প্রশ্ন : শুরুটা একটু অন্য রকম প্রশ্নেই হোক। খেলোয়াড়ি জীবনে শারীরিক গড়নে ডাকাবুকো ছিলেন খুব। আর গায়ের রঙও ছিল টুকটুকে ফর্সা। দুটোরই এত পরিবর্তন কিভাবে? আবু ইউসুফ : শরীরের ক্ষেত্রে বয়স হয়তো মূল ব্যাপার। খেলোয়াড়ি জীবনের মতো পরিশ্রম তো করি না, সেই শরীর আর থাকবে কেন! তবে গায়ের রঙের ব্যাপারটি মজার। আমি আসলে খুব ফর্সা না, খুব কালোও না। খেলোয়াড়ি জীবনের বড় একটা সময় আমার চামড়ায় এক ধরনের অ্যালার্জির সমস্যা ছিল। একটু পরিশ্রম করলে, অথবা রোদে অনুশীলন বা ম্যাচ খেললে মুখ একেবারে কমলালেবুর মতো লালচে হয়ে যেত। পরে আমার চিকিৎসক প্রথম বলেন যে এটি একটি রোগ। তাঁর কাছ থেকে ওষুধ খেয়ে খেয়ে এটি পরে ভালো হয়ে যায়। প্রশ্ন : আর থাইয়ের রহস্য? আপনার থাইয়ের বিশাল গড়ন নিয়ে তখন সমর্থকদের মধ্যে তো আলোচনা হতো খুব... ইউসুফ : তা হতো। তবে এখানে আমার ইনজুরির বড় অবদান রয়েছে। কিভাবে? ১৯৭৬ সালে আমি প্রথম বিভাগে রহমতগঞ্জে খেলি। তত দিনে জাতীয় দলেও সুযোগ পেয়েছি। একদিন পাড়ার বকশীবাজার মাঠে খেলতে গিয়ে হাঁটুতে ব্যথা পাই। সঙ্গে সঙ্গে নানা সমালোচনা কানে আসতে লাগল- এই বয়সে হাঁটুতে ব্যথা পেল, নিশ্চয়ই চারিত্রিক সমস্যা রয়েছে। কষ্টে একা একা কাঁদতাম। কিন্তু এই ইনজুরি থেকে কিভাবে ভালো হব, উপায় জানা ছিল না। তখনো আমাদের পঙ্গু হাসপাতাল হয়নি। অপারেশনের তো প্রশ্নই ওঠে না। সেই সময় ইংল্যান্ড থেকে ডক্টর গাস্ট বলে একজন সার্জন মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে আসতেন সেমিনার বা কোনো অনুষ্ঠানে। অনেক কষ্টে অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে তাঁকে দেখান আমাদের ফুটবলার মালা ভাই। তাঁরও হাঁটুর সমস্যা ছিল। কিন্তু ডক্টর গাস্টকে দেখিয়ে এসে উনি মহাখ্যাপা। ঢাকাইয়া ভাষায় খিস্তি দিয়ে গজরাতে লাগলেন, 'হালায় কয়, পায়ে ওজন বাইন্ধা ব্যায়াম করতে। তাইলে নাকি হাঁটু ভালো হইব!' আমি কিন্তু সে কথা শুনে পায়ে ইট বেঁধে শুরু করলাম ব্যায়াম। তাতে তিন সপ্তাহের মধ্যে হাঁটু তো ভালো হলোই, সঙ্গে থাইও বাড়তে লাগল। আমার থাই সামনে উপচে পড়ত, আলাদা একটা ভাঁজ ছিল। সেটি নিয়ে সমর্থকরা তাই আলোচনা করত। প্রশ্ন : এ ক্ষেত্রে আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী? ইউসুফ : তোফা নামের একজনের কথা মনে পড়ছে, ওয়ান্ডারার্সে খেলত। এ ছাড়া, এ ছাড়া.... আসলে শুধু থাই থাকলেই তো হবে না। সঙ্গে পারফরমেন্সও চাই। যে কারণে হয়তো আমারটির কথা সবার মনে আছে। প্রশ্ন : দূরপাল্লার বুলেট শটেও খ্যাতি ছড়ায় আপনার। এ জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বী কারা? ইউসুফ : এনায়েত ভাই। তাঁর শটে পাওয়ার থাকত, তবে এর চেয়ে বেশি থাকত অ্যাকুরেসি। আমার আবার একেবারেই পাওয়ারনির্ভর। এত জোরে মারতাম যে বল সোজা যেতে যেতে হয়তো গোলরক্ষকের সামনে গিয়ে বাঁক খেয়ে অন্যদিক দিয়ে জালে ঢুকে যেত। মজাও লাগত তখন! প্রশ্ন : প্রচণ্ড জোরে শট মারতেন, প্রতিপক্ষকে হার্ড ট্যাকল করতেন- আপনার এই খেলার ধরন কি তখনকার ফুটবলের চাহিদা মাথায় রেখেই? ইউসুফ : বলতে পারেন। আমি হয়তো ছিলাম সেই সময়ের