• ই-পেপার

নবীজীবন

আইয়ুব (আ.)-এর ধৈর্যের পরীক্ষা

মৃত্যু এমন নির্মম যাত্রা : আমলই যার একমাত্র সঙ্গী

মুফতি ওমর বিন নাছির
মৃত্যু এমন নির্মম যাত্রা : আমলই যার একমাত্র সঙ্গী
সংগৃহীত ছবি

মানুষ এই পৃথিবীতে নানা সম্পর্ক, স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পদের মোহে জীবন অতিবাহিত করে। কেউ পরিবার-পরিজনের সুখের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে, কেউ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে, আবার কেউ সম্মান ও মর্যাদার পেছনে ছুটে চলে। কিন্তু জীবনের এক চরম ও অবশ্যম্ভাবী সত্য হলো—মৃত্যু। যে মৃত্যুর হাত থেকে কোনো মানুষ, রাজা-বাদশাহ, ধনী-গরিব কিংবা শক্তিশালী ব্যক্তি রক্ষা পাবে না।

মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের সব দুনিয়াবি সম্পর্ক ও অর্জনের প্রকৃত মূল্য প্রকাশ পায়। তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই পৃথিবীতে যার জন্য মানুষ এত ব্যস্ত ছিল, তার অধিকাংশই মৃত্যুর পরে আর কোনো কাজে আসে না। এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরেছেন মহানবী (সা.)। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বস্তু মৃত ব্যক্তির পিছু পিছু (কবর পর্যন্ত) যায়—তার পরিবার-পরিজন, তার ধন-সম্পত্তি এবং তার কৃতকর্ম। তারপর দুইটি বস্তু ফিরে আসে—তার পরিবার-পরিজন এবং তার ধন-সম্পত্তি; আর একটি বস্তু তার সঙ্গেই থেকে যায়, আর তা হলো তার কৃতকর্ম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫১৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৬০)

ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের নির্মম বাস্তবতা
পরিবার মানুষের জীবনের সবচেয়ে আপন আশ্রয়। পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য মানুষ কত ত্যাগই না করে! কিন্তু মৃত্যুর পর এই প্রিয়জনদের ভালোবাসারও একটি সীমা আছে। তারা মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাবে, জানাজা পড়বে এবং কবর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। কিন্তু কবরের মাটিতে শুইয়ে দেওয়ার পর সবাই ফিরে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা : ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে তখন কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সন্তান পাশে থাকবে না। মানুষ একাই তার রবের মুখোমুখি হবে।

ধন-সম্পদের অসারতা
পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ সম্পদ অর্জনের জন্য জীবন ব্যয় করে। কখনো বৈধভাবে, কখনো অবৈধভাবে সম্পদ সঞ্চয় করে। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সম্পদের কোনো অংশই তার সঙ্গে যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের আমার নিকটবর্তী করতে পারবে না; বরং যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তারাই সফল হবে।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩৭)

কাফনের কাপড়ে কোনো পকেট থাকে না। মানুষ তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ, জমি, বাড়ি, ব্যবসা কিংবা ব্যাংক-ব্যালান্সের কিছুই সঙ্গে নিতে পারে না। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এগুলো উত্তরাধিকারীদের হাতে চলে যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ বলে, আমার সম্পদ, আমার সম্পদ। অথচ তার সম্পদ বলতে সে যা খেয়েছে ও শেষ করেছে, যা পরেছে ও পুরোনো করেছে, অথবা যা দান করেছে এবং তা নিজের জন্য সংরক্ষণ করেছে—এগুলোই তার প্রকৃত সম্পদ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৫৮)

একমাত্র চিরস্থায়ী সঙ্গী—আমল
কবরের অন্ধকারে, হাশরের ময়দানে এবং আল্লাহর আদালতে মানুষের একমাত্র সঙ্গী হবে তার আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তা-ও দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)

যদি মানুষের আমল হয় নামাজ, রোজা, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, মানুষের উপকার, সততা ও তাকওয়া—তবে সেই আমল কবরকে আলোকিত করবে এবং আখিরাতে মুক্তির কারণ হবে। অন্যদিকে জুলুম, মিথ্যা, সুদ, ঘুষ, হারাম উপার্জন, গিবত, অপবাদ ও অন্যায় কাজ যদি জীবনের সঙ্গী হয়, তবে সেই আমলই কবর ও আখিরাতের শাস্তির কারণ হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি সে-ই, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৯)

কোরআনের আলোকে পরকালের প্রস্তুতি
মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আখিরাতের সফলতা। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন চিন্তা করে, সে আগামী দিনের জন্য কী প্রেরণ করেছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজকের প্রতিটি কাজই আগামী জীবনের জন্য পুঁজি।

মৃত্যু এমন এক সত্য, যা প্রতিটি মানুষের দুয়ারে একদিন কড়া নাড়বে। সেই দিন আমাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব কিংবা ধন-সম্পদ কেউই আমাদের সঙ্গে থাকবে না। কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে একমাত্র সঙ্গী হবে আমাদের আমল। তাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ হলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে ডুবে না গিয়ে এমন আমল করা, যা মৃত্যুর পরও তার জন্য নূর, শান্তি এবং জান্নাতের পথপ্রদর্শক হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নেক আমলের মাধ্যমে কবর ও আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন। 

গ্রাফিক ডিজাইনকে পেশা বানিয়ে উপার্জনের বিধান

মুফতি ওমর বিন নাছির
গ্রাফিক ডিজাইনকে পেশা বানিয়ে উপার্জনের বিধান
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। ডিজিটাল মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ব্যবসা এবং বিজ্ঞাপনের প্রসারের ফলে গ্রাফিকস ডিজাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় পেশায় পরিণত হয়েছে। অসংখ্য তরুণ-তরুণী এ পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। লোগো, ব্যানার, পোস্টার, বইয়ের প্রচ্ছদ, বিজ্ঞাপনচিত্র, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে গ্রাফিকস ডিজাইনের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

তবে একজন সচেতন মুসলমানের জন্য শুধু আয়ের উৎস হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সেই আয় হালাল কি না, কাজটি শরিয়তসম্মত কি না এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুকূল কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রাণীর ছবি, মানুষের ছবি কিংবা নারীদের ছবি ব্যবহার করে ডিজাইন তৈরি ও বিক্রির বিধান সম্পর্কে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে। তাই এর বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে আহার কর।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭২)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।’(সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)
এ দুটি আয়াত থেকে বোঝা যায়, মুসলমানের উপার্জন যেমন হালাল হতে হবে, তেমনি তার কাজও গুনাহ ও হারামের সহযোগী হওয়া যাবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি নির্মাতারা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১০৯)
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যে ঘরে ছবি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪০৪)

এসব হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ ফকিহ ও মুহাদ্দিস প্রাণীর চিত্র অঙ্কনের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। একদল আলেমের মতে, ডিজিটাল ছবি কাগজে আঁকা স্থায়ী চিত্রের মতো নয়; বরং এটি আলো ও পিক্সেলের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিচ্ছবি। তাই প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডিজিটাল ছবি ব্যবহারের অবকাশ রয়েছে।
অন্যদিকে আরেকদল আলেম মনে করেন, ডিজিটাল হোক বা অঙ্কিত হোক—সজীব প্রাণীর ছবি তৈরির মধ্যে চিত্র নির্মাণের অর্থ বিদ্যমান থাকে। তাই তারা এ ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের পক্ষে মত দেন। তাই ফটোগ্রাফিকে নিরঙ্কুশ বৈধ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়; বরং প্রয়োজনের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। (তাফসিরে আয়াতিল আহকাম, ২/৩০০)

গ্রাফিকস ডিজাইন পেশার বিধান
গ্রাফিকস ডিজাইন একটি মাধ্যম। এর বিধান নির্ভর করবে এর বিষয়বস্তু ও ব্যবহারের ওপর।

যেসব ডিজাইন বৈধ
১. ইসলামী পোস্টার ও দাওয়াহমূলক ডিজাইন
২. ক্যালিগ্রাফি ও আরবি নকশা
৩. প্রকৃতি, পাহাড়, নদী, ফুল ইত্যাদির ডিজাইন
৪. ব্যাবসায়িক লোগো ও ব্যানার
৫. বইয়ের প্রচ্ছদ ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট
৬. অনুমোদিত ডিজিটাল আইকন ও গ্রাফিক উপাদান
এসব ক্ষেত্রে গ্রাফিকস ডিজাইন করা এবং এর মাধ্যমে উপার্জন করা বৈধ বলে গণ্য হবে।

