব কোনো বর্ষপঞ্জি ছিল না। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে একবার আবু মুসা আশআরি (রা.) তাঁকে এই মর্মে চিঠি লেখেন যে আপনার পক্ষ থেকে খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে চিঠি পাঠানো হয়।

কিন্তু এসব চিঠির ওপর কোনো তারিখ থাকে না। অথচ তারিখ লেখার উপকারিতা অনেক। এতে চিঠিগুলো সংরক্ষণ করাও সহজ হয়ে যায়। তারিখ থাকলে বোঝা যায়, আপনি কবে চিঠি লিখেছেন, কবে প্রেরণ করেছেন, কোন দিন হুকুম জারি করেছেন, কখন থেকে নির্দেশ বাস্তবায়ন করা হবে—এসব বিষয় বোঝা যায় চিঠিতে তারিখ থাকলে।

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কাছে আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর যুক্তি অত্যন্ত পছন্দ হয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় সাহাবির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেন। সাহাবিরাও আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর কথা পছন্দ করেন। সিদ্ধান্ত হয় নিজস্ব বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে কখন থেকে সন গণনা শুরু হবে? সাহাবিরা এ বিষয়ে চারটি পরামর্শ দেন।

তা হলো—১. মহানবী (সা.)-এর জন্ম দিন থেকে, ২. নবুয়তের বছর থেকে,  ৩. হিজরতের বছর থেকে, ৪. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর বছর থেকে।
উমর (রা.) বিষয়টি ফয়সালা করার জন্য মজলিসে শুরা (উচ্চতর পরামর্শ সভা) আহ্বান করেন। মজলিসে চারটি মতের পক্ষে ও বিপক্ষে একাধিক যুক্তিতর্ক পেশ করা। উমর (রা.) নিজেও বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করেন। তিনি ভেবে দেখেন, নবীজি (সা.)-এর জন্ম ও নবুয়ত লাভের সন অমীমাংসিত। তাই এই দুই বছরকে সূচনা ধরলে বর্ষপঞ্জি নিয়ে বিতর্ক থেকে যাবে। অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যু সনকে সূচনা ধরা অনুচিত। কেননা মুসলমানের জন্য অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার সময়। সব দিক বিবেচনা করে তাঁর মনে হলো, হিজরতের বছরটিই ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনা হওয়া উচিত। কেননা হিজরতের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের নবযাত্রা শুরু হয়, মুসলমানরা নিরাপদ জীবন লাভ করে, মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করা হয়, ইসলামের প্রচার-প্রসারের নবধারার সূচনা হয়। উমর (রা.) সাহাবিদের সামনে হিজরতের বছর থেকে সন গণনা করার যুক্তি তুলে ধরলে অন্য সাহাবিরা তা মেনে নেন।

বাহ্যত হিজরত মুসলমানের জন্য একটি হতাশাজনক বিষয় ছিল। কেননা তারা অপারগ হয়ে মাতৃভূমি ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হিজরত মুসলিম জাতিকে নবজীবন দান করেছিল। মুসলমানদের উত্থান-অগ্রগতির সূচনা হিজরতের সময় থেকেই হয়েছিল। হিজরতের পরই মুসলমানরা নিজস্ব সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন, নিরাপদে ইসলাম পালন ও প্রচার, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। হিজরতের পরই নির্যাতিত-নিপীড়িত মুসলমানরা ধীরে ধীরে বিজয়ী জাতিতে উন্নীত হয়েছিল।

হিজরতের বছর থেকে সন গণনার আরেকটি উপকার হলো হিজরতের ঘটনা মুসলিম জাতিকে একই সঙ্গে ধৈর্য-সহনশীলতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জোগায়। কেননা হিজরতের আগে মুসলমানরা মক্কায় অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছিল। এমন কোনো অত্যাচার নেই যা তাদের ওপর করা হয়নি। মক্কি জীবনে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়েছে, সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে, তিন বছর সর্বাত্মক অবরোধে রাখা হয়েছে, সহায়-সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে; এমনকি শুধু মুসলমান হওয়ার অপরাধে জীবন দিতে হয়েছে। হিজরত শব্দটি উচ্চারণ করলে মুসলমানের অন্তরে এসব দৃশ্য ভেসে ওঠে, যা তাদের প্রতিকূল অবস্থায় ঈমানি দৃঢ়তা দান করে।

