মানস চৌধুরী নিজের একটি ওয়েবসাইট খুলেছেন। বহু গুণের অধিকারী তিনি। সফল একজন ডেন্টিস্ট হিসেবেই নিজেকে নিয়ে তৃপ্ত থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তো প্রবাল চৌধুরীরও ছেলে, বাবার সহজাত গানের গলাটা তাঁর আছে। গানের সাধনা তাই ছোটবেলা থেকেই। এখন রেডিও, টিভি, অ্যালবাম, প্লেব্যাকেও তাই ব্যস্ত সময় কাটে। কিন্তু বিকেল বেলাটায় তাঁকে খোঁজ করুন, আর কোথাও পাবেন না চট্টগ্রাম জিমনেসিয়াম ছাড়া। সেখানে পুরোদস্তুর তিনি খেলোয়াড়, কপালে ব্যান্ড জড়িয়ে টেবিল টেনিস ব্যাট হাতে ঘাম ঝরাচ্ছেন। যেনতেন পর্যায়ের খেলোয়াড় নন মানস, পাঁচবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। সর্বশেষটি এ বছরই জিতেছেন চট্টগ্রাম রহমতগঞ্জের এই ছেলে। বাবা প্রবাল চৌধুরীর হাত ধরেই সেই ছোটবেলায় ঢাকায় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় খেলতে এসেছিলেন। চ্যাম্পিয়ন হয়ে রওশন এরশাদের হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এরপরের গল্পটা আন্দাজ করেই নেওয়া যায় তাঁর সাফল্যের সূত্র ধরে। টিটিতে রচি, কচি, কিসলুদের পর নড়াইলের মাহবুব বিল্লাহর একক রাজত্ব শুরু হতো যদি মানস না থাকতেন। মাহবুব জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁর পঞ্চম শিরোপাটি জেতেন ২০১০ সালে। এর পরের চারটি আসরে এই সাফল্য ধরে রাখতে পারলে দেশের টিটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ডটা হয়ে যেতে তাঁরই, মানসই সেটি হতে দেননি। ২০০৯ সালে প্রথম শিরোপা জেতার পর সর্বশেষ এই চারটি ট্রফিই নিয়ে গেছেন তিনি চট্টগ্রামে। মোসাদ্দেকুল হক রচির রেকর্ড আটটি শিরোপা জেতার কীর্তি ছোঁয়ার সম্ভাবনা এখন তাঁরই বেশি। মানস নিজে আগ বাড়িয়ে অত বড় স্বপ্ন দেখতে রাজি নন, ‘প্রথমবার শিরোপা জেতাটাই আমার কাছে ছিল অবিশ্বাস্য। এর পর পরিশ্রম করে গেছি শুধু নিজের ফর্মটা ধরে রাখার জন্যই। শিরোপা আপনিই ধরা দিয়েছে। তো আরো তিন-চার বছর এই ফর্মটা ধরে রাখা সহজ কথা নয়। আমি চেষ্টা করব, কিন্তু ভাগ্যে কী আছে জানি না।’ ১৯৯০ সালে প্রথমবার যখন জাতীয় জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েছিলেন মানস, তখন ১৪তম হয়েছিলেন। ভাবাই যায়নি পরের আসরে এই ছেলেটিই শিরোপা জিতে নেবে। সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে এ পর্যন্ত সাতবার ফাইনাল খেলেছেন, প্রথমটি ২০০১ সালে, তরুণ এই খেলোয়াড়ের সামনে টিটিতে তখন অবারিত ভবিষ্যৎ। কিন্তু মানস যে একটা মাত্র গণ্ডিতে আটকে থাকার মানুষ নন। তত দিনে ঢাকা সিটি ডেন্টাল কলেজ থেকে তাঁর বিডিএস ডিগ্রি সম্পন্ন হয়ে গেছে। তরুণ চিকিৎসক হিসেবে নাম লেখানোর এই সময়টিও তিনি হাতছাড়া করতে চাননি। ভাবা যায়, টিটিতে অমন দারুণ শুরুর পরও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আর টেবিলের সামনেই আসতেন না। পুরো মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন নিজের চেম্বার গড়ে তোলা নিয়ে। পেশাদার ক্যারিয়ারে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার পর ২০০৭ সালে তাঁর প্রত্যাবর্তন। ‘আমাদের দেশে টেবিল টেনিস খেলাটাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার এখনো সুযোগ তৈরি হয়নি। আমার নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তাই ভাবতে হয়েছে। সেদিকে যখন কিছুটা গুছিয়ে নিলাম, তখন আবার সেই ভালো লাগার জায়গাটায় ফিরলাম। ফিরতামই, মনের মধ্যে সব সময় সেই ইচ্ছাই ছিল।’ তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মাহবুব বিল্লাহর চোখে, ‘দ্বিতীয়বার মানস ফিরল দারুণ পরিণত হয়ে। এমন সব শট আর এমন একাগ্রতা নিয়ে খেলা শুরু করল যে আমরাই ওর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলাম না।’ প্রত্যাবর্তনের পর শিরোপা জিততে বছর দুইয়ের বেশি লাগেনি, ২০০৯ সালে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় শিরোপা, আর এবার ২০১৫ সালে এসে জিতলেন পঞ্চমটি। ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়নশিপ না হওয়ায় ২০১১ সাল থেকে টানা চারবার তিনি জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। মোটা দাগে গত পাঁচ বছরে টিটিতে মানসেরই রাজত্ব। আর কত দিন তিনি এই ‘ফর্ম’ বা রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেন সেটা আগ্রহের বিষয়ই হয়ে রইল। তবে এ পর্যন্তই যা করেছেন বাংলাদেশের টিটির ইতিহাসে তিনি খ্যাতিমান হয়েই থাকবেন। শিল্পী, ডাক্তার, আর সব পরিচয় ছাপিয়ে শুধু এই ক্রীড়াঙ্গন তাঁকে মনে রাখবে।