• ই-পেপার

সুস্থ থাকতে নিয়মিত দুধ খেতে হবে

  • তামান্না চৌধুরী
  • প্রধান পুষ্টিবিদ, অ্যাপোলো হাসপাতাল, ঢাকা

জ্বালানি নিরাপত্তায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
জ্বালানি নিরাপত্তায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে
হোসেন জিল্লুর রহমান

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন চিন্তা ও সমন্বিত পরিকল্পনার আহবান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, পুরনো পদ্ধতিতে আর সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন ‘ইনোভেটিভ আইডিয়া’ ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের জ্বালানির ভবিষ্যৎ : নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা’।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি ল্যান্ড-বেইজড এফএসআরইউ স্থাপনের কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর সমাধান হতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিয়ে তিনি  আরো বলেন, সোলার এনার্জি বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা। শিল্প ও আবাসিক খাতে এর ব্যবহার বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এ জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল দরকার। এটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে পরিচালনা করা যেতে পারে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)। তিনি বলেন, একসময় সস্তা গ্যাস ও জ্বালানির কারণে দেশে শিল্পায়ন বেড়েছিল। এখন সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। তাঁর মতে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১০০ এমএমসিএফ গ্যাস উৎপাদন কমছে। সরকার এলএনজি আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, শিল্প ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকসের লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম। এতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

জ্বালানি নিরাপত্তায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের তাগিদ

 

বিশেষ লেখা

গাছ লাগানোকে করনীতির অংশ করা যায় কি

মো. জাহাঙ্গীর আলম

গাছ লাগানোকে করনীতির অংশ করা যায় কি

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। আমরা তা প্রতিদিনই দেখছি অস্বাভাবিক গরম, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা আর হঠাৎ বন্যায়। গ্রামের কৃষক যেমন এই পরিবর্তনের চাপ অনুভব করছেন, তেমনি শহরের মানুষও ছায়াহীন রাস্তা, দাবদাহ ও দূষণের মধ্যে তা বুঝতে পারছে। এই বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণ আর শুধু একটি সামাজিক বা নৈতিক কাজ নয়; এটি আমাদের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি জরুরি প্রয়োজন।

তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না। আমাদের বড় সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় উৎসব করে গাছ লাগাই, ছবি তুলি, সংবাদ করি; কিন্তু কয়েক মাস পর সেই গাছগুলোর কতটি বেঁচে আছে, তা আর কেউ খোঁজ নেয় না। তাই এখন প্রয়োজন বৃক্ষরোপণকে এক দিনের কর্মসূচি থেকে বের করে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও নীতিগত সহায়তার মধ্যে নিয়ে আসা।

এই কাজটি একা রাষ্ট্রের পক্ষে করা সম্ভব নয়। আবার শুধু সাধারণ মানুষের আবেগ দিয়েও একটি জাতীয় পর্যায়ের সবুজ আন্দোলন টেকসই করা কঠিন। এখানে দরকার তিনটি শক্তির সমন্বয়—সাধারণ মানুষ, করপোরেট খাত এবং রাষ্ট্রীয় নীতি।

শিক্ষার্থী, তরুণ ও সাধারণ মানুষ যেকোনো সামাজিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। তারা সচেতনতা তৈরি করে, পরিবার ও সমাজকে যুক্ত করে এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিবর্তনের সূচনা করে। কিন্তু এই অংশগ্রহণকে বড় পরিসরে নিতে হলে করপোরেট খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আছে অর্থ, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার করার সক্ষমতা এবং বহুসংখ্যক কর্মীকে যুক্ত করার সুযোগ।

বাংলাদেশের অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কর্মসূচির আওতায় নানা কাজ করছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের অনেকটাই খণ্ডিত, স্বল্পমেয়াদি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রচারণাকেন্দ্রিক। যদি সিএসআর তহবিলের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও গাছের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যায় বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে তা একটি কার্যকর জাতীয় সবুজ কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে।