অন্যদিকে হিজরতের পর মুসলিমরা ধীরে ধীরে আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে নিজেদের সুসংহত করেছে; সমগ্র আরবে, বরং বিশ্বের প্রধান প্রধান রাজদরবারে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিয়েছে, তারা শিরক ও জুলুমের পরিবর্তে তাওহিদ ও মানবতার সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছে। হিজরত শব্দটি এই সাফল্যগুলোও স্মরণ করিয়ে দেয়, যা মুসলিম জাতির জন্য চির অনুপ্রেরণার উৎস।

ইসলামী সন প্রণয়নের সময় এই প্রশ্নটিও সামনে আসে যে কোন মাস থেকে বছরের সূচনা হবে। এ বিষয়েও সাহাবায়ে কেরাম (রা.) বিভিন্ন মত পেশ করেন। একদল সাহাবি বলেন, রমজান মাসকে প্রথম মাস নির্ধারণ করা হোক। কেননা এটা সবচেয়ে মর্যাদাশীল মাস। এই মাসে কোরআন নাজিল হয়েছিল। আরেক দল সাহাবি বলেন, মহররম মাস থেকে শুরু করা হোক। কেননা এই মাসে হাজিরা ঘরে ফেরেন। অন্য একদল সাহাবি পরামর্শ দিলেন রবিউল আউয়াল মাস থেকে শুরু করতে। কেননা এই মাসে মহানবী (সা.) হিজরত শুরু করেছিলেন।

সব মতামত পর্যালোচনা করার পর উমর (রা.) মহররম মাসকে ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস নির্ধারণ করেন। কারণ হলো প্রাচীনকালে আরবরা মহররম প্রথম মাস হিসেবে গণনা করে আসছে। এই হিসাবের সঙ্গে তাদের জীবন-জীবিকার নানা প্রশ্ন জড়িত ছিল। তাই বিনা প্রয়োজনে তিনি বদলে দিতে চাননি। শুধু তাই না, তিনি প্রচলিত মাসের নামগুলোও গ্রহণ করেছিলেন, যা প্রায় ২০০ বছর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পূর্বপুরুষ কিলাব বিন মুররাহর সময়ে নির্ধারণ করা হয়েছিল। মাসের নামগুলো হলো মহররামুল হারাম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জুমাদাল উলা, মুজাদাস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ।

তথ্যঋণ : দারুল উলুম দেওবন্দ ডটকম

হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মুফতি মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি
হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। পৃথিবীর সব হারানো সম্পদ একদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব হলেও চলে যাওয়া সময় কখনো ফিরে আসে না। তাই ইসলাম সময়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং সময়ের যথাযথ ব্যবহারকে সফল জীবনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।’ (সুরা : আসর, আয়াত : ১-২)

সময়ের এই গুরুত্ব উপলব্ধি করেই ইসলাম একটি স্বতন্ত্র বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেছে, যা মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বর্ষপঞ্জির নাম হিজরি সন। হিজরি সন শুধু দিন-মাস-বছরের হিসাব রাখার মাধ্যম নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ত্যাগ, সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও সভ্যতার উত্থানের এক জীবন্ত দলিল।

হিজরি সনের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
হিজরি সনের সূচনা ইসলামের ইতিহাসের এক মহান ও যুগান্তকারী ঘটনাকে কেন্দ্র করে। মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত মানব ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই হিজরতের মাধ্যমে ইসলাম শুধু একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপ লাভ করেছে।

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খিলাফতকালে প্রশাসনিক প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনিয়তা দেখা দেয়। সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতকে ইসলামী সনের সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ইতিহাসবিদ ইমাম তাবারি (রহ.) উল্লেখ করেন যে সাহাবায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে হিজরতকেই ইসলামী বর্ষপঞ্জির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। (তারিখ আত-তাবারি, খণ্ড-২)

এখানে একটি গভীর শিক্ষা নিহিত আছে : ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম বা ওফাতের বছর থেকে নয়; বরং হিজরত থেকে। এর মাধ্যমে মুসলমানদের শেখানো হয়েছে যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা, সত্যের বিজয় এবং জাতির পুনর্জাগরণ ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।

