হকির কিংবদন্তি খেলোয়াড় তিনি। ফুটবল খেলেছেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান দলে। অ্যাথলেটিকসেও সাফল্যের কমতি নেই। খেলেছেন ক্রিকেটও। খেলা ছাড়ার পর হয়েছেন কোচ, নির্বাচক। হকির আন্তর্জাতিক আম্পায়ার, ফুটবলের রেফারি। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন চার বছর। এমনই বহুবিধ পরিচয় তাঁর, এমনই সব্যসাচী ক্রীড়াব্যক্তিত্ব বশীর আহমেদ। ফেলে আসা সেই বর্ণাঢ্য, সাফল্য ঝলমলে জীবনের গল্পের ঝাঁপি মেলে ধরলেন তিনি নোমান মোহাম্মদ-এর সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে। আর কী আশ্চর্য, এত কীর্তির পরও আরেকটু বেশি কিছু করতে না পারার আক্ষেপ এখনো খুঁজে পাওয়া গেল তাঁর কণ্ঠে! প্রশ্ন : আপনার বড় এক কীর্তি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে হকিতে টেস্ট খেলা। আপনার কাছে এটি নিশ্চয়ই অনেক বড় গর্বের ব্যাপার? বশীর আহমেদ : অবশ্যই। এর আগেও কিন্তু ১৯৬০ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলের ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। তখন তো আমি একেবারে তরুণ। মূল দলে সুযোগ পাওয়াটা ছিল কঠিন। তবে ওই বছর যে রোম অলিম্পিক, সেখানে ‘অবজার্ভার’ হিসেবে যাওয়ার কথা ছিল আমার। ‘অবজার্ভার’ ব্যাপারটি হলো, উঠতি তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের এশিয়ান গেমস বা অলিম্পিকে জাতীয় দলের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে অনুশীলন, থাকা-খাওয়া করায় ওরা প্রেরণা পেত ভবিষ্যতে ভালো খেলার জন্য। তো ওই অবভার্জার হিসেবে আমার রোমে না যাওয়ার কোনো যুক্তি ছিল না। কারণ ১৯৫৮ সাল থেকে আমি পূর্ব পাকিস্তান দলে ফুটবল খেলি, হকি খেলি। কিন্তু আমাকে বাদ দিয়ে বড়লোক এক ইঞ্জিনিয়ারের ছেলেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেটি আমার জন্য ছিল খুব কষ্টের। এরপর ১৯৬২ সালে জাকার্তায় এশিয়ান গেমসে আমাকে পাঠানো হয় ঠিকই। কিন্তু উৎসাহটা আর আগের মতো ছিল না। প্রশ্ন : আপনার সেই টেস্ট খেলা কি ওই বছরই? বশীর : হ্যাঁ, ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে, কেনিয়ার বিপক্ষে। এশিয়ান গেমস থেকে ফেরার পর আবার ক্যাম্পে যোগ দিই। কেনিয়া এলো পাঁচটি টেস্ট খেলার জন্য। সেখানে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলি আমি। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে সেই টেস্ট খেলা অবশ্যই আমার খেলোয়াড়ি জীবনের মস্ত বড় এক অর্জন। অনেক বড় গর্ব। তখন মনে হতো, আমি বোধ হয় আমার বাঙালি ভাইদের জন্য একটা রাস্তা খুলে দিয়েছি। পরে আবার ১৯৬৭ সালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পাকিস্তানের হয়ে আরেকটি টেস্ট খেলার সুযোগ পাই। এখনকার ছেলেরা তো খেলাধুলায় অনেক এগিয়েছে। আমাদের সাকিব এখন ক্রিকেটে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু যখনই ওই টেস্ট খেলার কথা ভাবি, মনে হয়, এই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের পূর্বসূরি হিসেবে আমি বোধ হয় কিছুটা করতে পেরেছি। প্রশ্ন : ’৬২-র ডিসেম্বরে টেস্ট খেললেন, ’৬৪ সালে অলিম্পিকে খেলার সুযোগ কি তৈরি হয়নি? বশীর : সেটি আরেক দুঃখের স্মৃতি। টোকিও অলিম্পিকের জন্য পাকিস্তানের ক্যাম্পে আমি ছিলাম। মূল দলে সুযোগ পাওয়াও একরকম চূড়ান্ত। ক্যাম্প শেষে টোকিও যাওয়ার আগে ১৫ দিনের মতো ছুটি ছিল। সেই ছুটিতে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের কোচ আই এস দারা আমাকে বলে দিলেন, ‘খবরদার, এ সময়ে তুমি ফুটবল খেলতে নেমে যেও না। হকির প্র্যাকটিস মন দিয়ে করো। কারণ তুমি আমাদের সঙ্গে অলিম্পিকে যাচ্ছ।’ তো ছুটিতে ঢাকা চলে এলাম। একদিন সেলুনে চুল কাটাচ্ছি। সেখানে দেখি ‘মনিং নিউজ’-এর শিরোনাম, ‘পাকিস্তান অলিম্পিক হকি টিম অ্যনাউন্সড’। আমি দ্রুত সেখানে চোখ বোলালাম। আমার নাম নেই। একবার পড়ি, দু’বার পড়ি, তিনবার পড়ি। কিন্তু আমার নাম খুঁজে পাই না। কী বেইমানিই না পাকিস্তানি কোচ আমার সঙ্গে করেছিলেন! ’৬৪-র অলিম্পিক খেলতে না পারার কথা মনে হলে এখনো বুকে কষ্টের অনুভূতি হয়। প্রশ্ন : হকি ছাড়াও ফুটবল, অ্যাথলেটিকসসহ অনেক কিছুই তো খেলেছেন। তবু আমরা হকি দিয়েই শুরু করতে চাই। ব্রাজিলে জন্মালে ফুটবল খেলা যেমন অবধারিত, আপনাদের সময়ে মাহুতটুলী আরমানিটোলার ছেলেদের ক্ষেত্রে হকি খেলা ছিল তেমনই অনিবার্য। আপনি ওই এলাকার বলে সেভাবেই কি হকির প্রেমে পড়া? বশীর : একেবারে ঠিক উদাহরণ দিয়েছেন। মাহুতটুলীর চারপাশেই তখন হকি খেলার ধুম। আরমানিটোলা স্কুলে তো ভর্তি করায় ক্লাস থ্রি থেকে। আমার হাতে এর আগেই খালু তুলে দেন হকি স্টিক। ওই ওয়ান-টুতে পড়ার সময় থেকেই আরমানিটোলা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে হকি দেখতাম। আলমগীর আদেল, নুরুল ইসলাম নান্না, ফখরুল ইসলাম, ওজির আলী—নামকরা সব হকি খেলোয়াড় খেলতেন সেখানে। একটি লাঠি দিয়ে বল কিভাবে এদিক-ওদিক ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেই কারুকার্য আমার কাছে জাদুকরী মনে হতো। খুব মাঝেমধ্যে যখন খেলার সুযোগ পেতাম, আমার খেলা দেখে সবাই প্রশংসা করতেন। তাতে আমার উৎসাহ বাড়ত আরো। প্রশ্ন : এরপর আরমানিটোলা স্কুলে ভর্তি হওয়ায় খেলাধুলার সুযোগটা নিশ্চয়ই বেড়ে গেল? বশীর : তা আর বলতে! ওই স্কুলের মাঠ বাদ দিয়ে আমার খেলাধুলার ক্যারিয়ার কিছুতেই গড়ে উঠত না। জীবনে যদি সফলতা কিছু হয়ে থাকে, সবই এর জন্য। আমি তো বলি, স্কুল মাঠে ঢোকার যে কালো পিচের রাস্তা, সেখানে খেলেই আমরা ১২-১৩ জন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছি। এই দেখুন, নাম লিখে রেখেছি। মাহমুদুর রহমান মোমিন, আব্দুস সালাম, আমি, আব্দুস সাদেক, আব্দুল মালেক চুন্নু, জামাল হায়দার, প্রতাপ শংকর হাজরা, সাব্বির ইউসুফ, মো. মহসীন, নুরুল ইসলাম, হোসেন ইমাম চৌধুরী, এহতেশাম সুলতান। এর বাইরেও এক-দুজন থাকতে পারেন। বলে বোঝানো যাবে না, ওই স্কুল মাঠটি আমাদের কাছে কী ছিল! প্রশ্ন : ফুটবল আর অ্যাথলেটিকসেও তো সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলেছেন। সেসবের শুরু কিভাবে? বশীর : স্কুলের মাঠেই। আসলে তখন তো মৌসুমভিত্তিক খেলা হতো। ফুটবলের সময় অন্যরা ফুটবল খেলত, আমিও তাই। বাস্কেটবলও খেলেছি। যখন স্কুলে সবে ভর্তি হই, তখন কিন্তু সেখানে বেসবল খেলার প্রচলন ছিল। মনে আছে, বেসগুলো ছিল খাকি রঙের। তাও খেলেছি। আর অ্যাথলেটিকসের ব্যাপারটি বোধ হয় সহজাত। একটি উদাহরণ দিলে