বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। ডিজিটাল মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ব্যবসা এবং বিজ্ঞাপনের প্রসারের ফলে গ্রাফিক্স ডিজাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় পেশায় পরিণত হয়েছে। অসংখ্য তরুণ-তরুণী এ পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। লোগো, ব্যানার, পোস্টার, বইয়ের প্রচ্ছদ, বিজ্ঞাপনচিত্র, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে গ্রাফিক্স ডিজাইনের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
তবে একজন সচেতন মুসলমানের জন্য শুধু আয়ের উৎস হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সেই আয় হালাল কি না, কাজটি শরিয়তসম্মত কি না এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুকূল কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রাণীর ছবি, মানুষের ছবি কিংবা নারীদের ছবি ব্যবহার করে ডিজাইন তৈরি ও বিক্রির বিধান সম্পর্কে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে। তাই এর বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে আহার করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭২)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’(সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)
এ দুটি আয়াত থেকে বোঝা যায়, মুসলমানের উপার্জন যেমন হালাল হতে হবে, তেমনি তার কাজও গুনাহ ও হারামের সহযোগী হওয়া যাবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি নির্মাতারা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১০৯)
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যে ঘরে ছবি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪০৪)
এসব হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ ফকিহ ও মুহাদ্দিস প্রাণীর চিত্র অঙ্কনের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। একদল আলেমের মতে, ডিজিটাল ছবি কাগজে আঁকা স্থায়ী চিত্রের মতো নয়; বরং এটি আলো ও পিক্সেলের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিচ্ছবি। তাই প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডিজিটাল ছবি ব্যবহারের অবকাশ রয়েছে।
অন্যদিকে আরেকদল আলেম মনে করেন, ডিজিটাল হোক বা অঙ্কিত হোক—সজীব প্রাণীর ছবি তৈরির মধ্যে চিত্র নির্মাণের অর্থ বিদ্যমান থাকে। তাই তারা এ ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের পক্ষে মত দেন। তাই ফটোগ্রাফিকে নিরঙ্কুশ বৈধ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়; বরং প্রয়োজনের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। (তাফসিরে আয়াতিল আহকাম, ২/৩০০)
গ্রাফিক্স ডিজাইন পেশার বিধান
গ্রাফিক্স ডিজাইন একটি মাধ্যম। এর বিধান নির্ভর করবে এর বিষয়বস্তু ও ব্যবহারের ওপর।
যেসব ডিজাইন বৈধ
১. ইসলামী পোস্টার ও দাওয়াহমূলক ডিজাইন
২. ক্যালিগ্রাফি ও আরবি নকশা
৩. প্রকৃতি, পাহাড়, নদী, ফুল ইত্যাদির ডিজাইন
৪. ব্যবসায়িক লোগো ও ব্যানার
৫. বইয়ের প্রচ্ছদ ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট
৬. অনুমোদিত ডিজিটাল আইকন ও গ্রাফিক উপাদান
এসব ক্ষেত্রে গ্রাফিক্স ডিজাইন করা এবং এর মাধ্যমে উপার্জন করা বৈধ বলে গণ্য হবে।
যেসব ডিজাইন থেকে বিরত থাকা আবশ্যক
১. নারীদের ছবি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি
২. অশ্লীল বা অনৈতিক কনটেন্ট ডিজাইন
৩. হারাম পণ্য বা কার্যক্রমের প্রচারণা
৪. ধর্মবিরোধী বা শিরকপূর্ণ প্রতীক প্রচার
৫. গুনাহের কাজে সহায়ক ডিজাইন
এসব কাজ গুনাহের সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই এসব ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ণ। তাই তাকওয়ার দাবি হলো অপ্রয়োজনীয় প্রাণীর ছবি নির্ভর ডিজাইন থেকে দূরে থাকা এবং বিকল্প ক্ষেত্র বেছে নেওয়া। বিশেষত ইসলামী ক্যালিগ্রাফি, টাইপোগ্রাফি, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, ইনফোগ্রাফিক, শিক্ষামূলক কনটেন্ট ও ব্যবসায়িক ডিজাইনের ক্ষেত্রগুলো একজন মুসলিম ডিজাইনারের জন্য অধিক নিরাপদ ও প্রশংসনীয়। (ফাতাওয়ায়ে শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক আকিফি, ১/৩০৫)
একজন মুসলিম গ্রাফিক্স ডিজাইনারের করণীয়
১. কাজের বিষয়বস্তু শরিয়তসম্মত কি না তা যাচাই করা।
২. অশ্লীলতা ও হারাম বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
৩. নারীদের ছবি নির্ভর ডিজাইন এড়িয়ে চলা।
৪. ইসলামী ও কল্যাণকর কনটেন্ট তৈরিতে দক্ষতা ব্যবহার করা।
৫. সন্দেহপূর্ণ আয়ের ক্ষেত্র থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা।
৬. আল্লাহভীতি ও তাকওয়াকে পেশাগত জীবনের মূলনীতি বানানো।
গ্রাফিক্স ডিজাইন বর্তমান যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় পেশা। মূলত এটি একটি মাধ্যম, যার বিধান নির্ভর করে এর ব্যবহার ও বিষয়বস্তুর ওপর। শরিয়তসম্মত বিষয় নিয়ে ডিজাইন করা এবং তার মাধ্যমে উপার্জন করা বৈধ। তবে প্রাণীর ছবি ও ডিজিটাল চিত্রের ব্যাপারে সমকালীন আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এজন্য যে বিষয়গুলো নিয়ে মতভেদ ও সন্দেহ রয়েছে, সেগুলো থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা একজন মুমিনের তাকওয়ার পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মানকে নিরাপদ রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫২)
অতএব একজন মুসলিম ডিজাইনারের উচিত এমন ক্ষেত্র বেছে নেওয়া, যেখানে তার দক্ষতা মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হবে, উপার্জন হবে হালাল এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিও অর্জিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক অর্জন, সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা এবং তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।