হিজরত : আত্মত্যাগ ও পরিবর্তনের প্রতীক
হিজরত শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন নয়; বরং এটি ছিল ঈমান, আদর্শ ও সত্যের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম দ্বিনের স্বার্থে জন্মভূমি, সম্পদ ও আত্মীয়-স্বজন ত্যাগ করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছে, তারাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২১৮)

এই হিজরতের ফলেই মদিনায় প্রতিষ্ঠিত হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম আদর্শ রাষ্ট্র। সেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মর্যাদার এক অনন্য নজির স্থাপিত হয়, যা আজও বিশ্বমানবতার জন্য অনুসরণীয়।

হিজরি সন ও ইসলামী জীবনব্যবস্থা
ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও ইবাদত হিজরি বর্ষপঞ্জির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। রমজানের রোজা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, হজ, আশুরার রোজা, আরাফার দিবস, জাকাতের হিসাব এবং ইদ্দতের সময়কাল—সবকিছুই হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তা মানুষের এবং হজের সময় নির্ধারণের মাধ্যম।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ কর।’ (সহিহ বুখারি)

এ থেকে স্পষ্ট হয় যে ইসলামের সময়ব্যবস্থা মূলত চান্দ্র বর্ষপঞ্জির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং হিজরি সন মুসলিম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মুসলিম আত্মপরিচয় রক্ষায় হিজরি সনের ভূমিকা
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মুসলমানরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পরিচয় সংকটের মুখোমুখি। আজ অনেক মুসলমান ইংরেজি সন-তারিখ সম্পর্কে সচেতন হলেও হিজরি মাসগুলোর নাম এবং এগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নন। এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। হিজরি সন মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আমরা একটি বিশ্বজনীন মুসলিম উম্মাহর অংশ। আমাদের ইতিহাস ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস।

হিজরি সনের শিক্ষা
প্রতিটি নতুন হিজরি বছর আমাদের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে—

প্রথমত, এটি আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়। গত বছরের কাজের হিসাব গ্রহণ করে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ এনে দেয়।

দ্বিতীয়ত, এটি ত্যাগ ও কোরবানির শিক্ষা দেয়। হিজরতের ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মহৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ত্যাগ স্বীকার অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, এটি আল্লাহর ওপর ভরসা করার শিক্ষা দেয়। সাওর গুহায় অবস্থানকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন, ‘চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : আত-তাওবা, আয়াত : ৪০)

চতুর্থত, এটি আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুহাজির সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিত্যাগ করে।’ (সহিহ বুখারি)

অর্থাৎ আজকের দিনে প্রকৃত হিজরত হলো মিথ্যা, দুর্নীতি, সুদ, মাদক, অন্যায় ও সব গুনাহ থেকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ফিরে আসা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়
হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আজ সময়ের দাবি। এ জন্য পরিবার, মসজিদ, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজরি সনের প্রচলন বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি নথিপত্রে হিজরি তারিখ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। পাশাপাশি সন্তানদের ইসলামী ইতিহাস ও হিজরতের শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। হিজরি নববর্ষকে আনন্দ-উল্লাসের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে আত্মসমালোচনা, তাওবা, আত্মশুদ্ধি এবং নতুন সংকল্প গ্রহণের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

হিজরি সন শুধু একটি বর্ষপঞ্জি নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, আদর্শ ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ত্যাগ ছাড়া সফলতা আসে না, সংগ্রাম ছাড়া পরিবর্তন আসে না এবং আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া প্রকৃত বিজয় অর্জিত হয় না। নতুন হিজরি বছর আমাদের জীবনে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, নৈতিকতা ও দ্বিনি চেতনার নতুন জাগরণ সৃষ্টি করুক। হিজরতের মহান শিক্ষা ধারণ করে আমরা যদি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সত্য, ন্যায় ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে হিজরি সনের প্রকৃত তাৎপর্য বাস্তবায়িত হবে।

লেখক : প্রভাষক (আরবি)
মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম ও
খতিব, হাজী মনসুর আলী জামে মসজিদ, শাকপুরা, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম