বালুর নরম বিছানা। সামনে বিশাল সমুদ্র। নীল জলরাশি আর শোঁ শোঁ গর্জনে মেশা মনোমুগ্ধকর সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। ১৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্র সৈকতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ছোট মনে হলেও সাগরের বিশালতা দেখে মনটা ভরে যাবে। জেলার ক্রীড়াঙ্গনেও একটা সময় ছিল এ ধরনের মুগ্ধতা। নানা কারণে সেই ঐতিহ্য হারিয়েছিল তারা। তবে ধীরে ধীরে জাগছে ঝিমিয়ে পড়া ক্রীড়াঙ্গন। চার কোটি টাকা ব্যয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানে নতুন ক্রীড়া ভবন পেয়েছে তারা। আরো ২২০ ফুট গ্যালারি সংস্কারের কাজও শুরু হয়েছে। প্রথমবারের মতো ঘোষণা করা হয়েছে ২০১৫ সালের ক্রীড়াপঞ্জি। তারই ধারাবাহিকতায় ফেব্র“য়ারিতে হয়েছে আন্তস্কুল ক্রিকেট, ভলিবল লিগ ও ডিসি সাহেবের বলী খেলা। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন আয়োজিত জাতীয় যুব হকি প্রতিযোগিতায় পাঠানো হয়েছে প্রথমবারের মতো কক্সবাজার জেলা যুব হকি দল। তবে টানা ছয় বছর ক্রিকেট লিগ বন্ধ থাকাটা হতাশার কক্সবাজারের ক্রীড়াঙ্গনে। এখনকার বিমানবন্দরে গড়ে ওঠা ‘কক্সবাজার টাউন ফিল্ড’ একটা সময় ছিল ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইস্ট বেঙ্গলের রশিদুজ্জামান (গদা), চুন্নুবাবু, কুদ্দুছ, অমিতরা খেলতেন এখানে। ১৯৩৩ সালে প্রথম ফুটবল দল হিসেবে গড়ে ওঠে টাউন ক্লাব। তবে টাউন ফিল্ড হারিয়ে গেলেও এখনো প্রবীণদের হƒদয়ে অম্লান ‘জ্যোতিস্মান স্মৃতি’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ পর্যন্ত স্থবির ছিল ক্রীড়াঙ্গন। ১৯৪৮ সালে তখনকার মহকুমা প্রশাসক এ এস ছলিম উল্লাহ ও বন বিভাগের কর্মকতা কিউ এম গাউস প্রাণ ফেরান জেলার খেলায়। তাঁদের উৎসাহ আর মণিন্দ্রলাল চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হয় ‘এ কে ঘোষ রানিং শিল্ড’। জেলার খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র এখন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম। চার কোটি টাকার বেশি বাজেটে সম্প্রতি হয়েছে এর আধুনিকায়ন। আরেক মহকুমা প্রশাসক এ কে এম জাকারিয়ার উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে যাত্রা শুরু এই স্টেডিয়ামের। সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান অনুদান দিয়েছিলেন ২৫ হাজার রুপি। বাকি টাকা চাঁদা তোলা হয় স্থানীয়ভাবে। পরের বছর আগা খান গোল্ড কাপ ফুটবলে অংশ নিয়ে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবকে ২-১ গোলে হারিয়ে কক্সবাজার মহকুমা দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন একরাম উল হুদা চৌধুরী, জালাল আহমেদ, সগীর আহমেদ, খেমেশ বড়ুয়া, সৈয়দ নূর, মোশতাক আহমেদরা। ১৯৫৭ সালেই শুরু মণিন্দ্রনাথ শিল্ড আর সাব্বির মেমোরিয়াল কাপ। সাব্বির মেমোরিয়াল কাপ বদলে এখন হয়েছে জেলা ফুটবল লিগ। তিনবার অনুষ্ঠিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপও। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মমভাবে খুন হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় এই টুর্নামেন্ট। সেই ধারাতেই ফুটবলে উঠে এসেছে একঝাঁক তরুণ। চট্টগ্রাম ফুটবল লিগে খেলেন এই জেলার প্রায় ১৫০ জন। ঢাকার ফুটবলেও আছেন ২০ জনের বেশি খেলোয়াড়। সুনীল কৃষ্ণ দে, বিজন বড়ুয়া, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মঙ্গল, মামুনুল করিম, সাইফুল ইসলাম টিটুরা একটা সময় মাতিয়েছেন ঢাকার ফুটবল। তাদের দেখানো পথ ধরে উঠে এসেছেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম, আনিসুর রহমান জিকু, রাজু, রবি, সুশান্ত, কৌশিকরা। ফুটবলে কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় অর্জন ১৯৯০ সালের শেরেবাংলা কাপে সেমিফাইনাল খেলা। আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর চূড়ান্ত পর্বেও চমক দেখিয়ে চলেছিল জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মঙ্গলের নেতৃত্বে খেলা সেই দল। সেমিফাইনালে প্রায় জাতীয় দল নিয়ে খেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে ৮৭ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে ছিল ১-০ গোলে। এরপরই ডিফেন্সের ভুলে হজম করে বসে এক গোল। শেষদিকে সমতা ফেরায় হতোদ্যম ফুটবলাররা টাইব্রেকারে আর পেরে ওঠেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। এরপর ১৯৯৪ সালের শেরেবাংলা কাপেও আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন কক্সবাজার। তবে সেবার তেমন কিছু করতে পারেনি চূড়ান্ত পর্বে। ১৯৮৯ সালে জেলা জুয়েলার্স সমিতি গোল্ডকাপ দান করার পর জমজমাটভাবেই হতো জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ। ঢাকা থেকে পেশাদার অনেক ফুটবলারই আসত এই টুর্নামেন্টে খেলতে। ১৯৯৪ সালের পর বন্ধ হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্টটি। আন্ত-উপজেলা ফুটবল অবশ্য বলা চলে নিয়মিতই। স্টেডিয়াম সংস্কারের জন্য এটা বন্ধ থাকলেও গত মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে আবারও। টানা তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে চকরিয়া ফুটবল দল। এই টুর্নামেন্ট দিয়েই আসলে উদ্বোধন হয়েছে সংস্কারের পর নতুন চেহারা পাওয়া বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামের। ২০০৮ সালে জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠনের পর ফুটবল লিগটা হয়ে পড়ে অনিয়মিত। তবে ২০১২ সালে এম. জাহেদ উল্লাহ সভাপতি ও জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মঙ্গল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর গতি ফিরেছে জেলার ফুটবলে। ২০১২ থেকে তিনবার ফুটবল লিগ করতে পেরেছেন তাঁরা। গত লিগটা তো ইতিহাস গড়েই শেষ করেছে জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। স্টেডিয়ামের সংস্কারের জন্য কক্সবাজারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তারা লিগটা করে চকরিয়ার দুটি ভেন্যু বদরখালী ও মালুমঘাটে। আরেকটি ভেন্যু ছিল কক্সবাজার সদর উপজেলারই খুরুশকুল। পরিকল্পনা আছে এমপি গোল্ডকাপেরও। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি ক্লাবের পাশাপাশি কলকাতার ইস্ট বেঙ্গল আর মোহামেডানকে নিয়ে হবে এই টুর্নামেন্ট। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো ক্রীড়া ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অত্যাধুনিক এই ক্রীড়া ভবনে রয়েছে ড্রেসিং রুম, কনফারেন্স রুম, প্রেস বক্স, খেলোয়াড়দের জন্য বিশ্রামাগার। অনিয়মের অভিযোগ আছে আবার এই সংস্কার নিয়েও। অনেকেরই অভিযোগ, নিæমানের এসি লাগিয়ে স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরবরাহ করা হয়েছে স্থানীয়ভাবে তৈরি আসবাব। ভবনের চুনকামেও করা হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম। বিসিবির কাউন্সিলর মাহমুদুল করিম মাদু জানালেন, মূলত মামলার জন্যই ২০০৯-১০ মৌসুমের পর ক্রিকেট লিগ মাঠে গড়ায়নি আর। অর্থাৎ সারা দেশে যখন ক্রিকেট জোয়ার তখন সাগরের শহরে লাগেনি এর ঢেউ। ২২টি দল নতুন লিগের জন্য নাম এন্ট্রি করেছে এরই মধ্যে। এখন স্পনসর পেলেই লিগ শুরু করার প্রতিশ্র“তি দিলেন মাহমুদুল করিম মাদু। তবে মামলার পাশাপাশি মাঠ স্বল্পতাকেও ক্রিকেট লিগ না হওয়ার জন্য দায়ী করলেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক জসিম উদ্দিন। এমনিতে এই জেলায় স্টেডিয়াম দুটি, শেখ কামাল আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম ও বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম। মেয়েদের বিশ্বকাপের জন্য ২০১৪ সালে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পর্যটন করপোরেশনের গলফ মাঠের লাবণী পয়েন্টে শেখ কামাল আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। শেষপর্যন্ত অবশ্য মেয়েদের বিশ্বকাপের ম্যাচ হয়নি এখানে। তবে আগামী বছর অনুষ্ঠেয় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ১৮টি ম্যাচ হবে এখানে। এ বছরই বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দুটি ম্যাচ হয়েছে এই স্টেডিয়ামে। হয়েছে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের মেয়েদের দলের সিরিজ। গত