এই গানের [ও রে নীল দরিয়া] জন্য আমাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তবে জীবনের সার্থকতা, সারা পৃথিবীর বাঙালি গানটি গায়, তারা আমাকে পুরস্কার দিয়েছে। বহু ছবিতে পুরস্কার পাইনি—এগুলোই আমার অতৃপ্তি। তবে জনগণের কাছ থেকে আবার পুরস্কার পেয়েছি। যেমন ‘রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই’ গানটির জন্য পুরস্কার পাইনি, প্রাণ সজনীর জন্য পাইনি, যেগুলো পাওয়া উচিত ছিল। পাইনি, এর কারণ এখনকার মতো তখনো কিছু হতো। [হাসি] আর আমার কপাল। এমন কিছু পুরস্কার পেয়েছি, যেগুলো আশাও করিনি। সাতবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। এর মধ্যে চার-পাঁচটিতে তৃপ্ত যে ঠিক আছে, ঠিক পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলো নিজেই জানি না কিভাবে পেলাম, কেন দিল? অর্থ খুঁজে পাইনি এটি একটি দুর্ভাগ্য যে আপনার সম্পর্কে তথ্য কম। কোনো এক রিপোর্টার আমার খারাপ কিছু খুঁজে বের করে সেগুলোই শুধু লিখত। তাকে ডেকে বোঝালাম, তুমি লেখো সমালোচনা। সমালোচনা মানে তো সমান আলোচনা; ভালো এবং মন্দ দুটো দিকই লিখবে, তাহলে খারাপই কেন লিখবে? ‘নীল দরিয়া’সহ যেসব ভালো ভালো কাজ করেছি, সেগুলোর কথা বলো না কেন? তখন চুপ করে থাকে। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হলো এবং বলে দিলাম, আমার কোনো রিপোর্টিং আর করবে না। সে বলল, রিপোর্টিং দিয়ে তো মানুষ ওপরে ওঠে। বললাম, না, আমি দেখব, কর্ম দ্বারা ওপরে উঠতে পারি কি না। সেই থেকে ১০-১৫ বছর আমার কোনো রিপোর্টিং মার্কেটে আসেনি, আসতে দেইওনি। সাংবাদিকরা এলে ফিরিয়ে দিয়েছি। এই ১৫ বছর অভিমান করে কোনো ইন্টারভিউ দেইনি। শেষের দিকে কবির বকুল এলো। ও আবার আমার খুব ভক্ত। সে পটিয়ে ফেলল, ভাই দেন। ইদানীং তাই কিছু সাক্ষাত্কার দিই। [দীর্ঘশ্বাস] একেবারে স্বর্ণসময়ে মিডিয়াকে নিজে থেকে অ্যাভয়েড করেছি। রিপোর্টারের নাম এখন আর বলব না, সেও তো বুড়ো হয়ে গেছে। তাহলে আপনার কাজের কথা লোকজন কিভাবে জানত? আমার মূল মিডিয়া ছিল রেডিও, ওই যে নাজমুল হোসেন—‘হ্যাঁ ভাই, আলম খান, মেলোডি কিং’, এসব বলে সে কাঁপিয়ে দিত, সেগুলোই যথেষ্ট ছিল। তখন মিডিয়া বলতে তো রেডিও আর টেলিভিশন—এ দুটোই ছিল। এই গানের জীবনটি শুরু থেকে শুনতে চাই। আমাদের পাড়ায় রতন ভাই বলে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর অর্কেস্ট্রা গ্রুপটি ভালো ছিল। জলতরঙ্গ [চীনা মাটির বাটিতে পানি ভরে স্টিক দিয়ে বাজানো হতো, এটি এখন চলে না। কারণ কিবোর্ডের ভেতরেই এগুলো আছে।], মাউথ অর্গান, ব্যাঞ্জো, হাওয়াইন গিটার ইত্যাদি দিয়ে তিনি গ্রুপটি তৈরি করেছিলেন। পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাঁর কাছে গিয়ে বসে থাকতাম। একদিন বললেন, ‘গানবাজনা শিখবি?’ বললাম, শেখার জন্যই তো বসে থাকি। তিনি বললেন, ‘কাল আসিস।’ গেলাম। তাঁর হাতেই হাতেখড়ি। কলোনি থেকে কমলাপুর চলে এসে গান শেখা শুরু। গানবাজনা যারা জানে, আমি তেমন লোকজনকে বন্ধু বানাতাম। একসঙ্গে গান শিখতাম, অলোচনা করতাম। তারপর? আব্বা যখন দেখলেন লেখাপড়ার দিকে মন নেই, মারধরও করলেন। সেন্টিমেন্টাল হয়ে মাকে বললাম, যদি গান করতে না দাও তাহলে রেললাইনের নিচে গিয়ে আত্মহত্যা করব। আম্মা আব্বাকে বলে দিলেন। তিনি ভয় পেয়ে [হাসি] বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, ও যা করতে চায় করবে। বুদ্ধি করে আব্বার কাছে দুই হাজার টাকা চেয়েছিলাম। তখন এটি তো দুই লাখেরও অনেক বেশি। এক টাকা দিয়ে সংসারের বাজার করা যেত, স্বর্ণের ভরি বোধ হয় এক শর সামান্য বেশি ছিল। আব্বার কাছেও এ বিরাট ব্যাপার, তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সৎ অফিসার ছিলেন। আব্বা বললেন, এত টাকা? বললাম, এর কমে হবে না। তিনি টাকা দিলেন এবং তা দিয়ে হারমোনিয়াম, সেতার, গিটার, হাওয়াইন গিটারসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র কিনে ফেললাম। রেওয়াজ শুরু হলো? বাড়ির সামনে রেওয়াজের রুম করলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুরু করতাম। নাশতা, গোছল-খাওয়া, ঘুম এবং আনুষঙ্গিক কাজ বাদে সারাক্ষণ রেওয়াজ করতাম, গানের সঙ্গে থাকতাম। আশপাশের বাসার লোকেরা বলত, ছেলেটি পাগল হয়ে গেছে। অনেকে মা-বাবাকে অভিযোগও করত, সারা দিন অ্যাঁ অ্যাঁ করে, চিল্লায়। ব্যাপার কী? ছেলেকে সামলান না? তারা বলতেন, ‘ও ভালোবাসে, করতে দেন।’ লোকের কথা যাতে শুনতে না হয় সে জন্য জানালা বন্ধ করে দিতাম। [হাসি] এটিই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট, যার জন্য আমি এখানে। গানবাজনার জন্য যে পরিশ্রম করেছি, কোনো মানুষ লেখাপড়ার জন্যও এত করে না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘুম ইত্যাদিতে যদি ৮-১০ ঘণ্টা ব্যয় হয়, বাকি ১৪ ঘণ্টার ১২ ঘণ্টা তো প্র্যাকটিসই করতাম, না করলে মন ভরত না। তখন আবার আব্বা সাপোর্ট দিলেন, যখন এ লাইনেই আসতে চাও, শিক্ষা নিতে হবে। সব কিছুই শিখতে হয়। বুদ্ধি দিয়েছিলেন, একজন বড় ওস্তাদ ধরো, না হলে হবে না। ওস্তাদ ছাড়া হয় না। ননী চ্যাটার্জির কাছে নিয়ে গেলেন। কবি জসীমউদ্দীন কি কোনো প্রভাব ফেলেছিলেন? হ্যাঁ। তাঁর ছেলে ফিরোজ আমার বন্ধু ছিল। তাঁর বাসায় যাওয়া-আসা ছিল। বৃহস্পতিবার, ছুটির দিনগুলোতে তাঁর বাসায় গানের আসর বসত। সেখানে আগেকার দিনের শিল্পী ওসমান খান, রেজাউদ্দিন আহমেদ গাইতেন। গানগুলোও ছিল তাঁর লেখা, ফোক গান। গিয়ে বসে থাকতাম, ভালো লাগত। তিনি জানতেন, আমি একটু গানবাজনা করি। [হাসি] দেখলেই বলতেন, ‘আলম, আয়, বয়। কী করতাছস?’ ফরিদপুরে বাড়ি তো, সে ভাষায় কথা বলতেন। তিনি বলতেন, ‘কী গানবাজনা শিখস?’ বলতাম, আমি তো আধুনিক...কবি বলতেন, ‘গ্রামের গান, দেশের গান শিখতে পারছ না?’ বললাম, গ্রামের গানও আমি শিখতে চাই। শিখমু? তিনি বলতেন, ‘ওটা শিখ, ওটাই আমাদের আসল, রক্তের গান। আধুনিক, ইংলিশ গান—ওগুলো তো বিদেশি, দেশেরটি শিখ।’ মনে মনে বলতাম, আপনি তো দেশের কথা বলবেনই, আপনি পল্লীকবি। [হাসি] অবচেতন মনে এখন বুঝতে পারি, ফোক গান করার উৎসাহ তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। বিকেলে তিনি হাঁটতে বেরোতেন। আমার কাঁধে হাত রেখে হাঁটতেন। দেখতে সুন্দর ছিলাম, তার ওপর তাঁর সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ছিল আমি তাঁর ছেলের বন্ধু। সে হিসেবে পছন্দ করতেন, আদর করতেন। গান করি বলে সাজেশন দিয়েছিলেন, ‘পল্লী গান কর।’ বাস্তবে আমি পল্লী গানই করলাম। যত গান করেছি—‘কি জাদু করিলা’, ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুশ’, ‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে’, ‘ও রে নীল দরিয়া’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’—সবগুলোতে পল্লীর সুর মেশানো, সব কিন্তু ফোক। আমার বেশির ভাগ গানই ফোকের ওপর জোর দেওয়া। মানুষ মনে করে, আলম খান আধুনিক গান ভালো করেন। আসলে ফোক মেশানো গান বেশি ভালো করি; কিন্তু সেটি বোঝা যায় না। কারণ ফোকটি সম্পূর্ণ আমার সত্তা অনুযায়ী তৈরি করি। ফলে আমার কোনো ফোক গান কোনো পল্লী গানের সঙ্গে মিলবে না। কেন? আমি শিখেছি। আরেকজনের সুরের ওপরে কথা বসাব কেন? এখন যারা সুর করে, ওই যে ওমুক ছাড়া হয় না ওমুক...ওরা তো আরেকটি গানের সুরের ওপর কথা বসায়। এতে সুর তো একই রইল। সুরের সংখ্যা তো বাড়ল না, সুরের পরিমাপ তো বাড়ল না। নাকি বাড়ল? আমার ভাবনা ছিল, ওই লোকটি ১০০ বছর আগে ফোক সুর করতে পেরেছে, তাহলে আমি এখন পারব না কেন? আমি তো আরো আগে যেতে চাই, চেষ্টা করতে চাই, আগের টিপিক্যাল ফোকে চলে যেতে চাই; কিন্তু শরীর ভালো না। দেখি, আল্লাহ যদি হায়াত দেন তাহলে যাব। ফোকটিকে ব্লেন্ড করে আমি আমার মতো করে নিই। এসব গানের সুর অন্য কোনো ফোক গানের সুরের সঙ্গে খুঁজে পাবে না, গান কিন্তু ফোকই থাকে। গায়ক না হয়ে সংগীত পরিচালক কিভাবে হলেন? প্রথমে গায়কই হতে চেয়েছিলাম। পরে যখন নিজেই বুঝতে পারলাম, টেপে গলা রেকর্ড করে নিজেকে জাজ করলাম, দেখলাম, এ গলা চলবে না। বয়স তখন ২০-২২, এর আগ পর্যন্ত চিন্তা ছিল, গায়ক হব। মূল ডেস্টিনেশন ওটিই ছিল। পরে দেখলাম, না, আমার গলা ফাঁপা, কিছুটা কাঁপে এবং ডিফেক্ট আছে। ভয়েস সম্পর্কে আমি খুব ভালো বুঝি যে কোন ভয়েসটি মার্কেটে এলে লিফট নেবে। এ ব্যাপারে আমার চয়েজ খুব ভালো। এ জন্যই ২০-৩০ জনের ওপরে কণ্ঠশিল্পীকে প্রোডিউস করেছি, বুঝতে পেরেছি, এ গানে আসতে পারবে। এই জ্ঞানটি খুব কম লোকের হয়। ফেরদৌস ওয়াহিদ আমার আবিষ্কার, আগুন, খালিদ হোসেন মিলু, আরেকটি মেয়ে ছিল না? এখন নেই, রুলিয়া রহমান, ইফফাত আরা নার্গিস, শেখ ইশতিয়াক, আজম খানও আমার ছায়াছবিতে প্রথম গান করেছে। ‘ঘর ভাঙা ঘর’ ছবিতে ও আমার গান করেছে। কথা ছিল—‘মানুষ নামের খেলনা বানাইয়া’। এমন আরো অনেক আছে, এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। কণ্ঠ ভালো লাগলে ধরনা দিতে হয় না, আমিই ডেকে নিয়ে আসি। নীল দরিয়া পল্লী গান হয়েও এত আধুনিক কেন? ওটা তো মিউজিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট, সুরের মধ্যেও এক্সপেরিমেন্ট আছে। সারেং যে যে পরিবেশে আসবে, সেগুলোর ইফেক্ট দিয়েছি। যখন সাম্পানে আসবে, তখন বৈঠা-পানির আওয়াজ দেওয়া হয়েছে। যখন ট্রেনে এসেছে, ট্রেনলাইনের ইফেক্ট, গ্রামে যখন এসেছে, লাউয়ের টু টু শব্দ দিয়ে সে পরিবেশ বোঝানো হয়েছে। এতে জাস্ট আমি এক্সপেরিমেন্ট করেছি। এমন অনেক গান আছে, মানুষ বুঝতে পারে না। যেমন রেডিওতে করেছিলাম, ‘এই তো এই চলে গেল কিছুটা সময়, সৌরজগৎ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে।’ বর্তমান বলে কিছু নেই—ভাবনাটি আমার গীতিকার মুকুল চৌধুরীকে বোঝালাম। সে বলল, দারুণ সাবজেক্ট, কয়েক দিন সময় দাও। বললাম, নাও। গান লেখার পর ভাবলাম, কী করা যায়? আগেকার দিনে দেয়াল ঘড়ির ঘণ্টা বাজলে ঢং ঢং আওয়াজ হতো, সেকেন্ডের কাঁটা টিক টিক করে ঘুরত না? সাবিনা ইয়াসমীনের গাওয়া, আগেকার দিনের খুব জনপ্রিয় এই গান এখনো অনেকের প্রিয়। গানটিতে মাত্র দুটি ইনস্ট্রুমেন্ট ইউজ করেছি, ঢং ঢং, টিক টিক টিক; টাইম ক্রস করছে। এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আরো অনেক করেছি—পদ্মার তীরে [সিরাজগঞ্জ] আমার ঘরবাড়ি ছিল, নদী ভাঙে, গানের মধ্যে সে ইফেক্ট আছে; তারপর শহরে চলে আসি, গানে শহরে আসার ইফেক্ট দিয়েছি। প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট করেছি; কিন্তু মানুষ এগুলো বোঝে না। একটি গান ছিল, ‘কখন ছুটি হবে, কখন বাজবে সেই ঘণ্টা’, আবদুর রউফকে দিয়ে গাইয়েছিলাম। এর মানে, ছোটবেলায় স্কুলের ঘণ্টা বাজলে মানুষ খুশি হয়; কিন্তু শেষজীবনে যখন মৃত্যুর ঘণ্টাটি বাজে, তখন কী হয়? স্কুলের ঘণ্টা দিয়ে গান শুরু করলাম আর শেষের দিকে বিরাট বড় ঘণ্টা বাজছে। ছোটবেলার সঙ্গে জীবনের শেষ ঘণ্টা দিয়ে মিল করে ফেললাম। জানলেন যে এ গলা চলবে না, তারপর? তখন চিন্তা করলাম, মিউজিশিয়ান হব। তখন তো এই কিবোর্ড ছিল না, বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে হাওয়াইন গিটার, ব্যাঞ্জো, শিখলাম। বহু ওস্তাদ আমার। সারা দিন ঘুরে ঘুরে শিখতাম যে এটি কিভাবে বাজাতে হয়? যেখানেই গান, সেখানেই আমি পাগল হাজির। শিখতে শিখতে একটি অর্কেস্ট্রা গ্রুপ তৈরি করলাম। নাম দিলাম ‘ঋতু শিল্পীগোষ্ঠী’। তখন ক্লাস এইট-নাইনে পড়ি, অ্যামেচার ওয়েতে বিভিন্ন ফাংশনে বাজাতাম। আমাদের সঙ্গে ছোটু মিয়া ‘ম্যারাক্কাস’ বাজাত। ওই যে নারিকেলের মতো গোল, ঝিক ঝিক করে, সেই বাদ্যযন্ত্র। নাটকে কাজের শুরু কিভাবে? ওর আবার এক নাট্য পরিচালকের সঙ্গে পরিচয় ছিল। এর আগে অন্য সোর্সে জীবনের প্রথমে নাটকের সংগীত পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলাম; কিন্তু প্রযোজক বললেন, আপনার মিউজিক ভালো না, চলবে না। বাদ হয়ে গেলাম। এমন ঘটনা অনেক আছে। জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রথমবার ব্যর্থ হয়েছি। এফডিসিতে প্রথম যেদিন গেলাম, দারোয়ান ঢুকতে দিল না। ব্যাঞ্জো বাজাতাম, স্টেজে অর্ধেক বাজানোর পর তার ছিঁড়ে গেল। রেডিওতে অডিশন দিতে গেলাম, বলল, বাদ। প্রথমবার সব বিফলে গেছে। তখন ওই কবিতাটি ভেতরে খেলত—একবার না পারিলে দেখ শতবার। পারব না কেন? আর করবই বা কী? তারপর কী হলো? ছোটু মিয়া বলল, আমার এক ভাই আছে, এজাজ খান, নাটকের ডিরেকশন দেয়। তোমার কথা বলেছি, সে তোমাকে সুযোগ দিতে চেয়েছে। ‘ভাড়াটে বাড়ি’, আমার জীবনের প্রথম নাটক। সম্মানী হিসেবে ৬৫ টাকা পেলাম। মিউজিশিয়ানদের দিয়ে নিজের কাছে বোধ হয় ২০-২৫ টাকা ছিল। এই আমার জীবনের প্রথম আয়। এটি ১৯৬৫ সালের ঘটনা। এরপর এজিবি কলোনিতে অফিসের অনেক মঞ্চনাটকে কাজ করেছি। আর টেলিভিশনে ব্রেক পেলেন কিভাবে? সাকিনা সারোয়ার টেলিভিশনে প্রোডিউসার ছিলেন। তিনি একটি চিলড্রেনস প্রোগ্রামে বাচ্চাদের গান করার সুবিধা দেন। সেটিও সাকসেসফুলি করি, ১৯৬৭ সালের ঘটনা। এখনো মনে আছে—‘কসমস, ডালিয়া, ফুটেছে কত ফুল’ গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এরপর মোস্তাফিজুর রহমানকে দিয়ে টিভিতে একটি গান করার সুযোগ পেলাম। ‘ও মাধবী গো’ গেয়েছিলেন রওশন আরা মোস্তাফিজ, তাঁর স্ত্রী। গানটি মার মার কাট কাট হলো। এরপর আমাকে পিক করলেন আবদুল্লাহ আল-মামুন। তাঁর সংশপ্তক নাটকের টাইটেল সং তো আপনার। এখনো ওই মিউজিকই বাজায় এবং রয়্যালটিও দেয়। সংশপ্তকের আগে তাঁর সঙ্গে মঞ্চেও কাজ করেছি—‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘ইডিয়ট’। সংশপ্তকের আগে বললেন, ‘একটি টাইটেল মিউজিক করবি, যাতে মানুষ শুনলেই দূর থেকে দৌড়ে আসে, এই শুরু হয়েছে সংশপ্তক।’ এরপর বললেন, ‘তুই পারবি।’ প্রথম আমাকে তুই তুই বলতেন, পরে তুমি বলতেন। তাঁর ‘সখী তুমি কার’, ‘সারেং বৌ’—আরো অনেক ছবিতে কাজ করেছি। সিনেমায় মিউজিশিয়ান হিসেবে কাজ? ননী চ্যাটার্জির সঙ্গে প্রথম উর্দু ‘পুনম কি রাত’ ছবিতে অ্যাসিস্ট করি, ১৯৬৮ সালের ঘটনা। পাশাপাশি সংগীত পরিচালক প্রয়াত করিম শাহাবুদ্দীনের সঙ্গে অ্যাসিস্ট করেছি। তাঁর অনেক সুপারহিট গান আছে। একটির নাম বলি—‘সাগরের তীর থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে।’ তিনি আমার ওস্তাদ, এই গানেও অ্যাসিস্ট করেছি। সত্য সাহা, রবীন ঘোষের সঙ্গে অ্যাসিস্ট করেছি। বাংলাদেশের শুরু থেকে সমর দাস থেকে এ দেশের এমন কোনো বিখ্যাত সংগীত পরিচালক নেই, যাঁর সঙ্গে মিউজিশিয়ান হিসেবে কাজ করিনি। কমল দাশগুপ্ত এখানে দুটি ছবির ডিরেকশন দিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গেও বাজিয়েছি। এত সংগীত পরিচালকের অভিজ্ঞতা আমার ভেতরে আছে। কে কিভাবে কাজ করতেন, কে টিউনে-কম্পোজিশনে কোন টেকনিক অ্যাপ্লাই করেন—সব অভিজ্ঞতা আমার আছে। ভূপেন হাজারিকার সঙ্গেও বাজিয়েছি, আবিদা সুলতানা যে গানটি গেয়েছে—‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’, সেটি আমাদের এখানে ইন্দিরা রোডে রেকর্ড করা। আমরা মিউজিশিয়ান ছিলাম। ছবির সংগীত পরিচালনায় কিভাবে এলেন? আমার বন্ধু ছিল রুমু খান, তার বাবা আবদুল জব্বার খান আমাদের ছায়াছবির জনক। তাঁর ‘কাচ কাটা হিরে’ ছবিতে প্রথম সংগীত পরিচালনার সুযোগ পাই। তার পর থেকে আমি সাকসেস। এই পর্যন্ত তিন শর ওপরে ছবি করলাম। সবই করেছি, ফোক, মাটির গান, রক—সবই করেছি। ‘সারেং বৌ’ ছবির গল্প? তিনি [আবদুল্লাহ আল-মামুন] আমার বাসায় এলেন। আমাকে আর মুকুল চৌধুরীকে বইটি দিয়ে বললেন, পড়ে নিয়েন। পড়ার পরে সিচুয়েশনগুলো বললেন। সেখানে গানও ছিল। ‘হীরামতি, হীরামতি’ গানটি শহীদুল্লা কায়সারের লেখা, বইতেও আছে। এই গানে হাত দেইনি। যা লিখেছেন, তা-ই সুর করেছি। বাকিগুলো মুকুল চৌধুরী লিখেছে, নীল দরিয়া...খুব সুন্দর লিখেছে। এটির পরিবেশের সঙ্গে মিউজিকটি অ্যাডজাস্ট করা আছে, বললাম তো। আর সুরের ব্যাপারে বলি, ১৯৬৯ সালে একটু অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। খিদে লাগত না, নানা রকম শারীরিক অসুবিধা ছিল। বি-চৌধুরীর [ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী] ট্রিটমেন্টে ছিলাম। একদিন বিকেলে একটু সুস্থ ফিল করছি, গুনগুন করে সুরটি এলো। তবে কোনো জায়গায় ব্যবহার করার সুযোগ পাইনি, সারেং বৌতে পেলাম। অ্যাকচুয়ালি যেটি চিন্তা করেছিলাম, যাঁরা গানবাজনা জানেন, তাঁরা বুঝবেন—এতে ভূপালি, বিলাবল—এ দুটি রাগের সঙ্গে আমাদের মাটির সুরের মিশ্রণ করেছি। আমার মনে হয়, এর জন্যই এটি এত জনপ্রিয়, এগুলোরই ফসল গানটি। একটি স্যাড দিক হলো, এই গানের জন্য আমাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তবে আমার জীবনের সার্থকতা, সারা পৃথিবীর বাঙালি গানটি গায়, তারা আমাকে পুরস্কার দিয়েছে। বহু ছবিতে পুরস্কার পাইনি—এগুলোই আমার অতৃপ্তি। তবে জনগণের কাছ থেকে আবার পুরস্কার পেয়েছি। যেমন—‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই’ গানটির জন্য পুরস্কার পাইনি, ‘প্রাণ সজনী’র জন্য পাইনি, যেগুলো পাওয়া উচিত ছিল। পাইনি, কারণ এখনকার মতো তখনো কিছু হতো [হাসি] আর আমার কপাল। এমন কিছু পুরস্কার পেয়েছি, যেগুলো আশাও করিনি। সাতবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। এর মধ্যে চার-পাঁচটিতে তৃপ্ত যে ঠিক আছে, ঠিক পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলো নিজেই জানি না কিভাবে পেলাম, কেন দিল? অর্থ খুঁজে পাইনি। তার পরও ভেবেছি যে ঠিক আছে, পুরস্কার দিয়েছে, নিয়ে আসি। অপমানও করা যায় না। রাষ্ট্রীয় সম্মান দিচ্ছে, রিফিউজ করি কিভাবে? অপমান করা হয় না? এটা তো করতে পারি