• ই-পেপার

আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা থেকে সতর্কতা

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৭২

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

তবে কি তারা কোরআন সম্পর্কে অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? যারা নিজেদের কাছে সৎপথ ব্যক্ত হওয়ার পর তা পরিত্যাগ করে, শয়তান তাদের কাজকে শোভন করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত: ২৪-২৫)

আয়াতদ্বয়ে কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা না করার নিন্দা করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. আয়াতে কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। আর তা থেকে বিমুখ থাকার নিন্দা করা হয়েছে।

২. কিছু মানুষ এমন আছে, যারা কোরআন পাঠ করে কিন্তু কোরআনের মর্ম তাদের অন্তরে প্রবেশ করে না। এটাও নিন্দনীয়।

৩. বুজুর্গ আলেমরা বলেন, গোপন পাপ ও পবিত্রতার প্রতি উদাসীনতার কারণে মানুষ কোরআনের জ্ঞান ও মর্ম থেকে বঞ্চিত হয়।

৪. হাদিসের ভাষ্য মতে, কোরআনের জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়ার আরেকটি কারণ হলো কোরআনের প্রতি উদাসীনতা ও অমনোযোগ।

৫. আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সত্য জানার পর যারা তা উপেক্ষা করে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তারা শয়তানের দলভুক্ত। (তাফসিরুল মুনির : ১৩/৪৪৬)

হাদিসের আলো

অপেক্ষা করলে নামাজের সওয়াব

অপেক্ষা করলে নামাজের সওয়াব

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কারো জামাতে নামাজ আদায়ে নিজ ঘরের নামাজের চেয়ে ২০ গুণেরও অধিক মর্যাদা রয়েছে। কেননা সে যখন

উত্তমরূপে অজু করে মসজিদে আসে, নামাজ আদায় ছাড়া অন্য কোনো অভিপ্রায়ে আসে না, নামাজ ছাড়া অন্য কিছুই তাকে উদ্বুদ্ধ করে না, এমতাবস্থায় তার প্রতি কদমে একটি মর্তবা বৃদ্ধি করা হবে এবং একটি গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। আর ফেরেশতারা তোমাদের সে ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে থাকবেন, যতক্ষণ সে যেখানে নামাজ আদায় করেছেহে আল্লাহ! আপনি তার প্রতি অনুগ্রহ করুন, তার প্রতি রহম করুন। যতক্ষণ না সে সেখানে অজু ভঙ্গ করে, যতক্ষণ না সে সেখানে কাউকে কষ্ট দেয়। তিনি আরো বলেছেন, তোমাদের সে ব্যক্তি নামাজরত বলে গণ্য হবে, যতক্ষণ সে নামাজের অপেক্ষায় থাকে।

(বুখারি, হাদিস : ২১১৯)

 

শিক্ষা

আলোচ্য হাদিসের আলোকে প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন

১. জামাতে নামাজ আদায় করা আবশ্যক। জামাতে নামাজ পড়লে অধিক সওয়াব পাওয়া যায়।

২. নেক আমলের দ্বারা পাপ মার্জনা হয়।

৩. ফেরেশতারা ইবাদতকারীদের জন্য দোয়া করেন।

৪. মসজিদে অজু অবস্থায় থাকা উত্তম।

৫. নামাজের জন্য অপেক্ষা করলেও সওয়াব পাওয়া যায়।

(মাউসুয়াতুল হাদিসিয়্যা)

পবিত্র কাবাঘর ধোয়ার পদ্ধতি ও আসবাব

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
পবিত্র কাবাঘর ধোয়ার পদ্ধতি ও আসবাব

প্রতিবছর মহররম মাসে পবিত্র কাবাঘর ধোয়া হয়। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) মক্কা বিজয় করার পর থেকে কাবাঘর ধোয়ার এই রীতি শুরু হয়েছে। মক্কা বিজয়ের পর তিনি কাবাঘরকে মূর্তিমুক্ত করেন এবং তা ধুয়ে পরিষ্কার করেন। কাবাঘর বিশেষ পদ্ধতিতে ধোয়া হয় এবং তা ধুতে বিশেষ পানি ও উপকরণ ব্যবহার করা হয়।

