পৃথিবী মহান আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি। তিনি যখন ইচ্ছা করেন, তখন তাঁর অসীম ক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেন। ভূমিকম্প মানুষের জন্য শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং এটি আল্লাহর শক্তি, ক্ষমতা ও মহিমার এক জাগ্রত স্মারক। আধুনিক বিজ্ঞান ভূমিকম্পের ভৌত কারণ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হলেও, একজন মুমিন জানেন—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তাই ঘনঘন ভূমিকম্পের মতো ঘটনা মানুষকে নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করতে, গুনাহ থেকে ফিরে আসতে এবং পরকালের কথা স্মরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বারবার ভূমিকম্প আঘাত হানছে। অসংখ্য প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মানুষের অসহায় আর্তনাদ আকাশ-বাতাশ ভারি হয়ে উঠছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি নিদর্শনসমূহ পাঠাই শুধু মানুষকে সতর্ক করার জন্য।’(সুরা : ইসরা, আয়াত : ৫৯)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীতে সংঘটিত বিভিন্ন ভয়াবহ ঘটনা মানুষের জন্য সতর্কবার্তা। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে তাঁর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যারা মন্দ ষড়যন্ত্র করে, তারা কি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে যে, আল্লাহ তাদের ভূগর্ভে ধসিয়ে দেবেন না?’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৫)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তোমরা কি আসমানে অধিষ্ঠিত সত্তা (আল্লাহ) সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছ যে, তিনি তোমাদের ভূমিতে ধসিয়ে দেবেন না? তখন তা হঠাৎ প্রবলভাবে কাঁপতে থাকবে।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১৬)
এই আয়াতগুলো মানুষকে অহংকার ও গাফিলতি থেকে সতর্ক করে।
১. তাওবা ও ইস্তিগফার করা
ভূমিকম্পের মতো বিপদের সময় সর্বপ্রথম করণীয় হলো আন্তরিক তাওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
২. বেশি বেশি দোয়া করা
বিপদের সময় দোয়াই হলো মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৬০)
৩. নামাজের প্রতি যত্নশীল হওয়া
যে কোনো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আল্লাহর সাহায্য লাভের অন্যতম উপায় হলো সালাত। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৪৫)
৪. গুনাহ ও অন্যায় থেকে বিরত থাকা
সমাজে যখন পাপাচার বেড়ে যায়, তখন আল্লাহর শাস্তি নেমে আসার আশঙ্কা বাড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ৪১)
৫. ধৈর্য ধারণ করা
বিপদে ধৈর্যশীল হওয়া ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫)
৬. বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্যে থাকেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
৭. পরকালের কথা স্মরণ করা
ভূমিকম্প কিয়ামতের ভয়াবহ দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘যখন পৃথিবী তার প্রচণ্ড কম্পনে কেঁপে উঠবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ১)
ইসলাম শুধু দোয়া ও তাওয়ার ওপর সীমাবদ্ধ নয়; বরং যথাযথ উপায় অবলম্বনেরও নির্দেশ দেয়। তাই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ ভবন নির্মাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা মেনে চলা, জরুরি প্রস্তুতি রাখা, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসরণ করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব। কারণ ইসলাম তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি বৈধ উপায় গ্রহণেরও শিক্ষা দেয়।
ঘনঘন ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের শক্তি, সম্পদ ও প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক না কেন, আল্লাহর একটিমাত্র নির্দেশেই পৃথিবী কেঁপে উঠতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার, ঈমান ও তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনা করার এবং সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।