• ই-পেপার

ডিজিটাল যুগে মানুষের অস্থিরতা ও মনোজগতের পরিবর্তন

  • ড. শাহরীনা আখতার

কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে অক্টোবর বিপ্লব : ইতিহাসের ফিরে ফিরে আসা...

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে অক্টোবর বিপ্লব : ইতিহাসের ফিরে ফিরে আসা...

ইতিহাস সোজা পথে হাঁটে না কখনো, বরং চক্রাকারে ঘোরে, ঘড়ির কাঁটার মতোই একসময় ফিরে আসে ঠিক একই বিন্দুতে। নির্মমভাবে ফিরে আসে একই সত্যে—শোষিতের অধিকারের লড়াই শাসকের সিংহাসন নাড়িয়ে দেয়। বারবার...একাদশ শতাব্দীর বাংলার কৈবর্ত বিদ্রোহ আর বিংশ শতাব্দীর রুশ অক্টোবর বিপ্লব এই অমোঘ সত্যের জ্বলন্ত প্রমাণ। দুই ঘটনার মাঝে ৯০০ বছরের ব্যবধান, কিন্তু শোষণের কৌশল আর প্রতিরোধের আগুন একই।

কৈবর্তভূমি ১০৭১ : বৌদ্ধ পাল রাজা দ্বিতীয় মহিপালের শাসন ছিল লোভ ও অযোগ্যতার চরম উদাহরণ। খরায় খাজনা কম আসছে, রাজকোষ ফাঁকা। সমাধান কী? উর্বর বাংলার কৈবর্তদের ওপর খাজনা দ্বিগুণ করে চাপিয়ে দেওয়া! এই অঞ্চল ছিল উপমহাদেশের শস্যভাণ্ডার। শাসকরা বারবার এখানে লুটপাট করেছে, আর প্রান্তিক কৈবর্তরা হয়েছে শোষণের প্রধান শিকার।

রাজা দ্বিতীয় মহিপালের আরোপিত বাড়তি এই কর আদায়ে অনাগ্রহী ছিলেন স্থানীয় ভূস্বামীরা! দ্বিতীয় মহিপাল ভূস্বামীদের শিক্ষা দিতে জোর করে খাজনা আদায়ে বরকন্দাজদের পাঠান। অত্যাচার শুধু লুটপাটে সীমাবদ্ধ থাকেনি—হত্যা, অগ্নিসংযোগ, এমনকি নারী নির্যাতনের ঘটনাও বেড়ে যায়। প্রান্তিক বলেই হয়তো বা, কৈবর্ত রমণীদের সঙ্গে বারাঙ্গনার মতোই আচরণ করে পাল বাহিনী, ঠিক পাকিস্তানি বাহিনীর মতোই! এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন দিব্য। সপরিবারে গড়ে উঠল প্রতিরোধ!

দিব্যরই ভ্রাতুষ্পুত্র ভীম এই প্রতিরোধকে সত্যিকারের বিপ্লবে রূপ দিলেন। ভীম ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ মঠের বিশাল করমুক্ত জমি ছিনিয়ে নিয়ে কৈবর্তদের মধ্যে বিতরণ করলেন। রামশরণ শর্মা একে মধ্যযুগীয় ভারতের অন্যতম প্রথম সত্যিকারের ভূমি সংস্কার বলেছেন। রমেশচন্দ্র মজুমদারও স্বীকার করেছেন—এ ছিল স্থানীয় জনগণের স্বার্থে জমির মালিকানার পরিবর্তন। ভীম কোনো আদর্শের বুলি আওড়াননি। তিনি সরাসরি ব্রাহ্মণ আর বৌদ্ধ মঠের নিজস্ব জমি দিয়েছিলেন প্রান্তিক মানুষকে। আর সেই জমির আকাঙ্ক্ষায় কৃষক, জেলে, মাঝি—সব প্রান্তিক শোষিত মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