আদর্শ ফুটবলার। তখন ঢাকার ফুটবলে কৌশলের চেয়ে বড় ব্যাপার ছিল, মাঠে কে কতটা দাপট নিয়ে খেলতে পারে। আমরা পুরান ঢাকায় বলতাম, যে 'রোয়াব' প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তারই জয়ের সম্ভাবনা। এটি মাথায় রেখেই আমি ছোটবেলা থেকে খেলতাম। যে কারণে কোচ এবং সমর্থকদের প্রিয় ছিলাম। তবে এখানে আরেকটি কথাও বলতে চাই। রহমতগঞ্জ ও মোহামেডানে আমি যেমন ডাকাবুকো ছিলাম, আবাহনীতে আবার তেমন না। দুটি অপারেশনের পর আমি শারীরিক দিকের চেয়ে সেন্স অ্যাপ্লাই করে খেলার দিকে বেশি নজর দিই। আর আবাহনীর পাসিং ফুটবলের ধরনের সঙ্গে আমার ওই রাফ খেলা ঠিক যায়ও না। মনে আছে, আবাহনীর খেলোয়াড়-কর্মকর্তারা মজা করে বলত, 'বুড়া এখন ভদ্র হয়ে গেছে।' প্রশ্ন : বুড়া কেন? ইউসুফ : বয়স না, দাড়ির কারণে। সেই মোহামেডানে থাকতেই তো দাড়ি রাখি। তখন থেকে আমার নাম হয়ে যায় বুড়া। প্রশ্ন : এই 'বুড়া' মানুষের শৈশবের গল্পটি একটু শুনতে চাই। ফুটবলার হলেন কেন অথবা ফুটবলার হতেই হবে- এমন ভাবনার কারণটা যদি বলতেন। ইউসুফ : ফুটবলের টানটা রক্তেই ছিল। আমার আব্বা ছিলেন বকশীবাজার মসজিদের ইমাম। ওনার ছোটবেলা কাটে কলকাতায়। সেখানে কলকাতা মোহামেডানের সমর্থক ছিলেন আব্বা। পাকিস্তান আমলে আব্বার সঙ্গে ঢাকা স্টেডিয়ামে গিয়ে অনেক খেলা দেখেছি। আলী নেওয়াজ, জব্বার, কালা গফুর, গফুর বেলুচ, মুসার খেলা দেখেছি। আমার খুব ভালো লাগত আমির বক্সের খেলা। মওলা বক্সেরও। আর বাঙালিদের মধ্যে টিপু ভাই (গোলাম সারোয়ার), নান্নু ভাইয়ের (মনোয়ার হোসেন) খেলা সবচেয়ে পছন্দের। আব্বার সঙ্গে স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখতে দেখতে মনে হতো, যদি ওনাদের মতো ওই মাঠে খেলতে পারতাম! প্রশ্ন : আব্বা ফুটবলভক্ত ছিলেন বলে আপনার ফুটবলার হওয়ার পথটা তো তৈরিই ছিল... ইউসুফ : মোটেও না। বাসায় সব সময় বরং তিরস্কার করা হতো। ছয় ভাই, সাত বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। আব্বা-আম্মা তাই সব সময় বলতেন, লেখাপড়া করতে। কিন্তু আমার যে ফুটবল ছাড়া কিছু ভালো লাগে না! খ্যাপ খেলে খেলে তত দিনে নাম হয়েছে বেশ। এই করতে করতে তো ১৯৭১ সালের যুদ্ধই লেগে গেল দেশে। কী কষ্টে যে সেই সময়টা কেটেছে! প্রশ্ন : আপনার বয়স তখন কত? ইউসুফ : ১২-১৩ বছর, ক্লাস এইটে পড়ি। আব্বা কিছু টিউশনি করাতেন, যুদ্ধের সময়ে সেগুলো আর থাকেনি। খুব আর্থিক অনটনে পড়তে হয় পরিবারকে। ওই সময় যুদ্ধে যাওয়ার চেয়ে সংসারের দায়িত্ববোধ আমার কাছে ছিল বেশি। আমি ঢালাই কারখানায় কাজ নিই। সপ্তাহে ২০-৩০ টাকা আয় হতো; সেটিই অনেক। শুধু তাই না, ১৯৭১ সালে ক্লাস এইটে পড়া এই আমাকে রিকশা পর্যন্ত চালাতে হয়। আমাদের কতগুলো রিকশা ছিল, যেগুলো অন্যরা ভাড়া নিয়ে চালাত। কিন্তু যুদ্ধের সময় ভাড়া নেওয়ার লোক কই! বাসায় যেদিন তাই চাল থাকত না, রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম নিজেই। প্রশ্ন : যুদ্ধ শেষ হতেই কি আবার ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠা? ইউসুফ : সেটাই যে ছিল আমার নেশা! এমনিতে বকশীবাজার, চকবাজার, পাংখাপট্টি, চুড়িহাট্টা