যেসব ডিজাইন থেকে বিরত থাকা আবশ্যক

১. নারীদের ছবি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি
২. অশ্লীল বা অনৈতিক কনটেন্ট ডিজাইন
৩. হারাম পণ্য বা কার্যক্রমের প্রচারণা
৪. ধর্মবিরোধী বা শিরকপূর্ণ প্রতীক প্রচার
৫. গুনাহের কাজে সহায়ক ডিজাইন

এসব কাজ গুনাহের সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই এসব ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ণ। তাই তাকওয়ার দাবি হলো অপ্রয়োজনীয় প্রাণীর ছবিনির্ভর ডিজাইন থেকে দূরে থাকা এবং বিকল্প ক্ষেত্র বেছে নেওয়া। বিশেষত ইসলামী ক্যালিগ্রাফি, টাইপোগ্রাফি, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, ইনফোগ্রাফিক, শিক্ষামূলক কনটেন্ট ও ব্যাবসায়িক ডিজাইনের ক্ষেত্রগুলো একজন মুসলিম ডিজাইনারের জন্য অধিক নিরাপদ ও প্রশংসনীয়। (ফাতাওয়ায়ে শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক আকিফি, ১/৩০৫)

একজন মুসলিম গ্রাফিকস ডিজাইনারের করণীয়
১. কাজের বিষয়বস্তু শরিয়তসম্মত কি না তা যাচাই করা।
২. অশ্লীলতা ও হারাম বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
৩. নারীদের ছবিনির্ভর ডিজাইন এড়িয়ে চলা।
৪. ইসলামী ও কল্যাণকর কনটেন্ট তৈরিতে দক্ষতা ব্যবহার করা।
৫. সন্দেহপূর্ণ আয়ের ক্ষেত্র থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা।
৬. আল্লাহভীতি ও তাকওয়াকে পেশাগত জীবনের মূলনীতি বানানো।

গ্রাফিকস ডিজাইন বর্তমান যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় পেশা। মূলত এটি একটি মাধ্যম, যার বিধান নির্ভর করে এর ব্যবহার ও বিষয়বস্তুর ওপর। শরিয়তসম্মত বিষয় নিয়ে ডিজাইন করা এবং তার মাধ্যমে উপার্জন করা বৈধ। তবে প্রাণীর ছবি ও ডিজিটাল চিত্রের ব্যাপারে সমকালীন আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ জন্য যে বিষয়গুলো নিয়ে মতভেদ ও সন্দেহ রয়েছে, সেগুলো থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা একজন মুমিনের তাকওয়ার পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বিন ও সম্মানকে নিরাপদ রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫২)

অতএব, একজন মুসলিম ডিজাইনারের উচিত এমন ক্ষেত্র বেছে নেওয়া, যেখানে তার দক্ষতা মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হবে, উপার্জন হবে হালাল এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিও অর্জিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক অর্জন, সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা এবং তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

হাদিসের বাণী

আখিরাতে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট যেভাবে ভুলিয়ে দেয়া হবে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আখিরাতে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট যেভাবে ভুলিয়ে দেয়া হবে
সংগৃহীত ছবি

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন জাহান্নামিদের থেকে একজনকে উপস্থিত করা হবে, যে দুনিয়াতে সবচেয়ে সুখী ছিল। তখন তাকে জাহান্নামের মধ্যে ঢুকানো হবে, এরপর বলা হবে, হে বনি আদম, তুমি কি কখনো কল্যাণকর জিনিস দেখেছ? তোমার কাছে কখনো কি সুখের আসবাবপত্র এসেছে? সে বলবে, হে আমার রব, ওয়াল্লাহি! না। আর জান্নাতিদের থেকে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, যে জগতে সবচেয়ে দুঃখী ছিল। তাকে জান্নাতে একবার প্রবেশ করানোর পর বলা হবে, হে বনি আদম, তুমি কি দুনিয়াতে কখনো দুঃখ পেয়েছ? তোমার ওপর কি কোনো বিপদাপদ এসেছিল? সে বলবে, না, ওয়াল্লাহি! আমি দুনিয়াতে কোনো দুঃখ ও মুসিবতে পড়িনি এবং কোনো দুঃখ দেখিনি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭০৮৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৩১১২)