হয়তো বুঝতে পারবেন। প্রশ্ন : বলুন না প্লিজ... বশীর : অ্যাথলেটিকসে আমার ইভেন্ট ছিল জাম্প। সবগুলো জাম্পে অংশ নিতাম, সঙ্গে হয়তো ডিসকাস। এখান থেকে স্প্রিন্টে কেমন করে আসি, সেটিই বলতে চাইছি। ওই সময় ‘পাকিস্তান ইয়ুথ ডে’ নামে একটি দিন পালন করা হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে গেলাম তাতে অংশ নিতে। গিয়ে শুনি, ওখানে নাকি শুধু একটি জাম্পই হবে—ব্রড জাম্প। বাকি সব স্প্রিন্ট ইভেন্ট। আমি তো দৌড়াই না। বন্ধুরা বলল, ‘দিয়ে দেখ, কী আর হবে!’ তো ওদের কথাতেই আমি স্প্রিন্টে নাম লেখাই। ১০০ মিটার, ২০০ মিটারে আমিই ফার্স্ট। এ কারণেই বলছি, আমি হয়তো সহজাত অ্যাথলেট ছিলাম। প্রশ্ন : এই যে সারা দিন খেলাধুলা নিয়ে পড়ে থাকতেন, বাসায় বাবা-মা কিছু বলতেন না? বশীর : তেমন একটা না। আমরা দুই বোন, দুই ভাই। আমি সবার ছোট। সংসার খুব সচ্ছল ছিল না। বাবা টুকটাক নানা ব্যবসা করতেন। কখনো আতরের দোকান দিতেন, কখনো লেপ-তোষকের। আমি খেলাধুলা শুরু করার সময় তাঁর বয়সও হয়েছে অনেক। আমি মূলত খেলায় এসেছি খালু আবরার হোসেনের উৎসাহে। আমরা একসঙ্গে থাকতাম। ওনার কোনো সন্তান ছিল না, আমাকে নিজের ছেলের মতো দেখতেন। আমিও খালুকে ডাকতাম আব্বা বলে। তিনি পেশায় হাকিম তবে গানবাজনা, খেলাধুলা এসব নিয়ে তাঁর উৎসাহ ছিল ব্যাপক। তাঁর সঙ্গে বাসার পাশের ছোট্ট মাঠে আমার খেলাধুলার শুরু। আর ওনার এক বন্ধু ছিল খলিল চাচা, শাহী স্পোর্টসের মালিক। ওখানে গিয়ে আমরা খেলার জন্য যখন যা প্রয়োজন, নিয়ে আসতাম। প্রশ্ন : প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলা শুরু করলেন কবে? বশীর : ১৯৫৬-৫৭ মৌসুমে হয়তো, ক্রিকেট দিয়ে... প্রশ্ন : বলেন কী, আপনি ক্রিকেটও খেলেছেন! বশীর : হ্যাঁ। ভিক্টোরিয়ার হয়ে খেলি। আমি ছিলাম পেস বোলার, শেষ দিকে নেমে টুকটাক রানও করতাম। তখন সামার ক্রিকেট হতো। একেক দলের রান হতো ৫০-৬০ করে। ১০০ হলে তো অনেক রান। তবে ওই সময়ে ক্রিকেট খেলাকে খুব উৎসাহ দেওয়া হতো না। বলা হতো, এটি বড়লোকদের খেলা। নওয়াববাড়ির ছেলেরা খেলে। সে কারণে ক্রিকেটে খুব একটা এগোনো হয়নি। ভিক্টোরিয়ায় যখন ক্রিকেট খেলতাম, সেখানে আমাদের সঙ্গে ছিলেন সালাম ভাই। উনি রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজের গেমস টিচার। খেলার আগে-পরে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়াই। ওনার মাধ্যমেই হকি খেলা শুরু। এর আগেই ফুটবল শুরু করেছি। সেটি আগে বলে নেব? প্রশ্ন : অবশ্যই... বশীর : আমার এক বন্ধু ফুটবল খেলত দ্বিতীয় বিভাগের একটি দলে। একদিন আমাকে ও নিয়ে গেল ঢাকা স্টেডিয়ামে, কিন্তু আমার সামনে দিয়ে ও মাঠে নেমে গেল। আমি মন খারাপ করে বসে আছি। তখন ফ্রান্সিস নামে একজন, পরবর্তীতে যে হকিও খেলেছে, আমাকে জিজ্ঞেস করল, ব্যাপার কী! আমি বলি, ‘আমাকে ও নিয়ে এলো কিন্তু সুযোগ না দিয়ে ও নিজেই খেলতে নেমে গেল।’ ফ্রান্সিস তখন বলল, ঠিক আছি তুমি ঢাকা স্পোর্টিয়ের অনুশীলনে এস। এভাবেই ঢাকা স্পোর্টিংয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেললাম। এটি ওই ’৫৬ সালেই। প্রশ্ন : হকি শুরুর কথা বলছিলেন... বশীর : হ্যাঁ, সালাম ভাইয়ের সঙ্গে তো আমরা ঘুরে বেড়াই। একদিন উনি ক্রিকেট খেলা শেষে বললেন, ‘চল হকি দেখতে যাই’। রমনা পার্কের ভেতর রমনা গ্রিন নামে সুন্দর একটি মাঠ ছিল। সেখানে সালাম ভাইয়ের সঙ্গে হকি দেখতে গেলাম। হঠাৎ দেখি, ব্রাদার্সের এক কর্মকর্তা এসে বলছে, ‘সালাম ভাই আমাকে দু-তিনজন প্লেয়ার দেন। নইলে তো টিম মাঠে নামাতে পারব না।’ আমি, বুলবান আর ফিরোজ ছিলাম সেখানে। মোহামেডানে পরে ফুটবল খেলে অনেক নাম করেছিল যে সাব্বির, তার চাচা এই ফিরোজ। যা-ই হোক, সালাম ভাই আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘খেলবা নাকি?’ আমার শখের খেলা হকি, খেলব না মানে! কেডস পরা ছিল, জার্সি পরে মাঠে নেমে গেলাম। প্রশ্ন : কেমন খেলেছিলেন? বশীর : ইপিআরের সঙ্গে সাত গোল খেয়েছিলাম (হাসি)। বুঝতেই পারছেন কী অবস্থা! তবে এর মধ্যেও আমার খেলা বেশ নজর কাড়ল। ইপিআরে তো বেশির ভাগ খেলোয়াড় অবাঙালি। ওরা এসে পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, ‘বহুত আচ্ছা খেলা বেটা’। এটি শোনার পর উৎসাহ আরো বেড়ে যায়। ব্রাদার্সের হয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেললাম। এরপর সালাম ভাই, মোমিন ভাইরা বললেন, ‘তুই ভিক্টোরিয়া থাকতে অন্য ক্লাবে খেলবি কেন?’ ব্যস, একই ক্লাবে ক্রিকেটের পাশাপাশি হকি খেলা শুরু করি। পরের বছর থেকে ফুটবলও। প্রশ্ন : ঢাকা স্পোর্টিংয়ের পর? বশীর : ঢাকা স্পোর্টিংয়ে তো মৌসুমের শেষ দিকে অল্প কয়েকটি ম্যাচ খেলেছি। পরের মৌসুম শুরুর আগে একদিন আজিমপুরে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যারম খেলছিলাম। সেখানে এলেন ভিক্টোরিয়া ক্লাবের ফুটবলার মাহমুদুর রহমান মোমিন ভাই। উনি বললেন, ‘ভিক্টোরিয়াতে খেলবি? তোকে ২০০ টাকা দেওয়া হবে।’ আমি ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে সেকেন্ডের মধ্যে হিসাব করে ফেললাম, ওই টাকা দিয়ে কী কী করব! মাখন-জিন কাপড়ের দুটো প্যান্ট বানাব, মাকে শাড়ি কিনে দেব, বন্ধুরা মিলে খাওয়া-দাওয়া করব, সিনেমা দেখব। মোমিন ভাইয়ের প্রস্তাবে তাই ফুটবল না খেলার কোনো কারণ ছিল না। এই শুরু ভিক্টোরিয়ায় খেলা। প্রশ্ন : ওই ক্লাবের হয়ে তো লিগ চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন? বশীর : সেটি ১৯৬২ সালে। তবে সত্যি বলতে, ওই চ্যাম্পিয়নশিপে আমার খুব বেশি অবদান ছিল না। মাকরানি ফুটবলাররাই চ্যাম্পিয়ন করিয়েছে। আমার যদি অবদান থেকে থাকে, তাহলে দু’বার আমি ভিক্টোরিয়াকে রেলিগেশনের হাত থেকে বাঁচিয়েছি। একবার শেষ ম্যাচে তেজগাঁও ফ্রেন্ডস ইউনিয়নের সঙ্গে শেষ খেলায় এমন সমীকরণ ছিল যে, যারা হারবে তারাই নেমে যাবে। সেখানে ১-০ গোলে জিতি, গোলটা আমার। আরেকবার কামাল স্পোর্টিংয়ের সঙ্গেও শেষ ম্যাচের আগে একই অবস্থা। সেই ম্যাচেও দল জেতে আমার দুই গোলে। ভিক্টেরিয়ার হয়ে লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে আমার বেশি তৃপ্তি ওই দুবার দলকে বাঁচানোর। প্রশ্ন : ভিক্টোরিয়ার তো আপনি ঘরের ছেলে। সেখান থেকে মোহামেডানে গেলেন কিভাবে? বশীর : ১৯৫৯ সালে আগাখান গোল্ডকাপে মোহামেডান আমাকে নেয় অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে। সেবার প্রথমবারের মতো ওই টুর্নামেন্টে মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর আজাদী কাপ নামে