খেলার ২৯ মিনিটে গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল। ডাগআউটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কার্লো আনচেলোত্তি ধীর পায়ে গিয়ে বসলেন নিজের আসনে। মুখে কোনো হাসি নেই, চোখে-মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। কিন্তু ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য শিরোপা জেতা এই অভিজ্ঞ কোচ এত সহজে ভেঙে পড়ার মানুষ নন। প্রথমার্ধে নিজেদের ছন্দ খুঁজে না পাওয়া ব্রাজিল দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই বদলে যায়। যে কাসেমিরো প্রথম ৪৫ মিনিটে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন, ৫৬ মিনিটে তিনিই সমতায় ফেরান দলকে। গ্যাব্রিয়েলের নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে জাপানের জালে বল জড়িয়ে সমতায় ফেরান অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডার।
গোলের পর যেন ঝড় তোলে ব্রাজিল। একের পর এক আক্রমণে জাপানকে নিজেদের অর্ধেই আটকে ফেলে তারা। তবে গোলরক্ষক সুজুকি বারবার দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। তাঁর একের পর এক সেভে জয়সূচক গোলের অপেক্ষা দীর্ঘ হতে থাকে।
তবে আনচেলোত্তির ব্রাজিল যে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়, তার প্রমাণ মিলল যোগ করা সময়ে। ব্রুনো গিমারেসের নিখুঁত পাস বক্সে পেয়ে বদলি হিসেবে নামা গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলি ঠাণ্ডা মাথায় বল জড়িয়ে দেন জালে। সঙ্গে সঙ্গেই হিউস্টনের গ্যালারি ভেসে যায় হলুদ জার্সিধারী ব্রাজিল সমর্থকদের উল্লাসে। দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ গোলের জয় তুলে নিয়ে ব্রাজিল নিশ্চিত করে শেষ ষোলোর টিকিট।
মাত্র এক বছর আগে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেন আনচেলোত্তি। সে সময় বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ধুঁকছিল সেলেসাওরা। মাঠের খেলায় ছিল না কোনো ধার, একের পর এক হার ও ড্রয়ের হতাশায় নিমজ্জিত ছিল দলটি। আনচেলোত্তির ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে দলের চেহারা। বিশ্বকাপে এসেও শুরুর ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ড্র করে ধাক্কা খায় দলটি। এরপর দুর্দান্ত ফুটবলে হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ ৩২-এ আসে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। নক আউটের শুরুতেই প্রতিপক্ষ জাপান বলে কঠিন চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করছিল ভিনিসিয়ুসদের সামনে। এশিয়ার প্রতিনিধিরা সেই চ্যালেঞ্জে ফেলেছিল আনচেলোত্তির দলকে। প্রথমার্ধে জাপানের জমাট রক্ষণ ভাঙতে বেশ ভুগেছে ব্রাজিল। মাঝ মাঠে জায়গা না পাওয়ায় আক্রমণগুলো বারবার থেমে যাচ্ছিল। বিরতিতে সেই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করেন কার্লো আনচেলোত্তি। দ্বিতীয়ার্ধে তিনি কৌশলে পরিবর্তন এনে উইং থেকে বেশি ক্রস এবং বক্সের ভেতরে বল পাঠানোর ওপর জোর দেন। সেই পরিবর্তনেই ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। হাওয়ায় ভেসে আসা বলগুলো সামলাতে হিমশিম খেতে থাকে জাপানের রক্ষণ। কাসেমিরোর হেডে সমতার গোলও আসে এমনই একটি আক্রমণ থেকে। এরপর একের পর এক ক্রস ও আক্রমণে জাপানকে চাপে রাখে ব্রাজিল। অল্পের জন্য গোল পাননি ভিনি। তাঁর প্রচেষ্টা ফিরে আসে বারে লেগে। কিন্তু জাপানের ওপর চাপ অব্যাহত ছিল ব্রাজিলের। শেষ পর্যন্ত সেই অবিরাম চাপই ফল দেয় যোগ করা সময়ে। মার্তিনেলির নিখুঁত ফিনিশিং জাপানের স্বপ্ন ভেঙে দেয়, আর ব্রাজিল নিশ্চিত করে শেষ ষোলোর টিকিট। দলের প্রথম গোল করা কাসেমিরোর প্রথমার্ধের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। হলুদ কার্ডও দেখেছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তাঁকে তুলে নেওয়ারই কথা ছিল কিন্তু আনচেলোত্তি ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি কাসেমিরোর ওপর আস্থা রাখেন, তাঁকে মাঠেই রেখে দেন। এতেই বাজিমাত! অনেক সময় আনচেলোত্তির সবচেয়ে বড় শক্তি নতুন কিছু করা নয়, বরং অস্থিরতার মাঝেও শান্ত থাকা এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা। জাপানের বিপক্ষেও সেই ধৈর্য এবং কৌশল বদলানো ‘মাস্টারক্লাস’ই এনে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত জয়।




