• ই-পেপার

শিশুদের ইবাদতমুখী করে গড়ে তোলার উপায়

বাবা দিবসে সন্তানের পঠিতব্য কিছু দোয়া

মুফতি ওমর বিন নাছির
বাবা দিবসে সন্তানের পঠিতব্য কিছু দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে বাবার স্থান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তিনি সন্তানের জন্য নিরাপত্তার ছায়া, ভালোবাসার আশ্রয় এবং ত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। একজন বাবা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। তাই ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা এতটাই উচ্চ যে আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশের পরপরই তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন।

বর্তমান সময়ে ‘বাবা দিবস’ উপলক্ষে অনেকেই বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন। একজন মুসলিম সন্তানের জন্য সবচেয়ে সুন্দর উপহার হলো—বাবার জন্য আন্তরিক দোয়া করা। কারণ দোয়া এমন এক আমল, যা জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় পিতা-মাতার জন্য উপকারী হয়। তাই আসুন, আমরা বাবা দিবসকে উপলক্ষ করে বাবার জন্য কোরআন-সুন্নাহ থেকে শেখা দোয়াগুলো জানি এবং আমল করি।


১. বাবার জন্য রহমত ও নিরাপত্তা কামনায় দোয়া

رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

উচ্চারণ : রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগিরা।
অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৪)

২. ক্ষমা ও জান্নাতের দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

উচ্চারণ : রব্বানাগফির লি ওয়া লিওয়ালিদাইয়া ওয়ালিল মুমিনীনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।
অর্থ : ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন, যেদিন হিসাব কায়েম হবে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

৩. মৃত বাবার জন্য দোয়া
যাদের বাবা ইন্তেকাল করেছেন, তারা বেশি বেশি এ দোয়া করতে পারেন—

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া আফিহি ওয়াফু আনহু।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! তাঁকে ক্ষমা করুন, তাঁর প্রতি দয়া করুন, তাঁকে নিরাপত্তা দিন এবং তাঁর ত্রুটিগুলো মার্জনা করুন।’ (সহিহ মুসলিম)

সন্তানের দোয়া মাতা-পিতার জন্য সদকায়ে জারিয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল চলতে থাকে—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানের আন্তরিক দোয়া পিতা-মাতার জন্য মৃত্যুর পরও উপকার বয়ে আনে।

বাবা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ। একজন মুসলিম সন্তানের উচিত শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা জীবন বাবার সম্মান করা, তাঁর খোঁজখবর নেওয়া, তাঁর সেবা করা এবং তাঁর জন্য নিয়মিত দোয়া করা। পৃথিবীর কোনো উপহারই একজন বাবার জন্য সন্তানের আন্তরিক দোয়ার সমতুল্য নয়। তাই আসুন, আমরা আজ বাবা দিবসে এবং জীবনের প্রতিটি দিনে আমাদের বাবার জন্য আল্লাহর দরবারে হাত উঠাই, হে আল্লাহ! আমাদের বাবাদের ক্ষমা করুন, তাঁদের প্রতি রহম করুন, তাঁদের জীবনকে বরকতময় করুন এবং তাঁদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন।

আজ ‘বাবা দিবসে’ প্রতিটি সন্তানের করনীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
আজ ‘বাবা দিবসে’ প্রতিটি সন্তানের করনীয়
সংগৃহীত ছবি

বাবা—ছোট্ট একটি শব্দ, কিন্তু এর গভীরতা আকাশসম বিস্তৃত। একজন সন্তানের জীবনে বাবাই হলেন নিরাপত্তার আশ্রয়, সাহসের উৎস, জীবনের প্রথম শিক্ষক এবং পরিবারের নীরব অভিভাবক। তিনি নিজের স্বপ্ন, আরাম-আয়েশ ও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। অনেক সময় মায়ের ভালোবাসা প্রকাশ্য হলেও বাবার ভালোবাসা থাকে নীরব, গভীর এবং আত্মত্যাগে পরিপূর্ণ।

বিশ্বজুড়ে আজ ‘বাবা দিবস’ পালিত হচ্ছে। যদিও ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন নেই; বরং বছরের প্রতিটি দিন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই তাদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সেবার জন্য নির্ধারিত। তবুও এই দিনটি আমাদেরকে পিতার অবদান স্মরণ করার, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার এবং নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়।

কোরআনের আলোকে পিতার মর্যাদা
আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকে নিজের ইবাদতের পরপরই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৩)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর হক আদায়ের পর মানবজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হক হলো পিতা-মাতার হক।

আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৪)
পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাকে আল্লাহ নিজের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, যা তাদের মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

হাদিসে পিতার মর্যাদা
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি তিনবার একই প্রশ্ন করলে তিনবারই তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’
চতুর্থবার তিনি বললেন, ‘অতঃপর তোমার বাবা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৪৮)
এ হাদিসে মায়ের মর্যাদা বিশেষভাবে বর্ণিত হলেও বাবার অধিকার ও সম্মানও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পিতা হলো জান্নাতের মধ্যবর্তী উত্তম দরজাগুলোর একটি।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৯০০)
অর্থাৎ, পিতার সন্তুষ্টি অর্জন জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

পিতার আত্মত্যাগ: এক নীরব সংগ্রামের গল্প
একজন বাবা সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের অগণিত কষ্ট গোপন করেন। সন্তানের শিক্ষার জন্য, চিকিৎসার জন্য, সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেন। সন্তান যখন নিশ্চিন্তে ঘুমায়, তখনও বাবার মনে ঘুরপাক খায় পরিবারের দায়িত্বের চিন্তা। অনেক সময় সন্তান বড় হয়ে বাবার এই আত্মত্যাগ ভুলে যায়। অথচ আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে সে পৃথিবীকে দেখছে, তার পেছনে রয়েছে বাবার ঘাম, পরিশ্রম ও ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস।

সন্তানের করণীয়
ইসলাম সন্তানের ওপর পিতার প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে। সেগুলো হলো-
১. পিতার সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা।
২. তাঁর আনুগত্য করা (শরিয়তবিরোধী বিষয় ব্যতীত)।
৩. তাঁর ভরণপোষণ ও সেবাযত্ন করা।
৪. তাঁর জন্য দোয়া করা।
৫. তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের সম্মান করা।
৬. মৃত্যুর পরও তাঁর জন্য সদকা ও ইস্তিগফার করা।


মাতা-পিতার জন্য পঠিতব্য কোরআনে বর্ণিত দোয়া হলো-

   رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا 

উচ্চারণ : ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।’
অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৪)

বাবা দিবসে আমাদের শিক্ষা
বাবা দিবস শুধু সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনার একটি উপলক্ষ। আমরা কি আমাদের বাবার খোঁজ রাখি? আমরা কি তাঁর কষ্ট বুঝি? আমরা কি তাঁর জন্য দোয়া করি? আমরা কি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করছি? যদি উত্তর ইতিবাচক হয়, তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি উত্তর হয় ‘না’ তাহলে আজই পরিবর্তনের সময়। কেননা বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি সন্তানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। তাঁর ভালোবাসা অনেক সময় শব্দে প্রকাশ পায় না, কিন্তু প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি দায়িত্ব পালন এবং প্রতিটি দুশ্চিন্তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সন্তানের প্রতি গভীর মমতা।

তাই বাবা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—শুধু একটি দিনের শুভেচ্ছায় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি দিনে বাবার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব। তাঁর সেবাকে ইবাদত মনে করব, তাঁর সন্তুষ্টিকে জান্নাতের পথ হিসেবে গ্রহণ করব এবং তাঁর জন্য সর্বদা দোয়া করব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল পিতা-মাতাকে সুস্থতা, বরকত ও দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন এবং যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।

খতমে খাজেগানের ফজিলত, নিয়ম ও দোয়াসমূহ

মুফতি ওমর বিন নাছির
খতমে খাজেগানের ফজিলত, নিয়ম ও দোয়াসমূহ
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন অনেক সময় আসে, যখন চারদিকের পথ যেন বন্ধ হয়ে যায়। দুশ্চিন্তা, বিপদ-মুসিবত, মানসিক অস্থিরতা কিংবা অপূর্ণ চাওয়া-পাওয়ার ভারে হৃদয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ঠিক এমন মুহূর্তে একজন মুমিন তার রবের দরবারে ফিরে আসে—দোয়া, যিকির ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে। আল্লাহর স্মরণেই যে অন্তরের প্রশান্তি, তা পবিত্র কোরআনেই ঘোষণা করা হয়েছে, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)

আল্লাহমুখী জীবনচর্চারই একটি বরকতময় রূপ হলো খতমে খাজেগান। যুগে যুগে বুযুর্গানে দ্বিন, অলিয়ায়ে কেরাম এবং তাসাউফের পথিকগণ নিজেদের আত্মশুদ্ধি, রূহানি উন্নতি এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভের আশায় এই খতমের আমল করে আসছেন। বিশেষত নকশবন্দিয়া, চিশতিয়া ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ তরিকায় এটি একটি পরিচিত ও সম্মানিত আমল হিসেবে বিবেচিত।