অবস্থা বেগতিক দেখে রাজা দ্বিতীয় মহিপাল এই বিদ্রোহ দমনে বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। প্রশিক্ষিত এই বিশাল পাল বাহিনীর বিরুদ্ধে সংখ্যায় ছোট হলেও কৈবর্ত বাহিনী অসাধারণ সাহস দেখায়। কৈবর্তদের কাছে লড়াইটা ছিল অস্তিত্বের লড়াই—১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধেরই মতো! অতঃপর কয়েক দশকের জন্য স্বাধীন কৈবর্তভূমি। কার্ল মার্ক্সের জন্মের শত শত বছর আগে বাংলাদেশে গঠিত হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের দেশ কৈবর্তভূমি। প্রথম প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্র!

পেট্রোগ্রাদ ১৯১৭ : ভ্লাদিমির লেনিন কৈবর্ত বিদ্রোহের কথা জানতেন কি না, জানা যায় না, কিন্তু তিনি ঠিক একই অস্ত্র ব্যবহার করলেন। ১৯১৭ সালের ৮ নভেম্বর ‘ল্যান্ড ডিক্রিজারি করে জমিদারি প্রথা ধ্বংস করে কৃষকদের হাতে জমি তুলে দিলেন। স্লোগান ছিল সহজ, কিন্তু আকর্ষক—শান্তি, জমি, রুটি। ভীমের বল্লম আর লেনিনের রাইফেলের মধ্যে শুধু যুগের ফারাক। কিন্তু কৌশল অভিন্ন—জমির মালিকানা হলো ক্ষমতা দখলের চাবিকাঠি। কিন্তু লেনিনের পরবর্তী ইতিহাস এক বড় বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকল মাত্র ৭৪ বছর।

লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিনেরকোলেক্টিভাইজািসয়া’র নামে কৃষকদের সেই জমি আবার কেড়ে নেওয়া হলো। লেনিনের ডিক্রি পুরোপুরি টিকেছিল মাত্র ১৩ বছর! অথচ মার্ক্স না পড়া অশিক্ষিত ভীম লিখিত দলিল রাখতে না পারলেও যত দিন স্বাধীন কৈবর্তভূমি টিকেছিল, তত দিন টিকেছিল প্রান্তিক কৈবর্তের ভূমির মালিকানা! এই দুই বিপ্লব প্রমাণ করে—শাসকশ্রেণি যতবার শোষকে পরিণত হয়, শাসিতের অধিকার ক্ষুণ্ন করে; ততবারই জনগণের মধ্যে নতুন দিব্য, নতুন ভীম বা নতুন লেনিন জন্ম নেয়। কখনো কখনো কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, কখনো বা ভেনেজুয়েলার হুগো শাভেজ...শুধু অধিকার আদায়ের লড়াইটা থামে না। কখনোই!

লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক

 

নগদবিহীন অর্থনীতি এবং বাস্তবতা

নিরঞ্জন রায়

নগদবিহীন অর্থনীতি এবং বাস্তবতা

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলার ব্যাপারে অগ্রসর হতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর উল্লেখ করেছেন যে দেশে নগদবিহীন অর্থনীতি চালু করার উদ্দেশ্যে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—(১) গভর্নরের নেতৃত্বে স্টিয়ারিং কমিটি গঠন ও কার্যক্রম শুরু করা; (২) এখন থেকে গভর্নর নিজে বিষয়টি সরাসরি তদারকি করবেন; (৩) একটি ইউনিক কিউআর কোডের মাধ্যমে সব ব্যাংক এমএফএস (মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস) লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করা। এই প্রসঙ্গে গভর্নর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এবং নগদের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দেশ থেকে ঘুষ, দুর্নীতি এবং কর ফাঁকি ঠেকাতে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনা হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস কম্পানিগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। নগদবিহীন অর্থনীতি চালু করলে ঘুষ, দুর্নীতি বা কর ফাঁকির মতো অপরাধ কতটা কমবে, তা বলা কঠিন। এসব অপরাধ যে কারণে সংঘটিত হয়, সেসব কারণ দূর করতে না পারলে শুধু নগদবিহীন অর্থনীতি চালুর মাধ্যমে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তখন দেখা যাবে যে নগদবিহীন অর্থনীতিতে নগদবিহীন অর্থনীতি এবং বাস্তবতাএসব অপরাধের ধরন পাল্টেছে, কিন্তু অপরাধ ঠিকই অব্যাহত আছে। গভর্নরের এমন ঘোষণার পরপরই বাংলা কিউআর বেশ ঘটা করে উদ্বোধনও হয়েছে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ডেপুটি গভর্নর, কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং কয়েকটি অংশগ্রহণকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। উদ্বোধনী বক্তব্যে একজন ডেপুটি গভর্নর উল্লেখ করেছেন যে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে নগদবিহীন অর্থনীতি চালু হলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। নগদবিহীন লেনদেনের কারণে দেশের জিডিপি কিভাবে বৃদ্ধি পাবে, তা আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। নগদবিহীন লেনদেন তো কোনো পণ্য বা সেবা উৎপাদন করবে না। আগে যে লেনদেন নগদে সম্পন্ন হতো, এখন সেই লেনদেনই নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। এর সঙ্গে জিডিপি বৃদ্ধি পাওয়ার কী সম্পর্ক আছে, তা আমার জানা নেই। যা হোক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর যেহেতু বলেছেন, তাই আশা করছি তাঁদের কাছে অর্থনীতির সেই সূত্র নিশ্চয়ই আছে।

দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাক আর না পাক, অথবা ঘুষ, দুর্নীতি এবং কর ফাঁকির মতো অপরাধ বন্ধ হোক বা না হোক, নগদবিহীন অর্থনীতি এখন সময়ের দাবি। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক খুবই ভালো একটি উদ্যোগ নিয়েছে এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নগদবিহীন অর্থনীতি স্লোগান হিসেবে যতটা জনপ্রিয়, বাস্তবে কার্যকর করা ততটাই কঠিন। এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন নগদবিহীন অর্থনীতির সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য বা প্যারামিটার নির্ধারণ করা। কেননা অর্থনীতিকে শতভাগ নগদবিহীন করে তোলা কখনোই সম্ভব নয়। সমাজে এবং অর্থনীতিতে কিছু অংশ থাকে, যেখানে নগদেই লেনদেন নিষ্পত্তি করতে হয়। আমেরিকা, কানাডাসহ উন্নত বিশ্ব নগদবিহীন অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এখানে এখন আর সেভাবে নগদে লেনদেন হয় না। কিন্তু তার পরও অর্থনীতির শতভাগ এখনো নগদবিহীন করা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য না থাকলেও মার্কেটে নগদ লেনদেনের দৃশ্য থেকে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে এখনো ১৫ থেকে ২০ শতাংশ লেনদেন নগদে সম্পন্ন হয়। সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশে নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলার কাজটা মোটেই সহজ নয়। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত যে নগদবিহীন লেনদেন হয়, তার বেশির ভাগই সম্পন্ন হয়ে থাকে বিকাশ ও নগদ এমএফএস কম্পানির মাধ্যমে। সেখানে এখনো নির্দিষ্ট কিছু মানুষ এই আর্থিক সেবা নিয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত নগদবিহীন অর্থনীতি বলতে যা বোঝায়, সে রকম নগদবিহীন অর্থনীতি তৈরি করতে হলে দেশের অতি সাধারণ মানুষকে নগদবিহীন লেনদেনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একজন দিনমজুর, রিকশাচালক, শ্রমিক, কৃষক, রাস্তার পাশের চায়ের দোকানদার, কাঁচাবাজারের তরকারি বিক্রেতা, কামার, কুমার, এমনকি কাজের বুয়ার মতো সাধারণ মানুষ যখন নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে অভ্যস্ত হবে, তখনই নগদবিহীন অর্থনীতি বা সমাজ গড়ে উঠবে।