না; কিন্তু যদি অ্যাকচুয়ালি পুরস্কার পেতাম, তাহলে আমার ১৫-২০টি জাতীয় পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল। আমার ধারণা ভুল হতে পারে। কারণ ওই সময় আরো ভালো সুর ছিল, সেগুলোকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, রজনীগন্ধা গানটির জন্য সাবিনা ইয়াসমীন পুরস্কার পেল, গীতিকার মাসুদ করিমও পুরস্কার পেল। আমি কী দোষটা করলাম? লেখাটিই ভালো হলো আর গাওয়াটিই ভালো হলো, সুরটি ভালো হলো না? তাহলে কিভাবে ওরা পুরস্কার পেল [হাসি]—এটিই আমার প্রশ্ন। আর রেডিওর জীবন? প্রত্যেকে রেডিওতে আগে কাজ করে; কিন্তু আমি কাজ করি পরে। ১৯৬৭ সালে টেলিভিশনে কাজ করেছি, রেডিওতে করলাম ১৯৭৬ সালে। তখন আমি ছায়াছবির সঙ্গে সম্পূর্ণ জড়িত। ফলে দেশাত্মবোধক গান করার সুযোগ কম পেয়েছি। এমন গান করিনি তা নয়, অনেক করেছি; ছায়াছবিতেও আমার দেশাত্মবোধক ‘এই মাটি আমার সোনালী স্বপ্নে আঁকা’ ইত্যাদি অনেক ভালো গান আছে। কিন্তু রেডিও-টেলিভিশনে তখন অন্যদের মতো এমন গান করার সুযোগটি পাইনি। ছায়াছবির গান করা তো ভীষণ কঠিন। ওরা সব সময় সিচুয়েশন বেঁধে দিত। আমি একটু বেরোতে চাইতাম। সোহেল রানার ‘নাগ পূর্ণিমা’, এটি তো সাপের ছবি। চিন্তা করলাম, সারা জীবন তো খালি ছবির গল্পের ভেতরেই থাকি, সাপের গীত থাকে, তেমন মিউজিক দিতে হয়। তখন তাঁর সঙ্গে আলোচনা করলাম। তিনি বললেন, আমি তো এক্সপেরিমেন্টে রাজি। বললাম, পুরো রক কাট দেব। এক্সপেরিমেন্ট করে ‘তুমি যেখানে আমি সেখানে’ গানটিতে ওয়েস্টার্ন রিদম, ড্রাম সেট দিয়ে অন্য রকম ইফেক্ট দিয়ে ব্যাকআপ তৈরি করে, খুব সিম্পল বাঁশি দিয়ে মিউজিকটি দিলাম। গানটির ভেতর নতুনত্ব দিয়ে এই বেরিয়ে গেলাম। বহু গানে এমন চেষ্টা করেছি, সাকসেসফুল হয়েছি। কিভাবে গান তৈরি করতেন? সাধারণত গান লেখার পর সুর বসে। কিন্তু আমি ম্যাক্সিমাম গান যেমন নীল দরিয়া সুরের ওপর লিখেছি। আগে সুর করতাম। সেই সুরের ওপর গীতিকারদের লিখতে হতো। এ জন্য অনেক গীতিকার পালিয়ে যেত, আমার কাছে আসত না। প্রথমে আমরা কিছু রাগ, কর্ড চুজ করতাম। তারপর সুর হতো। আমার অনেক গীতিকার ছিলেন। নিয়মিত গীতিকার মুকুল চৌধুরী। তবে কেবল সৈয়দ শামসুল হকের গানের কথার ওপর সুর করেছি। তিনি তো আমার মুরব্বি। একজন গীতিকারের বাসায়ই গিয়ে গান করতাম, তিনি সৈয়দ হক। আর সবাই আমার বাসায় গান লিখতে আসত। তাঁকে খুব সম্মান করতাম। তাঁর বাসায় হারমোনিয়াম, তবলা—সব ছিল। তিনি বলতেন, আলম এই যে, এটির সুর করেন তো বলে মুখটি দিতেন। সুর করলে ‘হয়েছে?’ বলে ভেতর থেকে এসে বলতেন, এই যে নেন অন্তরা। পুরো গান একসঙ্গে দিতেন না। সুর ঠিক আছে কি না শুনতেন, চুজি ছিলেন। দুজন শিল্পী আমার বাসায় আসত না—রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমীন। ওরা কারো বাসায় আসত না, ওদের বাসায় গিয়ে গান শেখাতে হতো। আগে তো স্টুডিওতে বসে গান শিখলাম, রেকর্ডিং করলাম—তা ছিল না। তিন দিন আগে শিল্পীরা গান শিখতে আসত। লজিক হলো—এই তিন দিন সে গানটি গুনগুন করবে, গান তার আত্মার সঙ্গে মিশে যাবে। ফলে সে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে গানটি নিজের মতো করে গাইবে। রেকর্ডিংয়ের মিনিমাম তিন দিন আগে গান শিখিয়ে দিতাম, এটি আমাদের দায়িত্ব ছিল। রুনা-সাবিনা বাদে যত বড় শিল্পী হোক, বাসায় আসত। [হাসি] খুরশিদ আলম, মাহমুদুন্নবী, আবদুল জব্বার—সবাই আসতেন। বলতেন, ‘হ্যাঁ, খান, কেমন আছেন?’ অ্যালবামে কাজ করেছিলেন? করেছি। তবে সাকসেসফুল হইনি। কারণ তখন এই কাজ বুঝতে পারিনি, এখন কিছুটা বুঝি। এটা তো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। আমি ছায়াছবি, নাটক—এগুলো ভালো বুঝি। অ্যালবাম যেহেতু বুঝতে পারিনি, তাই ঠিক অতটা গুরুত্বও দেইনি। আমার কাছে ছায়াছবি বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। তার পরও দু-চারটি গান সাকসেসফুল হয়েছে; ‘ভালো আছি আমি ভালো আছি’, ‘শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলেছি’—এমন কয়েকটি গান মানুষ গায়। এগুলো এন্ড্রু কিশোর গেয়েছে। অ্যালবামে গানও লিখেছিলাম। তবে সেটিও মানুষ বুঝতে পারেনি। যেমন হায় রে হায়/প্রেমিকের বড় জ্বালা/যখন আসে বিরহের পালা/বড় লোকের বড় ভয়/যখন আসে লোকসানের পালা/দিনমজুরের দিনে ভয়/দিনে রুজি যদি না হয়/অনাহারে পেট লাগে পিঠেতে/আর রাতের বিছানা হয় মাটিতে/আমি ভালো আছি/আমি খুব ভালো আছি/দুবেলা খাই, সুখে দিন কাটাই/রাতে ঘুমাই শীতল পাটিতে—এই আমার লিরিকের স্টাইল। এন্ড্রু কিশোরের জন্ম কিভাবে? আমার এক বন্ধু দুলাল, প্রযোজক ছিল, সে বলল, আলম খান একটি ভালো ভয়েস আছে, ট্রাই করতে পারেন। বললাম, আনো। ভয়েসটি শুনেই পছন্দ হয়ে গেল। বললাম, পরশু দিন রেকর্ডিং। এই তাকে শুরু করিয়ে দিলাম। অনেক গান গাইল। আমার অধিকাংশ গান এন্ড্রু কিশোর গেয়েছে। এখন আপনার শরীর কেমন? লাংসের তিন ভাগের এক ভাগ নেই, আর্থ্রাইটিস আছে, নানা সমস্যা। বয়স ৭২। তখন দিনে দুই-তিন পার্টির কাজ করতাম। তারা যাতায়াত খরচ, সোনারগাঁওয়ে খাব না শেরাটনের খাবার খাব, সেটিরও বন্দোবস্ত করত। এসেই টেবিলে এক প্যাকেট বেনসন রাখত। না খেতে চাইলেও বলত, না, আপনি খাবেন। না হলে মুড বেরোবে না। মাগনা সিগারেট যে কত কস্টলি ছিল এখন টের পাই। আপনার ছোটভাই মারা গেলেন, সেই খবরও তো আপনাকে দেওয়া গেল না? না, যখন মারা যায় তখন আমার অপারেশন হয়। ব্যাংককে তখন আমার অপারেশন হচ্ছে। এখানে অপারেশন করতে চেয়েছিল, সাহস পাইনি। একই পরিবার থেকে দুটি প্রতিভা কিভাবে বেরোল? ও [আজম খান], ওর মতো করে বেরিয়েছে। আমার মতোই সে চিন্তা করেছে, নতুন কিছু কী করা যায়? তাতে সে সাকসেসফুল হয়েছে। আমাদের পরিবারে এ দুই ভাই বাদে আর কেউ গান করতেন না। তবে মা গাইতেন, সুন্দর গলা ছিল। [২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ঢাকা]