মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও জিজ্ঞাসিত বিষয়গুলোর একটি হলো—‘ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল?’ অনেকেই মনে করেন, যেহেতু আল্লাহ সবকিছু পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন, তাই মানুষের চেষ্টা, দোয়া কিংবা সৎকর্মের কোনো প্রভাব নেই। আবার কেউ কেউ মনে করেন, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই সম্পূর্ণভাবে গড়ে তোলে। ইসলাম এ দুই চরমপন্থার কোনোটিকেই সমর্থন করে না।
ইসলামের দৃষ্টিতে তাকদির তথা ভাগ্য হলো-আল্লাহ তাআলার সর্বজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের অংশ। তিনি সবকিছু জানেন, সবকিছু লিখে রেখেছেন; তবে একই সঙ্গে মানুষকে ইচ্ছাশক্তি, কর্মক্ষমতা এবং দোয়ার সুযোগও দিয়েছেন। তাই একজন মুমিন বিশ্বাস করে—আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কিছুই ঘটে না, আবার আল্লাহর নির্দেশিত উপায় অবলম্বন করলে তিনি বান্দার অবস্থা ও নির্ধারিত অনেক বিষয় পরিবর্তনও করেন।
তাকদির বা ভাগ্য কী?
তাকদির অর্থ হলো—মহান আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান অনুযায়ী সৃষ্টিজগতের সবকিছুর পরিমাণ, সময়, অবস্থা ও পরিণতি পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই সমস্ত সৃষ্টির তাকদীর লিখে রেখেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৫৩)
ভাগ্য কি পরিবর্তন হয়?
এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, আল্লাহ যেসব বিষয় পরিবর্তনের সঙ্গে শর্তযুক্ত রেখেছেন, সেগুলো দোয়া, সৎকর্ম, তওবা ও আমলের মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে আল্লাহর চূড়ান্ত ও সর্বজ্ঞ সিদ্ধান্ত কখনো ভুল হয় না।
১. চেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের অবস্থা পরিবর্তন করেন
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১১)
এই আয়াত প্রমাণ করে, মানুষের ঈমান, আমল, চরিত্র ও কর্মের পরিবর্তনের সঙ্গে আল্লাহ তাদের অবস্থাও পরিবর্তন করেন।
২. দোয়া ভাগ্যের পরিবর্তনের অন্যতম মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোয়া ছাড়া কোনো কিছুই তাকদীরকে প্রতিহত করতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২১৩৯)
অর্থাৎ, আল্লাহ এমনভাবেই তাকদির নির্ধারণ করেছেন যে বান্দা দোয়া করলে বিপদ দূর হবে, আর দোয়া না করলে তা নেমে আসবে।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি পায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ু বরকতময় হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬)
তাকদিরের দুই স্তর
আলেমগণ তাকদিরকে সাধারণভাবে দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেছেন—
১. চূড়ান্ত তাকদির (যা আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞানে সংরক্ষিত)। এটি লাওহে মাহফুজে লিখিত, যা কখনো পরিবর্তিত হয় না।
২. শর্তযুক্ত তাকদীর
এটি ফেরেশতাদের নিকট লিখিত বিষয়, যা আল্লাহর নির্দেশে দোয়া, তওবা, সদকা, নেক আমল ইত্যাদির কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন; আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব (লাওহে মাহফুজ)।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ৩৯)
অতএব, মানুষের ভাগ্য নিয়ে ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা সবকিছু পূর্ব থেকেই জানেন এবং তাঁর জ্ঞানে কোনো পরিবর্তন হয় না। তবে তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য এমন অনেক বিষয় শর্তসাপেক্ষে নির্ধারণ করেছেন, যা দোয়া, তওবা, সৎকর্ম, তাকওয়া ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ‘ভাগ্যে যা আছে তাই হবে’—এই অজুহাতে অলস বসে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং একজন মুমিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, আল্লাহর কাছে কান্নাভেজা দোয়া করবে, নেক আমলে নিজেকে সমৃদ্ধ করবে এবং সবশেষে ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করবে।
আসুন, আমরা তাকদিরের ওপর দৃঢ় ঈমান রাখি, দোয়া ও সৎকর্মকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানাই এবং বিশ্বাস করি—যিনি তাকদিরের মালিক, তিনিই চাইলে আমাদের জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোয়, সংকট থেকে স্বস্তিতে এবং হতাশা থেকে সফলতায় পরিবর্তন করে দিতে পারেন।