সত্যিকার অর্থে নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেটি হতে পারে যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে নগদবিহীন লেনদেনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এরপর নির্ধারণ করতে হবে যে কিভাবে এবং কী পদ্ধতিতে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে নগদবিহীন লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হবে। শুধু নগদ বা বিকাশের মতো মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস কম্পানির মাধ্যমে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য আরো এমএফএস প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হবে এবং দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতকে কাজে লাগাতে হবে। দেশের প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে তাদের গ্রাহকদের কার্ড প্রদানের মাধ্যমে মানুষকে নগদবিহীন লেনদেন সম্পন্ন করার পথ সুগম করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে পয়েন্ট অব সেল মেশিন ব্যবহার সহজ করে দিতে হবে। একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে শ্রমিক বা চায়ের দোকানদার চাইলেই যেন পিওএস মেশিন পেতে পারে। এই পিওএস মেশিনের মাধ্যমেই নগদের পরিবর্তে ডেবিট অথবা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবে। আর এ জন্য প্রয়োজন হবে জাতীয়ভাবে এবং ইন্ডাস্ট্রিব্যাপী পেমেন্ট প্রসেসিং, সেটলমেন্ট ও রিকনসিলিয়েশন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এসব করার পরও যে মানুষ ব্যাপক হারে নগদবিহীন লেনদেনে উৎসাহিত হবে, তেমন নয়। প্রথমত, দীর্ঘদিনের অভ্যাস নগদ টাকায় লেনদেন করা। তাই সেই অভ্যাস খুব সহজে পরিবর্তন করা কঠিন কাজ। দ্বিতীয়ত, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নগদ টাকা কাছে পেতে বেশি পছন্দ করে। তা ছাড়া শুধু ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে নগদবিহীন লেনদেন জনপ্রিয় করে তোলা বেশ কঠিন। কেননা ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে নগদবিহীন লেনদেন করতে হলে কার্ডহোল্ডারকে প্রথমে তার হিসাবে টাকা জমা করতে হবে এবং সেই অর্থের বিপরীতে ডেবিট কার্ড ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তখন মানুষ ডেবিট কার্ড এবং নগদ অর্থের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাবে না। উল্টো ব্যাংকের হিসাবে টাকা জমা দিয়ে সেই টাকার বিপরীতে কার্ড ব্যবহার করার চেয়ে নগদ টাকা ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। ফলে নগদবিহীন লেনদেন কখনোই অতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠবে না। মূলত ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপক ব্যবহারই দ্রুত নগদবিহীন লেনদেন জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। উন্নত বিশ্বে যে নগদবিহীন লেনদেন এত জনপ্রিয়, তার পেছনে আছে ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপক ব্যবহার। উন্নত বিশ্বে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া এক দিনও চলার উপায় নেই। আর এই ক্রেডিট কার্ডের কারণেই মানুষ নগদে লেনদেন করতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে ক্রেডিট কার্ড এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমাদের দেশেও সব ব্যবহারকারীর জন্য ক্রেডিট কার্ড প্রদানের ব্যবস্থা করা যাবে না। অবশ্যই যাবে, কিন্তু এ জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতি নিতে পারলেই দেশের বেশির ভাগ নাগরিক, এমনকি সব নাগরিকের জন্য ক্রেডিট কার্ড প্রদান করা সম্ভব হবে। 

বিশ্বের আর্থিক খাত যেভাবে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের দেশকেও নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তবে সেটি করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে। খুব দ্রুত এবং সংক্ষেপে কোনো কিছু করতে গেলে সেটি প্রকৃত নগদবিহীন অর্থনীতি হবে না। আমাদের দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের যে অবস্থা, সে রকম অবস্থাই হবে নগদবিহীন অর্থনীতির ক্ষেত্রেও। তাই সময় লাগলেও ভেবেচিন্তে, পরিকল্পনা করে এই পথে এগোতে হবে।

 

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

পূর্বমুখী কূটনীতি : জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন থেকে নতুন দিগন্ত

