বর্তমান যুগে অনলাইন কেনাকাটা মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ পণ্য ক্রয় করে থাকেন। তবে অনেক সময় দেখা যায়, বিদেশ থেকে অর্ডারকৃত কোনো পণ্য কাস্টমস জটিলতা, আমদানি বিধিনিষেধ কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক কারণে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর আগেই বাতিল হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত ক্রেতাকে তার পরিশোধিত অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। কখনো কখনো প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে মূল টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু অর্থও প্রদান করে থাকে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মনে প্রশ্ন জাগে—এই অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা কি বৈধ? এটি কি সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে, নাকি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ উপহার হিসেবে গণ্য হবে?
লেনদেনের ক্ষেত্রে বৈধতা ও স্বচ্ছতা
ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনকে বৈধ ঘোষণা করেছে এবং তা ন্যায়, সততা ও পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে হলে তা বৈধ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বৈধ ও স্বচ্ছ উপায়ে সম্পদ অর্জন করা ইসলামে অনুমোদিত।
সুদ কী?
শরিয়তের দৃষ্টিতে সুদ (রিবা) হলো এমন অতিরিক্ত অর্থ, যা কোনো ঋণ বা বিনিময় চুক্তিতে পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারিত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
ফোকাহায়ে কেরাম বলেন, ‘রিবা হলো এমন অতিরিক্ত সুবিধা, যা কোনো চুক্তিতে প্রতিদান ছাড়াই শর্তসাপেক্ষে নির্ধারণ করা হয়।’ (বুহুস ফি কাদায়া ফিকহিয়্যা মুআসিরাহ, ২/১৫৫)
অতএব, কোনো অতিরিক্ত অর্থকে সুদ বলার জন্য অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো—সেটি পূর্বনির্ধারিত ও শর্তযুক্ত হতে হবে।
অতিরিক্ত অর্থ যদি পূর্বশর্ত না হয়
যদি কোনো গ্রাহক একটি পণ্য ক্রয় করেন এবং পরে কোনো কারণে পণ্যটি বাতিল হয়ে যায়, এরপর প্রতিষ্ঠান বা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের ক্ষতি, সময় নষ্ট বা অসুবিধার কথা বিবেচনা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অতিরিক্ত কিছু অর্থ প্রদান করে, অথচ এই অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার বিষয়ে আগে কোনো শর্ত, চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি না থাকে, তাহলে তা সুদ হিসেবে গণ্য হবে না। বরং তা উপহার (হাদিয়া), অনুদান বা ক্ষতিপূরণস্বরূপ সৌজন্য প্রদানের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আর ইসলাম উপহার প্রদান ও গ্রহণকে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর উপহার আদান-প্রদান করো, এতে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫৯৪)
সুতরাং এই উপহার শরিয়তসম্মত, তাই তা গ্রহণ করা বৈধ।
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ মিরকাতুল মাফাতিহ-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘কোনো অতিরিক্ত প্রদান যদি পূর্বশর্তবিহীন হয় এবং তা অনুগ্রহ বা সৌজন্যবশত প্রদান করা হয়, তাহলে তা বৈধ উপহারের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (মিরকাতুল মাফাতিহ, ৬/২৪৩৮)
একইভাবে সমসাময়িক ইসলামি গবেষকরাও উল্লেখ করেছেন যে, কোনো পুরস্কার, বোনাস বা অতিরিক্ত অর্থের বৈধতার অন্যতম শর্ত হলো এটি যেন প্রদানকারীর পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় প্রদত্ত অনুদান হয় এবং এর বিপরীতে গ্রহীতার ওপর কোনো আর্থিক দায়বদ্ধতা আরোপিত না হয়।
অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি দারাজ বা অন্য কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্য অর্ডার করেন এবং কাস্টমস বা প্রশাসনিক কারণে সেই পণ্য বাতিল হয়ে যায়, এরপর প্রতিষ্ঠানটি মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ১. অতিরিক্ত কিছু অর্থ প্রদান করে, তাহলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচ্য হবে—
১. অতিরিক্ত অর্থটি আগে থেকে চুক্তিবদ্ধ বা শর্তযুক্ত ছিল না।
২. গ্রাহক অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেননি।
৩. এটি কোনো ঋণের ওপর নির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ নয়।
৪. প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় তা প্রদান করেছে।
৫. অর্থটি ক্ষতিপূরণ, সৌজন্য বোনাস বা উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
এসব শর্ত পূরণ হলে উক্ত অতিরিক্ত অর্থ শরিয়তের দৃষ্টিতে হাদিয়া বা অনুদান হিসেবে গণ্য হবে এবং তা গ্রহণ করা বৈধ হবে, ইনশাআল্লাহ।
ইসলাম লেনদেনের ক্ষেত্রে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সন্তুষ্টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কোনো অতিরিক্ত অর্থ তখনই সুদে পরিণত হয়, যখন তা পূর্বশর্তযুক্ত ও চুক্তিবদ্ধ অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে নির্ধারিত থাকে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রাহকের প্রতি সৌজন্য, ক্ষতিপূরণ বা উপহার হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে, তাহলে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং বৈধ হাদিয়া হিসেবে গণ্য হবে।
তাই দারাজ বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠানের অর্ডার বাতিলের ক্ষেত্রে কাস্টমস বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থ যদি পূর্বশর্তহীন ও স্বেচ্ছাপ্রদত্ত হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে মুসলমানের উচিত সর্বদা নিজের উপার্জন ও ভোগে হালাল-হারামের ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মানকে নিরাপদ রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫২)
সর্বশেষ কথা হলো, পার্থিব জীবনের লেনদেনে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সে শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখে না; বরং হালাল-হারামের মানদণ্ডেও প্রতিটি বিষয়কে যাচাই করে। অনলাইন কেনাকাটার এই যুগে বিভিন্ন কারণে অর্ডার বাতিল হওয়া এবং তার বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো, সেই অতিরিক্ত অর্থটি কোনো পূর্বশর্ত, চুক্তি বা সুদভিত্তিক লেনদেনের অংশ কি না।
যদি অতিরিক্ত অর্থ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, কোনো দাবি বা পূর্বনির্ধারিত শর্ত ছাড়াই ক্ষতিপূরণ, সৌজন্য বা উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়, তাহলে তা বৈধ হাদিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে এবং গ্রহণ করতেও শরিয়তের কোনো বাধা নেই। কারণ ইসলাম বৈধ উপহারকে উৎসাহিত করে, কিন্তু শর্তযুক্ত অতিরিক্ত সুবিধা তথা রিবাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
সুতরাং একজন সচেতন মুসলমানের কর্তব্য হলো, প্রতিটি আর্থিক লেনদেনে আল্লাহভীতিকে প্রাধান্য দেওয়া, সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা এবং হালাল উপার্জনের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। কেননা দুনিয়ার সামান্য সম্পদের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও হালাল রিজিকের বরকতই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতার ভিত্তি।




