• ই-পেপার

কোরআন থেকে শিক্ষা

  • পর্ব-১১৬৮

রাশিয়ায় আরবি ভাষা শিক্ষা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক গোলটেবিল বৈঠক

ইসলামী জীবন ডেস্ক
রাশিয়ায় আরবি ভাষা শিক্ষা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক গোলটেবিল বৈঠক

অনারবিভাষীদের জন্য আরবি ভাষা শিক্ষাকে আরো কার্যকর, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলতে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গোলটেবিল বৈঠক। রাশিয়ার মুসলিমদের কেন্দ্রীয় ধর্মীয় প্রশাসনের অধিভুক্ত রাশিয়ান ইসলামিক ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে রাশিয়া, ভারত, জর্দান, গিনিসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বিভিন্ন শিক্ষাগত প্রেক্ষাপটে অনারবিভাষীদের আরবি শিক্ষাদান : আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতার সম্ভাবনা শীর্ষক এই আন্তর্জাতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে রাশিয়ান ইসলামিক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. রুসলান সিয়াখভ আন্তর্জাতিক একাডেমিক সম্পর্ক জোরদার এবং যৌথ শিক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী আরবি ভাষা শিক্ষার মানোন্নয়নে আন্তর্দেশীয় সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়ের কোনো বিকল্প নেই।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদেশি ভাষা হিসেবে আরবি শিক্ষাদানের বিভিন্ন মডেল বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষণ-পদ্ধতির উন্নয়ন নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন। ভারতের মাদিন ইসলামিক কালচার ইউনিভার্সিটির বহিঃসম্পর্ক বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. আব্দুল জলিল আল-আজহারি আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থায় আরবি ভাষা শিক্ষাদানে ভারতের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি বহুভাষিক সমাজে আরবি শিক্ষার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে রাশিয়ান ইসলামিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময়, প্রশ্নোত্তর এবং আরবি ভাষা শিক্ষা ও ইসলামী অধ্যয়নের সমসাময়িক ধারা সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পান। আন্তর্জাতিক অতিথিরা অনুষ্ঠানের উচ্চমানের আয়োজনের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও আরবি ভাষা শিক্ষা ও ইসলামী অধ্যয়নের ক্ষেত্রে রাশিয়ান ইসলামিক ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সূত্র : আলোকা নেটওয়ার্ক

অহেতুক বিতর্কে বহু ধরনের ক্ষতি

আশরাফুন নাঈম
অহেতুক বিতর্কে বহু ধরনের ক্ষতি

তর্কপ্রিয় মানুষ মহান আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হলো কঠিন ঝগড়াটে ব্যক্তি।

(বুখারি, হাদিস : ২৪৫৭)

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তর্ক করে না, তার জন্য পরকালীন জীবনে আছে জান্নাত। আবু উমামাহ বাহেলি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের শেষ সীমায় একটি ঘর দেওয়ার জামিন হচ্ছি, যে হক হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া বর্জন করে। ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের মধ্যস্থলে একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যে উপহাসছলেও মিথ্যা বলা বর্জন করে। আর ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যার চরিত্র উত্তম। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮০০)

শত্রুতা সৃষ্টি হয় : মন্দ বিতর্কের ফলে কখনো কখনো প্রাচীন বন্ধুত্ব ও সুদৃঢ় বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। কখনো বিপক্ষ দলের ওপর চড়াও হওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। ফলে উভয়ের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়।

কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়া : আল্লাহ তাআলা শবেকদরের মতো মহান রাতের সুনির্দিষ্ট সময়ের বিষয়টি শুধু বিতর্ক বা ঝগড়ার কারণে তুলে নেন। (বুখারি, হাদিস : ৪৯)

শয়তানের সুযোগ সৃষ্টি : বিতর্কের সময় ব্যক্তি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করে। হোক সেটা বৈধ বা অবৈধ উপায়। সেই সুযোগে শয়তান যেকোনো ব্যক্তিকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। এ বিষয়ে মুসলিম ইবনু ইয়াসার বলতেন, তোমরা অবশ্যই ঝগড়া-বিবাদ থেকে সাবধান থাকবে। কেননা এটি একজন আলেমের অজ্ঞতার মুহূর্ত। আর এই মুহূর্তে শয়তান এর দ্বারা তার ত্রুটি বা বিভ্রান্তি কামনা করে।

(সুনানে দারেমি, হাদিস : ৪১৯)

হেদায়েতপ্রাপ্তিতে অন্তরায় : রাসুলুল্লাহ (সা.) বিতর্ক বা ঝগড়াকে হেদায়েতপ্রাপ্তদের বিভ্রান্ত হওয়ার মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। আবু উমামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো সম্প্রদায়ের সুপথপ্রাপ্ত হওয়ার পরে বিভ্রান্ত হওয়ার একটিই কারণ যে তারা ঝগড়া বা বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়ে। অতঃপর রাসুল (সা.) এই আয়াত পাঠ করলেন—‘তারা কেবল তোমার সঙ্গে ঝগড়ার জন্যই এ কথা বলে; বরং তারা হলো ঝগড়াকারী সম্প্রদায়। (সুরা : ঝুখরুফ, আয়াত : ৫৮), (তিরমিজি, হাদিস : ৩২৫৩)

আল্লাহর নিকট ঘৃণিত হওয়া : ঝগড়া বা বিতর্ককারী আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি। রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে ওই ব্যক্তি সবচেয়ে ঘৃণিত, যে অতি ঝগড়াটে। (বুখারি, হাদিস : ২৪৫৭)

আল্লাহর রোষানলে পতিত হওয়া : কোনো অবস্থায়ই অন্যায় বিষয়ে তর্কবিতর্ক করা উচিত নয়। আর যে ব্যক্তি এই কাজ করবে সে আল্লাহর রোষানলে পড়বে। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জেনেশুনে কোনো বাতিল (অন্যায়) বিষয়ে তর্কবিতর্ক করে, সে ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রোষানলে থাকে, যতক্ষণ না সে তা বর্জন করে।

(আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫৯৭)

আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত : যারা অন্যায়ভাবে বিতর্ক বা ঝগড়া করবে তারা আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার আমল পেশ করা হয়, অতঃপর আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, যারা আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে না, তবে ঝগড়াকারী দুই ব্যক্তি ছাড়া। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বলেন, এদের অবকাশ দাও, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে নেয়।

(মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ৭৬২৭)

জাহান্নামে প্রবেশ : তর্কবিতর্কের মতো গর্হিত কাজ যে ব্যক্তির কাছে প্রিয় হয়ে যাবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এ সম্পর্কে একটি হাদিসে এসেছে, জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, তোমরা আলেমদের মাঝে গর্ব করা, অজ্ঞদের সঙ্গে বিতর্ক করা এবং (প্রসিদ্ধ) মজলিস লাভ করার উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা কোরো না। যে ব্যক্তি তা করে (তার জন্য) জাহান্নাম, জাহান্নাম।

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫৪)

পরিশেষে কথা বলা বা বিতর্ক হতে হবে উত্তম পন্থায়। যেন এতে কারো ক্ষতি না হয়। মানসিকভাবে কেউ যেন আঘাত না পায়। কাউকে খাটো করা না হয় বা তাদের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ প্রকাশ না পায়। মহান আল্লাহ বলেন, তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক ভালোভাবেই জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তিনি ভালোভাবেই জানেন কে সুপথপ্রাপ্ত হয়েছে। (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

তুরস্কে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের প্রথম আন্তর্জাতিক বৈঠক

ইসলামী জীবন ডেস্ক
তুরস্কে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের প্রথম আন্তর্জাতিক বৈঠক

তুরস্কের গাজিয়ানতেপ শহরে ইসলামী বিশ্বের উচ্চশিক্ষা খাতে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধানদের আন্তর্জাতিক পরামর্শমূলক সভায় বিশ্বের ৪৩টি দেশের ৭০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী ১০০ জনেরও বেশি উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অংশ নিয়েছেন।

এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা। পাশাপাশি যৌথ গবেষণা সম্প্রসারণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই একাডেমিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।

সম্মেলনের ফাঁকে সৌদি আরব, ফিলিস্তিন, মিসর, লিবিয়া, লেবানন, ভারত, থাইল্যান্ড, সার্বিয়া, গাম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের মধ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে একাডেমিক সহযোগিতার পরিধি আরো বিস্তৃত করা, গবেষণাভিত্তিক অংশীদারি গড়ে তোলা এবং ইসলামী বিশ্বের উন্নয়নে যৌথ বৈজ্ঞানিক প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল গাজা উপত্যকার শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা। অংশগ্রহণকারী শিক্ষাবিদরা যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের মধ্যেও গাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তুরস্কের উচ্চশিক্ষা পরিষদের প্রধান গাজার বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে দাঁড়াতে ইসলামী বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের আহবান জানান। তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও যেন গাজার শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ ও কার্যকর সহযোগিতা জরুরি।

 

স্কিল ডেভেলপমেন্টও যেভাবে ইবাদত হতে পারে

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
স্কিল ডেভেলপমেন্টও যেভাবে ইবাদত হতে পারে

বর্তমান বিশ্বে দক্ষতা (স্কিল) একটি বড় সম্পদ। শুধু ডিগ্রি নয়, বরং কর্মদক্ষতাও মানুষকে সামাজিক ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী করে। ইসলামের দৃষ্টিতে উপকারী জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন শুধু দুনিয়াবি সফলতার উপায় নয়; বরং তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত থাকলে, তা ইবাদতেও পরিণত হতে পারে। বুখারি শরিফের প্রথম হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমল (এর প্রাপ্য হবে) নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভের অথবা কোনো মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে, তবে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে, যে জন্য সে হিজরত করেছে। (বুখারি, হাদিস : ১)

