মানবসভ্যতার ইতিহাসে বর্ষপঞ্জি শুধু দিন-তারিখ গণনার একটি পদ্ধতি নয়; বরং এটি একটি জাতির পরিচয়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতীক। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি নিজেদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেছে। মুসলিম উম্মাহও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলামের ইতিহাসে হিজরি সনের প্রবর্তন ছিল মুসলিম জাতিসত্তার স্বকীয়তা রক্ষার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই বর্ষপঞ্জি শুধু সময় গণনার মাধ্যম নয়; বরং এটি ইসলামের ত্যাগ, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং বিজয়ের ইতিহাসকে চিরস্মরণীয় করে রাখার এক অনন্য নিদর্শন।
প্রাক্-ইসলামী আরবে সাল গণনার পদ্ধতি
ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবদের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট সন বা বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল না। তারা সাধারণত কোনো বিশেষ ঘটনা বা স্মরণীয় দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছর নির্ধারণ করত। যেমন—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মবছরকে আরবরা ‘আমুল ফিল’ বা ‘হস্তীবাহিনীর বছর’ নামে স্মরণ করত। কোনো বড় যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনাও কখনো কখনো সাল নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফলে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত তারিখ পদ্ধতির অভাব ছিল সুস্পষ্ট।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তার এবং প্রশাসনিক সংকট
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের বিজয়ধারা দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। খিলাফতে রাশেদার যুগে আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে ইরাক, শাম, মিসর ও পারস্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। মুসলিম সমাজ তখন আর শুধু গোত্রভিত্তিক সম্প্রদায় নয়; বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
ওমর (রা.)-এর খিলাফতের ষষ্ঠ বছরে ইরাকের গভর্নর ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আবু মুসা আশআরি (রা.)। তিনি লক্ষ্য করলেন, মদিনা থেকে আগত সরকারি নির্দেশনাগুলোতে কোনো সাল বা তারিখ উল্লেখ থাকে না। ফলে কোন নির্দেশ আগে এসেছে, কোনটি পরে এসেছে এবং কোন ফরমান আগে কার্যকর করতে হবে—তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই জটিল পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কাছে একটি চিঠি পাঠান এবং একটি স্থায়ী সমাধানের আবেদন জানান।
ওমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক শুরা সভা
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই সমস্যাকে ওমর (রা.) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। তিনি মদিনায় বিশিষ্ট সাহাবিদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শসভা আহ্বান করেন। সে সভায় উপস্থিত ছিলেন ওসমান ইবনে আফফান (রা.), আলী ইবন আবি তালিব (রা.), তালহা (রা.), জুবায়ের (রা.), আবু হুরায়রা (রা.)-সহ ইসলামের প্রখ্যাত সাহাবিরা।
সভায় বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। কেউ রোমানদের বর্ষপঞ্জি অনুসরণের কথা বলেন, কেউ পারস্যের পঞ্জিকা গ্রহণের পরামর্শ দেন, আবার কেউ ইহুদিদের তারিখ পদ্ধতি অনুসরণের মত দেন। কিন্তু ওমর (রা.) অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব আকীদা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা রয়েছে; তাই তাদের সময় গণনার পদ্ধতিও স্বতন্ত্র হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘মুসলিমদের নিজস্ব একটি বর্ষপঞ্জি থাকবে, যা তাদের স্বকীয় পরিচয় ও ইতিহাসকে ধারণ করবে।’ সাহাবায়ে কেরামও এ সিদ্ধান্তকে সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন করেন।
কোন ঘটনা থেকে শুরু হবে নতুন সন?