খতমে খাজেগান মূলত কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত, দরূদ শরিফ, ইস্তিগফার, তাসবিহ ও আল্লাহ তাআলার গুণবাচক নামসমূহ পাঠের সমষ্টি। এটি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদত নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, অন্তরের পরিশুদ্ধি এবং দোয়া কবুলের আশায় পরিচালিত একটি নফল ও রূহানিয়াতপূর্ণ আমল।

আধ্যাত্মিক সাধকদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, একাগ্রতা, ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে খতমে খাজেগান আদায় করলে হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে, পেরেশানি দূর হয়, বিপদ-মুসিবত থেকে মুক্তির পথ সুগম হয় এবং বান্দা আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকতের আশা করতে পারে। এ কারণেই যুগে যুগে অসংখ্য নেককার মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে এই খতমের আয়োজন করে আসছেন। খতমে খাজেগানের নির্দিষ্ট ও সর্বজনস্বীকৃত কোনো একক পদ্ধতি নেই। 

এই খতমের একটি সংক্ষিপ্ত নিয়ম হলো—

১. ইস্তেগফার—১১ বার
২. সুরা ফাতিহা—৭ বার
৩. দরুদ শরিফ—১১ বার
৪. সুরা আলাম নাশরাহ—৭ বার
৫. সুরা ইখলাছ—১১ বার
৬. পুনরায় সুরা ফাতিহা—৭বার
৭. পুনরায় দরুদ শরিফ—১১ বার

তারপর
৮.  فَسَهِّلْ يَا اِلٰهِىْ كُلَّ صَعْبٍ بِحُرْ مَتِ سَيِّدِ الْاَ بْرَارِ سَهِّلْ سَهِّلْ بِفَضْلِكَ يَاعَزِيْزُ‎
 ফাসাহ্হিল ইয়া ইলাহি কুল্লা সাবিন বিহুরমাতি সায়্যেদিল আবরারি সাহ্হিল,
সাহ্হিল বিফাদ্বলিকা ইয়া আজিজ১১ বার।

৯. يَا قَاضِىَ الْحَاجَاتْ   ইয়া ক্বাদ্বিয়াল হাজাত৭ বার
১০. يَا كَفِىَ الْمُهِمَّاتْ   ইয়া কাফিয়াল মুহিম্মাত৭ বার
১১. يَا دَافِعَ الْبَلِيَّاتْ    ইয়া দাফিয়াল বালিয়্যাত৭ বার
১২. يَا مُجِيْبَ الدَّعْوَاتْ  ইয়া মুজিবাদ দাওয়াত৭ বার
১৩. يَا رَافِعَ الدَّرَجَاتْ   ইয়া রাফিয়াদ্ দারাজাত৭ বার
১৪. يَا حَلَّالَ الْمُشْكِلَاتْ  ইয়া হাল্লালাল্ মুশ্কিলাত্৭ বার
১৫. يَا مُسَبِّبَ الْاَسْبَابْ  ইয়া মুসাব্বিবাল আসবাব৭ বার
১৬. يَا شَافِي الْاَمْرَاضْ  ইয়া শাফিয়াল আমরাজ৭ বার
১৭. يَا مُفَتِّحَ الْاَبْوَابْ   ইয়া মুফাত্তিহাল্ আব্ওয়াব৭ বার

১৮. رَبِّ اِنِّىْ مَغْلُوْبٌ فَانْتَصِرْ  রাব্বি ইন্নি মাগ্লুবুন ফানতাছির৭ বার
১৯. يَا غَوْثُ اَغِثْنِىْ وَاَمْدُدْنِىْ  ইয়া গাউছু আগিছ্নী ওয়া আম্দুদ্নী৭ বার
২০. اِنَّالِلّٰهِ وَاِنَّااِلَيْهِ رَاجِعُوْنْ   ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন৭ বার

২১. لَااِلٰهَ اِلَّاۤ اَنْتَ سُبْحَانَكَ اِنِّىْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِيْنْ
লা-ইলাহা ইল্লা আনতা সুব্হানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন১১ বার।‎

২২. فَاسْتَجَبْنَا لَهٗ وَنَجَّيْنٰهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذٰ لِكَ نُنْجِى الْمُؤْمِنِيْنْ
ফাসতাজাবনা লাহু ওয়ানাজ্জাইনাহু মিনাল গাম্মি ওয়া কাজালিকা নুনজিল মুমিনিন১১ বার।‎

