মানুষ স্বভাবগতভাবেই সৌন্দর্যপ্রিয়। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি জীবনযাপন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। ইসলামও মানুষের এই স্বাভাবিক চাহিদাকে অস্বীকার করেনি; বরং সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও শোভনতার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। তবে ইসলামে সৌন্দর্যচর্চার ক্ষেত্রেও কিছু নীতিমালা রয়েছে, যাতে মানুষ সৌন্দর্যের নামে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম না করে। আধুনিক যুগে দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে এবং দাঁতের স্বাভাবিক গঠন ঠিক রাখতে ব্রেস বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দাঁত সোজা করা কি শরিয়তসম্মত?
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : তিন, আয়াত : ৪)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে আদমসন্তান! তোমরা প্রত্যেক ইবাদতের সময় তোমাদের সৌন্দর্য ও শোভা গ্রহণ করো।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
এসব আয়াত থেকে বোঝা যায় যে ইসলাম মানুষের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তবে এই সৌন্দর্যচর্চা হতে হবে বৈধ ও শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)
এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে বৈধ উপায়ে সৌন্দর্য অর্জন ও পরিচ্ছন্ন থাকা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় কাজ। তবে একই সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কিছু কৃত্রিম সৌন্দর্যচর্চার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, যা আল্লাহর সৃষ্টিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে পরিবর্তন করার শামিল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ওইসব নারীর ওপর লানত করেছেন যারা সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দাঁতের মাঝে কৃত্রিম ফাঁক সৃষ্টি করে এবং এভাবে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৩১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১২৫)
কিন্তু এই হাদিসের অর্থ বুঝতে হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করতে হবে। হাদিসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে স্বাভাবিক দাঁতকে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করে নতুন ধরনের সৌন্দর্য সৃষ্টি করাকে। এখানে চিকিৎসা, রোগ নিরাময় বা জন্মগত ত্রুটি সংশোধনের কথা বলা হয়নি। তাই ইসলামী আইনবিদগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো শারীরিক ত্রুটি দূর করা, বিকৃতি সংশোধন করা কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ নয়।
প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) লিখেছেন, ‘যেসব চিকিৎসা বা ওষুধ মুখমণ্ডলের দাগ দূর করে এবং চেহারাকে সুন্দর করে, সেগুলোতে কোনো বাধা নেই।’ (উমদাতুল কারি, ১৪/১৭৯)
একইভাবে ইমাম নববি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, যদি কোনো পরিবর্তন চিকিৎসা বা ত্রুটি দূর করার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ নয়; বরং বৈধ।
এসব মূলনীতির আলোকে দাঁত অত্যধিক বাঁকা হলে, উঁচু-নিচু হলে, চোয়ালের গঠনগত সমস্যার কারণে দাঁত বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলে, খাওয়া-দাওয়া বা কথা বলায় অসুবিধা সৃষ্টি হলে কিংবা মুখমণ্ডলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে ব্রেস বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে দাঁত সোজা করা সম্পূর্ণ জায়েজ। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং বিদ্যমান ত্রুটি সংশোধন এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা।
অতএব বলা যায়, কোনো দাঁত যদি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং তা সংশোধনের জন্য ব্রেস বা আধুনিক দন্তচিকিৎসার আশ্রয় নেওয়া হয়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে এতে কোনো বাধা নেই। বরং এটি চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত একটি বৈধ ব্যবস্থা। কারণ ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য সমর্থন করে এবং মানুষের কষ্ট ও ত্রুটি দূর করার পথকে সহজ করে দেয়। এটাই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবমুখী সৌন্দর্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ।