গাছ লাগানোর জায়গা, প্রজাতি ও পরিচর্যার প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে-সেখানে গাছ লাগালেই পরিবেশ রক্ষা হয় না। স্থানীয় আবহাওয়া, মাটি, পানি এবং মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে দেশীয় প্রজাতির গাছ নির্বাচন করতে হবে। স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গণ, রাস্তার ধারে খালি জায়গা, খালের পার, নদীর পার, শিল্পাঞ্চলের আশপাশ, সরকারি খাসজমি এবং নগরের ছাদ—এসব জায়গা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি গাছের জন্য অন্তত তিন বছরের পরিচর্যা পরিকল্পনা থাকা দরকার।

করপোরেট খাত চাইলে এই কাজকে আরো স্বচ্ছ ও ফলাফলভিত্তিক করতে পারে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, জিও-ট্যাগিং, ডেটা বেইস বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিটি গাছের অবস্থান, প্রজাতি, রোপণের তারিখ, বৃদ্ধি ও পরিচর্যার তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে বৃক্ষরোপণ শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকবে না; বরং তা পরিমাপযোগ্য ও যাচাইযোগ্য কাজে পরিণত হবে।

কিন্তু শুধু করপোরেট অংশগ্রহণ দিয়ে এই আন্দোলন জাতীয় চরিত্র পাবে না। সাধারণ করদাতাকেও এর সঙ্গে যুক্ত করতে হলে রাষ্ট্রের করনীতিকে ব্যবহার করা যেতে পারে। করনীতি শুধু রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার নয়; এটি নাগরিক আচরণকে উৎসাহিত করারও একটি কার্যকর মাধ্যম। সরকার যেমন সঞ্চয়, বিনিয়োগ বা কিছু নির্দিষ্ট খাতে কর সুবিধা দিয়ে নাগরিকদের উৎসাহিত করে, তেমনি পরিবেশবান্ধব কাজকেও কর সুবিধার আওতায় আনা যেতে পারে।

এই জায়গায় একটি নীতি প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ উন্নয়নে ব্যয় করা অর্থকে কর রিবেটযোগ্য খাতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। যেমন—ডিপিএস বা সঞ্চয় স্কিমের মতো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য বৃক্ষরোপণ ব্যয়ের ওপর কর রিবেটের সুযোগ রাখা যেতে পারে। এতে মানুষ শুধু আবেগ থেকে নয়, অর্থনৈতিক প্রণোদনার কারণেও পরিবেশ সংরক্ষণে অংশ নিতে আগ্রহী হবেন।

তবে এ ধরনের সুবিধা চালু করতে হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কাগজে-কলমে গাছ দেখিয়ে কর সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না। এ জন্য একটি সহজ কিন্তু কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা দরকার। যে স্থানে গাছ রোপণ করা হবে, সেই এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ বা স্বীকৃত পরিবেশ সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি জিও-ট্যাগ করা ছবি, রোপণের তারিখ এবং পরবর্তী পরিচর্যার সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনও রাখা যেতে পারে।

এতে দুটি লাভ হবে। প্রথমত, কর সুবিধার অপব্যবহার কমবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব অর্থে পরিবেশ আন্দোলনের অংশীদার হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিদ্যালয়, পাড়া ও গ্রামের গাছের বৃদ্ধি চোখের সামনে দেখতে পারবে।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই সবুজ অর্থনীতির পথে এগোতে চায়, তাহলে বৃক্ষরোপণকে আবেগ, অনুষ্ঠান ও প্রচারণার বাইরে এনে অর্থনীতি, করনীতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। রাষ্ট্র নীতিগত উৎসাহ দেবে, করপোরেট খাত ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি দেবে। সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নেবে—এই সমন্বয় তৈরি করা গেলে বৃক্ষরোপণ একটি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি থাকবে না; এটি জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি গাছ লাগানোর ছবি থেকে গাছ বাঁচানোর দায়িত্বে যেতে প্রস্তুত?

