kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা

বিশ্বজিৎ ঘোষ   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ধর্মঘট চলাকালে পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত শওকত আলীকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি : বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে

১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬—এই কালখণ্ডে সংঘটিত হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই গোটা সময়েই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন—কখনো মুক্ত থেকে, কখনো বা কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায়। বদরুদ্দীন উমরসহ অনেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে অস্বীকার কিংবা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তিনটি গ্রন্থ এবং শেখ হাসিনা সম্পাদিত 'Secret Documents of Intelligence Branch on Father of the Nation Bangabadhu Sheikh Mujibur Rahman' শীর্ষক গ্রন্থের খণ্ডগুলো প্রকাশের পর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও ভূমিকার কথা সুস্পষ্টভাবে জানতে পারি।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বলতে সাধারণভাবে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির কথাই মনে আসে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস অনেক বিস্তৃত—১৯৪৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এর পরিধি। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কোনো মুহূর্তের বিষয় নয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিশাল প্রেক্ষাপটে আদি থেকে চূড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত অনেক নামের ভিড়েও একটি নাম উজ্জ্বলভাবে আমাদের সামনে আসে—সে নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন কারাগারে বন্দি—তাই বায়ান্নর আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে তাঁর ভূমিকা পালনের কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু বায়ান্নর আন্দোলনের আগে-পরে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সংশ্লিষ্টতা ছিল সরাসরি এবং প্রত্যক্ষ। মনে রাখতে হবে, এই আন্দোলনের যাঁরা পথিকৃৎ চিন্তক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদের অন্যতম; আর এ-ও মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণেই পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক সরকার তাঁকে বন্দি করেছে ১৯৪৯ সালের ২৯ এপ্রিল—এরপর একাধিকবার তিনি বন্দি হন। অবশেষে ১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর কারাগার থেকে তিনি মুক্তিলাভ করেন। মুক্ত অবস্থায় যেমন, তেমনি বন্দি থাকাকালেও নানা মাধ্যমে ও বিভিন্ন কৌশলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংগঠন ও ২১শে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট পালনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। নানা উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই ছিলেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি ও সংগঠনের প্রধান স্থপতি—এ কথা আজ ঐতিহাসিক সত্য।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু তারও পূর্বে, যখন পাকিস্তান সৃষ্টির কথাবার্তা চলছে, তখন বাংলাকে পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালের ৭ জুলাই কলকাতার ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর এই দাবি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২১ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন শিক্ষাবিদ নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক না কেন, বাংলায় রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলাকে—এমন দাবি তিনি উত্থাপন করেছিলেন। এরপর শুরু হয় উর্দু আর বাংলা নিয়ে বিতর্ক। এ সময় বিভিন্ন পত্রিপত্রিকায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রমথ চৌধুরী, মুহম্মদ এনামুল হক, মুজাফ্ফর আহমদসহ অনেক লেখক গবেষক রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি উত্থাপন করতে থাকেন। গণ-আজাদী লীগ, তমদ্দুন মজলিস, গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রভৃতি রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ছাত্রসংগঠনও নানাভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি উত্থাপন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৫০ মোগলটুলির ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের কর্মী শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য যে কজন ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি উত্থাপন করেছিলেন, ইতিহাসের ধারাক্রমে আজ তা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবেই বিবেচ্য।

তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষাসংক্রান্ত সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব বাংলার প্রথম অসাম্প্রদায়িক যুব প্রতিষ্ঠান ‘পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ’। সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব পাঠ করেন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বলেন : ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনসাধারণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’ এর আগে গণ-আজাদী লীগও ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে ঘোষিত তাদের আশু দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার প্রস্তাব করে। কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমান গণ-আজাদী লীগের রাষ্ট্রভাষাসংক্রান্ত এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করলে এবং বাংলা ভাষা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য প্রকাশ করলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে প্রতিবাদস্বরূপ স্বাক্ষর অভিযান শুরু হয়। ফজলুর রহমানকে ধিক্কার জানিয়ে কয়েক হাজার মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়। এই কর্মসূচিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর পূর্ব বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউসে (বর্তমান বাংলা একাডেমি) বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে কি, হবে না—এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যই এই সভার আয়োজন। বৈঠক চলাকালে বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিকর্মী-শিক্ষক-ছাত্ররা বর্ধমান হাউসে মিছিল সহকারে উপস্থিত হন। মিছিলে একটাই মাত্র স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। অন্যান্যের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান মিছিলে নেতৃত্ব দেন এবং বজ্রকণ্ঠে স্লোগান উচ্চারণ করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন গণতান্ত্রিক যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকরা নানা কৌশলে বাংলা ভাষাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। হরফ পরিবর্তন ছিল তাঁদের চক্রান্তেরই একটা অংশ। ফজলুর রহমান আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করলে ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে পূর্ববঙ্গের ১৪ জন প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠক বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিসহ ২১ দফাসংবলিত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। ওই পুস্তিকার ২১ দফার মধ্যে ষষ্ঠ দফাটি ছিল রাষ্ট্রভাষাসংক্রান্ত। এই পুস্তিকা প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমান প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং পুস্তিকায় ১৪ জনের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা ও উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ১৯৪৭-১৯৫২ কালপর্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সফল করার জন্য শেখ মুজিবই সংগঠনের সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার সময় সর্বসম্মতভাবে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। ১০ দফার মধ্যে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ছিল উল্লেখযোগ্য।

১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অগ্রসেনানীর ভূমিকায়। এ বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন আরম্ভ হয়। ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাব করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। খাজা নাজিমুদ্দীন গণপরিষদে ডাহা মিথ্যা বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের বেশির ভাগ অধিবাসীরই মনোভাব হচ্ছে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা।’ খাজা নাজিমুদ্দীনের এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশেই সেদিন ছাত্রলীগ সর্বশক্তি দিয়ে খাজা নাজিমুদ্দীনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করে।

খাজা নাজিমুদ্দীনের বাংলা ভাষাবিরোধী বক্তব্যে ক্ষুব্ধ ছাত্রনেতারা ১৯৪৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করে। এই ধর্মঘট সফল করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো এবং প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তব্যের প্রতিবাদে ১১ মার্চ সমগ্র পূর্ব বাংলায় ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১১ মার্চ সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ছাত্র ধর্মঘটে পিকেটিং করার সময় অনেকের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছাত্র ধর্মঘট সফল করার জন্য তিনি ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল জেলায় ছাত্র সমাবেশ করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৫ মার্চ মুক্তি দেওয়া হয়। ১৬ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। পরের বছর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয় এপ্রিল মাসে। ১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু জেলে বন্দি ছিলেন। জেলে থেকেও নানাভাবে তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বন্দি অবস্থায় ঢাকা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু ভর্তি হলেন। ওখানে এসেও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে তিনি মিলিত হয়েছেন, অনশন ধর্মঘট করেছেন, চিরকুটের মাধ্যমে নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পরে বঙ্গবন্ধু অনেকটা এককভাবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। এই ঐতিহাসিক সত্য অন্যত্র আমরা বিশদভাবে উল্লেখ করেছি। এই ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করা জ্ঞানপাপী ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়।