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার

পূর্বমুখী কূটনীতি : জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন থেকে নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য গৃহীত হয়, আবার কিছু সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনীতি ছিল দ্বিতীয় ধরনের একটি রাষ্ট্রদর্শনের অংশ। এটি শুধু চীন বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের একটি নীতি ছিল না, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একমুখী নির্ভরশীলতার গণ্ডি থেকে বের করে এনে একটি বহুমাত্রিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর কূটনৈতিক কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। আজ যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শ্রমবাজার ও কৌশলগত অংশীদারির নতুন দিগন্ত উন্মোচনের চেষ্টা করছেন, তখন সেই সফরকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বিচার করলে দেখা যায়—বাংলাদেশের পূর্বমুখী কূটনীতির যে বীজ জিয়াউর রহমান রোপণ করেছিলেন, বর্তমান সময়ে তা নতুন বাস্তবতার আলোকে আরো বিস্তৃত রূপ লাভ করছে।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান সব সময়ই তাকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দুই মেরুকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় বিভক্ত। এমন বাস্তবতায় একটি নবীন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই চ্যালেঞ্জকে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি আবেগের পরিবর্তে বাস্তববাদ, জাতীয় স্বার্থ এবং কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। হ্যান্স জে মরগেনথাও (১৯৪৮) যেমন বলেছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূলভিত্তি হলো জাতীয় স্বার্থ; কেনেথ ওয়াল্টজ (১৯৭৯) দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অরাজক চরিত্র রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে বাধ্য করে। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রদর্শন এই বাস্তববাদী তত্ত্বগুলোর সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তাঁর উপলব্ধি ছিল—বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ নয়। ফলে তিনি একই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব, মুসলিম বিশ্ব এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি, মাল্টিভেক্টর ফরেন পলিসি এবং স্ট্র্যাটিজিক ডাইভার্সিভিকেশন বলা হয়। এভলিন গুহ (২০০৫)-এর হেজিং স্ট্র্যাটেজি ধারণা অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখে। জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনীতি ছিল এই নীতির একটি অগ্রগামী প্রয়োগ।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীন ভবিষ্যতে একটি প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তিতে পরিণত হবে। ডেং শিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনাকালে চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের যে উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেন, তা শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি স্থাপন করেছিল। আজ বাংলাদেশের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে চীনের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি অনেকাংশেই সেই সময়ে নির্মিত হয়।

পূর্বমুখী কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং আসিয়ান অঞ্চলের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান সামনে রেখে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে এই উদীয়মান অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজারে পরিণত হয় এবং বিনিয়োগ ও শিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প সহযোগিতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে, তা পূর্বমুখী কূটনীতির ধারাবাহিকতাকেই নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রদর্শনের আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’-এর ধারণা। আর্নস্ট বি. হাস (১৯৫৮)-এর নিও-ফাংশনালিজম তত্ত্ব অনুসারে অর্থনৈতিক, কারিগরি ও সামাজিক সহযোগিতা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে। হাস এই প্রক্রিয়াকে স্পিলওভার ইফেক্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো যদি কৃষি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগে একসঙ্গে কাজ করে, তবে আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নের নতুন ভিত্তি গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি বহুপক্ষীয় কাঠামো কল্পনা করেছিলেন, যেখানে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোও সম্মিলিতভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক হবে সহযোগিতানির্ভর, একক প্রভাবনির্ভর নয়।

বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রবার্ট কিওহান ও জোসেফ নেই (১৯৭৭)-এর কমপ্লেক্স ইন্টারডিপেনডেন্ট তত্ত্ব আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁদের মতে, আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরের আলোচ্য বিষয়গুলো—বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শ্রমবাজার, শিক্ষা ও বাণিজ্য এই তত্ত্বেরই বাস্তব প্রতিফলন।

এই সফরের একটি বড় অর্জন হলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার প্রচেষ্টা। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, শিল্প বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