লেখক : রাজস্ব বিশ্লেষক ও নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ

 

 

লজিস্টিকস খরচ ২৫% কমলে রপ্তানি আয় বাড়বে ২০%

ডিসিসিআই আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
লজিস্টিকস খরচ ২৫% কমলে রপ্তানি আয় বাড়বে ২০%

বিশ্ববাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে বিভিন্ন দেশ অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি লজিস্টিকস সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এতে তাদের খরচ কমে আসছে, রপ্তানিও বাড়ছে। অথচ এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘লজিস্টিকস খরচ ২৫ শতাংশ কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এমনকি পণ্য পরিবহন ব্যয় মাত্র ১ শতাংশ কমানো গেলে রপ্তানি বাড়তে পারে ৭.৪ শতাংশ।’

গতকাল শনিবার রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাণিজ্যনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন। ডিসিসিআই অডিটরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী বলেন, ‘দেশের লজিস্টিক খাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা রপ্তানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। বন্দরগুলোতে পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময়, সড়ক ও রেলপথে ধীরগতির পরিবহন ব্যবস্থা এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন সুবিধার অভাবে সামগ্রিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা ব্যয়বহুল ও মন্থর হয়ে পড়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে বন্দরে পেপারলেস ও অটোমেটেড ব্যবস্থা চালু, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিআইএম মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, ‘সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। এ খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহবান জানান তিনি।

মূল প্রবন্ধে ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশের জিডিপিতে উৎপাদনমুখী খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ, যা অনেক প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি। তবে উৎপাদনমুখী খাতের আরো সম্প্রসারণে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘গত চার দশকে দেশের রপ্তানিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও তা এখনো সীমিত কয়েকটি পণ্য ও বাজারের মধ্যে আবদ্ধ। তাই অর্থনীতিতে বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি, দুর্বল লজিস্টিকস কাঠামো এবং উচ্চ ব্যয় দেশের বাণিজ্য সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’ এ পরিস্থিতি উত্তরণে লজিস্টিক নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি ও দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বন্দর পরিচালনা, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাসের সময় কমানো এবং নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব (প্রাক্তন সদস্য, প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হওয়ায় রেলপথকে বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বাড়ানো গেলে কম সময় ও কম ব্যয়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।’ তিনি অন্তত একটি সমুদ্রবন্দর পরিচালনায় বেসরকারিখাতকে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাবও দেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, ‘বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাবে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।’ একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, ‘পানগাঁও বন্দরে স্ক্যানার না থাকায় উদ্যোক্তারা বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ নৌপথ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় শিল্পপণ্যের পরিবহন ব্যয় কমার পরিবর্তে বাড়ছে।’

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবী বলেন, ‘দেশের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি আধুনিক ও ডিজিটাল হয়নি। বিশেষ করে স্থলবন্দরগুলোতে ডিজিটাল ব্যবস্থা না থাকায় পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে এবং ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় বাড়ছে।’

এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, ধীরাশ্রম আইসিডি কনটেইনার ডিপো ও একটি মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব প্রকল্প বাস্তবায়নে এডিবি কাজ করছে। পাশাপাশি লজিস্টিকস সেবার প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি।

মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআই পরিচালক ইঞ্জি. এম এ ওয়াহাব, সাবেক পরিচালক এ কে ডি খায়ের মোহাম্মদ খান, ইএসজি প্রজেক্ট লজিস্টিকস (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবরারুল আলম এবং এএনবি লজিস্টিকসের প্রতিনিধি মোক্তার উদ্দিন মতি প্রমুখ অংশ নেন। অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

 

দেশি পেঁয়াজে রমরমা খাতুনগঞ্জ বাজার

সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা—সবাই এখন দেশি পেঁয়াজেই আস্থা রাখছেন ভারতীয় পেঁয়াজের জৌলুস কেড়ে নিয়েছে দেশের পাবনা, রাজশাহী ও ফরিদপুরের পেঁয়াজ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
দেশি পেঁয়াজে রমরমা খাতুনগঞ্জ বাজার

দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে দীর্ঘ কয়েক দশকের চিরাচরিত চিত্র বদলে গেছে। একসময় যেখানে ভারতীয় পেঁয়াজের দাপটে দেশি পেঁয়াজ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর ছিল, এখন সেখানে একচেটিয়া রাজত্ব চলছে দেশের মাটিতে উৎপন্ন পেঁয়াজের। স্বাদে ও গুণে অনন্য হওয়ায় এবং রান্নায় ঝাঁজ বেশি থাকায় সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা—সবাই এখন দেশি পেঁয়াজেই আস্থা রাখছেন। আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজের সেই জৌলুস কেড়ে নিয়েছে দেশের পাবনা, রাজশাহী ও ফরিদপুরের পেঁয়াজ।