এক প্রতিযোগিতায় আবার খেলি একইভাবে; আবার চ্যাম্পিয়ন। তখন থেকেই মোহামেডান আমাকে নেওয়ার চেষ্টা করে। আগেই বলেছি, আমি খুব সচ্ছল পরিবার থেকে আসিনি। কিন্তু ভিক্টোরিয়াতে আবার মায়ার বাঁধনে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। টাকাপয়সার ব্যাপারটা তাই আর সেভাবে দেখিনি। ১৯৬১ সাল থেকে ভিক্টোরিয়া ক্লাব এক-দুজন করে মাকরানি ফুটবলার আনতে শুরু করল। আর ’৬২ সালে প্রায় সবাই মাকরানি। সেটি ছিল এই উপমহাদেশেরই অন্যতম সেরা দল। সেবার দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমি রেজা ভাই, বড়দাকে বললাম, ‘আপনারা তো অনেক ভালো ভালো ফুটবলার নিয়ে এসেছেন। মোহামেডানে আমার প্রস্তাব আছে। আমাকে এবার ছেড়ে দেন।’ ওনারা বললেন, ‘বশীর, এখন আর তোমাকে আমি থাকতে বলব না। মোহামেডানে খেলতে পারবে, টাকা পাবে বেশি। ওখানেই যাও।’ প্রশ্ন : কত টাকা পেয়েছিলেন, মনে আছে? বশীর : টাকা না, আমি শর্ত দিয়েছিলাম আমার বাড়িটা করে দিতে হবে। ভিক্টোরিয়া ক্লাবে অনেক কর্মকর্তা ছিলেন কন্ট্রাক্টর। খেলার বিনিময়ে তাঁরা কিছু ইট-বালু দিয়েছিলেন আমাকে। মোহামেডানকে বলেছিলাম, ইট-বালু তো আছেই, আপনারা বাড়িটা করে দিন। কাজী শামসুল ইসলাম ছিলেন ক্লাবের ম্যানেজার। ক্লাব থেকে তাঁকে তাই বলা হয়েছিল। আমাদের ঘরবাড়ি সব ভেঙে তা করা আরম্ভ করলেন। কিন্তু কিছুদিন করে আর করেন না। বুড়ো বাবা-মা নিয়ে কী দুর্দশা গেছে তখন! কাজী সাহেবকে বললাম। কিন্তু তিনি নানা বাহানায় তা আর করেন না। পরে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ইসলাম সাহেবকে বললাম, আমি ফায়ার সার্ভিসে চলে যাব। পরে আমার বাড়ি শেষ করে দেয়। আর পারিশ্রমিক হিসেবে বোধ হয় সাত হাজার টাকা দিয়েছিলেন। প্রশ্ন : এমনিতে তখন মোটা দাগে পারিশ্রমিকের অবস্থা ছিল কেমন? বশীর : স্টেডিয়ামের পাশে রেক্স বলে একটি হোটেল ছিল। যেদিন ভালো খেলতাম, সেদিন সেখানে একটি শিক কাবাব, একটি পরোটা ও এক কাপ চা—এই ছিল সম্মানী। সঙ্গে এক টাকা রিকশাভাড়াও জুটত। হারলে তো খাওয়া কিংবা টাকা পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ভিক্টোরিয়া কিংবা মোহামেডান ক্লাবে চার-পাঁচটি খেলা খেলেছি একসঙ্গে। এর মধ্যে ফুটবল আর হকিতেই যা কেবল কিছুটা পারিশ্রমিক পাওয়া যেত। প্রশ্ন : ফুটবলার হিসেবে সবচেয়ে বেশি সাফল্য কি মোহামেডানেই? বশীর : হ্যাঁ। ভিক্টোরিয়া আমাকে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলেছে। আর মোহামেডান দিয়েছে প্রতিষ্ঠা। এই ক্লাবের হয়ে ’৬৩ সালে আমরা চ্যাম্পিয়ন। পরেরবার বোধ হয় পারিনি। ’৬৫ ও ’৬৬ সালে আবার টানা দুবার। তবে মোহামেডানে বলেন কিংবা পূর্ব পাকিস্তান দলে—আমার একাদেশ জায়গা পাওয়াটা কখনো খুব সহজ হয়নি। আমার পজিশন ছিল লেফট ইন কিংবা রাইট ইন। সেখানে খেলতেন সেরা সব ফুটবলার। বিশেষ মারীদা খেলতেন সেখানে। তাঁকে আমি খুবই শ্রদ্ধা করি। তাঁকে অনুকরণ করার চেষ্টা করেছি সব সময়। পূর্ব পাকিস্তান দলে ১৯৫৯ সালে হায়দরাবাদের এক টুর্নামেন্টের কথা মনে পড়ছে। একাদশে যথারীতি মারী ভাই লেফট ইনে। তবে এক ম্যাচ পর কবির ভাইকে রাইট ইন থেকে সরিয়ে সেখানে খেলানো হয় আমাকে। উনি চলে যান রাইট আউটে। এভাবে প্রথম একাদশে ঢুকে যাওয়া