এ ছাড়া এই সফর বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকেও আরো সুদৃঢ় করেছে। বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের মধ্যে বাংলাদেশকে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শনের মূল শিক্ষা—জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই সফর সেই নীতিরই একটি বাস্তব প্রতিফলন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো আঞ্চলিক সংযোগ, উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ। মালয়েশিয়া ও চীন এই চারটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত করেছে। সঠিক কূটনৈতিক কৌশল, উন্নত অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

পরিশেষে বলা যায়, পূর্বমুখী কূটনীতি কোনো সাময়িক কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রকৌশলের একটি মৌলিক ভিত্তি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে খালেদা জিয়া সেই ধারার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যান। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই ধারাবাহিকতাকে নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। যদি এই সফরের সম্ভাবনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমাত্রিক ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ অব্যাহত রাখে, তবে পূর্বমুখী কূটনীতি আগামী দিনের বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র, কৌশলগত অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরো মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা

 

উদ্বৃত্ত শ্রম, দ্বৈত অর্থনীতি ও বাজেটের ফাঁদ

এম এম মুসা

উদ্বৃত্ত শ্রম, দ্বৈত অর্থনীতি ও বাজেটের ফাঁদ

১৯৫৪ সালে স্যার আর্থার লুইস যখন ‘ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট উইথ আনলিমিটেড সাপ্লাইজ অব লেবার’  শিরোনামে তাঁর ঐতিহাসিক প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন, তখন বিশ্বের কেউ ভাবেননি যে ৭০ বছর পরও দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ তাঁর সেই তত্ত্বের জীবন্ত পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করতে বসলে লুইসের দ্বি-পথ কাঠামো যেন দর্পণের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়।

লুইস বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে দুটি সমান্তরাল পথ থাকে। একদিকে থাকে ‘ঐতিহ্যবাহী পথ’—কৃষি, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, গ্রামীণ শ্রম, যেখানে প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা শূন্যের কাছাকাছি, কিন্তু মানুষ টিকে থাকে। অন্যদিকে থাকে ‘আধুনিক পথ’—কারখানা, রপ্তানিমুখী শিল্প, শহরের নতুন পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা যেখানে শ্রমের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এই দুটি পথের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনাই হলো উন্নয়নের মূল রহস্য বা সূত্র।

লুইস তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হলো ‘টার্নিং পয়েন্ট’, যখন ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হয়ে যায় এবং মজুরি বাড়তে শুরু করে। এই বিন্দু অতিক্রম করলে দেশটি প্রকৃত উন্নয়নের পথে প্রবেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা এই টার্নিং পয়েন্টের সামনে এসে থমকে আছি—এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু নীতিকাঠামো সেই সুযোগ ধরতে পারছে না।

দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৮ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত। তাদের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা শিল্প বা সেবা খাতের তুলনায় চার থেকে ছয় গুণ কম। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৫.৮ শতাংশ। লুইসের ভাষায়, এই বরাদ্দ ঐতিহ্যবাহী পথ আরো দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখবে।

বাজেটে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু এই বৃদ্ধির গঠন দেখলে লুইসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর উদ্বেগ জাগায়। বরাদ্দের বেশির ভাগ চলে যাচ্ছে বিদ্যমান বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের করছাড় ও প্রণোদনায়, কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নয়।

লুইস দেখিয়েছেন যে আধুনিক পথ শুধু তখনই ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে শ্রম আকর্ষণ করতে পারে, যখন সেখানে মজুরির পার্থক্য বজায় থাকে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি শ্রম সরবরাহের গতির চেয়ে বেশি হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে মাত্র পাঁচ থেকে সাত লাখ। বাকিরা কোথায় যাচ্ছে? তারা ভিড় করছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, রিকশায়, ফুটপাতে, মৌসুমি কৃষিতে—লুইসের ঐতিহ্যবাহী পথের গভীরে।