চাষিদের সাফল্যে সয়লাব বাজার গতকাল শনিবার সকালে খাতুনগঞ্জ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আড়তগুলোতে এখন ভারতীয় পেঁয়াজের দেখা মেলাই ভার। ব্যবসায়ীরা জানান, দুই বছর ধরে দেশের চাষিরা পেঁয়াজ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছেন। বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ ও চাষিদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ ট্রাকেরও বেশি নতুন ও পুরনো পেঁয়াজ আসছে খাতুনগঞ্জের লামা বাজার এলাকার আড়তগুলোতে। মূলত ফরিদপুর, পাবনা, কুষ্টিয়া ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে নিয়মিত আসছে এই পেঁয়াজ।

স্বাদ ও গুণে এগিয়ে দেশি পণ্য রান্নায় ঝাঁজ ও সুগন্ধ বেশি হওয়ার কারণে ভোক্তাদের প্রথম পছন্দ এখন দেশি পেঁয়াজ। বাজারে এখন হালি পেঁয়াজ, পাতা পেঁয়াজ ও মেহেরপুরী পেঁয়াজের ব্যাপক চাহিদা। আড়তদারদের মতে, আমদানি করা পেঁয়াজের তুলনায় দেশি পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা অনেক বেশি। ফলে পচে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকায় খুচরা ব্যবসায়ীরাও এখন দেশি পেঁয়াজ সংগ্রহে বেশি আগ্রহী। একসময় আমদানীকৃত পেঁয়াজ ছাড়া বাজার কল্পনা করা না গেলেও সেই জায়গা এখন পুরোপুরি দেশি পণ্যের দখলে।

দাম এখন সাধারণের নাগালে, সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় পাইকারি বাজারে দামও এখন নিম্নমুখী। খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ আড়তদার নবী হোসেন জানান, বর্তমানে বাজারে কোনো সংকট নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় দামও গত সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বাজারে মানভেদে সাধারণ দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৭-২৮ টাকা কেজি দরে। আর একটু ভালো মানের এবং তাজা পেঁয়াজ মিলছে ৩০-৩২ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ৩৫-৩৮ টাকা ছিল।

পাইকারি বাজারে দাম কমায় তার সুফল মিলছে খুচরা বাজারেও। তবে খুচরা পর্যায়ে দামের ব্যবধান কিছুটা বেশি। সাধারণ ভোক্তারা প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় কিনতে পারছেন।

আড়ত ও খুচরা বাজারের দর পরিস্থিতি বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ (৪০ কেজি) দেশি ‘হালি’ প্রজাতির পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকায়। শীতকালীন ‘পাতা পেঁয়াজ’ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ টাকায়। এ ছাড়া মজুদ করা পুরনো দেশি পেঁয়াজের দামও রয়েছে দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ টাকার মধ্যে।

খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ কিনতে আসা খুচরা ব্যবসায়ী রহমান আলী বলেন, ‘আমরা পাইকারি বাজার থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ নিয়ে যাচ্ছি। পরিবহন ও দোকান খরচ মিলিয়ে এটি ৪০-৪২ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তবে ভারতীয় পেঁয়াজের চেয়ে দেশি পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রি ভালো হচ্ছে।’

স্বাবলম্বী হওয়ার পথে বাংলাদেশ বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশের এই সাফল্য কৃষি খাতের জন্য বড় একটি মাইলফলক। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশি পণ্য দিয়ে বাজার সয়লাব রাখা সম্ভব হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। খাতুনগঞ্জের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। পেঁয়াজ বাজারে ভারতীয় দাপট এখন অতীত, ভবিষ্যৎ শুধুই দেশি পণ্যের।

 

 

সুস্থ থাকতে নিয়মিত দুধ খেতে হবে | কালের কণ্ঠ