যেভাবে ধোয়া হয়

কাবাঘরের ধৌত কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় কাবার অভ্যন্তরভাগের মেঝে ঝাড়ু দেওয়ার মাধ্যমে। প্রথমে ভেতরের অংশ ঝাড়ু দিয়ে ধুলো পরিষ্কার করা হয়। এরপর তামার পাত্রে গোলাপজল, গোলাপের সুগন্ধি ও উত্কৃষ্ট উদ মেশানো জমজম পানি প্রস্তুত করা হয়। সেই পানিতে কাপড় ভিজিয়ে কাবাঘরের দেয়াল মোছা হয়। অতঃপর কাবার ভেতরের তিনটি স্তম্ভ এবং এর মেঝে ধোয়া হয়। ধোয়ার পর বিশেষ কাপড় দিয়ে সেগুলো শুকানো হয়। সবশেষে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে কাবার দেয়াল সুগন্ধি ছিটিয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শেষ করা হয়। সুগন্ধি হিসেবে চার তোলা উদ, কয়েক তোলা আম্বর ও গোলাপের সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়। এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেন সৌদি আরবের বাদশাহ অথবা তাঁর প্রতিনিধি।

যেসব আসবাব ব্যবহার করা হয়

কাবাঘর ধুতে ও পরিষ্কার করতে ১০টি পাত্র ও উপকরণ ব্যবহার করা হয়। যেগুলোর বেশির ভাগ তামার তৈরি। তবে কয়েকটিতে রুপা ও কাঠের হাতল ব্যবহার করা হয়েছে। পাত্রগুলোতে ঐতিহ্যবাহী আরব ইসলামী নকশা ও কারুকাজ আছে।

১. জগ : বিশেষভাবে নকশা করা এই জগ ব্যবহার করে কাবাঘরের ভেতরে গোলাপজল ও উদ মেশানো জমজমের পানি ছিটানো হয়। গোলাপজল ও উদের সঙ্গে জমজমের পানি মেশানো হয় পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে।

২. কাপড় ভেজানোর পাত্র : গোলাপজল ও জমজমের পানিতে কাপড় ভিজিয়ে তা দিয়ে দেয়াল মোছা হয়, যেন জমে থাকা ময়লাগুলো দূর হয়ে যায়। কাপড়গুলো ভেজানো হয় চারকোণা বিশেষ পাত্রে। পাত্রটির গায়ে আছে বিশেষ কারুকাজ।

৩. জমজমের পানি রাখার পাত্র : পরিচ্ছন্নতা কাজের সময় পর্যন্ত জমজমের পানি ও গোলাপজল সরবরাহ করার জন্য দুটি চ্যাপ্টা ধরনের চারকোণা বোতল ব্যবহার করা হয়।

৪. পানি মেশানোর পাত্র : গোল একটি বড় বল বা বাটিতে মেশানো হয় গোলাপজল, উদ ও জমজমের পানি।

৫. বিশেষ ধরনের কাপড় : কাবাঘরের দেয়াল পরিষ্কার করতে নরম ও সাদা কাপড় ব্যবহার করা হয়। আকারে এগুলো ছোট হাত রুমালের সমান।

৬. ধূপদানি : কাবাঘর ধোয়ার পর বিশেষ ধরনের সুগন্ধি কাঠের মিশ্রণ পুড়িয়ে ধোঁয়া দেওয়া হয়। আর এই কাজে তামার তৈরি একটি ধূপদানি ব্যবহার করা হয়।

৭. টিস্যু বক্স : পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হাত পরিষ্কার করার জন্য এবং পরিষ্কারের কাজের সহায়ক হিসেবে একটি টিস্যু বক্সও রাখা হয়।

৮. খড়ের ঝাড়ু : কাবাঘরের দেয়াল ও মেঝে পরিষ্কারের জন্য রুপার হাতলযুক্ত চারটি খড়ের ঝাড়ু ব্যবহার করা হয়। এর হাতলে লেখা থাকে : এই সেই মহিমান্বিত কাবা, যার সুগন্ধি মনকে মোহিত করে। আর এর দেয়াল ধৌত হলে যেন তা নুরের জ্যোতিতে আরো দীপ্তিমান হয়ে ওঠে।

৯. মোছার যন্ত্র : কাবাঘরের উঁচু দেয়াল ও হাতের নাগালের বাইরে থাকা স্থান পরিষ্কার করার জন্য রুপার হাতলযুক্ত চারটি বিশেষ মোছার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

১০. শোকানোর কাপড় : কাবা শরিফের মেঝে মোছা ও ধোয়ার পর তা শোকানোর জন্য কাঠের হাতলযুক্ত চারটি বিশেষ কাপড় ব্যবহার করা হয়।

এ ছাড়া উঁচু স্থান পরিষ্কার করার জন্য একটি অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়।