মানবপুঁজির রূপান্তরের পূর্বশর্ত পূরণ হচ্ছে কি? লুইসের তত্ত্বে একটি প্রায়-উপেক্ষিত দিক হলো ‘সক্ষমতা-সেতু’। শুধু শ্রম স্থানান্তরিত হলেই হয় না—সেই শ্রমকে আধুনিক পথে উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকতে হয়। এই সেতু না থাকলে শহরে মানুষ আসে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ে না।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য সহজ ঋণ, ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থার হয়রানি থেকে মুক্তি—এই তিনটি বিষয় অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক খাতের দিকে টেনে আনতে পারে। বাজেটে এর প্রতিফলন কোথায়? ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য করছাড়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু তা কার্যকর করার জন্য প্রশাসনিক সক্ষমতা তৈরিতে কোনো বিনিয়োগ নেই।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স একটি অনন্য মাত্রা যোগ করেছে, যা লুইস নিজে কল্পনা করেননি। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকরা মূলত ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে আসেন এবং তাঁদের পাঠানো অর্থ পরিবারের ভোগব্যয় বাড়ায়, কিন্তু উৎপাদনশীল বিনিয়োগ সব সময় হয় না। ভোগব্যয় অন্যভাবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে, কিন্তু টেকসই রূপান্তরে দ্রুত প্রভাব রাখে না।

লুইস দেখিয়েছেন, উন্নয়নের চালিকাশক্তি হলো একটি বিনিয়োগ চক্র : আধুনিক পথ মুনাফা করে, সেই মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ হয়, আরো মুনাফা আসে। এই চক্রের গতি বাড়াতে হলে আধুনিক খাতকে মুনাফা ধরে রাখার সুযোগ দিতে হবে—সেই সঙ্গে সেই মুনাফার উৎপাদনশীল খাতে পুনর্বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের করপোরেট ট্যাক্সের কাঠামো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কিছুটা পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে, কিন্তু বড় সমস্যা রয়ে গেছে—দেশীয় মুনাফার একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে বা বিদেশে চলে যাচ্ছে। পুঁজিপাচারের এই সমস্যার বিরুদ্ধে বাজেটে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেই। লুইসের বিনিয়োগচক্র তাই সম্পূর্ণ হচ্ছে না।

নারীশ্রমের রূপান্তর : লুইসের তত্ত্বের অপূর্ণ অধ্যায়—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সাফল্য মূলত নারীশ্রমের আধুনিক পথে প্রবেশের ফসল, এটি একটি সত্যিকারের লুইসীয় রূপান্তর। ৪০ লাখের বেশি নারী শ্রমিক ঐতিহ্যবাহী পথের গৃহস্থালি ও অনানুষ্ঠানিক কাজ ছেড়ে আনুষ্ঠানিক শিল্পে এসেছেন। এই রূপান্তর শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। 

স্যার আর্থার লুইস নোবেল বক্তৃতায় সতর্ক করেছেন, ‘উন্নয়নের কোনো স্বয়ংক্রিয় পথ নেই। প্রতিটি দেশকে তার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই সিদ্ধান্তগুলো এখন নিতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটি সন্ধিক্ষণের বাজেট। দেশের সামনে সুযোগ আছে লুইসের টার্নিং পয়েন্ট অতিক্রম করার। কিন্তু সে জন্য দরকার তিনটি জিনিস : আধুনিক খাতে কর্মসংস্থান সৃজন, মানবপুঁজিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক রূপান্তর।

লুইস একবার বলেছিলেন, ‘উন্নয়নের অর্থ হলো মানুষকে সুযোগ দেওয়া।’ বাংলাদেশের বাজেট সেই সুযোগের কাঠামো তৈরি করছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে নীতিনির্ধারকদের। সংখ্যার আড়ালে যে মানুষগুলো লুকিয়ে আছেন গ্রামের মাঠে, শহরের ফুটপাতে, কারখানার সারিতে—তাঁদের জীবনের গল্পই বলবে এই বাজেট সত্যিকারের উন্নয়নের বাজেট ছিল কি না।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক