১৯৮৭ সালে উপমহাদেশের প্রথম বিশ্বকাপে আয়োজক ছিল শুধুই ভারত আর পাকিস্তান। ১৯৯৬ সালে বিশ্বকাপের দক্ষিণ এশিয়ায় ফেরার ক্ষণে আয়োজক হিসেবে যোগ হয় তৃতীয় আরেকটি নাম, শ্রীলঙ্কা। কথা ছিল ২০১১ সালে সার্ক অঞ্চলের তৃতীয় বিশ্বকাপে আয়োজক থাকবে এই অঞ্চলের চার টেস্ট খেলুড়ে দেশই। সেই হিসাবে এবার আয়োজনের গুরুভারের খানিকটা ভাগ পেয়ে যায় বাংলাদেশও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চার দল নয়, তিন দল নিয়েই আয়োজিত হয় এ টুর্নামেন্ট। পাকিস্তানের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সে দেশে দল পাঠাতে রাজি হচ্ছিল না কোনো দেশই, তাই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে ছাড়াই আয়োজন করা হয় এই বিশ্বকাপের। উপমহাদেশের আগের দুই বিশ্বকাপে যা হয়নি, এবার কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে যায় সেটা-সেমিফাইনালে ওঠে উপমহাদেশেরই তিন দল! সেমিফাইনালেই ভারত-পাকিস্তানের দেখা হয়ে যাওয়ায় একটু ছন্দপতন হলেও মুম্বাইয়ের ফাইনালটি রাঙিয়ে তোলে ভারতের উপস্থিতি। আর শুধু উপস্থিতিই বা কেন! মহেন্দ্র সিং ধোনির দল বিশ্বকাপটাই জিতে নিয়ে আরো রঙিন করে তোলে উৎসব, মুম্বাইয়ের ছেলে শচীন টেন্ডুলকারকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছিল যেটা। দুই দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সঙ্গে একেবারেই বেমানান একটা অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দিয়ে যেন সম্মানিত হয় বিশ্বকাপই! ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঠে এর আগের বিশ্বকাপটি ছিল সংগঠকদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার অনেকটাই বদলে ফেলা হয় টুর্নামেন্টের ফরম্যাট। দলের সংখ্যা ১৬ থেকে কমিয়ে করা হয় ১৪, চারটি করে দল নিয়ে ছোট ছোট গ্রুপ করার পরিবর্তে ফিরিয়ে আনা হয় সাত দলের দুটি গ্রুপ। ফিরিয়ে আনা হয় উপমহাদেশের মাঠের সর্বশেষ বিশ্বকাপের ফরম্যাটও, গ্রুপ পর্ব শেষে দুই গ্রুপ থেকে চারটি করে দল নিয়ে আয়োজন করা হয় কোয়ার্টার ফাইনাল। গ্রুপ পর্বে এ গ্রুপের ম্যাচগুলো বলতে গেলে কোনো অঘটনই হয়নি। প্রত্যাশিতভাবেই ছোট দলগুলোকে অনায়াসে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে গ্রুপের চার বড় দল। একমাত্র উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ১৯৯৯ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার হার। ওই ম্যাচ জিতে গ্রুপসেরাও হয় পাকিস্তান। কিন্তু অন্য গ্রুপের লড়াই মোটেই এমন সরল পথে এগোয়নি! বলা যায় এগোতে পারেনি ইংল্যান্ডের কারণে। বড় দলগুলোর বিপক্ষে দুর্দান্ত খেললেও বিস্ময়করভাবে ছোট দলগুলোর সঙ্গে খাবি খাচ্ছিল ইংলিশরা। ভারতের বিপক্ষে ৩৩৯ রান তাড়া করতে গিয়ে টাই করেছিল তারা, তুলনামূলক লো স্কোরিং ম্যাচে হারিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। কিন্তু সেই দলটাই আবার নেদারল্যান্ডসকে তুলতে দিয়েছে ২৯২ রান, আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরেছে ৩২৭ রান করেও, জিততে জিততে হেরেছে বাংলাদেশের কাছেও। ঘরের মাঠের প্রথম বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সুখস্মৃতি চট্টগ্রামের মাঠের ওই জয়টাই। সঙ্গে দুই ছোট দল আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে প্রত্যাশিত জয় কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইয়ে রেখেছিল টাইগারদের-কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫৮ আর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৮ রানের দুটি লজ্জাজনক স্কোর ডেকে আনে সর্বনাশ। সমান ৬ পয়েন্ট নিয়েও নেট রান রেটে অনেক এগিয়ে থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ উঠে যায় শেষ আটে। শেষ আটের চেহারাটাও তাই শেষ পর্যন্ত হয়েছিল প্রত্যাশিতই। কোয়ার্টার ফাইনালের শুরু আর শেষটা হয়েছিল একপেশে ম্যাচ দিয়ে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১১২ রানে গুটিয়ে দিয়ে শুরুটা করেছিল পাকিস্তান, আর ইংল্যান্ডের তোলা ২৩০ রান কোনো উইকেট না হারিয়েই টপকে গিয়ে শেষটা করেছিল শ্রীলঙ্কা। মাঝের দুটি ম্যাচে অবশ্য উত্তেজনার কমতি ছিল না। এর একটিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়ে তিন বিশ্বকাপ পর নতুন চ্যাম্পিয়ন পাওয়া নিশ্চিত করে ভারত, অন্যটিতে বরাবরের 'চোকার' দক্ষিণ আফ্রিকা নিউজিল্যান্ডের ২২১ রান তাড়া করতে নেমে ২ উইকেটে ১০৮ রান তোলার পর সব কিছু গুলিয়ে ফেলে ৪৯ রানে হেরে যায় প্রোটিয়ারা। ষষ্ঠবারের মতো সেমিফাইনালে উঠেও অবশ্য লাভ হয়নি নিউজিল্যান্ডের, ষষ্ঠবারের মতোই শেষ চার থেকে বিদায়ও নেয় তারা, শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে। মোহালির দ্বিতীয় সেমিফাইনালটা শুরু হয়েছিল ফাইনালের আবহ নিয়ে-ভারত-পাকিস্তান লড়াই বলে কথা! তাতে টস জিতে ব্যাট করতে নামা ভারতকে ২৬০ রানে বেঁধে রেখে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন পাকিস্তানের বোলাররা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি সেই স্বপ্ন। ২৯ রানের জয় তুলে নিয়ে মুম্বাইয়ের ফাইনালটাকেই বরং স্বপ্নের মঞ্চ বানায় মহেন্দ্র সিং ধোনির দল। মহানায়ক টেন্ডুলকারের জন্য সাজানো সেই মঞ্চ আলো করে সেঞ্চুরি করেছিলেন শ্রীলঙ্কার মাহেলা জয়াবর্ধনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাভ হয়নি তাতে, ব্যাটিং অর্ডারে নিজেকে ওপরে তুলে নিয়ে খেলা ৯১ রানের বিধ্বংসী এক ইনিংসে সেই সেঞ্চুরিকেও ম্লান করে দেন ধোনি নিজে। ঘরের মাঠে প্রথম বিশ্বকাপ জিতে পূর্ণ হয় টেন্ডুলকারের জীবনের সব অপূর্ণতা! ফাইনাল শ্রীলঙ্কা : ৫০ ওভারে ২৭৪/৬ (জয়াবর্ধনে ১০৩*, সাঙ্গাকারা ৪৮, দিলশান ৩৩, কুলাসেকেরা ৩২; যুবরাজ ২/৪৯, জহির ২/৬০, হরভজন ১/৫০)। ভারত : ৪৮.২ ওভারে ২৭৭/৪ (গম্ভীর ৯৭, ধোনি ৯১*, কোহলি ৩৫, যুবরাজ ২১; মালিঙ্গা ২/৪২, দিলশান ১/২৭, পেরেরা ১/৫৫)। ফল : ভারত ৬ উইকেটে জয়ী। ম্যাচসেরা : মহেন্দ্র সিং ধোনি। টুকিটাকি * মুম্বাইর ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের ফাইনালে আবহটা এতই উত্তেজনাকর ছিল যে দর্শকরাও তেতে ছিলেন। কিন্তু তাঁদের উল্লাসধ্বনির আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল মাঠের সব কথা। এমনকি টসের সময় কুমার সাঙ্গাকারার কলও! ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো যখন মুদ্রা ছুড়ে দেন, তখন কি ডেকেছিলেন সাঙ্গাকারা, সেটা শুনতেই পাননি ক্রো। তাই সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি দ্বিতীয়বার মুদ্রা নিক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমবার হেড উঠেছিল, এবারও সাঙ্গাকারা হেডই ডাকেন এবং টসটা তিনিই জেতেন শেষ পর্যন্ত! * নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২২২ রান তাড়া করতে নেমে একপর্যায়ে ২ উইকেটে ১০৮ রান তুলে ফেলেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু এর পরই শুরু হয় অবিশ্বাস্য সব কাণ্ড। মিড উইকেট দিয়ে উড়িয়ে মারা বলটি নিশ্চিতভাবেই উড়ে যাচ্ছিল ছক্কা হয়ে, কিন্তু ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার ওরাম দড়ির ওপর দাঁড়িয়ে তাঁর বিশাল হাত দিয়ে কোনো রকমে তালুবন্দি করেন সেটা, আউট হয়ে যান জ্যাক ক্যালিস। পরের ওভারেই ফাফ দু প্লেসির পাগলামিতে রানআউট হন অন্য প্রান্তের সেট ব্যাটসম্যান এবি ডিভিলিয়ার্স, তারপর যথারীতি লেগে যায় মড়ক। ৬৪ রানের মধ্যে ৮ উইকেট হারিয়ে হাতের মুঠোয় থাকা ম্যাচটা হেরে বসে দক্ষিণ আফ্রিকা। * ইংল্যান্ডের সঙ্গে ভারতের ম্যাচে ইয়ান বেলের বিপক্ষে আম্পায়ারের দেওয়া এলবিডাব্লিউর সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা হলে রিভিউয়ের সময় আম্পায়াররা প্রয়োগ করেছিলেন ২.৫ মিটার রুল নামে পরিচিত একটি স্বল্প ব্যবহৃত আইন। সে আইন অনুসারে রিপ্লেতে বল স্টাম্পে লাগবে বলে মনে হলেও পায়ে বল লাগার সময় ব্যাটসম্যান যদি স্টাম্প থেকে ২.৫ মিটারের চেয়ে বেশি দূরত্বে থাকেন, তাহলে এলবিডাব্লিউ দেওয়া যাবে না। ওই ঘটনার পর ভারতের আপত্তির মুখে টুর্নামেন্টের মাঝপথেই বাতিল করা হয় এই আইন। ফরম্যাট আয়ারল্যান্ডের বিস্ময়কর সাফল্যের পরও আগের বিশ্বকাপে ১৬ দলের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখের ছিল না আইসিসির জন্য। এ বিশ্বকাপের আগে তাই দলের সংখ্যা দুটি কমিয়ে করা হয় ১৪। তবে ১৪ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত ২০০৩ বিশ্বকাপ নয়, এ বিশ্বকাপের ফরম্যাট হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ১২ দলকে নিয়ে আয়োজিত ১৯৯৬ বিশ্বকাপের মডেল। ১৪টি দলকে দুই গ্রুপে ভাগ করে রবিন লিগ, তারপর সেরা চারটি করে দলের কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তরণ, সেখান থেকে সেমিফাইনাল এবং সব শেষে ফাইনাল-এই ছিল ফরম্যাট। টুর্নামেন্ট সেরা ৯ ম্যাচে একটি সেঞ্চুরি আর চারটি হাফ সেঞ্চুরিসহ ৩৬২ রান, সঙ্গে বাঁহাতি স্পিনে ২৫.১৩ গড়ে ১৫ উইকেট-বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্স আর দেখাতে পারেননি কেউ। ম্যাচের পর ম্যাচ মিডল অর্ডার সামাল দিয়েছেন যুবরাজ সিং, আর দরকারের সময় এনে দিয়েছেন প্রয়োজনীয় ব্রেক থ্রু। শচীন টেন্ডুলকার, মহেন্দ্র সিং ধোনিদের ছাপিয়ে তাই ভারতের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ছিলেন 'যুবি'। উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের ফাইনালে এমন কিছু করতে পারেননি শচীন টেন্ডুলকার। কিন্তু সতীর্থরা সবাই যে খেলছিলেন লিটল জিনিয়াসের জন্যই! ক্রিকেটের বরপুত্র তিনি; কিন্তু তারা ঝলমলে ক্যারিয়ারটাতেও রয়ে যাচ্ছিল একটা অপূর্ণতা, বিশ্বকাপ না জেতার সেই হতাশা পূরণের সুযোগটি আবার এলো একেবারে নিজের ঘরের মাঠে! জয়ের পর টেন্ডুলকারকে কাঁধে নিয়ে মহেন্দ্র সিং ধোনির কথাগুলো অনেক দিন কানে বাজবে দর্শকদের, 'এই ছোট্ট কাঁধে অনেক বছর তিনি বয়েছেন ভারতের দেড় শ কোটি মানুষের প্রত্যাশার ভার, আজ না হয় ক্ষণিকের জন্য আমরাই কাঁধে নিই তাঁকে!'