সিনিয়র দলেও আমার পরিচিতি ছিল খ্যাপের ফুটবলার হিসেবে। মাক্ষী, লক্ষ্মী নামে আরো দুজন খ্যাপের খেলোয়াড়ের কথা মনে পড়ছে। একজনের এক চোখ ছিল কানা, আরেকজনের ছিল কুঁজ। এরা সবাই পাড়ার ফুটবলে ছিল খুব জনপ্রিয়। আমাকেও ভাড়ায় নিয়ে যেত বিভিন্ন দল। প্রশ্ন : সেখান থেকে বিভাগীয় ফুটবলে উত্তরণ কিভাবে? ইউসুফ : পাড়ার খুরশিদ ভাই প্রথমে আমাকে নিয়ে যান দ্বিতীয় বিভাগের দল বাংলাদেশ স্পোর্টিংয়ে। কর্মকর্তারা আমার ছোটখাটো শারীরিক গড়ন দেখে বললেন, 'না, এই পিচ্চি দিয়ে চলবে না।' এরপর মাহুতটুলী ক্লাবেও একই অবস্থা। তখন উনি আমাকে নিয়ে যান বজলু ভাইয়ের কাছে। বজুল ভাই ফায়ার সার্ভিসে চাকরি করেন এবং সেখানকার কোচ। আমাকে নিলেন তাঁর দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব কামাল স্পোর্টিংয়ে। কিন্তু মাত্র দুটি ম্যাচ হওয়ার পরই প্রথম বিভাগে আবাহনীর খেলায় কী এক গণ্ডগোলের সূত্র ধরে সব খেলা বন্ধ হয়ে যায়। প্রশ্ন : প্রথম বুট কি তখন কেনা নাকি আরো আগে? ইউসুফ : আগে বুট কেনার পয়সা কই পাব! বজলু ভাই তাঁর ক্লাবে নেওয়ার পর অন্য একজনের ব্যবহার করা পুরনো বুট কিনি। সম্ভবত পাঁচ অথবা ছয় টাকা দিয়ে। বুটটি ছিল গ্লোব কম্পানির, যার মালিকের নাম সালাম। আমরা অ্যাডিডাসের অনুকরণে এই বুটকে বলতাম 'সালামডাস'। প্রশ্ন : বাসা থেকে ফুটবল খেলা নিয়ে কিছু বলত না তখন? ইউসুফ : বলত না আবার! তবে সব বলা বন্ধ হয়ে যায় ১৯৭৩ সালে। তখন ঢাকেশ্বরী কটন মিলে চাকরি হয় আমার। চাকরিটা খুব মজার। প্রতি মাস শেষে গিয়ে বেতন নিয়ে আসা আর বছরে ওদের হয়ে একটি-দুটি টুর্নামেন্ট খেলা। সেখানে বেতন ছিল চার শ নাকি সাড়ে চার শ টাকা। ব্যস, বাসার অভাব দূর হয়ে যায়। আর আমার ফুটবল নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেন না। প্রশ্ন : আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি। ছোটবেলায় প্রায় সবাই গোল দিতে চায়, মানে স্ট্রাইকার বা মিডফিল্ডার হতে চায়। আপনি গোল ঠোকানোর ডিফেন্ডার হলেন কেন? ইউসুফ : আমি তো ভাই ডিফেন্ডার ছিলাম না। খ্যাপ খেলে আমার যে সুনাম হয়েছিল, সেটি মিডফিল্ডার হিসেবে। বজুল ভাইয়ের দলে খেলি মাঝমাঠে। সাব-ডিভিশনে ঢাকা উত্তর, ঢাকা জেলা হয়ে রহমতগঞ্জেও সুযোগ পাই মিডমিল্ডার হিসেবে। কিন্তু রহমতগঞ্জের প্রথম একাদশে সুযোগ পাই না। এক ম্যাচে লেফট ব্যাক হাসনাত ভাই ইনজুরিতে পড়লেন। কোচ এসে জিজ্ঞেস করেন, ডিফেন্সে খেলব কি না। সেই যে ডিফেন্সে খেলা শুরু করি, এরপর জায়গা হারাতে হয়নি। প্রশ্ন : কিন্তু সাইড ব্যাকের চেয়ে স্টপার হিসেবেই তো আপনার পরিচিতি বেশি। সেখানে এলেন কিভাবে? ইউসুফ : আগেই বলেছি, আমি খুব দাপট নিয়ে খেলতাম। পরের দিকে রহমতগঞ্জের কোচ, অফিশিয়ালরা তাই বলেন আমাকে ডিফেন্সের মাঝখানে চলে আসতে। এভাবেই স্টপার হয়ে যাওয়া। পরে মোহামেডান-আবাহনী সব জায়গায় স্টপার হিসেবে খেলেছি। কোচদের কৌশলের প্রয়োজন হলে কখনো কখনো অবশ্য মিডফিল্ডে খেলেছি। আর ঢাকা জেলা দলে তো বেশির ভাগ সময় খেলেছি মিডফিল্ডেই। প্রশ্ন : জাতীয় দলের ডাক আসে কবে? ইউসুফ : ১৯৭৪ সালে এক রাশিয়ান কোচ নিয়ে আসে ফুটবল