বছর বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার নারী ক্রিকেট দলও খেলে গেছে শেখ কামাল স্টেডিয়ামে। ২০১৬ সালকে পর্যটন বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আর পর্যটনের মূল কেন্দ্র কক্সবাজার। এই জেলায় পর্যটক আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে নেওয়া হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ। রামুতে হতে যাচ্ছে এক লাখ দর্শক আসনের নতুন একটি স্টেডিয়াম। এ বছরের আগস্ট মাসে রামুতে জমি পরিদর্শন করে গেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাহিদ আহসান রাসেলের নেতৃত্বে একটি দল। কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ জাফর ও তাঁর সার্ফিং ক্লাব। বিদেশে সমুদ্রের নীল নোনা জলের তুমুল জনপ্রিয় এই খেলা বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেন জাফর। সার্ফিংয়ের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে দিন দিন। কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে গত ২৭ এপ্রিল প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিতও হয়েছে জাতীয় সার্ফিং। উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে দুঃসাহসিক রোমাঞ্চকর সার্ফিং করেছেন সার্ফাররা। পায়ের নিচে শক্ত সার্ফিং বোর্ড নিয়ে সাগরের ঢেউয়ের তালে নেচে বেড়িয়েছেন তাঁরা। জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সার্ফিং ইভেন্টও প্রবেশ করেছে নতুন দিগন্তে। তিন ক্যাটাগরিতে প্রথমবারের প্রতিযোগিতায় পেশাদার পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে ৭০ জন সার্ফার অংশ নিয়েছিলেন। উশুতেও যথেষ্ট সুনাম এই জেলার। উশু একাডেমিতে ৫০ জনের মতো তরুণ-তরুণী প্রশিক্ষণ নেন নিয়মিত। খেলাটির জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে একাধিকবার রানার্সআপ হওয়ার গৌরব আছে কক্সবাজারের। উশুতে টালু আর সান্দা এই দুই বিভাগ মিলে হয় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। সান্দায় তেমন খেলোয়াড় না থাকাতেই পদকে আনসারের সঙ্গে পিছিয়ে পড়ে কক্সবাজার। তবে টালুতে বাজিমাত করে সব সময়ই। প্রতি চ্যাম্পিয়নশিপে ১৬-১৭টি সোনার ১৪ থেকে ১৫টিই আসে টালুতে। সাফে দুটো ব্রোঞ্জ জেতা সিদ্দিকুল ইসলাম এখন কক্সবাজার উশু একাডেমির পরিচালক। তাঁর হাত ধরেই জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে বিভিন্ন সময় আলো ছড়িয়েছেন নুরুল আফসার, আলমগীর, সাজ্জাদ, রুবেল, সাকিব, রুমা, লাকি, ইয়াসমিন, আকলিমা, মর্জিনা ও রুকসানারা। তাঁরা বিভিন্ন বাহিনীতে চাকরিও করছেন উশুর সুবাদে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গত মে মাসে প্রথমবার অনুষ্ঠিত হয়েছে বিচ মহিলা কাবাডি। মে মাসে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ঊর্মি পয়েন্টে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘হোটেল অস্টার ইকো প্রথম বিচ রাগবি’। কক্সবাজার জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থা বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে মেয়েদের ভলিবল ও অ্যাথলেটিকস প্রশিক্ষণ দিয়েছে ২১ দিন। ১৯৮৫ সালে একাদশতম জাতীয় ভলিবল প্রতিযোগিতায় রানার্সআপ হয় কক্সবাজার জেলা দল। অষ্টাদশ জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ভলিবলে শিরোপা জিতেছিল চকরিয়া উপজেলার খুটখালী কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতন। কক্সবাজার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে প্রতিবারের মতো এ বছর অনুষ্ঠিত হয়েছে ডিসি সাহেবের বলী খেলার ৬০তম আসর। এবার চ্যাম্পিয়ন হন উখিয়ার শামসু বলী। টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, বান্দরবান, রামু, পেকুয়াসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বলীদের দেখতে কানায় কানায় ভরে যায় স্টেডিয়াম। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক অনুপ বড়ুয়া অপুর আশাবাদ, ‘দেশে স্পোর্টস ট্যুরিজম গড়ে তুলতে কক্সবাজারকে বেছে নেওয়া হয়েছে। আগামীতে কক্সবাজারই হবে ক্রীড়ানগরী।’