পবিত্র কোরআন মানুষকে ঈমান-তাকওয়ার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও উৎপাদনশীলতার শিক্ষা দেয়। মানুষ যে বিষয়ে সাধনা করে, চেষ্টা করে, মহান আল্লাহ তাকে সে বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ সহজ করে দেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, আর এই যে মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়। (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩৯)

মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের একেকজনকে একেক জগতে দক্ষতা দেন। একেকজনের মধ্যে একেক গুণ দিয়ে দেন, যা পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় অতি জরুরি। তাই তো রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী তাঁদের গড়ে তুলতেন। যেমনতিনি যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর প্রখর মেধা ও আমানতদারি দেখে তাঁকে ওহি লেখার দায়িত্ব দেন এবং বিদেশি ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। পরবর্তীকালে তিনি কোরআন সংকলনের মতো ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। এটি প্রমাণ করে, ভাষা ও প্রশাসনিক দক্ষতাও ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ২/৪২৮-৪২৯, তাহযীবুল আসমা ওয়াল-লুগাত : ১/২০০২০১; আসহাবে রাসুলের জীবনকথা : ৪/৭৭)

এমনিভাবে মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে বিভিন্ন দক্ষতা অর্জন করেন। ফলে মহান আল্লাহ তাঁকে বহু গুণে গুণান্বিত করেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন মুফতি, প্রাদেশিক গভর্নর, দূত, সাহসী সেনাপতি, বিজয়ী যোদ্ধা, জাকাত উসুলকারী, মজলিসে শুরার সদস্য ও কোরআন-হাদিসের শিক্ষক। তাঁর ব্যাপারেই রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে শরিয়তের হালাল-হারাম সম্বন্ধে অধিক বিজ্ঞ মুআজ ইবনে জাবাল। (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ৭/২৭১২৭২, আল-ইসতিআব : ৩/১৪০২১৪০৩, আল-আলাম [জিরিকলী] : ৭/২৫৮)

মহানবী (সা.)-এর আরেক সাহাবি আবু মাহযুরাহ (রা.)। তিনি ছিলেন, মহানবী (সা.)-এর মনোনীত চার মুয়াজ্জিনের একজন। তাঁর অসাধারণ কণ্ঠ ও মেধা দেখে মহানবী (সা.) তাঁকে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং পরবর্তী সময়ে আজান শিক্ষা দেন। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি আজীবন মসজিদে হারামের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/১১৭, সাহাবায়ে কেরামের আলোকিত জীবন, পৃষ্ঠা : ৩৫০)

এতে বোঝা যায়, ইবাদতের ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার গুরুত্ব রয়েছে। পাশাপাশি যাকে দিয়ে ইসলামের যে কাজটা সহজ ও সুন্দর হবে, তাকে সে প্রশিক্ষণ দিয়ে সে দায়িত্বে রাখা উত্তম।

দক্ষতা উন্নয়নের সবচেয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় এক অভাবী ব্যক্তির ঘটনায়। সাহায্য চাইতে এলে রাসুল (সা.) তাকে ভিক্ষা দিয়ে বিদায় করেননি; বরং তার ঘরের কিছু জিনিস বিক্রি করিয়ে একটি কুঠার কিনে নিজ হাতে তাতে হাতল লাগিয়ে দেন এবং কাঠ কেটে বিক্রি করে জীবিকা অর্জনের পরামর্শ দেন। অল্প কিছুদিন পর লোকটি স্বাবলম্বী হয়ে ফিরে আসে, তখন তার কাছে ১০ দিরহাম ছিল। সে তার নিজের উপার্জিত অর্থের বিনিময়ে কাপড় ও খাবার কিনেছিল।

(আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৪১ অবলম্বনে)

এ ঘটনার মাধ্যমে নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন, সাময়িক সাহায্যের চেয়ে মানুষের স্কিল ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থা করে তাদের আত্মনির্ভর করে তোলা অধিক কল্যাণকর।

বর্তমান যুগের মুসলমানদের জন্য ইসলামের ফরজ জ্ঞানের পাশাপাশি প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভাষা শিক্ষা, ব্যবসা, কৃষিসব খাতের জ্ঞান অর্জন করাই গুরুত্বপূর্ণ। হ্যাঁ একজন ব্যক্তির জন্য সব বিষয়ে পারদর্শী হওয়া সম্ভব নয়। তবে যার যে বিষয়ে সম্ভাবনা আছে, তাকে ইসলামের মৌলিক জ্ঞানের পাশাপাশি সে বিষয়ে এগিয়ে দেওয়া সবার দায়িত্ব। প্রত্যেক মুসলমানের ওপর যেমন ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা ফরজ, তেমনি দুনিয়ায় ইসলামের গৌরব সমুন্নত রাখতে জাগতিক জ্ঞানেও স্বনির্ভর হতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইসলামকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে সঠিক পদ্ধতিতে জ্ঞান অর্জন করাও ইবাদত হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। মহান আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।