বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। আমরা তা প্রতিদিনই দেখছি অস্বাভাবিক গরম, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা আর হঠাৎ বন্যায়। গ্রামের কৃষক যেমন এই পরিবর্তনের চাপ অনুভব করছেন, তেমনি শহরের মানুষও ছায়াহীন রাস্তা, দাবদাহ ও দূষণের মধ্যে তা বুঝতে পারছে। এই বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণ আর শুধু একটি সামাজিক বা নৈতিক কাজ নয়; এটি আমাদের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি জরুরি প্রয়োজন।
তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না। আমাদের বড় সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় উৎসব করে গাছ লাগাই, ছবি তুলি, সংবাদ করি; কিন্তু কয়েক মাস পর সেই গাছগুলোর কতটি বেঁচে আছে, তা আর কেউ খোঁজ নেয় না। তাই এখন প্রয়োজন বৃক্ষরোপণকে এক দিনের কর্মসূচি থেকে বের করে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও নীতিগত সহায়তার মধ্যে নিয়ে আসা।
এই কাজটি একা রাষ্ট্রের পক্ষে করা সম্ভব নয়। আবার শুধু সাধারণ মানুষের আবেগ দিয়েও একটি জাতীয় পর্যায়ের সবুজ আন্দোলন টেকসই করা কঠিন। এখানে দরকার তিনটি শক্তির সমন্বয়—সাধারণ মানুষ, করপোরেট খাত এবং রাষ্ট্রীয় নীতি।
শিক্ষার্থী, তরুণ ও সাধারণ মানুষ যেকোনো সামাজিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। তারা সচেতনতা তৈরি করে, পরিবার ও সমাজকে যুক্ত করে এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিবর্তনের সূচনা করে। কিন্তু এই অংশগ্রহণকে বড় পরিসরে নিতে হলে করপোরেট খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আছে অর্থ, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার করার সক্ষমতা এবং বহুসংখ্যক কর্মীকে যুক্ত করার সুযোগ।
বাংলাদেশের অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কর্মসূচির আওতায় নানা কাজ করছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের অনেকটাই খণ্ডিত, স্বল্পমেয়াদি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রচারণাকেন্দ্রিক। যদি সিএসআর তহবিলের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও গাছের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যায় বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে তা একটি কার্যকর জাতীয় সবুজ কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে।
গাছ লাগানোর জায়গা, প্রজাতি ও পরিচর্যার প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে-সেখানে গাছ লাগালেই পরিবেশ রক্ষা হয় না। স্থানীয় আবহাওয়া, মাটি, পানি এবং মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে দেশীয় প্রজাতির গাছ নির্বাচন করতে হবে। স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গণ, রাস্তার ধারে খালি জায়গা, খালের পার, নদীর পার, শিল্পাঞ্চলের আশপাশ, সরকারি খাসজমি এবং নগরের ছাদ—এসব জায়গা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি গাছের জন্য অন্তত তিন বছরের পরিচর্যা পরিকল্পনা থাকা দরকার।
করপোরেট খাত চাইলে এই কাজকে আরো স্বচ্ছ ও ফলাফলভিত্তিক করতে পারে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, জিও-ট্যাগিং, ডেটা বেইস বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিটি গাছের অবস্থান, প্রজাতি, রোপণের তারিখ, বৃদ্ধি ও পরিচর্যার তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে বৃক্ষরোপণ শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকবে না; বরং তা পরিমাপযোগ্য ও যাচাইযোগ্য কাজে পরিণত হবে।
কিন্তু শুধু করপোরেট অংশগ্রহণ দিয়ে এই আন্দোলন জাতীয় চরিত্র পাবে না। সাধারণ করদাতাকেও এর সঙ্গে যুক্ত করতে হলে রাষ্ট্রের করনীতিকে ব্যবহার করা যেতে পারে। করনীতি শুধু রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার নয়; এটি নাগরিক আচরণকে উৎসাহিত করারও একটি কার্যকর মাধ্যম। সরকার যেমন সঞ্চয়, বিনিয়োগ বা কিছু নির্দিষ্ট খাতে কর সুবিধা দিয়ে নাগরিকদের উৎসাহিত করে, তেমনি পরিবেশবান্ধব কাজকেও কর সুবিধার আওতায় আনা যেতে পারে।
এই জায়গায় একটি নীতি প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ উন্নয়নে ব্যয় করা অর্থকে কর রিবেটযোগ্য খাতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। যেমন—ডিপিএস বা সঞ্চয় স্কিমের মতো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য বৃক্ষরোপণ ব্যয়ের ওপর কর রিবেটের সুযোগ রাখা যেতে পারে। এতে মানুষ শুধু আবেগ থেকে নয়, অর্থনৈতিক প্রণোদনার কারণেও পরিবেশ সংরক্ষণে অংশ নিতে আগ্রহী হবেন।
তবে এ ধরনের সুবিধা চালু করতে হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কাগজে-কলমে গাছ দেখিয়ে কর সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না। এ জন্য একটি সহজ কিন্তু কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা দরকার। যে স্থানে গাছ রোপণ করা হবে, সেই এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ বা স্বীকৃত পরিবেশ সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি জিও-ট্যাগ করা ছবি, রোপণের তারিখ এবং পরবর্তী পরিচর্যার সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনও রাখা যেতে পারে।
এতে দুটি লাভ হবে। প্রথমত, কর সুবিধার অপব্যবহার কমবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব অর্থে পরিবেশ আন্দোলনের অংশীদার হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিদ্যালয়, পাড়া ও গ্রামের গাছের বৃদ্ধি চোখের সামনে দেখতে পারবে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই সবুজ অর্থনীতির পথে এগোতে চায়, তাহলে বৃক্ষরোপণকে আবেগ, অনুষ্ঠান ও প্রচারণার বাইরে এনে অর্থনীতি, করনীতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। রাষ্ট্র নীতিগত উৎসাহ দেবে, করপোরেট খাত ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি দেবে। সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নেবে—এই সমন্বয় তৈরি করা গেলে বৃক্ষরোপণ একটি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি থাকবে না; এটি জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি গাছ লাগানোর ছবি থেকে গাছ বাঁচানোর দায়িত্বে যেতে প্রস্তুত?
লেখক : রাজস্ব বিশ্লেষক ও নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