• ই-পেপার

প্রশ্ন-উত্তর

  • সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৪৬

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

আমি বনি ইসরাঈলকে কিতাব, কর্তৃত্ব ও নবুয়ত দান করেছিলাম। তাদের উত্তম জীবনোপকরণ দিয়েছিলাম এবং দিয়েছিলাম শ্রেষ্ঠত্ব। আমি তাদের সুস্পষ্ট প্রমাণ দান করেছিলাম দ্বিন সম্পর্কে।...এরপর আমি তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি দ্বিনের বিশেষ বিধানের ওপর; সুতরাং তুমি তার অনুসরণ কোরো, অজ্ঞদের খেয়ালখুশির অনুসরণ কোরো না। আল্লাহর মোকাবেলায় তারা তোমার কোনোই উপকার করতে পারবে না। জালিমরা একে অপরের বন্ধু; আল্লাহ মুত্তাকিদের বন্ধু।

(সুরা : জাসিয়া, আয়াত : ১৬-১৯)

আয়াতগুলোতে বনি ইসরাঈলের নিয়ামত লাভ ও তাদের অবাধ্যতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. আয়াতে বনি ইসরাঈলকে দেওয়া পাঁচটি নিয়ামতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে : ক. কিতাব, খ. রাজত্ব, গ. নবুয়ত, ঘ. উত্তম জীবিকা, ঙ. জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব।

২. আল্লাহ উল্লিখিত পাঁচটি নিয়ামত উম্মতে মুহাম্মদিকেও দান করেছেন, বরং আরো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তাদের জগেশ্রষ্ঠ করেছেন।

৩. অধিক নিয়ামত ও নিদর্শন পাওয়ার পরও আল্লাহর অবাধ্য হওয়ায় আল্লাহ বনি ইসরাঈলকে কঠিন শাস্তি দিয়েছেন।

৪. ইসলামী শরিয়তের শ্রেষ্ঠত্ব হলো আল্লাহ একে পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং এতে আছে পূর্ববর্তী শরিয়তগুলোর নির্যাস।

৫. মানবরচিত জীবনবিধান প্রত্যাখ্যাত। বিশেষত ইসলামী শরিয়তের বিপরীতে তা গ্রহণ করা গুরুতর পাপ। (তাফসিরে সাদি, পৃষ্ঠা-৭৭৬)

মসজিদময় জীবন

অন্তর দিয়ে মসজিদের পরিবেশকে অনুভব করা

আব্দুল্লাহ আল-মারূফ
অন্তর দিয়ে মসজিদের পরিবেশকে অনুভব করা

মসজিদ শুধু ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; বরং এটি মুমিনের আত্মিক প্রশান্তির উদ্যান। যখন কোনো বান্দা নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত শুরু করেন, তখন মসজিদের দেয়াল, মেহরাব আর মুসল্লিদের সঙ্গে তাঁর এক অদৃশ্য আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এই অনুভূতি তাঁকে বারবার টেনে আনে আল্লাহর ঘরে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যখন সালাত ও জিকিরের জন্য মসজিদে অবস্থান করে, তখন আল্লাহ তার প্রতি এতটাই আনন্দিত হন, যেমন প্রবাসী ব্যক্তি তার পরিবারে ফিরে এলে তারা তাকে পেয়ে আনন্দিত হয়। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০০)

এখানে (তাওয়াত্বনা) মসজিদে অবস্থান করার অর্থ হলো, মসজিদকে স্বদেশের মতো এমনভাবে ঠিকানা বানিয়ে নেওয়া, যার প্রতি বান্দা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন এবং এখানে অবস্থান করলে তিনি প্রশান্তি লাভ করেন।

আর তাবাশবাশা শব্দটির অথ হলো অত্যন্ত হাসিমুখে ও পরম মমতায় কাউকে বরণ করে নেওয়া।

সন্তান বা প্রিয় কোনো আত্মীয় পাঁচ বছর প্রবাসে কাটিয়ে আজ ঘরে ফিরছে। দরজায় পা রাখতেই মা-বাবা কি তাকে সোফায় বসিয়ে রেখে অন্য ঘরে চলে যান? কখনো না! তারা বরং পরম আদরে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন, সেরা আসনটি দেন, খুশিতে চোখের পানি ফেলেন।

সুবহানাল্লাহ! আপনি-আমি যখন অজু করে মসজিদের দিকে পা বাড়াই, তখন আসমানের মালিক আপনাকে-আমাকে ঠিক সেভাবেই স্বাগত জানান। তখন আমরা আল্লাহর ঘরের সাধারণ কোোন আগন্তুক থাকি না, বরং হয়ে যাই আরশের মালিকের রাজকীয় মেহমান।