২৩. لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللّٰهِ وَلَا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ
লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি, ওয়ালা মালজা'আ মিনাল্লাহি ইল্লা ইলাইহি১১ বার।

২৪. اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ
আল্লাহুম্মা ইন্না নাজ ‘আলুকা ফি নুহুরিহিম, ওয়া নাউজু বিকা মিন শুরুরিহিম১১ বার।

২৫. يَا اَرْ حَمَ الرَّحِمِيْنْ ইয়া আরহামার রহিমিন১১ বার।‎

সর্বশেষ ১০০ বা ১১  বার দরুদ শরিফ পাঠ করে খতম শেষ করে খালেছ দিলে মুনাজাত করলে
আল্লাহ তাআলা সকল দোয়া কবুল করবেন এবং এর ফলাফল প্রত্যক্ষ হতে থাকবে। ইনশাআল্লাহ।
 

হিজরি সনের ইতিহাস

মুসলিম উম্মাহর স্বকীয় পরিচয়ের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মুসলিম উম্মাহর স্বকীয় পরিচয়ের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়
সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বর্ষপঞ্জি শুধু দিন-তারিখ গণনার একটি পদ্ধতি নয়; বরং এটি একটি জাতির পরিচয়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতীক। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি নিজেদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেছে। মুসলিম উম্মাহও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলামের ইতিহাসে হিজরি সনের প্রবর্তন ছিল মুসলিম জাতিসত্তার স্বকীয়তা রক্ষার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই বর্ষপঞ্জি শুধু সময় গণনার মাধ্যম নয়; বরং এটি ইসলামের ত্যাগ, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং বিজয়ের ইতিহাসকে চিরস্মরণীয় করে রাখার এক অনন্য নিদর্শন।

প্রাক্-ইসলামী আরবে সাল গণনার পদ্ধতি

ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবদের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট সন বা বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল না। তারা সাধারণত কোনো বিশেষ ঘটনা বা স্মরণীয় দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছর নির্ধারণ করত। যেমন—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মবছরকে আরবরা ‘আমুল ফিল’ বা ‘হস্তীবাহিনীর বছর’ নামে স্মরণ করত। কোনো বড় যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনাও কখনো কখনো সাল নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফলে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত তারিখ পদ্ধতির অভাব ছিল সুস্পষ্ট।

ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তার এবং প্রশাসনিক সংকট

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের বিজয়ধারা দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। খিলাফতে রাশেদার যুগে আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে ইরাক, শাম, মিসর ও পারস্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। মুসলিম সমাজ তখন আর শুধু গোত্রভিত্তিক সম্প্রদায় নয়; বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

ওমর (রা.)-এর খিলাফতের ষষ্ঠ বছরে ইরাকের গভর্নর ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আবু মুসা আশআরি (রা.)। তিনি লক্ষ্য করলেন, মদিনা থেকে আগত সরকারি নির্দেশনাগুলোতে কোনো সাল বা তারিখ উল্লেখ থাকে না। ফলে কোন নির্দেশ আগে এসেছে, কোনটি পরে এসেছে এবং কোন ফরমান আগে কার্যকর করতে হবে—তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই জটিল পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কাছে একটি চিঠি পাঠান এবং একটি স্থায়ী সমাধানের আবেদন জানান।

ওমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক শুরা সভা

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই সমস্যাকে ওমর (রা.) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। তিনি মদিনায় বিশিষ্ট সাহাবিদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শসভা আহ্বান করেন। সে সভায় উপস্থিত ছিলেন ওসমান ইবনে আফফান (রা.), আলী ইবন আবি তালিব (রা.), তালহা (রা.), জুবায়ের (রা.), আবু হুরায়রা (রা.)-সহ ইসলামের প্রখ্যাত সাহাবিরা।

সভায় বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। কেউ রোমানদের বর্ষপঞ্জি অনুসরণের কথা বলেন, কেউ পারস্যের পঞ্জিকা গ্রহণের পরামর্শ দেন, আবার কেউ ইহুদিদের তারিখ পদ্ধতি অনুসরণের মত দেন। কিন্তু ওমর (রা.) অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব আকীদা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা রয়েছে; তাই তাদের সময় গণনার পদ্ধতিও স্বতন্ত্র হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘মুসলিমদের নিজস্ব একটি বর্ষপঞ্জি থাকবে, যা তাদের স্বকীয় পরিচয় ও ইতিহাসকে ধারণ করবে।’ সাহাবায়ে কেরামও এ সিদ্ধান্তকে সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন করেন।

কোন ঘটনা থেকে শুরু হবে নতুন সন?