ফেডারেশন। কোটবাড়িতে সিনিয়র-জুনিয়রদের ক্যাম্প হয় একসঙ্গে। ওই দল দুটি কুয়েতে যাবে। আমি সুযোগ পাই যুব দলে। রাশিয়ান কোচ আমাকে পছন্দ করতেন খুব। উনি ক্যাম্পের ফুটবলারদের মার্কিং করেছিলেন, সেখানে আমি পাই সবচেয়ে বেশি নম্বর। মূল জাতীয় দলে প্রথম খেলার ব্যাপারে একটি ট্র্যাজেডি আছে। ১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ার মারদেকায় খেলতে যাই আমরা। এর আগে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে আমাদের বিদায় দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের সময় উনি আমার চেহারা-সুরত দেখে জিজ্ঞেস করেন, 'এটি কি প্লেয়ার?' কোচ বললেন, 'হ্যাঁ।' উনি আবার জিজ্ঞেস করেন, 'এই ছেলে জাতীয় দলে খেলে?' কোচ মাথা নাড়েন। বঙ্গবন্ধু তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে কোচকে বলেন, 'এই ছেলেটিকে যত্ন নেবে।' এটিকে ট্র্যাজেডি বলছি; কারণ আমরা মালয়েশিয়া থাকতেই ১৫ আগস্টের সেই দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটে যায়। প্রশ্ন : রহমতগঞ্জ তো আপনার প্রায় পাড়ার ক্লাব। এখানে খেলেনও অনেক দিন। ক্লাব বদলে মোহামেডানে আসার গল্পটি কেমন? ইউসুফ : রহমতগঞ্জ ছাড়ার কথা আমরা কেউ আসলে কখনো ভাবিনি। টাকা-পয়সার কোনো দাবিও ছিল না। কিন্তু ১৯৭৯ সালে মনোমালিন্য হয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে। আমরা শুনলাম মঞ্জু ভাই দুই বছরের জন্য সোয়া এক লাখ টাকায় রহমতগঞ্জে নাম লিখিয়েছেন। আমি সেবার পাই বোধ হয় ৩৫ হাজার। মনে একটা কষ্ট তাই ছিল। ওই সময় টিপু ভাই একদিন বকশীবাজার মাঠে এসে আমাকে মোহামেডানে খেলার প্রস্তাব দেন। টিপু ভাইকে বললাম, আগে আমার ক্লাবের সঙ্গে কথা বলি। মঞ্জু ভাইয়ের ব্যাপারটি মাথায় ছিল। আমি গিয়ে রহমতগঞ্জের কাছে এক বছরের জন্য এক লাখ টাকা চাইলাম। ক্লাবের কর্মকর্তা আমাকে বললেন, 'তোমার মাথা ঠিক আছে? নিশ্চয়ই মাথায় গণ্ডগোল হয়েছে।' চলে এলাম। টিপু ভাইকে পাকা কথা দিলাম যে মোহামেডানে খেলব। ওনারা এক লাখ টাকাতেই রাজি। আমি মোহামেডানে যাচ্ছি এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রহমতগঞ্জ ক্লাব আমার বাসায় এক লাখ টাকা পাঠিয়ে দেয়। আমি সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পর এটি শুনি। কিন্তু আব্বাকে বলি, 'এখন টাকা দিলে হবে? ওরা বলেছে, আমার মাথা ঠিক নেই। এই টাকা ফেরত দিয়ে দেন।' আব্বা তা ফেরত দিলেন। আমি নাম লেখাই মোহামেডানে। প্রশ্ন : সেখানে তো খুব সফল সময় কাটিয়েছেন... ইউসুফ : হ্যাঁ। দুবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, তিনবার ফেডারেশন কাপ। ১৯৮২ সালে তো দেশ-বিদেশ মিলিয়ে চার-পাঁচটি ট্রফি সম্ভবত জিতেছিলাম। কিন্তু তত দিনে মোহামেডানের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আমার এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। ১৯৮১ সালে তখনকার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর লিগ বন্ধ হয়ে যায়। আমরা তো ভেবেছি, অনেক দিন তা বন্ধ থাকবে। টিপু ভাইকে বলে ওই সময়টায় হাঁটুর অপারেশন করাই সালেক তালুকদারকে