বিজ্ঞানী তোরাব আলী বিশেষত্বহীন এক নির্জন বিকেলে টিথকাটার আবিষ্কার করে ফেললেন। দেখতে অনেকটা নেলকাটারের মতোই। তবে এর সঙ্গে একটা চিকন বৈদ্যুতিক তার যুক্ত আছে, কানেক্ট করে নির্ধারিত বাটনে চাপ দিলেই এ ডিভাইস নিপুণ কায়দায় মানুষের বর্ধিত দাঁত কেটে ফেলতে শুরু করবে বলে বিজ্ঞানী তোরাব আলী আমাকে জানালেন। আমি যারপরনাই হতাশ ভঙ্গিতে বললাম, 'দাঁত তো চুল বা নখের মতো বড় হয় না যে এর বর্ধিতাংশ কাটতে টিথকাটার আবিষ্কার হবে!' কথাটা শুনেই তাঁর চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল, কোঁকড়ানো চুলগুলো আরো খানিকটা কুঁকড়ে গেল, দিশাহারা কণ্ঠে বললেন, 'আরে তাই তো! দাঁত তো বড় হয় না! দেখুন কাণ্ড, একদমই মাথায় ছিল না বিষয়টা। কী করা যায় বলুন তো!' এই হলো শখের বিজ্ঞানী তোরাব আলী। সপ্তাহান্তে একটা করে নতুন কোনো আবিষ্কার তাঁর নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেসব আবিষ্কারের বেশির ভাগই আবার ভয়াবহ রকম অপ্রায়োগিক। এই তো গত সপ্তাহে, বলা নেই কওয়া নেই আগুন জ্বলে না এমন এক ধরনের বিরল ম্যাচ আবিষ্কার করে বসলেন। ঘণ্টাখানেক নানা কসরত করেও আগুন জ্বালাতে ব্যর্থ হন। পরে জানা গেল মূল রহস্য- 'কী! জ্বলল আগুন?' বৃত্তাকার মুখজুড়ে তাঁর বিজয়ীর হাসি। বললাম, 'না, জ্বলল না তো! কী ম্যাচ বানালেন, জ্বলছে না?' 'হা হা হা, এটাই তো আবিষ্কার! কাঠি আছে, বারুদ আছে কিন্তু আগুন? উঁহু! জ্বলবে না! ভালো না ব্যাপারটা?' রাগে-ক্ষোভে মাথা ফোরটুয়েন্টি হয়ে গেছিল। ইচ্ছা করছিল এক ধাক্কায় তাঁকে ড্রেনে ফেলে দিই, অযথাই আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করলেন। আর এবার প্রয়োজনহীন টিথকাটার আবিষ্কারে তোরাব আলীর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে আমি ঘরে ফিরলাম। নেঙ্ট টাইম তাঁর আর কোনো বিরল আবিষ্কারের দর্শক হতে আমাকে যেন আমন্ত্রণ না জানানো হয়, শক্ত করে সে কথাও বলে এলাম। কিন্তু সন্ধ্যা নাগাদ আবারও তাঁর ফোন পেয়ে বিরক্ত হওয়ার বদলে আমার খানিকটা মায়াই হলো। ফোন রিসিভ করে জানতে পারলাম, টিথকাটার আবিষ্কার নাকি বৃথা যায়নি। বললেন, প্রমাণ চাইলে এখনই যেন তাঁর বাসায় চলে যাই। যেতেও হলো, কারণ আবিষ্কারটাকে কিভাবে অর্থবহ করে তোলা হলো জানতে আগ্রহ হচ্ছিল। গিয়ে দেখি হুলস্থুল ব্যাপার। মুখ বন্ধ রাখার পরও অন্তত আধা ইঞ্চি করে দাঁত বেরিয়ে আছে-এমন জনা পাঁচ খরগোশদন্ত লোক গোমড়ামুখে সোফায় বসে আছে। বিজ্ঞানী তোরাব আলীকে যথেষ্ট উত্তেজিত মনে হলো। 'এই যে এসে গেছেন, দেখুন এদের। প্রত্যেকেই এরা নিজেদের বর্ধিত দাঁত নিয়ে বিব্রত জীবন যাপন করে আসছিল। এখন আপনিই বলুন, ওই সমস্যা নিরসনে আমার এ আবিষ্কার ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হবে কি হবে না?' আমাকেও স্বীকার করে নিতে হলো, 'এ জাতীয় লোকদের জন্য তোরাব আলীর এমন আবিষ্কারের বিকল্প ছিল না।' চিকন তারটি বৈদ্যুতিক সকেটে লাগিয়ে টিথকাটারের বাটনে চাপ দিলেন তোরাব আলী। মুহূর্তেই ডিভাইসটি থেকে কলিজা শুকিয়ে আসার মতো বীভৎস এক ধরনের শব্দ নির্গত হলো। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সবার আগে তোরাব আলীই মেঝেতে ছিটকে পড়লেন। খরগোশদন্ত পাঁচ গিনিপিগের তিনজনই দৌড়ে পালাল। মোর দ্যান বর্ধিত দাঁতের অধিকারীদ্বয় হয়তো বিপরীত প্রভাবে কানে কিঞ্চিৎ খাটো, তাই তারা মেঝে থেকে উঠে আবারও সোফায় গিয়ে বসল। পরিস্থিতি সামলে আবারও তারটিকে সকেটে লাগাতে গেলে বিদ্যুৎ চলে গেল। আধা পাগল বিজ্ঞানী এবং তাঁর অবশিষ্ট দুই গিনিপিগের সঙ্গে একটা অন্ধকার রুমে বসে আছি এখন। ১০ মিনিট ধরে মোমবাতি জ্বালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন তোরাব। কিন্তু কিছুতেই সফল হচ্ছেন না, কারণটা এই অন্ধকারেও আমি স্পষ্টই অনুমান করতে পারছি। আমি বাজি ধরতে পারি, তাঁর হাতে এখন তাঁরই গত সপ্তাহের দুর্লভ আবিষ্কার-নিষ্ফল ঘষাঘষির বিশেষ ধরনের ওই ম্যাচটা লুটোপুটি খাচ্ছে।