যখন আপনি মসজিদের বারান্দায় পা রাখবেন, তখন এই অনুভূতি জাগিয়ে তুলুন যে আমি আল্লাহর মেহমান হিসাবে আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করছি। এরপর মসজিদের পরিবেশকে অন্তর দিয়ে অনুভব করুন। দেখবেন, মসজিদের ফ্যানের শীতল বাতাস বাড়ির ফ্যানের বাতাসের চেয়েও প্রশান্তিময় লাগছে। মনটাকে এমন হালকা ও প্রশান্ত অনুভব করবেন, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। যদি আপনি অনুভূতির শক্তি দিয়ে মসজিদকে এভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, তবে একটি জীর্ণ কুঁড়েঘরের মসজিদও আপনার কাছে রাজপ্রাসাদের চেয়ে বেশি মোহনীয় মনে হবে। এই অনুভূতির চূড়ায় পৌঁছেছিলেন আমাদের পূর্বসূরিরা। প্রখ্যাত তাবেঈ রবি ইবনে খুসাইম (১০-৬৫ হি.) বলেন, ‌‘আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গের চেয়ে মসজিদের চড়ুই পাখির ডাকের মাধ্যমে বেশি প্রশান্তি অনুভব করি।(মাওসুআতুল আখলাক, ১/১৩৩)

প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (১৫-৯৪ হি.) বলেন, ৪০ বছর যাবৎ আমার জামাতের সালাত মিস হয়নি। আর ৩০ বছর যাবৎ মুয়াজ্জিন যখন আজান দিয়েছে, তখন আমি সালাতের জন্য মসজিদে উপস্থিত থেকেছি। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা ৪/২২১)

সুতরাং আমরা যখন অন্তরের চোখ দিয়ে মসজিদের পরিবেশকে পর্যবেক্ষণে অভ্যস্ত হব এবং অনুভব করতে পারব যে আমরা আল্লাহর ঘরের একজন স্থায়ী বাসিন্দা এবং আল্লাহ আমাদের আগমনে আনন্দিত হচ্ছেন, তখন দুনিয়ার কোনো কাজ আমাদের মসজিদের চৌকাঠ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।

থাইল্যান্ডে ব্যতিক্রমী ইসলামী জাদুঘর

আবরার আবদুল্লাহ
থাইল্যান্ডে ব্যতিক্রমী ইসলামী জাদুঘর

মিউজিয়াম অব ইসলামিক কালচারাল হেরিটেজ অ্যান্ড আল-কোরআন লার্নিং সেন্টার থাইল্যান্ডের একটি গৌরবোজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান। দেশটির নারা থিওয়াত শহরে অবস্থিত এই জাদুঘরে ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির বহু নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। তবে এই জাদুঘর ইসলামী ভ্রাতৃত্বের উত্তম নিদর্শনও বটে। কেননা এখানে কোরআনের এমন বহু প্রাচীন অনুলিপি আছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম ও রাজপরিবারের সদস্যরা ওয়াকফ ও দান হিসেবে দিয়েছে। এখানে ভারত, ইরান, ইয়েমেন, মিসর, নাইজেরিয়া, ব্রুনাই ও স্পেনের প্রাচীন নিদর্শন আছে। জাদুঘরটি ২০২৪ সালে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

জাদুঘরের কর্মকর্তা নিক ইলহাম বলেন, জাদুঘরে বর্তমানে কোরআন ও হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপির মোট ১৮৪টি সংগ্রহ আছে, যেগুলোর বয়স ১০০ বছর থেকে শুরু করে এক হাজার বছরেরও বেশি। এসব সংগ্রহের বিশেষত্ব শুধু তাদের প্রাচীনত্বে নয়, বরং অধিকাংশ পাণ্ডুলিপি আলেম ও রাজপরিবারের বংশধরদের ওয়াকফকৃত। এগুলো কিনে সংগ্রহ করা হয়নি।

মালয়েশিয়া থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান নিদর্শনগুলোর মধ্যে আছে প্রখ্যাত আলেম টুক কেনালি (রহ.)-এর একটি পাণ্ডুলিপি, যার বয়স আনুমানিক ১৬০ বছর। এ ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত কোরআনের একটি অনুলিপিও এখানে সংরক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপি দুটি মালয়েশিয়ার কেলান্তান অঙ্গরাজ্যের কুবাং কেরিয়ানের একটি পণ্ডুক (ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো অতীত কাল থেকেই স্থানীয় আলেমদের কোরআনি জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রচারের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার প্রমাণ।