দিয়ে। কিন্তু কিছুদিন পর হঠাৎ করে আবার লিগ শুরু হয়ে যায়। তখন পর্যন্ত পয়েন্টে এগিয়ে থাকা মোহামেডান শেষে আর আমাকে ছাড়া চ্যাম্পিয়ন হতে পারে না। সব দোষ পড়ে তখন আমার ঘাড়ে- কেন এই সময় অপারেশন করালাম? তবু পরের মৌসুম খেলি। এরপর মোহামেডানের কর্মকর্তারা এমন অবহেলা করল, আমি ঘোষণা দিলাম, যদি কোনো ক্লাবও না পাই, মোহামেডানে আর খেলব না। ওই সময় আবাহনী প্রস্তাব নিয়ে এলো। আমি সায় দিই তাতে। এরপর তো টানা তিনবার লিগ শিরোপা জিতে হ্যাট্রটিক চ্যাম্পিয়ন হয় আবাহনী। প্রশ্ন : শুরুর দিকে বলছিলেন, ক্যারিয়ারের শুরুতে ডাকাবুকো ছিলেন খুব। আশির দশকের এক ম্যাচে আপনার, বড় বাদল, কোহিনূরদের মারামারির একটি ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল 'সদলবলে যুদ্ধ যাত্রা' শিরোনামে। সেই ম্যাচটির কথা মনে আছে? ইউসুফ : মনে থাকবে না আবার? আমি তখন মোহামেডানে। সেটি ছিল শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ। আবাহনী আমাদের সামনে পাত্তাই পায়নি। ওরা দুই গোল খাওয়ার পর ইচ্ছে করে গণ্ডগোল লাগিয়ে দেয়। পণ্ড হয়ে যায় খেলা। দুই দলের খেলোয়াড়-দর্শকদের মধ্যে মারামারি হয়েছিল প্রচণ্ড। প্রশ্ন : তাতে কয়েকজন বোধ হয় মারাও যায়। অভিযোগ ছিল, কর্নার ফ্ল্যাগ দিয়ে পিটিয়ে মোহামেডানের খেলোয়াড়রা মেরে ফেলেছে... ইউসুফ : আরে নাহ্! দর্শক নিয়ন্ত্রণ করার সময় পুলিশের ঘোড়ার নিচে পড়ে একজন দর্শক বোধ হয় মারা যায়। আর বড় বাদলের নামে এমন একটা গুজব রটেছিল। তবে সেটি সত্যি না। প্রশ্ন : আবাহনীতে তো অনেক দিন ছিলেন। শেষে অবসরও নেন সেখান থেকে। মাঝের সময়টায় আবাহনী ছাড়লেন কেন? ইউসুফ : শেষ দিকে বয়সের কারণে আমার ফর্ম ছিল পড়তির দিকে। প্রথম একাদশে সব সময় সুযোগ হতো না। আবাহনীর কোচ তখন সালাউদ্দিন ভাই। উনি প্রথম একাদশকে আলাদা কোচিং করাতেন, বাকিদের সেভাবে দেখতেনই না। এটি ছিল খুব অসম্মানের। আরেকটি ব্যাপার। আমরা অনেকে হয়তো আগের বছরের টাকা পাই না। কিন্তু মুন্নাকে নতুন মৌসুমের সব টাকাও দিয়ে দেওয়া হয়। ওকে যেকোনোভাবে রাখার কথা ক্লাব ভেবেছে, আমাদের কথা ভাবেনি। এমন অবস্থায় '৯১ বা '৯২ সালে ভিক্টোরিয়ায় গেলাম। এরপর দ্বিতীয় বিভাগের দল জুরাইন স্পোর্টিংয়ে কোচ কাম খেলোয়াড় হলাম। ১৯৯৪ সালে সাবের ভাই আবার আবাহনীতে নিয়ে আসেন। সেখানে শেষ ম্যাচটিতে কিছু সময়ের জন্য বোধ হয় মাঠে নামি। এরপর খেলোয়াড় হিসেবে অবসর। প্রশ্ন : প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কোচ ইউসুফের যাত্রা শুরু। সেখানটায় আসব আমরা, তার আগে আপনার খেলোয়াড়ি জীবনের আরো কিছু বিষয়ে একটু আলো ফেলতে চাই। ১৯৮৫ সালের সাফ ফুটবল ফাইনালের টাইব্রেকারের ওই পেনাল্টি মিস নিয়ে কষ্ট হয় এখনো? ইউসুফ : হয়। ওই সাফ গেমসের দলে শুরুতে কিন্তু আমি ছিলাম না। কোচ সালাউদ্দিন ভাই অনেক চেষ্টা করে পরে আমাকে ও টুটুলকে নিয়েছেন। আমি যে টাইব্রেকার মিস করব, এটি কেউ ভাবেনি। এমনিতে একটি দিক ঠিক করে খুব জোরে শট নিতাম। সাফের সময় বার-পোস্টের ঠিক কোনায় প্লেসিং করা অনুশীলন করি খুব করে। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে সেটিই করতে যাই। কিন্তু বলের একেবারে তলায় পা লাগায় বল উড়ে যায় আকাশে। এ জন্য আফসোস আছে এখনো। মনে হয়, যদি এক দিক বেছে নিয়ে বুলেট শট করতাম, তাহলে হয়তো গোল হতো। প্রশ্ন : আরেকটি আক্ষেপও কি পোড়ায় এখনো- ১৯৮৬ সালের লিগ ম্যাচে ভারতের মনোরঞ্জনের জায়গায় আপনি সেন্ট্রাল ডিফেন্সে খেললে মোহামেডানের কাছে হেরে হয়তো শিরোপা হারাতে হতো না? ইউসুফ : হ্যাঁ, আক্ষেপ তো আছেই। আমি আর পাকির আলী তখন আবাহনীর স্টপার। আমাদের মাঝ দিয়ে বল যাওয়া ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার। কিন্তু ক্লাবের কর্মকর্তারা আস্থা রাখলেন বিদেশিদের ওপর। মনোরঞ্জন নিঃসন্দেহে ভালো ডিফেন্ডার ছিল। কিন্তু পাকির আলীর সঙ্গে আমার যে বোঝাপড়া, সেটি তো ওর ছিল না। তার ওপর চিমা, মনোরঞ্জন ম্যাচের আগের সারা রাত বারে কাটিয়েছে। পার্টি করেছে, ডিসকোতে ছিল। এরপর ম্যাচের সময় নড়তে পারবে কিভাবে! প্রশ্ন : ম্যাচের আগে মনোরঞ্জনের একটি উক্তি তো এখনো পুরনো দিনের দর্শকরা মনে করতে পারেন- কিছু ভাববেন না দাদা... ইউসুফ : ...সব সামলে নেব। হ্যাঁ এটি বলেছিল মনোরঞ্জন। আসলে ম্যাচের আগে সবার টেনশন। একটু এদিক-ওদিক হলেই সব শেষ। আমি অধিনায়ক ছিলাম, অথচ আমাকে রাইট ব্যাকে সরিয়ে মনোরঞ্জনকে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে খেলানো হয়। ম্যাচের আগে মনোরঞ্জন খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিল, 'কিছু ভাববেন না দাদা, সব সামলে নেব'। দুই গোলে ম্যাচটি আমরা হেরে যাই, মোহামেডান জেতে শিরোপা। পরে মোহামেডানের সমর্থকরাই মনোরঞ্জনের ওই কথাটি বিখ্যাত বানিয়ে ফেলে। প্রশ্ন : নিজের সেরা ম্যাচ? ইউসুফ : আবাহনী থেকে ভিক্টোরিয়ায় যাওয়ার পর প্রথম যে ম্যাচে ওদের মুখোমুখি হই, সেটি। একেবারে জান দিয়ে খেলি সেদিন। শেষ পর্যন্ত প্রভাব কাজে লাগিয়ে আবাহনী ম্যাচটি জেতে এক গোলে। আরেক ম্যাচের কথা মনে পড়ছে। সম্ভবত ফেডারেশন কাপ ফাইনাল, মোহামেডানের বিপক্ষে। আমরা ১-৩ গোলে পিছিয়ে পড়ি, পরে ২-৪ গোলে। আবাহনীর খেলোয়াড়রা চোখ মুছছি আর খেলছি। সেখান থেকে প্রেমলালের হ্যাটট্রিকে ম্যাচটি ড্র হয় ৪-৪ গোলে। এরপর টাইব্রেকারে জিতি আমরা। মোহামেডানের হয়ে ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে একটি ম্যাচের কথাও বলতে পারি। ওদের গোলরক্ষক ছিল হয় লাল মোহাম্মদ, নয় আমানুল্লাহ। আমি স্টপার থেকে উপরে উঠে গিয়ে একটি শট এমন গতিতে করি যে গোলরক্ষকের সামনে গিয়ে বাঁক খেয়ে সেটি জড়িয়ে যায় জালে। প্রশ্ন : আপনি যাঁদের সঙ্গে বা বিপক্ষে খেলেছেন, তাঁদের মধ্য থেকে বাংলাদেশের সেরা একাদশ যদি বেছে দিতেন? ইউসুফ : আমাদের সময়ে দলগুলো খেলত মূলত ৪-২-৪ ফর্মেশনে। সে অনুযায়ী একটি দল সাজানোর চেষ্টা করি। গোলরক্ষক হিসেবে আমার খুব পছন্দ শান্টু ভাই। স্টপারে অনেকেই রয়েছেন, কিন্তু কায়সার হামিদ-মুন্নার দাবি সবচেয়ে বেশি। রাইট ব্যাকে মঞ্জু ভাই ও টুটুল আমার চোখে প্রায় সমান। তার পরও একজন বেছে নিতে হলে মঞ্জু ভাই। লেফট ব্যাক জনি। মিডফিল্ডে বল প্লেয়ার হিসেবে আশীষ ভদ্র খুব ভালো, তবে আমি নেব নান্নু ভাইকে। আহ্, কী ফুটবলার