নতুন বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর প্রশ্ন দেখা দিল—কোন ঘটনাকে ভিত্তি করে এই সনের সূচনা হবে? এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত উঠে আসে— কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মবছরকে সূচনাবিন্দু করার প্রস্তাব দেন। কেউ নবুওয়াত লাভের বছরকে ভিত্তি করার কথা বলেন। আবার কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের বছরকে শুরুর বছর হিসেবে গ্রহণের পরামর্শ দেন। কিন্তু আলী (রা.) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী মতামত পেশ করেন। তিনি বলেন, ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হলো হিজরত। কারণ, মক্কায় নির্যাতিত মুসলমানদের একটি ক্ষুদ্র দল মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল।
তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় কিছু চুক্তিপত্রে ‘হিজরতের পঞ্চম বছর’ জাতীয় তারিখ ব্যবহৃত হয়েছিল। তাই হিজরতকেই সনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত। সাহাবায়ে কেরাম এ মতামতকে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেন। এভাবেই ‘হিজরি সন’-এর সূচনা হয়।
কেন হিজরতকেই ভিত্তি করা হলো?
হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর ছিল না; বরং সত্য ও মিথ্যার সংঘাতের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। হিজরতের মাধ্যমে— মুসলমানরা স্বাধীনভাবে দ্বিন পালন করার সুযোগ লাভ করে। ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম উম্মাহ একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ইসলামের বিশ্বব্যাপী প্রসারের পথ উন্মুক্ত হয়। এ কারণেই মুসলিম জাতির ইতিহাসে হিজরতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বছরের প্রথম মাস হিসেবে মহররম নির্বাচন
হিজরতকে সনের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করার পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—বছরের প্রথম মাস কোনটি হবে? কিছু সাহাবি রবিউল আউয়াল মাসকে প্রথম মাস করার মত দেন, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসেই মদিনায় পৌঁছেছিলেন। অন্যদিকে কেউ কেউ রমজান মাসকে প্রথম মাস করার প্রস্তাব দেন, কারণ এটি কোরআন নাজিলের মাস এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তখন ওসমান (রা.) একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মতামত পেশ করেন। তিনি বলেন, যদিও রাসুলুল্লাহ (সা.) রবিউল আউয়ালে মদিনায় পৌঁছেছিলেন, কিন্তু হিজরতের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনার সূচনা হয়েছিল মহররম মাসে। উপরন্তু, আরবদের প্রাচীন প্রথাতেও মহররম ছিল বছরের প্রথম মাস।
আলী (রা.)-সহ অন্যান্য সাহাবিগণ এ মতকে সমর্থন করেন। অবশেষে ওমর (রা.) ঘোষণা করেন, ‘হিজরত হবে আমাদের সনের ভিত্তি এবং মহররম হবে এর প্রথম মাস।’ এভাবেই মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব বর্ষপঞ্জি ‘হিজরি সন’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
হিজরি সনের তাৎপর্য
হিজরি সন শুধু একটি ক্যালেন্ডার নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের জীবন্ত স্মারক। প্রতিবছর মহররম মাসের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানরা স্মরণ করে সেই ঐতিহাসিক হিজরতের ঘটনা, যার মাধ্যমে ইসলামের বিজয়ের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছিল। আজও ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত—যেমন রমজান, হজ, জাকাতের হিসাব, আশুরা, আরাফাহ দিবস ইত্যাদি—হিজরি বর্ষপঞ্জির ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়।
হিজরি সনের প্রবর্তন ছিল ওমর (রা.)-এর দূরদর্শী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি মুসলিম উম্মাহকে শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই দেয়নি; বরং তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়, ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে সংরক্ষণ করার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আজ যখন মুসলমানরা নতুন হিজরি বছরকে স্বাগত জানায়, তখন তাদের স্মরণ করা উচিত যে এই সনের সূচনা কোনো রাজা-বাদশাহর জন্ম, কোনো যুদ্ধের বিজয় কিংবা কোনো সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিয়ে হয়নি; বরং তা শুরু হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ, ঈমান, ধৈর্য এবং সংগ্রামের এক মহান ইতিহাস—হিজরত—দিয়ে। আর এ কারণেই হিজরি সন মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয় ও গৌরবের এক চিরন্তন প্রতীক।
তথ্যসূত্র : সহিহ বুখারি, ফাতহুল বারি (৭/২৬৮), আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইসমাইল রেহান প্রণীত তারিখে মুসলিম উম্মাহ।