জাদুঘরে প্রখ্যাত আলেম শায়খ দাউদ ফাতানি (রহ.)-এর হাতে লেখা একটি বই আছে, যার বয়স দুই শ বছরেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। এই পাণ্ডুলিপির বিশেষত্ব হলো, এর কিছু লেখায় সোনার অলংকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন রঙের কালি তৈরি করা হয়েছে ফুলের প্রাকৃতিক নির্যাস থেকে।

মালয় উপদ্বীপের নিদর্শনের পাশাপাশি জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে মালয় অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন কোরআনের অনুলিপি, যা প্রায় চার শ বছর আগে শায়খ নুরুদ্দিন আর-রানিরি প্রস্তুত করেছিলেন। এ ছাড়া স্পেনের ঐতিহাসিক অঞ্চল আন্দালুসিয়া থেকে প্রাপ্ত একটি পাণ্ডুলিপিও রয়েছে, যার বয়স প্রায় আট শ বছর।

জাদুঘরে এমন কিছু ব্যতিক্রমধর্মী সংগ্রহও রয়েছে, যেগুলো গাছের বাকল ও পশুর চামড়ার ওপর প্রস্তুত করা হয়েছে। নিক ইলহাম বলেন, এসব মূল্যবান সংগ্রহের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে ইসলামী শিক্ষা উন্নয়ন এবং জ্ঞান সংরক্ষণের প্রচেষ্টা কখনোই জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। যদিও জাদুঘরটি দক্ষিণ থাইল্যান্ডে অবস্থিত, তবু এর প্রতিটি প্রদর্শনীকক্ষে মালয় অঞ্চলের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চেতনা সমুন্নত রাখা হয়েছে। মালয় আলেম ও রাজপরিবারের উত্তরসূরিদের প্রদর্শিত ওয়াকফর এই চেতনা জাদুঘরটিকে শুধু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং অত্র অঞ্চলের ইসলামী ঐতিহ্যের ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই জাদুঘর এমন এক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে, যা যুগের পর যুগ ধরে সযত্নে লালিত, সংরক্ষিত এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এটি শুধু অতীতের স্মারক নয়; বরং সমগ্র মালয় অঞ্চলের ইসলামী জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং ওয়াকফভিত্তিক সভ্যতার ধারাবাহিকতার এক জীবন্ত সাক্ষ্য।

তথ্য সূত্র : স্ট্রেইট টাইমস ও মালয় মেইল

প্রাপ্ত রিজিক ও তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট না থাকার ক্ষতি

হাবিবুল্লাহ ফারহান
প্রাপ্ত রিজিক ও তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট না থাকার ক্ষতি

তাকদির অনুযায়ী যখন কোনো কিছু সংঘটিত হয়, তখন তাকে বলা হয় তাকদিরের ফয়সালা। তাকদিরের ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করাকে শরয়ি ভাষায় রিজা বলে।

আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার অর্থ হলো মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদিরের ব্যাপারে অন্তরকে প্রশান্ত রাখা, প্রফুল্লচিত্ত থাকা এবং মানসিকভাবে ব্যথিত না হওয়া। যদিও আপতিত বিপদকে সে অপছন্দ করে।

এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে যা কিছু নির্ধারণ করেছেন, সেটা ভালো হোক বা মন্দ হোক, পছন্দনীয় হোক বা অপছন্দনীয় হোক, সে ব্যাপারে মনের মধ্যে কোনো অভিযোগ না রাখা এবং অস্থির না হয়ে সেটাকে নির্দ্বিধায় ও প্রশান্তচিত্তে মেনে নেওয়া। আর এটা বিশ্বাস করা যে আমাদের সার্বিক জীবনে আগত আনন্দ-বেদনা, রোগ-শোক, বিপদাপদ এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সবকিছুই আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত তাকদিরের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের দ্বিন-দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর সিদ্ধান্তই আমাদের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর ও ইনসাফপূর্ণ।

একই কথা রিজিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহ বান্দাদের জন্য রিজিক বণ্টন করে থাকেন। মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত রিজিকের প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে তার জীবিকায় বরকত লাভ হয়। পক্ষান্তরে ওই রিজিকের ওপর সন্তুষ্ট না হলে জীবিকার বরকত চলে যায়।

রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ বান্দাকে প্রদত্ত জিনিসের মাধ্যমে পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে যদি সে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন এবং তা বৃদ্ধি করে দেন। আর যদি সন্তুষ্ট না থাকে, তাহলে তাতে বরকত দেন না। (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২০২৭৯; সহিহুল জামে, হাদিস : ১৮৬৯)

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সর্বাবস্থায় শোকরগুজার বান্দা হিসেবে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।