আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা একটি অত্যন্ত মারাত্মক আধ্যাত্মিক ব্যাধি। ইসলামে এটি কবিরা গুনাহ (মহাপাপ) হিসেবে বিবেচিত। এটি মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে এবং তাঁর প্রতি অবিশ্বাসের মনোভাব সৃষ্টি করে।
আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা কী?
আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণার অর্থ হলো সন্দেহ, অবিশ্বাস ও নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা। ইসলামের পরিভাষায়, যিনি বিশ্বাস ও আস্থার যোগ্য, তাঁর প্রতি আস্থা না রাখা বা তাঁর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করাই কুধারণা।
আর আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা বলতে বোঝায়—এটা মনে করা যে আল্লাহ তাঁর দ্বিনকে সাহায্য করবেন না;
আল্লাহ তাঁর বাণীকে বিজয়ী করবেন না; আল্লাহ বান্দার সব বিষয়ে যথেষ্ট নন; আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না বা দয়া করবেন না। (নাউজুবিল্লাহ)
এসব আল্লাহর প্রতি মারাত্মক কুধারণা, যা মানুষের ওপর আল্লাহর অসন্তোষ ও অভিশাপ ডেকে আনে।
এর বিপরীত হলো আল্লাহ সম্পর্কে সুধারণা রাখা ঈমানি দায়িত্ব। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তাঁর সাহায্য, ক্ষমা, রহমত ও বিজয়ের প্রতিশ্রুতি যে দিয়েছেন, সে ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।
কাজেই যে ব্যক্তি মনে করে যে মিথ্যা ও বাতিল চিরকাল সত্যের ওপর বিজয়ী থাকবে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা পোষণ করে।
প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘জাদুল মাআদ’ এ আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণার বহু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। সেখান থেকে আমাদের সময় ও প্রসঙ্গের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো—
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, বেশির ভাগ মানুষই আল্লাহ সম্পর্কে যথার্থ ধারণা পোষণ করে না। তারা নিজেদের ব্যাপারে এবং অন্যদের ব্যাপারে আল্লাহর ফয়সালা সম্পর্কে কুধারণা করে। এ থেকে শুধু সেই ব্যক্তি মুক্ত থাকতে পারে, যে আল্লাহকে, তাঁর নামসমূহ, গুণাবলি এবং তাঁর অসীম প্রজ্ঞাকে যথাযথভাবে চিনেছে।’ এরপর তিনি বলেন—
১. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া : যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায় এবং তাঁর অনুগ্রহের আশা ছেড়ে দেয়, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে।
২. মনে করা যে সত্য কখনো বিজয়ী হবে না : যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে—আল্লাহ সত্যকে সাহায্য করবেন না, তাঁর দ্বিনকে পূর্ণতা দেবেন না, তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিজয় দেবেন না, বরং বাতিলই স্থায়ীভাবে বিজয়ী থাকবে, সে আল্লাহর মহিমা, প্রজ্ঞা, শক্তি ও পরিপূর্ণতার পরিপন্থী ধারণা পোষণ করেছে।
৩. আল্লাহর ফয়সালার পেছনে প্রজ্ঞা অস্বীকার করা : যে ব্যক্তি মনে করে পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, তা আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী নয়, অথবা আল্লাহ কোনো গভীর প্রজ্ঞা ছাড়াই সবকিছু নির্ধারণ করেছেন, সে আল্লাহর রবুবিয়্যাত, সার্বভৌমত্ব ও অসীম প্রজ্ঞাকে অস্বীকার করেছে।
৪. মনে করা যে আল্লাহ নেককার ও পাপীকে সমানভাবে শাস্তি দেবেন : যে ব্যক্তি মনে করে, আল্লাহ তাঁর একনিষ্ঠ ও সৎ বান্দাদেরও শত্রুদের মতো একইভাবে শাস্তি দেবেন, সে আল্লাহ সম্পর্কে মারাত্মক কুধারণা করেছে।
৫. আখিরাত ও পুনরুত্থান অস্বীকার করা : যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে না যে আল্লাহ মৃত্যুর পর সব মানুষকে পুনরুত্থিত করবেন, সৎকর্মশীলকে পুরস্কৃত করবেন, পাপীকে শাস্তি দেবেন এবং মানুষের সব মতভেদ ও সত্য-মিথ্যার ফয়সালা করবেন, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে।
৬. মনে করা যে আল্লাহ নেক আমল নষ্ট করে দেবেন : যে ব্যক্তি মনে করে যে আল্লাহ তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করা আন্তরিক নেক আমল বিনা কারণে নষ্ট করে দেবেন, অথবা সারা জীবন ইবাদতকারীকে শাস্তি দেবেন, আর যারা সারা জীবন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরোধিতা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করবেন, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে।
৭. দোয়া ও তাওয়াক্কুলের পরও আল্লাহ সাড়া দেবেন না, এমন ধারণা করা : যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে চায়, তাঁর ওপর ভরসা করে, সাহায্য প্রার্থনা করে; তার পরও মনে করে আল্লাহ তাকে নিরাশ করবেন এবং তার দোয়া কবুল করবেন না, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে।
৮. আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার পর অন্য কারো ওপর ভরসা করা : যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার পর কোনো ফেরেশতা, জীবিত বা মৃত মানুষ কিংবা অন্য কাউকে আল্লাহর পরিবর্তে আশ্রয় মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে তারা তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করবে, সে আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করেছে। এ ধরনের বিশ্বাস মানুষকে আল্লাহ থেকে আরো দূরে সরিয়ে দেয় এবং তার শাস্তি বৃদ্ধি করে।