শিক্ষা ও বিধান

১. দুনিয়ার সুখ-দুঃখ ক্ষণস্থায়ী। মানুষ দুনিয়াতে যত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই ভোগ করুক, যদি তার শেষ পরিণতি জাহান্নাম হয়, তবে জাহান্নামের সামান্য শাস্তিও তার সমস্ত সুখকে ভুলিয়ে দেবে। অন্যদিকে, একজন মুমিন দুনিয়াতে যত কষ্টই ভোগ করুক, যদি তার গন্তব্য জান্নাত হয়, তবে জান্নাতের সামান্য নেয়ামতই তার সব দুঃখ-কষ্ট মুছে দেবে।

২. আখিরাতই প্রকৃত জীবন। তাই আসল সফলতা বা ব্যর্থতা দুনিয়ার অবস্থার ওপর নির্ভর করে না; বরং আখিরাতের পরিণতির ওপর নির্ভর করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আখিরাতের জীবনই হলো প্রকৃত জীবন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৪)

৩. আজ যারা দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, অপমান, নির্যাতন বা নানা বিপদে আক্রান্ত, তাদের জন্য এই হাদিস বিশাল সান্ত্বনার উৎস। কেননা একজন মুমিন যদি ঈমান ও তাকওয়ার ওপর অবিচল থাকে, তবে জান্নাতের এক মুহূর্তের সুখই তার জীবনের সব কষ্টকে তুচ্ছ করে দেবে।

৪. দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে প্রতারিত হওয়া উচিত নয়। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু মানুষ দুনিয়াতে অত্যন্ত সুখী, ধনী ও ক্ষমতাবান। কিন্তু বাহ্যিক সফলতা আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। যদি তারা ঈমান ও নেক আমল ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তবে তাদের দুনিয়ার সমস্ত সুখ কোনো উপকারে আসবে না।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, দুনিয়া চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং এটি আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। দুনিয়ার সুখ দেখে অহংকার করা এবং দুঃখ দেখে হতাশ হওয়া কোনোটিই মুমিনের কাজ নয়। কারণ জান্নাতের এক মুহূর্তের নেয়ামত পৃথিবীর সব কষ্টকে মুছে দেয়, আর জাহান্নামের এক মুহূর্তের শাস্তি পৃথিবীর সব সুখকে বিস্মৃত করে দেয়। তাই একজন বুদ্ধিমান মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাত লাভের জন্য আমল করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতমুখী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জুমার দিন যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিন যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মুসলমানদের জন্য জুমার দিন হচ্ছে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। হাদিসে জুমার দিনে করণীয় বেশকিছু আমলের কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ আমল হলো আল্লাহ তাআলার কাছে একাগ্রচিত্তে দোয়া করা। কারণ এটি দোয়া কবুলের দিন। এই দিনের দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসুল (সা.) হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন’। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪০০) 

তবে কোনো হাদিসে এসেছে, ‘সেই সময়টি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কর।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮) 
বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, জুমার দিন আসরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়। (জাদুল মাআদ, ২/৩৯৪)

তাই জুমার দিন বিশেষ করে আসর নামাজের পর দোয়া করা উচিত। যেকোনো দোয়াই করা যায়। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া তুলে ধরা হলো।

১. দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণ লাভের দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনইয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াকিনা আজাবান্নার।’ 
অর্থ : ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০১‍)


২. উত্তম জীবন যাপনের দোয়া

اَللَّهُمَّ اِنِّى أَسْألُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى 

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুক্বা ওয়াল আফাফা ওয়াল গেনা।’ 
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হেদায়াত কামনা করি এবং আপনার ভয় তথা তাকওয়া কামনা করি এবং আপনার কাছে নৈতিক পবিত্রতা কামনা করি এবং সম্পদ তথা সামর্থ্য ও সচ্ছলতা কামনা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২১, তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৮৯) 

৩. মা-বাবাসহ সকল মুমিনের জন্য দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ 

উচ্চারণ : ‘রব্বানাগ-ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।’ 

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে আপনি সেই দিন ক্ষমা করে দিবেন; যেই দিন হিসাব কায়েম করা হবে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উল্লেখিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার তাওফিক দান করুন। বিশেষ করে দোয়া কবুলের সময়গুলোতে বেশি বেশি পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।