আমার ফুটবল ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। প্রশ্ন : ফুটবল শেষ খেলেন কবে? বশীর : ১৯৬৭ সালে আমি পাকিস্তান হকি দলের ক্যাম্পে ছিলাম। ছুটি হওয়ার পর চলে এসে দেখি ফুটবল লিগ চলছে। সেখানে মোহামেডানের হয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেললাম। এর মধ্যে ফেনীতে জগন্নাথ কলেজ ফেনীতে এক প্রদর্শনী টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। সেখানে গেলাম খেলতে। মাঠে নামার পর ১০ মিনিটও হয়নি। এক মাকরানি এসে এমনভাবে মারল যে, হাঁটুতে একটা আওয়াজ হলো শুধু। হাঁটুর বাটি গেল ঘুরে। ওই আমার ফুটবল খেলা শেষ। প্রশ্ন : হকিতে? বশীর : ফুটবলের ওই ইনজুরির পর হকিও আর আগের মতো খেলতে পারতাম না। যদিও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলেছি স্বাধীনতার পরেও। আমি তখন সোনালী ব্যাংকে চাকরি করি। তাদের হয়ে খেলতাম। ১৯৭৬ সালে স্বাধীনতা কাপে আবাহনীর বিপক্ষে হকি খেলি শেষবারের মতো। আবাহনী তখন অনেক ভালো দল। সাদেক, ইব্রাহিম সাবের সবাই খেলে। ওদের বিপক্ষে ম্যাচটি শেষ হয় ড্রতে। টাইব্রেকারে প্রথম পাঁচ শটের পরও দুই দলের সমান। পরে এমন অবস্থা হলো যে, আমি গোল দিলে দল জিতবে। গোল দিয়ে জিতলাম, চ্যাম্পিয়ন হলাম। সেই হকিতে শেষ। সাত গোল খাওয়া দিয়ে শুরু যে ক্যারিয়ার, তার এমন শেষ খারাপ কী! প্রশ্ন : অ্যাথলেটিকসের আলোচনা তো সেভাবে করাই হলো না। সেটি নিয়ে যদি কিছু বলতেন? বশীর : ১৯৫৮-৫৯ থেকে অ্যাথলেটিকসে প্রভেন্সিয়াল স্পোর্টসে অংশ নিই। ভিক্টোরিয়া, মোহামেডান, আজাদ স্পোর্টিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অংশ নিয়েছি। শেষ দৌড়েছি হয়তো ১৯৬৫ সালে। তখন মোহামেডানে ফুটবল খেলতাম। কবির ভাই নামে ক্লাবের এক কর্মকর্তা ছিলেন। তো আমি একদিন অনুশীলন করছিলাম। কবির ভাই এসে বললেন, চলো আমার সঙ্গে। নিয়ে গেলেন ঢাকা স্টেডিয়ামে। বললেন, এখন তোমাকে দৌড়াতে হবে। কবির ভাই আমার পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে কার কাছ থেকে রানিং শু নিয়ে এলেন। গায়ে চাপিয়ে দিলেন মোহামেডানের জার্সি। রিলে রেস নাকি দিতে হবে। রেসের অন্য তিনজনের মধ্যে দুরন্ত ফুটবলার মেজর হাফিজও ছিল। দৌড়ে আমরা ফার্স্ট হলাম। একেবারে রেকর্ড টাইম গড়ে। প্রভিন্সিয়াল স্পোর্টসে সেটিই বোধ হয় আমার শেষ অংশ নেওয়া। প্রশ্ন : হকি আর ফুটবলে তো পূর্ব পাকিস্তান দলেও আপনি খেলেছেন... বশীর : নিয়মিত। হকি দলের অধিনায়ক হিসেবে খেলেছি অনেক ম্যাচ। প্রশ্ন : কিছু স্মরণীয় খেলার কথা যদি বলতেন। হকি দিয়েই শুরু করি? বশীর : হকিতে সবচেয়ে স্মরণীয় নিঃসন্দেহে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট খেলা। আমার হকির শুরু তো ওই ব্রাদার্স ক্লাবে। এরপর ভিক্টোরিয়ায়। এরই মধ্যে আমি চাকরি শুরু করি ন্যাশনাল ব্যাংকে, যেটি স্বাধীনতার পর হয় সোনালী ব্যাংক। ১৯৬৩ সাল থেকে খেলেছি সেই ক্লাবে। ওই দলের হয়ে ইস্পাহানীর বিপক্ষে এক খেলার কথা মনে পড়ছে। সেই দলে ছিল পশ্চিম পাকিস্তান দলের অনেক নামকরা খেলোয়াড়। তাদের বিপক্ষে ম্যাচে আমি দিই দুই গোল। তাতেই হই অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। এটি ১৯৬৭ সালের কথা। এর আগে ’৬৩ সালের লিগেও