ছিলেন! তাঁর সঙ্গী ভীষণ পরিশ্রমী খুরশিদ বাবুল। লেফট ইনসাইডে চুন্নু, রাইট ইনসাইডে ওয়াসিম। আর মাঝের দুজন নিয়ে বাংলাদেশের কেউ হয়তো দ্বিমত করবেন না। এনায়েত ভাই ও সালাউদ্দিন ভাই। প্রশ্ন : সেরাদের সেরার তুলনায় এই দুজনকে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। আপনার দৃষ্টিতে সালাউদ্দিন-এনায়েতের মধ্যে কে এগিয়ে? ইউসুফ : সালাউদ্দিন ভাই খুব ভালো ফুটবলার। তবে তাঁর চেয়ে কম বলব না এনায়েত ভাইকে; অনেক ক্ষেত্রে বরং বেশি। সালাউদ্দিন ভাই ছিলেন ফিনিশার। তাঁর বাড়তি সুবিধা স্টাইলের কারণে দর্শকপ্রিয়তা। পেপারে তাঁকে নিয়ে লেখালেখি হতো অনেক। এনায়েত ভাই আবার অন্য রকম। তাঁর ব্যবহার ভালো ছিল না, কাউকে পাত্তা দিতেন না। তবে উনি ছিলেন 'টিম প্লেয়ার'। একেবারে জানপ্রাণ দিয়ে খেলতেন। গোলের ক্ষেত্রে সালাউদ্দিন ভাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু এখনকার ফুটবলে তাঁর চেয়ে এনায়েত ভাই বেশি কার্যকর হতেন, অলরাউন্ড সামর্থ্যের কারণে। তবে একটা বাজে অভ্যাস ছিল তাঁর। কেউ একজন যদি এনায়েত ভাইয়ের পায়ের নিচ দিয়ে বল নিয়ে যেত কিংবা তাঁকে রাফ ট্যাকেল করত, তাহলে শুধু ওই খেলোয়াড়ের সঙ্গে ঘুরতেন তিনি। অপেক্ষায় থাকতেন সুযোগের, কখন বল পেলে ড্রিবলিং করে তাকে নাচাবেন। এতে দর্শকের হাততালি মিলত, কিন্তু ওদিকে যে দলের আক্রমণের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেটি মাথায় রাখতেন না এনায়েত ভাই। পরবর্তীতে বাবলু, সাব্বিরের মধ্যেও এই কারিকুরি দেখিয়ে দর্শকের হাততালি পাওয়ার ব্যাপারটি আমি দেখেছি। প্রশ্ন : বাংলাদেশে খেলা বিদেশিদের মধ্যে সেরা কে? ইউসুফ : তিনজনের কথা আমি বলব- সামির শাকির, জুকভ ও নালজেগার। অনেকে এমেকার কথা বলেন। তবে আমি ওকে সেরাদের কাতারে আনতে চাই না। কেননা মোহামেডানের কর্মকর্তাদের দাপটের কারণে এমেকা শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করেও পার পেত। যে কারণে মোহামেডানকে ও অনেক সাফল্য এনে দিলেও বাংলাদেশে খেলা সেরা বিদেশিদের মধ্যে ওকে আমি রাখব না। প্রশ্ন : শেষদিকে চলে এসেছি। এবার একটু কোচিংয়ে ফেরা যাক। খেলা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কি কোচিং শুরু করলেন? ইউসুফ : আসলে খেলা ছাড়ার আগেই কোচিংয়ে আসা। ভিক্টোরিয়ায় তো এক রকমের কোচ কাম খেলোয়াড় ছিলাম। জুরাইনেও তাই। আর আবাহনীতে আমাকে নিয়ে আসা হয় কোচ করার জন্য। বলা হয়, 'এখানে খেলে অবসর নাও, এরপর আমাদের কোচ হবে।' শেষ মৌসুমে আমি খেলোয়াড় হলেও সামির শাকিরের সহকারী কোচ হিসেবেই কাজ করেছি এক রকম। কিন্তু পরের মৌসুমে আবাহনী আমার সঙ্গে কথা না বলে দল নিয়ে আইএফএ শিল্ড খেলতে চলে যায় ভারতে। তখন মোহামেডান আমাকে প্রস্তাব দিল। তাদের কোচ হয়ে ফেডারেশন কাপ শিরোপা জেতাই। প্রশ্ন : তবু তো মোহামেডান লিগে বিদেশি কোচ নিয়ে আসে... ইউসুফ : ফেডারেশন কাপ ফাইনালের আগের দিনই আনে। আর মোহামেডানের খেলোয়াড়রাও এমন, জেতার পর মিডিয়ায় বলে যে এর কৃতিত্ব নাকি ওই নাইজেরিয়ান কোচ ইখানার। আমাকে মোহামেডান তখন মাসে বেতন দেয় ১০ হাজার। আমি (মোসাদ্দেক আলী) ফালু ভাইকে