তথ্যসূত্র : সৌদি গেজেট ও সৌদি পিডিয়া

অশ্লীলতার প্রসারে দুনিয়া-আখিরাতে লাঞ্ছনা

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
অশ্লীলতার প্রসারে দুনিয়া-আখিরাতে লাঞ্ছনা

ইসলাম মানবজাতিকে চারিত্রিক পবিত্রতা, শালীনতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। ঈমানের দাবি হলো মানুষের মুখের ভাষা, আচরণ, পোশাক, দৃষ্টি, চিন্তাসবকিছুর মধ্যেই যেন শালীনতা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে। তাই ইসলাম শুধু অশ্লীল কাজকেই হারাম করেনি; বরং অশ্লীলতার প্রচার, প্রসার, স্বাভাবিকীকরণ এবং তাতে সহযোগিতা করাকেও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কারণ অশ্লীলতা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় এবং তা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে অপমান ও লাঞ্ছনার কারণ হয়।

এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই যারা এটা পছন্দ করে যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।

(সুরা : আন-নুর, আয়াত : ১৯)

পবিত্র কোরআনের এই আয়াত প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শুধু অশ্লীল কাজের কথা বলা হয়নি; বরং অশ্লীলতার প্রচার ও প্রসার কামনা করাকেও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ যদি নিজে অশ্লীলতায় লিপ্ত না-ও হয়, কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি করে, যাতে অশ্লীলতা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলেও সেও এ সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে (নাউজুবিল্লাহ!)।

শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য অশ্লীলতার স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। এটা তার অন্যতম বড় কৌশল। যে কৌশলের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেছেন, হে মুমিনরা, তোমরা শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ কোরো না। আর যে শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করবে, নিশ্চয়ই সে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেবে। (সুরা : আন-নুর, আয়াত : ২১)

বোঝা গেল, মানব সমাজে যারা অশ্লীলতা স্বাভাবিকীকরণে কাজ করে, তারা মূলত শয়তানের ফাঁদে পা দিয়েছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই কিছু অশ্লীল শব্দ, বাক্য বা স্লোগান ট্রেন্ড হয়ে যায়। অসংখ্য মানুষ না বুঝেই সেগুলো মিম বা ট্রেন্ড মনে করে শেয়ার করে, মন্তব্যে ব্যবহার করে কিংবা ভিডিও বানিয়ে আরো ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য কোনো বিষয় জনপ্রিয় হওয়াই তার বৈধতার প্রমাণ নয়। মুমিন কখনো এসব কাজে লিপ্ত হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিশাপকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না। (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭)

অনেক ক্ষেত্রে মানুষ মতবিরোধ ও বিতর্কে জেতার জন্য অশ্লীল পথ অবলম্বন করে বসে। অথচ ইসলাম মতবিরোধ ও বিতর্কের ক্ষেত্রেও শালীনতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান করো এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো। (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

অতএব, প্রতিপক্ষ ভুল করলেও তার জবাবে অশ্লীল ভাষা, কুরুচিপূর্ণ উপহাস বা নোংরা শব্দ ব্যবহার করা ইসলামের শিক্ষা নয়। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যও শালীনতা বিসর্জন দেওয়া বৈধ নয়।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অশ্লীলতা ছড়ানো হয় ইন্টারনেটে। অশ্লীল একটি পোস্ট, মন্তব্য বা শেয়ার মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের চিন্তা করা উচিত আমার একটি লাইক, শেয়ার, কমেন্ট ইত্যাদি মানুষের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাচ্ছে কি না? আমি কি নিজের অজান্তেই শয়তানের কোনো পরিকল্পনার অংশ হয়ে যাচ্ছি?

রাসুল (সা.) বলেন, আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ নিয়মের প্রচলন ঘটাবে, তার জন্য তার গুনাহ তো রয়েছেই, অন্যদিকে সে অনুসারে আমলকারীদের গুনাহও তার জন্য রয়েছে। অবশ্য এর কারণে তাদের গুনাহ বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না। (নাসায়ি, হাদিস : ২৫৫৪)

সুতরাং অশ্লীল শব্দ, অশ্লীল কৌতুক, অশালীন ট্রেন্ড কিংবা নোংরা সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার আগে একজন মুমিনের মনে রাখা উচিত কঠিন কিয়ামতের দিনে প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি মন্তব্য এবং প্রতিটি শব্দেরও হিসাব দিতে হবে। মহান আল্লাহ সবাইকে এসব থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।