ন্যাশনাল ব্যাংক অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। এ ছাড়া ১৯৬৫ সালের এক খেলায় তিন হ্যাটট্রিকসহ ১৩ গোল করেছি। সেটিও স্মরণীয়। প্রশ্ন : ফুটবলে? বশীর : ১৯৬০ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় পূর্ব পাকিস্তান। আমি ছিলাম সেই দলে। সেটি স্মরণীয়। শ্রীলঙ্কার দলের বিপক্ষে আগাখান গোল্ডকাপে মোহামেডানের বিপক্ষে খেলাটি নিয়ে পেপারে লিখেছিল, সেটি নাকি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ খেলা। ভিক্টোরিয়াকে দুবার রেলিশন থেকে বাঁচানোও স্মরণীয়। প্রশ্ন : অ্যাথলেটিকসে? বশীর : আন্তস্কুল অ্যাথলেটিকসে আমাদের আরমানিটোলার স্কুল কখনো চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। আমি তাদের চ্যাম্পিয়ন করিয়েছি। নিজে হয়েছি সেরা অ্যাথলেট। পরে প্রভিন্সিয়াল স্পোর্টসে অনেক রেকর্ড করলেও স্কুলের ওই অর্জন আমার কাছে এখনো সবচেয়ে স্মরণীয়। প্রশ্ন : ফুটবল ও হকিতে যাঁদের খেলা দেখেছেন, তাঁদের মধ্যে সেরা বলবেন কাদের? বশীর : ফুটবলে মারীদা। তাঁর মতো অমন ব্যক্তিগত স্কিল আমি আর কারো মধ্যে দেখিনি। তাঁর খেলা আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। আর হকিতে সেরা আব্দুস সাদেক। ও আমার ছোট। তবে কী চমৎকার যে খেলত! এখানে আরেকটি কথা বলি, সাদেকের ছোট ভাই বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক আহমেদ আকবর সোবহানও কিন্তু হকি খেলতেন। ১৯৭০ সালে ইয়ুথ ক্যাম্পে ছিলেন। কুমিল্লা জেলার হয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছিলেন। পরে তো ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। প্রশ্ন : সেরা হিসেবে চিং হ্লা মং চৌধুরী মারী ও আব্দুস সাদেকের কথা বলছিলেন... বশীর : এখানে আমি আরেকজনের কথা একটু উল্লেখ করতে চাই। গজনবী ভাই। মোহামেডান ক্লাবে খেলার সময় তাঁর খুব সহযোগিতা পেয়েছি। ওনার বুকটা ছিল এত্ত বড়, একেবারে সিংহের মতো। বলতেন, ‘বশীর তুই খেলে যা। আমি তো আছিই।’ উনি থাকাতে আমরা নির্ভয়ে খেলতাম। গজনবী ভাই যখন মৃত্যুশয্যায়, তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। নতুন কয়েক জোড়া মোজা আমাকে দিয়ে বললেন, ‘বশীর, আমি বোধ হয় আর এগুলো পরতে পারুম না। তুই নিয়ে যা, পরিস।’ ঘটনাটি মনে হলে চোখ ভিজে ওঠে। প্রশ্ন : খেলা ছাড়ার পর পর কোচও হয়েছিলেন... বশীর : পাতিয়ালায় ডিপ্লোমা করি ’৭৩-’৭৪ সালে। পরে জাতীয় দলকে কোচিং করিয়েছি ’৭৭-’৭৮ সালের দিকে। নির্বাচকও ছিলাম। আর সংগঠক হিসেবে কাজ করছি তো সেই খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই। প্রশ্ন : ক্রীড়াঙ্গনের সব ক্ষেত্রেই ছিল আপনার কীর্তির চিহ্ন। রেফারিও তো হয়েছিলেন... বশীর : হ্যাঁ, রেফারিং পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম। কিন্তু এক ম্যাচের পর দেখলাম, কর্মকর্তারা রেফারিকে এমন থাপ্পড় দিলেন, তিনি পড়ে গেলেন। এরপর আর রেফারিং করার ইচ্ছে হয়নি। অনেক পরে একবার কোনো এক কারণে রেফারিরা ধর্মঘট করলেন। পরে নূর ভাইয়ের অনুরোধে আমি রেফারিং করি। এটি ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে। দুই-তিন বছর রেফারিং করার পর তা ছেড়ে দিই আরেক কারণে। একদিন আমার ছেলে বাসায় এসে ওর মাকে বলল, ‘আম্মা, তুমি আব্বাকে রেফারিং করতে মানা করো। আমার বন্ধুরা বলে, রেফারিরা চোর।’ ওই আমি এরপর রেফারিং ছেড়ে দিই। এ ছাড়া হকির আন্তর্জাতিক আম্পায়ারও ছিলাম আমি। প্রশ্ন : বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিবও তো হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? বশীর : ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত চার বছর বিওএ মহাসচিব ছিলাম। এর মধ্যে বড় একটি কাজ ছিল ১৯৯৩ সালের সাফ গেমস আয়োজন। ওই ক্রীড়াযজ্ঞ ঠিকভাবে করতে পারায় তৃপ্তি আছে। প্রশ্ন : সংগঠক হিসেবেও ছিলেন নানা জায়গায়? বশীর : ছিলাম। হকিতে যুগ্ম সম্পাদক ছিলাম অনেক দিন। আরো নানা ভূমিকায় আরো অনেক জায়গায়। আমি মনে করি, আমাদের মতো অভিজ্ঞদের এখনো কাজে লাগানো যায়। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতিতে এখনো আমরা বোধ করি অবদান রাখতে পারি। প্রশ্ন : পরিবারের কথা যদি ছোট্ট করে যদি বলতেন? বশীর : আমি বিয়ে করেছি ১৯৬৮ সালে। স্ত্রী তাহমিনা বেগম ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা, এখন অবসরে। আমাদের এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলের নাম তানভীর আহমেদ। এ বছরের ১৭ এপ্রিল হার্ট অ্যাটাকে ও মারা গেছে। এই দুঃখ নিয়ে আমরা বুড়ো-বুড়ি এখন বেঁচে আছি। ছেলের ঘরে আছে এক নাতনি। ওর নাম রামিসা তাহসিন, ক্লাস থ্রিতে উঠবে। আমাদের মেয়ের নাম তাসমিন আহমেদ। ওর স্বামী আর্মিতে রয়েছে। মেয়ের ঘরে দুই নাতি-নাতনি। নাতনি নানজিবা মাশিয়াত এবার এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। আর নাতি আহনাফ ইফতেশাম পড়ে ক্লাস ফাইভে। ওদের নিয়েই গল্পটল্প করে দিন কেটে যায়। প্রশ্ন : জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন আপনি। ক্রীড়া লেখক সমিতির বর্ষসেরা পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু, গ্রামীণফোন-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কারও পেয়েছেন। কিছুদিন আগে ক্রীড়া লেখক সমিতির অগ্রজ সংগঠকদের সম্মানও। এগুলো কতটা তৃপ্তি দেয়? বশীর : আগেও কোথায় যেন বলেছি কথাটি। এই পুরস্কারগুলো মনে করিয়ে দেয়, আমি বেঁচে আছি। ক্রীড়াঙ্গনকে আমার আরো কিছু দেওয়ার আছে। বিশ্ববিদ্যালয় ব্লু কিংবা সমিতির বর্ষসেরা পুরস্কার তো পেয়েছি খেলোয়াড়ি জীবনে। সেগুলোর এক রকম ব্যাপার। পরের পুরস্কারগুলোর মাত্রা আলাদা। এগুলোতে বেঁচে থাকার প্রেরণা পাই। আর মনে হয়, ফেলে আসা জীবনে বাংলাদেশের খেলাধুলায় কিছুটা হলেও অবদান আমি রাখতে পেরেছি। প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা? বশীর : এক হিসাবে আমি তৃপ্ত নই। মনে হয়, আরো বেশি কিছু বোধ হয় ক্রীড়াঙ্গনকে দিতে পারতাম। আরো বেশি কিছু বোধ হয় করতে পারতাম। তবে আবার অন্য কথাও ভাবি। আমার মতো সাধারণ এক ঢাকাইয়া ছেলেকে এই ক্রীড়াঙ্গন যা দিয়েছে, তা বলে শেষ করার না। মানুষ আমাকে সালাম দেয়, চেনে। এ নিয়ে তৃপ্তি অনেক। আর জীবনের কাছ থেকে যা চেয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু পেয়েছি। শেষ বয়সে ছেলেটাকে হারিয়ে শুধু আমার ও আমার স্ত্রীর বুকজোড়া দুঃখ। এই দুঃখ কিছুতেই শেষ হওয়ার নয়।