গিয়ে বলি, 'ফুটবলার পায় ১০ লাখ, কোচ ১০ হাজার- এটি কেমন কথা?' উনি বলেন, 'ইউসুফ ভাই আপনাকে যে কি দিমু, চিন্তাই করতে পারবেন না।' প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নিয়ে চা খাওয়ান, নানা গল্প করেন, কিন্তু টাকা আর দেন না। অথচ ইখানার গাড়ির তেল, খাওয়ার খরচ বাবদ প্রতিদিন নাকি চার হাজার করে খরচ করত। তবে লিগের প্রথম চার ম্যাচে আট পয়েন্ট হারানোর পর ওই কোচকে বিদায় দেয় মোহামেডান। ওই অবস্থায় আবার দায়িত্ব নিয়ে শিরোপা লড়াইয়ে ফেরাই মোহামেডানকে। কিন্তু আবাহনীর বিপক্ষে শেষ ম্যাচে আমাদের কায়সার ও মুন্না শতভাগ ফিট ছিল না। ম্যাচটি হেরে গিয়ে শিরোপা জিততে পারি না। মোহামেডান থেকে বলা হয়, আমি নাকি আবাহনী থেকে অবসর নিয়েছি বলে ওদের ইচ্ছে করে জিতিয়ে দিয়েছি। আবাহনী ক্লাবে গিয়ে নাকি মিষ্টিও খেয়ে এসেছি। এতে কষ্ট পেয়ে আর মোহামেডানে কোচিং করাইনি। প্রশ্ন : দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারে আবাহনী-মোহামেডানে খুব অল্পই কোচিং করিয়েছেন। এ নিয়ে অতৃপ্তি আছে? ইউসুফ : আমি চট্টগ্রাম আবাহনী, ভিক্টোরিয়া, মুক্তিযোদ্ধা, শেখ রাসেল, শেখ জামালসহ অনেক ক্লাবেই কোচিং করিয়েছি। এখানে কাজের স্বাধীনতা তুলনামূলক বেশি। আবাহনী-মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন না হলে সব দোষ কোচের ঘাড়ে পড়ে। আবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য পাতানো ম্যাচও খেলে ওরা। সেটি তো আমাকে দিয়ে সম্ভব না। আমার ক্লাবগুলো যে কখনো পাতানো ম্যাচ খেলেনি, তা নয়। তবে সেটি আমার অগোচরে। কারণ আবাহনী-মোহামেডানের মতো আমার কাছে চ্যাম্পিয়নশিপ বড় ব্যাপার না, ফুটবলই বড় কথা। ফুটবলের ধ্বংস করে আমি চ্যাম্পিয়নশিপ চাই না। প্রশ্ন : জাতীয় দলেরও তো কোচ হয়েছিলেন? ইউসুফ : আমার অধীনে দল কাতারে গিয়ে ওদের জাতীয় দল ও অলিম্পিক দলের সঙ্গে দুটো ম্যাচ ড্র করে। হংকং নিয়ে যাই দল। একটি সাফেও কোচ ছিলাম। কিন্তু আমাদের ফেডারেশন বিদেশি কোচদের যেভাবে গুরুত্ব দেয়, দেশি কোচদের সেভাবে না। যে কারণে বেশি দিন জাতীয় দল নিয়ে কাজ করা হয়নি। প্রশ্ন : কোচিং নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? ইউসুফ : ফুটবল থেকে আমি অনেক কিছু পেয়েছি। কোচ হিসেবে এর কিছুটা ফিরিয়ে দিতে চাই। তবে সে জন্য সুযোগ তো লাগবে। আমাকে সেই সুযোগ দিলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আমি। প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে তৃপ্ত কতটা? ইউসুফ : পুরোপুরি তৃপ্ত। ফুটবলের কারণে পুরো দেশের মানুষ আমাকে চেনে। এটি কি কম কথা! তা ছাড়া এই ফুটবল দিয়ে জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। আমার দুই ছেলেকে ডাক্তার বানাতে পেরেছি। বড় ছেলের এমবিবিএস শেষ হলো, ছোটটির ফাইনাল সামনে। আমি কখনো টাকার পেছনে ছুটিনি। কিন্তু যুদ্ধের সময় আমাকে টাকার জন্য যেমন ঢালাইয়ের কারখানায় কাজ করতে হয়, রিকশা চালাতে হয়- আমার ছেলেদের সেটি করতে হবে না। আর এসবই ফুটবলের কারণে। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার তাই অশেষ কৃতজ্ঞতা।