নতুন বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর প্রশ্ন দেখা দিল—কোন ঘটনাকে ভিত্তি করে এই সনের সূচনা হবে? এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত উঠে আসে— কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মবছরকে সূচনাবিন্দু করার প্রস্তাব দেন। কেউ নবুওয়াত লাভের বছরকে ভিত্তি করার কথা বলেন। আবার কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের বছরকে শুরুর বছর হিসেবে গ্রহণের পরামর্শ দেন। কিন্তু আলী (রা.) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী মতামত পেশ করেন। তিনি বলেন, ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হলো হিজরত। কারণ, মক্কায় নির্যাতিত মুসলমানদের একটি ক্ষুদ্র দল মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল।

তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় কিছু চুক্তিপত্রে ‘হিজরতের পঞ্চম বছর’ জাতীয় তারিখ ব্যবহৃত হয়েছিল। তাই হিজরতকেই সনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত। সাহাবায়ে কেরাম এ মতামতকে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেন। এভাবেই ‘হিজরি সন’-এর সূচনা হয়।

কেন হিজরতকেই ভিত্তি করা হলো?

হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর ছিল না; বরং সত্য ও মিথ্যার সংঘাতের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। হিজরতের মাধ্যমে— মুসলমানরা স্বাধীনভাবে দ্বিন পালন করার সুযোগ লাভ করে। ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম উম্মাহ একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ইসলামের বিশ্বব্যাপী প্রসারের পথ উন্মুক্ত হয়। এ কারণেই মুসলিম জাতির ইতিহাসে হিজরতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বছরের প্রথম মাস হিসেবে মহররম নির্বাচন

হিজরতকে সনের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করার পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—বছরের প্রথম মাস কোনটি হবে? কিছু সাহাবি রবিউল আউয়াল মাসকে প্রথম মাস করার মত দেন, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসেই মদিনায় পৌঁছেছিলেন। অন্যদিকে কেউ কেউ রমজান মাসকে প্রথম মাস করার প্রস্তাব দেন, কারণ এটি কোরআন নাজিলের মাস এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তখন ওসমান (রা.) একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মতামত পেশ করেন। তিনি বলেন, যদিও রাসুলুল্লাহ (সা.) রবিউল আউয়ালে মদিনায় পৌঁছেছিলেন, কিন্তু হিজরতের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনার সূচনা হয়েছিল মহররম মাসে। উপরন্তু, আরবদের প্রাচীন প্রথাতেও মহররম ছিল বছরের প্রথম মাস।

আলী (রা.)-সহ অন্যান্য সাহাবিগণ এ মতকে সমর্থন করেন। অবশেষে ওমর (রা.) ঘোষণা করেন, ‘হিজরত হবে আমাদের সনের ভিত্তি এবং মহররম হবে এর প্রথম মাস।’ এভাবেই মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব বর্ষপঞ্জি ‘হিজরি সন’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

হিজরি সনের তাৎপর্য

হিজরি সন শুধু একটি ক্যালেন্ডার নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের জীবন্ত স্মারক। প্রতিবছর মহররম মাসের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানরা স্মরণ করে সেই ঐতিহাসিক হিজরতের ঘটনা, যার মাধ্যমে ইসলামের বিজয়ের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছিল। আজও ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত—যেমন রমজান, হজ, জাকাতের হিসাব, আশুরা, আরাফাহ দিবস ইত্যাদি—হিজরি বর্ষপঞ্জির ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়।

হিজরি সনের প্রবর্তন ছিল ওমর (রা.)-এর দূরদর্শী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি মুসলিম উম্মাহকে শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই দেয়নি; বরং তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়, ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে সংরক্ষণ করার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আজ যখন মুসলমানরা নতুন হিজরি বছরকে স্বাগত জানায়, তখন তাদের স্মরণ করা উচিত যে এই সনের সূচনা কোনো রাজা-বাদশাহর জন্ম, কোনো যুদ্ধের বিজয় কিংবা কোনো সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিয়ে হয়নি; বরং তা শুরু হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ, ঈমান, ধৈর্য এবং সংগ্রামের এক মহান ইতিহাস—হিজরত—দিয়ে। আর এ কারণেই হিজরি সন মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয় ও গৌরবের এক চিরন্তন প্রতীক।

তথ্যসূত্র : সহিহ বুখারি, ফাতহুল বারি (৭/২৬৮), আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইসমাইল রেহান প্রণীত তারিখে মুসলিম উম্মাহ।

শিশুদের ইবাদতমুখী করে গড়ে তোলার উপায় | কালের কণ্ঠ